এম,সফিউল আজম চৌধুরী: কর্ণফুলী নদী বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান হৃদস্পন্দন এবং চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণশক্তি হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে এটি এক ঐতিহাসিক ও ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সচলতা যে নদীর নাব্যতা বা নব্যতার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল, সেই কর্ণফুলীর মোহনায় বর্তমান অবস্থা এখন কেবল একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অদূরদর্শিতা এবং এক শ্রেণির অসাধু মহলের দুর্নীতির এক করুণ আখ্যানে পরিণত হয়েছে।

নদীর তলদেশে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা পলিথিনের দুর্ভেদ্য আস্তরণ এবং এই নব্যতা রক্ষার নামে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্য দিয়ে চলা বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপচয় নদীটিকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায়, গত এক দশকে কর্ণফুলীর নব্যতা ফিরিয়ে আনার স্লোগান দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে নদীর গভীরতা বাড়ার পরিবর্তে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জাহাজ চলাচলের চ্যানেল আরও সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের শেষ সময় পর্যন্ত কর্ণফুলী ছিল একটি প্রমত্তা ও প্রাকৃতিক গভীরতা সম্পন্ন নদী। তৎকালীন সময়ে বর্তমানের মতো কৃত্রিম ড্রেজিংয়ের এত বিশাল আয়োজন ছাড়াই বড় বড় জাহাজ অনায়াসে জেটিতে ভিড়তে পারত। কারণ তখন উজানের বনভূমি উজাড় হয়নি এবং নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক বা পলিথিনের মতো মরণঘাতী উপাদানের অস্তিত্ব ছিল না। প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নদীকে নিজেই নিজের তলদেশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করত,কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে উন্নয়নের নামে নদীর বুক চিরে গড়ে তোলা অপরিকল্পিত বাঁধ, ব্রিজ এবং শিল্পকারখানা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে শৃঙ্খলিত করেছে।

আজ ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি, সেই চিরযৌবনা কর্ণফুলী এখন ড্রেজিং নামক এক ব্যয়বহুল চিকিৎসার ওপর কৃত্রিমভাবে বেঁচে আছে, যা মূলত একদল অসাধু মানুষের পকেট ভারি করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ​নদীর এই নব্যতা হ্রাসের পেছনে প্রধানত তিনটি ঘাতক কারণ অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

প্রথমত: চট্টগ্রাম মহানগরীর অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন পাহাড় সমান প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য নালা-নর্দমা দিয়ে সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে। বর্তমানে নদীর তলদেশে কোথাও কোথাও ৩ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত পলিথিনের একটি কঠিন ও দুর্ভেদ্য স্তর তৈরি হয়েছে। কারিগরি ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘প্লাস্টিক সেডিমেন্টেশন’, যা মাটির স্বাভাবিক বিন্যাসকে নষ্ট করে সাধারণ ড্রেজারের ব্লেড অকেজো করে দিচ্ছে।

দ্বিতীয়ত: পার্বত্য চট্টগ্রাম ও এর আশপাশ এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কাটার মহোৎসব চলায় বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে আসা বিপুল পরিমাণ বালু ও পলি নদীর মোহনায় স্থায়ীভাবে জমা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে গত এক দশকে বনায়ন হ্রাস পাওয়ায় মাটির ক্ষয় কয়েক গুণ বেড়েছে, যার শেষ গন্তব্য হচ্ছে কর্ণফুলীর মোহনা।

তৃতীয়ত: রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নদীর দুই পাড়ে গড়ে ওঠা প্রায় দুই হাজারেরও বেশি অবৈধ স্থাপনা নদীর প্রশস্ততাকে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করে দিচ্ছে, যা পানির স্বাভাবিক গতিবেগকে ধীর করে দিচ্ছে এবং পলি জমার প্রক্রিয়াকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করছে। ​বর্তমান সময়ে এই সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ কারিগরি প্রভাব এবং এর ফলে উদ্ভূত গাণিতিক ঝুঁকি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি (Sea Level Rise) পাওয়ার ফলে কর্ণফুলীর মোহনায় লোনা পানির ‘ব্যাকওয়াশ এফেক্ট’ তৈরি হচ্ছে। সমুদ্রের লোনা পানি নদীর মিঠা পানির চেয়ে ভারী হওয়ায় তা তলদেশ দিয়ে দীর্ঘপথ উজানে প্রবেশ করছে। এই প্রক্রিয়ায় সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ সূক্ষ্ম বালু বা ‘কোস্টাল সেডিমেন্ট’ নদীর ভেতরে ঢুকে পড়ছে।

গাণিতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, নব্যতা হ্রাসের বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে বড় জাহাজের গড় ‘অপেক্ষমাণ সময়’ (Waiting Time) বর্তমানের ৩-৫ দিন থেকে বেড়ে ১০-১২ দিনে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বন্দরে কন্টেইনার জট ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং লজিস্টিক খরচ প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ড্রাফট বা গভীরতা প্রতি এক সেন্টিমিটার কমে যাওয়ার অর্থ হলো একটি জাহাজকে কয়েকশ টন পণ্য কম বহন করতে হওয়া, যা পরোক্ষভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

​কর্ণফুলীর এই করুণ দশাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও সমালোচিত বিষয়টি হলো ড্রেজিং প্রকল্পের নামে ‘টাকার হরিলুট’। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ড্রেজিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নদী থেকে উত্তোলিত পলি বা মাটি নিয়ম অনুযায়ী মোহনা থেকে অনেক দূরে গভীর সমুদ্রে সরিয়ে ফেলার কথা থাকলেও তারা তা করছে না। খরচ বাঁচাতে এবং কারচুপি করতে উত্তোলিত এই মাটি ও পলি নদীর মোহনার খুব কাছেই কর্ণফুলী উপজেলা উপকূলীয় এলাকা এবং নদীর উত্তর পাড়ে উপকূলীয় এলাকার চরের আশপাশে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে জোয়ার-ভাটার প্রবল টানে সেই মাটি পুনরায় মূল চ্যানেলে ফিরে আসছে এবং ড্রেজিং কার্যক্রমটি একটি অন্তহীন ও লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

এই বিষয়ে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং প্রশাসনের একটি অংশের সাথে ঠিকাদারদের আঁতাতই এই সমস্যার মূল কারণ। তিনি মনে করেন, বড় কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া নদীর মোহনার মতো জায়গায় এমন ভয়াবহ ড্রেজিং দুর্নীতি দিনের পর দিন চলতে পারে না। তাঁর দাবি, নদী রক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না রেখে তা মাঠ পর্যায়ে উচ্ছেদ ও খনন কাজে প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

একইভাবে, নদীর এই কৃত্রিম নব্যতা সংকট একটি বিশেষ ‘লাইটারেজ সিন্ডিকেট’ বা জাহাজ ব্যবসায়ীদের পকেট ভারি করছে। নদীর গভীরতা কম থাকলে বড় জাহাজ মূল জেটিতে ভিড়তে পারে না, ফলে বাধ্য হয়ে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করতে হয়। এতে লাইটারেজ জাহাজের ব্যবহার বাড়ে এবং পণ্য খালাসের খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ ড্রেজিংয়ের ব্যর্থতা কেবল দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য নয়, বরং একটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর জন্যও লাভজনক।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, সিঙ্গাপুর বা নেদারল্যান্ডসের রটারডামের মতো বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দরগুলোও পলি সমস্যার মুখোমুখি হয়, কিন্তু তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অত্যাধুনিক সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে নদীর তলদেশ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে। তাদের ড্রেজিং ব্যবস্থা অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং উত্তোলিত বর্জ্য দিয়ে তারা সমুদ্র উপকূলে নতুন ভূমি গঠন করে। অথচ আমাদের দেশে উত্তোলিত মাটি পুনরায় নদীতেই ফিরে যাচ্ছে।

​কর্ণফুলীর এই ড্রেজিং দুর্নীতি ও নদীর দুই পাড়ে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল কাজ করা এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের অভিমত হলো, সংবাদকর্মীরা যখনই এই চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করার চেষ্টা করেন, তখনই তাঁদের ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি করা হয়। তিনি মনে করেন, সাংবাদিকতা কেবল তথ্য উপস্থাপনের নাম নয়, বরং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলে ঝুঁকি নেওয়া। তাঁর মতে, মিডিয়ার একটি অংশকে অর্থের বিনিময়ে হাত করে এই অব্যবস্থাপনাকে আড়াল করা হচ্ছে। সঠিক সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং ব্যবসার এই লুটপাট কোনোদিন বন্ধ হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রশাসনিক নিরাপত্তা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারলে নদী রক্ষার এই সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারবে না।

