মাহবুবুর রহমান: ২৬ মার্চ—মহান স্বাধীনতা দিবস—আমাদের জাতীয় জীবনের এমন এক দিন, যা কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি আত্মপরিচয়ের শিকড়, রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকনির্দেশ। ১৯৭১ সালের এই দিনে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা বাঙালি জাতিকে পরিণত করে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক জনগোষ্ঠীতে, যারা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জানে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান এবং অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। তাই এই দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে গৌরবের ও দায়বদ্ধতার।

স্বাধীনতার ঘোষণা: ইতিহাসের বাঁকবদল
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রি ছিল ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস অভিযান বাঙালির ঘরে ঘরে শোক ও ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সেই অন্ধকারের মধ্যেই স্বাধীনতার আহ্বান উচ্চারিত হয়। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ঘোষণা করে—এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এই ঘোষণা ছিল রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব রক্ষার শপথ, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংকল্প।

স্বাধীনতা দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় আয়োজন নয়; এটি একটি চেতনার নাম—যে চেতনা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সত্যের পক্ষে অবিচল থাকতে প্রেরণা দেয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: গণতন্ত্র, ন্যায় ও মানবিকতার অঙ্গীকার
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল চারটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত—গণতন্ত্র, সমাজিক ন্যায়, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। এই চার আদর্শই ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক নীতি। স্বাধীনতার পর সংবিধানে যে মূল্যবোধগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা এই সংগ্রামেরই প্রতিফলন।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি সেই চেতনা যথাযথভাবে ধারণ করতে পেরেছি? স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পার হলেও রাজনৈতিক মেরুকরণ, মতপ্রকাশের সংকোচন, দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্য আমাদের রাষ্ট্রচর্চায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে কেবল অতীতের গৌরবগাথা স্মরণ নয়; এটি বর্তমানের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়া।

অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা: সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের বাংলাদেশ—এ এক বিস্ময়কর রূপান্তরের গল্প। কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, তৈরি পোশাকশিল্পে বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব, রেমিট্যান্সে শক্তিশালী অবস্থান এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে তরুণদের সাফল্য দেশকে উন্নয়নশীল অর্থনীতির কাতারে নিয়ে এসেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন—সেতু, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র—দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে।

তবে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে কি? শহর-গ্রাম বৈষম্য, ধনী-দরিদ্র ব্যবধান, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা—এসব প্রশ্ন স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থকে সামনে নিয়ে আসে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়; যখন উন্নয়ন মানুষের জীবনের মানোন্নয়নে প্রতিফলিত হয়।

গণতন্ত্র ও সুশাসন: স্বাধীনতার পরিপূর্ণতা
স্বাধীনতার অন্যতম লক্ষ্য ছিল জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন অবাধ নির্বাচন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং শক্তিশালী গণমাধ্যম। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা থাকা জরুরি।

সুশাসনের ঘাটতি স্বাধীনতার চেতনাকে ক্ষুণ্ন করে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক সহিংসতা স্বাধীনতার স্বপ্নের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। মহান স্বাধীনতা দিবসে আমাদের আত্মসমালোচনা করা উচিত—রাষ্ট্র ও সমাজের কোথায় কোথায় সংস্কার প্রয়োজন এবং কীভাবে আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি।

নতুন প্রজন্ম ও ইতিহাসচর্চা
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্ম সরাসরি যুদ্ধ দেখেনি; তাদের কাছে স্বাধীনতার ইতিহাস পাঠ্যবই ও গল্পে সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে ভ্রান্ত তথ্য ও ইতিহাস বিকৃতির ঝুঁকি বাড়ছে। তাই গবেষণা, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা অপরিহার্য।

স্বাধীনতার ইতিহাস জানা মানে কেবল অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়; এটি আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়া। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে—স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়; এটি সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ফসল।

সামাজিক সম্প্রীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ
মুক্তিযুদ্ধ ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে এক ঐক্যবদ্ধ লড়াই। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। স্বাধীনতার চেতনা তাই অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ নির্মাণের আহ্বান জানায়।

আজকের বিশ্বে ঘৃণা, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা যখন বেড়েছে, তখন আমাদের আরও বেশি প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সহনশীলতা। সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা, নারীর সমান অংশগ্রহণ এবং প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই স্বাধীনতার প্রকৃত সম্মান।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভূমিকা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে ধীরে ধীরে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নেতৃত্ব এবং মানবিক সহায়তায় উদারতা—এসবই বাংলাদেশের পরিণত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রমাণ।

