# সরকার বলছে দক্ষতা ও বিনিয়োগ বাড়বে, বন্দর রক্ষাকমিটির দাবি – জাতীয় স্বার্থে বিদেশি ইজারা বন্ধ হোক।
# কাল ০১ জুলাই সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচির ঘোষণা বন্দর রক্ষা কমিটির
রাজিব শর্মা: চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর যুক্ত হলে বন্দরের সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়বে। অন্যদিকে বন্দর রক্ষা কমিটির দাবি, লাভজনক টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানায়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কয়েক দফা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে চুক্তির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে দরকষাকষি চলছে। সরকারের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রমবর্ধমান কনটেইনার চাপ সামাল দিতে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব।
বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রায় দুই দশক আগে নির্মিত এনসিটির অবকাঠামো সক্ষম হলেও ব্যবহৃত অনেক যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা কমে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি পিছিয়ে রয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্ত হলে নতুন প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে জাহাজের অবস্থানকাল কমানো, কনটেইনার হ্যান্ডলিং বৃদ্ধি এবং আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে তারা মনে করছেন।
সরকারি সূত্রটি আরও বলছে, সম্ভাব্য চুক্তি শুধুমাত্র টার্মিনাল পরিচালনা ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। বন্দরের মালিকানা, নিরাপত্তা, জলসীমা, কাস্টমস, গোয়েন্দা নজরদারি ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ সরকারের হাতেই থাকবে। আন্তর্জাতিক ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’ অনুসরণ করে পরিচালনার লাইসেন্স দেওয়া হলেও জমি ও অবকাঠামোর মালিকানা রাষ্ট্রের কাছেই থাকবে। তবে এই উদ্যোগের বিরোধিতা করছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি।
গত রোববার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এনসিটি ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা না দেওয়াসহ পাঁচ দফা দাবি জানায়। একই সঙ্গে আগামী ০১ জুলাই সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সংগঠনের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি- রপ্তানি বাণিজ্যের কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। তাই এর পরিচালনা কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
বন্দর রক্ষা কমিটির দাবি, এনসিটির বর্তমান সক্ষমতা ব্যবহার করেই দেশীয় জনবল বছরে অবকাঠামোগত সক্ষমতার চেয়েও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। ফলে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের যৌক্তিকতা নেই।তারা আরও অভিযোগ করেন, ভবিষ্যতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিচালনার দায়িত্ব গেলে বন্দরের আয়ের একটি বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে দেশের বাইরে চলে যেতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, বন্দরের আশপাশে নৌ বাহিনী, বিমান বাহিনী ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প প্রতিষ্ঠান থাকায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি বন্দর-সংক্রান্ত সব চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ এবং জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এদিকে সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্দর পরিচালনায় অভিজ্ঞ একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্কে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটির দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সরকারের আলোচনা এবং বন্দর রক্ষা কমিটির আন্দোলন দুই দিকেই পরিস্থিতি এগোচ্ছে। ফলে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আগ্রহ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।