​এই নব্যতা সংকট নিরসনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (CPA) ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর কর্তৃপক্ষকে কেবল প্রশাসনিক তদারকিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।

প্রথমত: আধুনিক ড্রেজিং কার্যক্রমের আওতায় পলিথিন অপসারণে সক্ষম বিশেষায়িত ‘গ্র্যাব ড্রেজার’ বা অত্যাধুনিক পলিথিন এক্সট্রাক্টর স্থায়ীভাবে সংগ্রহ ও মোতায়েন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত: নদীর তলদেশের পরিবর্তনের ওপর রিয়েল-টাইম নজরদারির জন্য ডিজিটাল মনিটরিং ও নিয়মিত হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত: পলি ও বর্জ্য প্রতিরোধে বন্দর কর্তৃপক্ষকে জিরো টলারেন্স অবস্থানে যেতে হবে এবং মারপোল (MARPOL) কনভেনশন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

চতুর্থত: নদীর কৌশলগত স্থানে ‘সিল্ট ট্র্যাপ’ বা পলি-ফাঁদ নির্মাণ করতে হবে যাতে উজানের বালি মূল চ্যানেলে প্রবেশ করার আগেই কারিগরিভাবে আটকে ফেলা যায়।

পঞ্চমত: আন্তঃসংস্থা সমন্বয় গড়ে তুলে নদী দূষণকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বন্দর ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

​কর্ণফুলীর এই বহুমুখী সংকটের প্রভাব এখন আর কেবল নদী বা বন্দর কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ নেই, এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝার মতো চেপে বসেছে। মোহনায় গভীরতা কমে যাওয়ায় জাহাজগুলোকে জোয়ারের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে এবং লাইটারেজ খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের ওপর দ্রব্যমূল্যের প্রভাব পড়ছে। এমনকি নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়েছে, যার ফলে শহরজুড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। নদীর তলদেশের বর্জ্যের কারণে পানির স্তর দূষিত হওয়ায় এবং লোনা পানির অনুপ্রবেশ বেড়ে যাওয়ায় নগরীর সুপেয় পানির সরবরাহও চরম হুমকির মুখে পড়েছে, যা চট্টগ্রামের সুপেয় পানির প্রধান উৎস হালদা নদীর জন্য হুমকিস্বরূপ। নদী রক্ষায় বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের একাধিক ঐতিহাসিক রায় থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন এখন কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ। আরএস (RS) ও বিএস (BS) জরিপ অনুযায়ী নদীর সীমানা নির্ধারণ করে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করা পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের সুফল মিলবে না।

​কর্ণফুলী নদী কেবল একটি ভৌগোলিক জলাধার নয়, এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এই নদীর মৃত্যু মানে প্রকারান্তরে চট্টগ্রাম বন্দরের পঙ্গুত্ব এবং দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়া। মোহনায় ড্রেজিংয়ের নামে যে পদ্ধতিগত অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড় গড়ে উঠেছে, তা যদি এখনই কঠোর হাতে দমন করা না হয় এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ যদি তাদের বর্ণিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মৃত ও পচা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আজকের প্রজন্মের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নৈতিক স্খলনের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

সময় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, তাই নদী লুণ্ঠনকারীদের হাত থেকে কর্ণফুলীকে মুক্ত করে এর স্বাভাবিক স্রোতধারা ও নব্যতা ফিরিয়ে দেওয়া এখন আর কেবল পরিবেশগত দাবি নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। নব্যতা ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের আগামী দিনের প্রধান অঙ্গীকার। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের চরম দায়বদ্ধ থাকতে হবে। নব্যতাহীন কর্ণফুলী মানেই পঙ্গু চট্টগ্রাম বন্দর, আর পঙ্গু বন্দর মানেই স্থবির বাংলাদেশ। এই সহজ সত্যটি অনুধাবন করে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক: এম,সফিউল আজম চৌধুরী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম।