বিশ্বায়নের এই যুগে কূটনৈতিক দক্ষতা ও অর্থনৈতিক কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ স্বাধীনতার সুফলকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে।

স্বাধীনতার দায়: নাগরিকের ভূমিকা
রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; নাগরিকেরও। আইন মান্য করা, কর প্রদান, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া—এসবই স্বাধীনতার চেতনার বাস্তব প্রয়োগ। স্বাধীনতার মানে দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়; বরং দায়িত্বের বিস্তার।

আমরা যদি নিজের কাজ সততার সঙ্গে করি, সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা চর্চা করি, তবে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার প্রকৃত রক্ষক জনগণই।

আত্মসমালোচনা ও অঙ্গীকার
প্রতিটি স্বাধীনতা দিবস আমাদের সামনে দুটি প্রশ্ন তোলে—আমরা কতদূর এগোলাম এবং কোথায় পিছিয়ে আছি? আত্মসমালোচনা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোনোর সাহসই জাতিকে পরিণত করে।

স্বাধীনতার পঞ্চাশোর্ধ্ব বছরে আমাদের অর্জন যেমন গর্বের, তেমনি সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। বৈষম্য কমানো, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রেই আরও মনোযোগ প্রয়োজন। শহীদদের স্বপ্ন পূরণে আমাদের নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।

স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা
মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—এই দেশ কারও দয়া নয়; এটি অর্জিত অধিকার। লাল-সবুজ পতাকা কেবল বিজয়ের প্রতীক নয়; এটি আত্মত্যাগ, দায়িত্ব ও অঙ্গীকারের প্রতীক। শহীদদের রক্তে রাঙানো এই স্বাধীনতা রক্ষা ও সমৃদ্ধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

আসুন, ২৬ মার্চে আমরা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে স্বাধীনতার চেতনা হৃদয়ে ধারণ করি। ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ঐক্যবদ্ধ হই। তবেই মহান স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে। জয় বাংলা।

মাহবুবুর রহমান, লেখক ও সাংবাদিক।

মাহবুবুর রহমান: ২৬ মার্চ—মহান স্বাধীনতা দিবস—আমাদের জাতীয় জীবনের এমন এক দিন, যা কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি আত্মপরিচয়ের শিকড়, রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকনির্দেশ। ১৯৭১ সালের এই দিনে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা বাঙালি জাতিকে পরিণত করে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক জনগোষ্ঠীতে, যারা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জানে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান এবং অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। তাই এই দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে গৌরবের ও দায়বদ্ধতার।

স্বাধীনতার ঘোষণা: ইতিহাসের বাঁকবদল
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রি ছিল ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস অভিযান বাঙালির ঘরে ঘরে শোক ও ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সেই অন্ধকারের মধ্যেই স্বাধীনতার আহ্বান উচ্চারিত হয়। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ঘোষণা করে—এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এই ঘোষণা ছিল রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব রক্ষার শপথ, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংকল্প।

স্বাধীনতা দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় আয়োজন নয়; এটি একটি চেতনার নাম—যে চেতনা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সত্যের পক্ষে অবিচল থাকতে প্রেরণা দেয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: গণতন্ত্র, ন্যায় ও মানবিকতার অঙ্গীকার
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল চারটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত—গণতন্ত্র, সমাজিক ন্যায়, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। এই চার আদর্শই ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক নীতি। স্বাধীনতার পর সংবিধানে যে মূল্যবোধগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা এই সংগ্রামেরই প্রতিফলন।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি সেই চেতনা যথাযথভাবে ধারণ করতে পেরেছি? স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পার হলেও রাজনৈতিক মেরুকরণ, মতপ্রকাশের সংকোচন, দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্য আমাদের রাষ্ট্রচর্চায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে কেবল অতীতের গৌরবগাথা স্মরণ নয়; এটি বর্তমানের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়া।

অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা: সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের বাংলাদেশ—এ এক বিস্ময়কর রূপান্তরের গল্প। কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, তৈরি পোশাকশিল্পে বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব, রেমিট্যান্সে শক্তিশালী অবস্থান এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে তরুণদের সাফল্য দেশকে উন্নয়নশীল অর্থনীতির কাতারে নিয়ে এসেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন—সেতু, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র—দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে।

