দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় টিকা না পাওয়া ছয় মাস থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে বিশেষজ্ঞ দল। একই সঙ্গে সংক্রমণ বেশি থাকা এবং টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেশি—এমন জেলাগুলোকে চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ৭০ সদস্যের যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল এই সুপারিশমালা উপস্থাপন করে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ নজরদারি পর্যালোচনার অংশ হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, আন্তর্জাতিক টিকা বিতরণ মঞ্চের প্রতিনিধি, দেশি জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এই মূল্যায়ন করা হয়। তাদের মতে, টিকাদানের ব্যর্থতার কারণেই দেশে হামের এই ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিশুর টিকা থেকে বাদ পড়া, ২০২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া, দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের নিয়মিত টিকা থেকে বাদ রাখা এবং উচ্চ জনঘনত্বের বিপরীতে অপর্যাপ্ত সাড়াকে এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল আটটা থেকে রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৩১৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃত্যু হয়েছে সাতজনের। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৬ জনে। এই সময়ে নিশ্চিত হাম ও এর উপসর্গে মোট ১ হাজার ১৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের তথ্যানুযায়ী, হামে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৬৫ শতাংশই মারাত্মক অপুষ্টির শিকার।
গত মার্চে শুরু হওয়া প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার ৫ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত হাম-রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। এরপর নিয়মিত কর্মসূচির পাশাপাশি বাদ পড়া শিশুদের টিকাদান অব্যাহত রাখা হলেও সংক্রমণ থামানো সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের বয়সসীমা দুই বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি ২০২৯ বা ২০৩০ সালের মধ্যে পরবর্তী জাতীয় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা সময়মতো শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রাদুর্ভাব না থামা পর্যন্ত ছয় মাস বয়স হলেই শিশুদের হাম-রুবেলার টিকা দিতে হবে এবং এ বয়সের কাছাকাছি শিশুদের আপাতত পৃথক রাখতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে টিকাদান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ে শিশুদের টিকা কার্ড যাচাই করা এবং বাদ পড়া ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানীয় পরিকল্পনা হালনাগাদের আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ চর্চা নিশ্চিত করা, হালনাগাদ রোগী ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা অনুসরণ করা এবং জ্বর ও র্যাশ থাকা সন্দেহভাজন প্রতিটি রোগীর সাধারণ তথ্য ঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করার তাগিদ দেওয়া হয়।
টিকার কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলা প্রাতিষ্ঠানিক ও মাঠপর্যায়ের ত্রুটিগুলো খতিয়ে দেখতে গবেষণার পাশাপাশি নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের তথ্য পর্যালোচনার কথা বলেছে মূল্যায়ন দল। এ বিষয়ে আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, বিশেষজ্ঞ দলের প্রায় সব সুপারিশই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শিশুদের টিকাদানের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিটি যৌক্তিক। তবে এই সুপারিশে কমিউনিটির সম্পৃক্ততা কিছুটা কম গুরুত্ব পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক ও ওষুধ সহায়তা না দিলে তারা চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসবে না, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।




