*৮০০ একরে শিল্পনগরী; ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ
রাজিব শর্মা: দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের অপেক্ষা, নীতিগত জটিলতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহুল প্রতীক্ষিত চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) বাস্তবায়নের দৃশ্যমান যাত্রা শুরু হচ্ছে আজ। প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক শিল্পাঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ারা উপজেলার নির্ধারিত প্রকল্প এলাকায় আজ সোমবার সকাল ১০টায় আনোয়ারায় প্রকল্প এলাকায় এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান হবে। এতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ব্যবসায়ী নেতাসহ দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হওয়াকে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে উন্নত টেক্সটাইল, তৈরি পোশাকের কাঁচামাল, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে উঠবে।এখানে শুধু চীনা কোম্পানিই নয়, দেশীয় ও অন্যান্য বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও শিল্প স্থাপনের সুযোগ পাবেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শিল্পাঞ্চলটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে নতুন পরিচয় পাবে। শিল্পাঞ্চলটিকে কার্যকর করতে সরকার ইতোমধ্যে প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর আওতায় নির্মিত হবে বহুমুখী জেটি, জেটি সংযোগ সড়ক, চার লেনের মহাসড়ক, সেতু, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা, জলাধার এবং নিরাপত্তা প্রাচীর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক এসব অবকাঠামো নির্মিত হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম অনেক সহজ হবে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এর কৌশলগত অবস্থান। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় কাঁচামাল আমদানি এবং প্রস্তুত পণ্য রপ্তানিতে সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও শিল্প উদ্যোক্তা মাহবুবুল আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রিক শিল্পায়নের যে সম্ভাবনার কথা দীর্ঘদিন বলা হচ্ছিল, এই প্রকল্প তার বাস্তব রূপ দিতে পারে। শিল্পাঞ্চলটি চালু হলে শুধু চীনা নয়, অন্যান্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও আগ্রহ বাড়বে। রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, স্থানীয় শিল্প নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।’
বাংলাদেশ গার্মেন্টস শিল্প সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমানে পোশাক শিল্পের অধিকাংশ কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি করতে হয়। অর্থনৈতিক অঞ্চলে যদি চীনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কারখানা স্থাপন করে, তাহলে লিড টাইম কমবে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাবে। তাঁর মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শিল্পায়নের গতি বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হবে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পের সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এই অর্থনৈতিক অঞ্চল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বর্তমানে অধিকাংশ কাঁচামাল ও আনুষঙ্গিক উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় এবং সরবরাহ সময়Ñদুটিই বেড়ে যায়। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে, তাহলে স্থানীয়ভাবেই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল পাওয়া যাবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে, সরবরাহের সময় কমে আসবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই শিল্পাঞ্চলে শুধু চীনা বিনিয়োগকারী নয়, দেশীয় এবং অন্যান্য বিদেশি উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। উন্নত টেক্সটাইল, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স, তথ্যপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প এখানে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বহুমুখী শিল্পভিত্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা দেশের শিল্পখাতে যুক্ত হবে।
বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটি ২০৩১ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কাজ নির্ধারিত গতিতে এগোলে প্রথম তিন বছরের মধ্যেই শিল্পাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অংশ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়েই অধিকাংশ শিল্প প্লট উন্নয়ন সম্পন্ন করে সেখানে কারখানা নির্মাণের সুযোগ তৈরি করতে বেজা কাজ করছে, যাতে দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা যায়।
আনোয়ারার স্থানীয় বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে আমরা শুধু এই প্রকল্পের কথা শুনেছি। এবার কাজ শুরু হলে এলাকার তরুণদের চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। হোটেল, পরিবহন, নির্মাণ, ছোট ব্যবসা -সবখানেই নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।’
ব্যবসায়ী আবদুল মান্নান বলেন, ‘শিল্পাঞ্চল হলে শুধু বড় কারখানাই হবে না, এর সঙ্গে হাজারো ছোট ব্যবসাও গড়ে উঠবে। তবে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’ তবে প্রত্যাশার পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের মতে, শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা,কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং কর্ণফুলী নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলছেন, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক মানে না হলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত সংকট তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘এই প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু জমি বরাদ্দ বা অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস, দ্রুত কাস্টমস সেবা, দক্ষ জনশক্তি এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে না পারলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।’
চট্টগ্রামভিত্তিক অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘কর্ণফুলী টানেল, সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং এই অর্থনৈতিক অঞ্চল, এই চারটি অবকাঠামো একসঙ্গে চট্টগ্রামের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তবে শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
উল্লেখ্য প্রকল্পটির ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৬ সালে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন এবং প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটি বছরের পর বছর স্থবির ছিল। পরে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) ডেভেলপার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রকল্পে গতি আসে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও বিনিয়োগ চুক্তির পর নির্মাণকাজ শুরুর পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এটি শুধু চট্টগ্রামের শিল্পায়ন নয়, বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।