তবে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে কি? শহর-গ্রাম বৈষম্য, ধনী-দরিদ্র ব্যবধান, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা—এসব প্রশ্ন স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থকে সামনে নিয়ে আসে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়; যখন উন্নয়ন মানুষের জীবনের মানোন্নয়নে প্রতিফলিত হয়।

গণতন্ত্র ও সুশাসন: স্বাধীনতার পরিপূর্ণতা
স্বাধীনতার অন্যতম লক্ষ্য ছিল জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন অবাধ নির্বাচন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং শক্তিশালী গণমাধ্যম। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা থাকা জরুরি।

সুশাসনের ঘাটতি স্বাধীনতার চেতনাকে ক্ষুণ্ন করে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক সহিংসতা স্বাধীনতার স্বপ্নের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। মহান স্বাধীনতা দিবসে আমাদের আত্মসমালোচনা করা উচিত—রাষ্ট্র ও সমাজের কোথায় কোথায় সংস্কার প্রয়োজন এবং কীভাবে আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি।

নতুন প্রজন্ম ও ইতিহাসচর্চা
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্ম সরাসরি যুদ্ধ দেখেনি; তাদের কাছে স্বাধীনতার ইতিহাস পাঠ্যবই ও গল্পে সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে ভ্রান্ত তথ্য ও ইতিহাস বিকৃতির ঝুঁকি বাড়ছে। তাই গবেষণা, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা অপরিহার্য।

স্বাধীনতার ইতিহাস জানা মানে কেবল অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়; এটি আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়া। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে—স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়; এটি সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ফসল।

সামাজিক সম্প্রীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ
মুক্তিযুদ্ধ ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে এক ঐক্যবদ্ধ লড়াই। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। স্বাধীনতার চেতনা তাই অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ নির্মাণের আহ্বান জানায়।

আজকের বিশ্বে ঘৃণা, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা যখন বেড়েছে, তখন আমাদের আরও বেশি প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সহনশীলতা। সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা, নারীর সমান অংশগ্রহণ এবং প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই স্বাধীনতার প্রকৃত সম্মান।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভূমিকা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে ধীরে ধীরে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নেতৃত্ব এবং মানবিক সহায়তায় উদারতা—এসবই বাংলাদেশের পরিণত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রমাণ।

বিশ্বায়নের এই যুগে কূটনৈতিক দক্ষতা ও অর্থনৈতিক কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ স্বাধীনতার সুফলকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে।

স্বাধীনতার দায়: নাগরিকের ভূমিকা
রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; নাগরিকেরও। আইন মান্য করা, কর প্রদান, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া—এসবই স্বাধীনতার চেতনার বাস্তব প্রয়োগ। স্বাধীনতার মানে দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়; বরং দায়িত্বের বিস্তার।

আমরা যদি নিজের কাজ সততার সঙ্গে করি, সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা চর্চা করি, তবে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার প্রকৃত রক্ষক জনগণই।

আত্মসমালোচনা ও অঙ্গীকার
প্রতিটি স্বাধীনতা দিবস আমাদের সামনে দুটি প্রশ্ন তোলে—আমরা কতদূর এগোলাম এবং কোথায় পিছিয়ে আছি? আত্মসমালোচনা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোনোর সাহসই জাতিকে পরিণত করে।

স্বাধীনতার পঞ্চাশোর্ধ্ব বছরে আমাদের অর্জন যেমন গর্বের, তেমনি সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। বৈষম্য কমানো, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রেই আরও মনোযোগ প্রয়োজন। শহীদদের স্বপ্ন পূরণে আমাদের নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।

স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা
মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—এই দেশ কারও দয়া নয়; এটি অর্জিত অধিকার। লাল-সবুজ পতাকা কেবল বিজয়ের প্রতীক নয়; এটি আত্মত্যাগ, দায়িত্ব ও অঙ্গীকারের প্রতীক। শহীদদের রক্তে রাঙানো এই স্বাধীনতা রক্ষা ও সমৃদ্ধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

আসুন, ২৬ মার্চে আমরা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে স্বাধীনতার চেতনা হৃদয়ে ধারণ করি। ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ঐক্যবদ্ধ হই। তবেই মহান স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে। জয় বাংলা।

মাহবুবুর রহমান, লেখক ও সাংবাদিক।