এম,সফিউল আজম চৌধুরী: কর্ণফুলী নদী বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান হৃদস্পন্দন এবং চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণশক্তি হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে এটি এক ঐতিহাসিক ও ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সচলতা যে নদীর নাব্যতা বা নব্যতার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল, সেই কর্ণফুলীর মোহনায় বর্তমান অবস্থা এখন কেবল একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অদূরদর্শিতা এবং এক শ্রেণির অসাধু মহলের দুর্নীতির এক করুণ আখ্যানে পরিণত হয়েছে।

নদীর তলদেশে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা পলিথিনের দুর্ভেদ্য আস্তরণ এবং এই নব্যতা রক্ষার নামে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্য দিয়ে চলা বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপচয় নদীটিকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায়, গত এক দশকে কর্ণফুলীর নব্যতা ফিরিয়ে আনার স্লোগান দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে নদীর গভীরতা বাড়ার পরিবর্তে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জাহাজ চলাচলের চ্যানেল আরও সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের শেষ সময় পর্যন্ত কর্ণফুলী ছিল একটি প্রমত্তা ও প্রাকৃতিক গভীরতা সম্পন্ন নদী। তৎকালীন সময়ে বর্তমানের মতো কৃত্রিম ড্রেজিংয়ের এত বিশাল আয়োজন ছাড়াই বড় বড় জাহাজ অনায়াসে জেটিতে ভিড়তে পারত। কারণ তখন উজানের বনভূমি উজাড় হয়নি এবং নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক বা পলিথিনের মতো মরণঘাতী উপাদানের অস্তিত্ব ছিল না। প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নদীকে নিজেই নিজের তলদেশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করত,কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে উন্নয়নের নামে নদীর বুক চিরে গড়ে তোলা অপরিকল্পিত বাঁধ, ব্রিজ এবং শিল্পকারখানা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে শৃঙ্খলিত করেছে।

আজ ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি, সেই চিরযৌবনা কর্ণফুলী এখন ড্রেজিং নামক এক ব্যয়বহুল চিকিৎসার ওপর কৃত্রিমভাবে বেঁচে আছে, যা মূলত একদল অসাধু মানুষের পকেট ভারি করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ​নদীর এই নব্যতা হ্রাসের পেছনে প্রধানত তিনটি ঘাতক কারণ অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

প্রথমত: চট্টগ্রাম মহানগরীর অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন পাহাড় সমান প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য নালা-নর্দমা দিয়ে সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে। বর্তমানে নদীর তলদেশে কোথাও কোথাও ৩ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত পলিথিনের একটি কঠিন ও দুর্ভেদ্য স্তর তৈরি হয়েছে। কারিগরি ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘প্লাস্টিক সেডিমেন্টেশন’, যা মাটির স্বাভাবিক বিন্যাসকে নষ্ট করে সাধারণ ড্রেজারের ব্লেড অকেজো করে দিচ্ছে।

দ্বিতীয়ত: পার্বত্য চট্টগ্রাম ও এর আশপাশ এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কাটার মহোৎসব চলায় বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে আসা বিপুল পরিমাণ বালু ও পলি নদীর মোহনায় স্থায়ীভাবে জমা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে গত এক দশকে বনায়ন হ্রাস পাওয়ায় মাটির ক্ষয় কয়েক গুণ বেড়েছে, যার শেষ গন্তব্য হচ্ছে কর্ণফুলীর মোহনা।

তৃতীয়ত: রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নদীর দুই পাড়ে গড়ে ওঠা প্রায় দুই হাজারেরও বেশি অবৈধ স্থাপনা নদীর প্রশস্ততাকে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করে দিচ্ছে, যা পানির স্বাভাবিক গতিবেগকে ধীর করে দিচ্ছে এবং পলি জমার প্রক্রিয়াকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করছে। ​বর্তমান সময়ে এই সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ কারিগরি প্রভাব এবং এর ফলে উদ্ভূত গাণিতিক ঝুঁকি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি (Sea Level Rise) পাওয়ার ফলে কর্ণফুলীর মোহনায় লোনা পানির ‘ব্যাকওয়াশ এফেক্ট’ তৈরি হচ্ছে। সমুদ্রের লোনা পানি নদীর মিঠা পানির চেয়ে ভারী হওয়ায় তা তলদেশ দিয়ে দীর্ঘপথ উজানে প্রবেশ করছে। এই প্রক্রিয়ায় সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ সূক্ষ্ম বালু বা ‘কোস্টাল সেডিমেন্ট’ নদীর ভেতরে ঢুকে পড়ছে।

গাণিতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, নব্যতা হ্রাসের বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে বড় জাহাজের গড় ‘অপেক্ষমাণ সময়’ (Waiting Time) বর্তমানের ৩-৫ দিন থেকে বেড়ে ১০-১২ দিনে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বন্দরে কন্টেইনার জট ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং লজিস্টিক খরচ প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ড্রাফট বা গভীরতা প্রতি এক সেন্টিমিটার কমে যাওয়ার অর্থ হলো একটি জাহাজকে কয়েকশ টন পণ্য কম বহন করতে হওয়া, যা পরোক্ষভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

​কর্ণফুলীর এই করুণ দশাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও সমালোচিত বিষয়টি হলো ড্রেজিং প্রকল্পের নামে ‘টাকার হরিলুট’। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ড্রেজিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নদী থেকে উত্তোলিত পলি বা মাটি নিয়ম অনুযায়ী মোহনা থেকে অনেক দূরে গভীর সমুদ্রে সরিয়ে ফেলার কথা থাকলেও তারা তা করছে না। খরচ বাঁচাতে এবং কারচুপি করতে উত্তোলিত এই মাটি ও পলি নদীর মোহনার খুব কাছেই কর্ণফুলী উপজেলা উপকূলীয় এলাকা এবং নদীর উত্তর পাড়ে উপকূলীয় এলাকার চরের আশপাশে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে জোয়ার-ভাটার প্রবল টানে সেই মাটি পুনরায় মূল চ্যানেলে ফিরে আসছে এবং ড্রেজিং কার্যক্রমটি একটি অন্তহীন ও লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

এই বিষয়ে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং প্রশাসনের একটি অংশের সাথে ঠিকাদারদের আঁতাতই এই সমস্যার মূল কারণ। তিনি মনে করেন, বড় কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া নদীর মোহনার মতো জায়গায় এমন ভয়াবহ ড্রেজিং দুর্নীতি দিনের পর দিন চলতে পারে না। তাঁর দাবি, নদী রক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না রেখে তা মাঠ পর্যায়ে উচ্ছেদ ও খনন কাজে প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

একইভাবে, নদীর এই কৃত্রিম নব্যতা সংকট একটি বিশেষ ‘লাইটারেজ সিন্ডিকেট’ বা জাহাজ ব্যবসায়ীদের পকেট ভারি করছে। নদীর গভীরতা কম থাকলে বড় জাহাজ মূল জেটিতে ভিড়তে পারে না, ফলে বাধ্য হয়ে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করতে হয়। এতে লাইটারেজ জাহাজের ব্যবহার বাড়ে এবং পণ্য খালাসের খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ ড্রেজিংয়ের ব্যর্থতা কেবল দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য নয়, বরং একটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর জন্যও লাভজনক।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, সিঙ্গাপুর বা নেদারল্যান্ডসের রটারডামের মতো বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দরগুলোও পলি সমস্যার মুখোমুখি হয়, কিন্তু তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অত্যাধুনিক সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে নদীর তলদেশ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে। তাদের ড্রেজিং ব্যবস্থা অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং উত্তোলিত বর্জ্য দিয়ে তারা সমুদ্র উপকূলে নতুন ভূমি গঠন করে। অথচ আমাদের দেশে উত্তোলিত মাটি পুনরায় নদীতেই ফিরে যাচ্ছে।

​কর্ণফুলীর এই ড্রেজিং দুর্নীতি ও নদীর দুই পাড়ে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল কাজ করা এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের অভিমত হলো, সংবাদকর্মীরা যখনই এই চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করার চেষ্টা করেন, তখনই তাঁদের ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি করা হয়। তিনি মনে করেন, সাংবাদিকতা কেবল তথ্য উপস্থাপনের নাম নয়, বরং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলে ঝুঁকি নেওয়া। তাঁর মতে, মিডিয়ার একটি অংশকে অর্থের বিনিময়ে হাত করে এই অব্যবস্থাপনাকে আড়াল করা হচ্ছে। সঠিক সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং ব্যবসার এই লুটপাট কোনোদিন বন্ধ হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রশাসনিক নিরাপত্তা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারলে নদী রক্ষার এই সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারবে না।

