আন্তজার্তিক ডেস্ক: পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলার পর বন্দুকযুদ্ধে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৬জন মুসল্লি ও ১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও অর্ধ শতাধিক মানুষ।
আজ শুক্রবার(১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জুমার নামাজের সময় আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের কোহাটে পুলিশ সদর দপ্তরের ভেতরে অবস্থিত একটি মসজিদে এ হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি মসজিদের প্রবেশ পথে ধাক্কা দিলে এ ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) একটি উপদল ইত্তেহাদুল মুজাহিদিন হামলার এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। সংগঠনটির নেতৃত্বে রয়েছেন হাফিজ গুল বাহাদুর। জঙ্গি সংগঠনটি জানিয়েছে, এটি ছিল আত্মঘাতী বোমা হামলা।
প্রাদেশিক পুলিশের প্রধান জুলফিকার হামিদও নিশ্চিত করে বলেছেন, বিস্ফোরণটি আত্মঘাতী হামলা ছিল। বিস্ফোরণের পর কয়েকজন বন্দুকধারী পুলিশ কম্পাউন্ডে ঢোকার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাদের গুলিবিনিময় শুরু হয়।
সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে চিকিৎসক তাহির শাহ জানিয়েছেন, হামলার পর প্রাথমিকভাবে অন্তত ১৫টি মরদেহ এবং ৫০ জনের বেশি আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
আল জাজিরাকে দেওয়া বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, আহতের সংখ্যা অন্তত ৭৫।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকাজে নিয়োজিত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিলাল ফয়জি জানিয়েছেন, আহতদের বেশির ভাগই ছিলেন মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লি।
বিস্ফোরণে মসজিদটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ স্টেশনের বাইরের দেয়ালের একটি অংশও ধসে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের শব্দ আশপাশের বেশ দূরবর্তী এলাকা থেকেও শোনা গেছে।
ইসলামাবাদ থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক কামাল হায়দার জানিয়েছেন, সংঘর্ষে হামলাকারীদের মধ্যে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে যে, তারা টিটিপি ও হামলা পরিচালনাকারী অন্যান্য গোষ্ঠীকে আফগান ভূখণ্ডে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিচ্ছে। তবে কাবুল এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। টিটিপি আফগানিস্তানে ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসা তালেবানের সঙ্গে সরাসরি একই সংগঠন নয়। তবে দুই পক্ষের মধ্যে মিত্রতা রয়েছে।
কামাল হায়দার বলেন, “কোহাট আফগান সীমান্তের কাছাকাছি। অশান্ত উত্তর ওয়াজিরিস্তান অঞ্চলে যাওয়ার প্রধান শহর এটি। একই সঙ্গে বান্নু ও ডেরা ইসমাইল খানের পথেও কোহাট পড়ে—গত কয়েক মাসে এসব এলাকায় আমরা প্রাণঘাতী হামলা দেখেছি।”
কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের ভিজিটিং অধ্যাপক এবং আফগানিস্তানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক প্রতিনিধি মাইকেল সেমপলের মতে, এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর লক্ষ্য পাকিস্তান সরকারকে “উৎখাত করা”।
আল জাজিরাকে সেমপল বলেন, কোহাটের মতো জটিল ও সুসংগঠিত হামলা পরিকল্পনা, রসদ এবং প্রশিক্ষণ ছাড়া পরিচালনা করা সম্ভব নয়। “মূলত, এটি এমন একটি ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে, যেখানে আফগান তালেবান আল-কায়েদা এবং টিটিপির বিভিন্ন গোষ্ঠীকে এ ধরনের হামলার প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য আশ্রয় দিচ্ছে।” দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সীমান্তের দুই পাশে মাঝেমধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও ঘটছে।
কোহাটের মসজিদে এই হামলার এক দিন আগেই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হাঙ্গু জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বহরে সড়কের পাশে পেতে রাখা বোমা বিস্ফোরিত হয়। ওই ঘটনায় ছয় সেনা সদস্য নিহত হন।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের সরকারি বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে টিটিপির সদস্য বলে সন্দেহ করা ১০ জন যোদ্ধাকে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী ও পুলিশ।
মসজিদে বোমা হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি উদ্ধার তৎপরতা আরও দ্রুত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে হামলাকারীদের কর্মকাণ্ডকে “কাপুরুষোচিত কর্মকাণ্ড” হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ধরনের হামলা “জাতির দৃঢ় সংকল্পকে” দুর্বল করতে পারবে না।