​এই নব্যতা সংকট নিরসনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (CPA) ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর কর্তৃপক্ষকে কেবল প্রশাসনিক তদারকিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।

প্রথমত: আধুনিক ড্রেজিং কার্যক্রমের আওতায় পলিথিন অপসারণে সক্ষম বিশেষায়িত ‘গ্র্যাব ড্রেজার’ বা অত্যাধুনিক পলিথিন এক্সট্রাক্টর স্থায়ীভাবে সংগ্রহ ও মোতায়েন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত: নদীর তলদেশের পরিবর্তনের ওপর রিয়েল-টাইম নজরদারির জন্য ডিজিটাল মনিটরিং ও নিয়মিত হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত: পলি ও বর্জ্য প্রতিরোধে বন্দর কর্তৃপক্ষকে জিরো টলারেন্স অবস্থানে যেতে হবে এবং মারপোল (MARPOL) কনভেনশন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

চতুর্থত: নদীর কৌশলগত স্থানে ‘সিল্ট ট্র্যাপ’ বা পলি-ফাঁদ নির্মাণ করতে হবে যাতে উজানের বালি মূল চ্যানেলে প্রবেশ করার আগেই কারিগরিভাবে আটকে ফেলা যায়।

পঞ্চমত: আন্তঃসংস্থা সমন্বয় গড়ে তুলে নদী দূষণকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বন্দর ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

​কর্ণফুলীর এই বহুমুখী সংকটের প্রভাব এখন আর কেবল নদী বা বন্দর কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ নেই, এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝার মতো চেপে বসেছে। মোহনায় গভীরতা কমে যাওয়ায় জাহাজগুলোকে জোয়ারের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে এবং লাইটারেজ খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের ওপর দ্রব্যমূল্যের প্রভাব পড়ছে। এমনকি নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়েছে, যার ফলে শহরজুড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। নদীর তলদেশের বর্জ্যের কারণে পানির স্তর দূষিত হওয়ায় এবং লোনা পানির অনুপ্রবেশ বেড়ে যাওয়ায় নগরীর সুপেয় পানির সরবরাহও চরম হুমকির মুখে পড়েছে, যা চট্টগ্রামের সুপেয় পানির প্রধান উৎস হালদা নদীর জন্য হুমকিস্বরূপ। নদী রক্ষায় বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের একাধিক ঐতিহাসিক রায় থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন এখন কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ। আরএস (RS) ও বিএস (BS) জরিপ অনুযায়ী নদীর সীমানা নির্ধারণ করে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করা পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের সুফল মিলবে না।

​কর্ণফুলী নদী কেবল একটি ভৌগোলিক জলাধার নয়, এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এই নদীর মৃত্যু মানে প্রকারান্তরে চট্টগ্রাম বন্দরের পঙ্গুত্ব এবং দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়া। মোহনায় ড্রেজিংয়ের নামে যে পদ্ধতিগত অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড় গড়ে উঠেছে, তা যদি এখনই কঠোর হাতে দমন করা না হয় এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ যদি তাদের বর্ণিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মৃত ও পচা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আজকের প্রজন্মের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নৈতিক স্খলনের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

সময় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, তাই নদী লুণ্ঠনকারীদের হাত থেকে কর্ণফুলীকে মুক্ত করে এর স্বাভাবিক স্রোতধারা ও নব্যতা ফিরিয়ে দেওয়া এখন আর কেবল পরিবেশগত দাবি নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। নব্যতা ফিরিয়ে আনাই হোক আমাদের আগামী দিনের প্রধান অঙ্গীকার। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের চরম দায়বদ্ধ থাকতে হবে। নব্যতাহীন কর্ণফুলী মানেই পঙ্গু চট্টগ্রাম বন্দর, আর পঙ্গু বন্দর মানেই স্থবির বাংলাদেশ। এই সহজ সত্যটি অনুধাবন করে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক: এম,সফিউল আজম চৌধুরী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম।