মন্তব্য প্রতিবেদন
মীর হোসেন মোল্লাঃ ছাত্রদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়েছে সরকার। কোটা সংস্কারে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতেও আমরা তা-ই দেখছি।আমরা এক ধরনের অন্ধকারে ছিলাম। কোটা বিরোধীরা আমাদের অন্ধকারে রেখেছিল। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা দেশ ও সমাজ বিচ্ছিন্ন ভেবেছিলাম, সেই প্রজন্মই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বেশি জীবন দিল।
অনেক বছর পর দেখলাম শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দলে দলে রাস্তায় নেমে এসেছেন। পুলিশের গাড়ি থেকে শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে শিক্ষক আহত হয়েছেন।
আইনজীবীরা বলেছেন, ‘ওদের গ্রেপ্তার করার আগে আমাদের গ্রেপ্তার করতে হবে।’
আন্দোলন বলতে আমরা এত দিন মিছিল, সমাবেশ, অবরোধ, হরতালকেই বুঝতাম। কিংবা রাজনৈতিক মঞ্চে কে কত গরম বক্তৃতা দিতে পারেন। শিক্ষার্থীরা হরতাল অবরোধ না ডেকে বললেন, ‘বাংলা ব্লকেড’। এরপর তারা বললেন, ‘মার্চ ফর জাস্টিস’। শিক্ষার্থীসহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে যে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার প্রতিকার চাওয়া হয়েছে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাত ৮টা পর্যন্ত আমরা কল্পনা করতে পারিনি যে, পুরো দেশে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে এবং তা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলতে থাকবে। দেশে হানাহানি হবে, শত শত নির্মম নিষ্ঠুর খুনখারাবি ও হত্যাকাণ্ডের সাথে পাল্লা দিয়ে লাখ লাখ মানুষের শরীর দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হবে। বেশুমার লোক আহত হয়ে জুলাই ম্যাসাকার নামক একটি অধ্যায়ের অংশীদার হবে।
আমরা বুঝতে পারছি না আগামীদিন কী ঘটতে যাচ্ছে; যেভাবে আমরা বুঝতে পারিনি আজকের শিরোনামে ব্যবহৃত শব্দমালার অর্থ। আমাদের সন্তানরা যখন ন্যায্যতার ভিত্তিতে কোটা- এ শব্দমালা নিয়ে সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটা পদ্ধতির সংস্কার চাইল, তখন আমাদের অথর্ব মস্তিষ্ক এবং অহমিকায় পরিপূর্ণ মন বুঝতে পারল না যে, আগামীতে কী ঘটতে যাচ্ছে। ফলে রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যখন একের পর এক বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল প্রদর্শন করতে থাকলেন তার বিপরীতে আমাদের অনেকের ক্রোধ, নির্বুদ্ধিতা ও অশিক্ষা পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল। আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে গিয়ে কিভাবে যে কমপ্লিট শাটডাউনের কবলে পড়লাম তা বুঝতে পারলাম না।
ব্যক্তিগতভাবে আমি আজীবন মোটা মাথার লোক। কোনো কিছু সহজে বুঝি না। কোনো কিছুতে যেমন সন্দেহ হয় না, তদ্রুপ কোনো বিষয় নিয়ে মাথার মধ্যে অভিনব কোনো প্রশ্নের উদ্রেক হয় না। আমার কাছে সবসময় সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো মনে হয়েছে। আমি বুঝতে পারিনি কে আমায় ভালোবাসে কিংবা কে আমায় ঘৃণা করে। আমার পশ্চাৎদেশে আঘাত না পাওয়া পর্যন্ত আমি কোনো দিন বুঝিনি কেউ আমায় আঘাত করতে পারে। যার কারণে ছাত্র আন্দোলনের কমপ্লিট শাটডাউনের অর্থ, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যেমন আন্দাজ করতে ব্যর্থ হয়েছি; তেমনিভাবে মার্চ ফর জাস্টিসের ওজনও আন্দাজ করা যায়নি। আমরা আন্দাজ করতে পারিনি কমপ্লিট শাটডাউনের ডালপালা গজিয়ে রেমিট্যান্স শাটডাউনে রূপ নেবে। প্রবাসে অবস্থানরত প্রায় দুই কোটি বাংলাদেশীর মধ্যে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়বে। আমরা বুঝতে পারিনি, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের মূল্য এক লাফে ডলারপ্রতি আট-নয় টাকা বেড়ে যাবে। রেমিট্যান্স শাটডাউনের প্রভাবে প্রবাসীরা বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আহ্বানে সাড়া দেবেন এমনটি আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।
সারা দেশব্যাপী বাংলার ছাত্রদের মধ্যে বিক্ষোভের নতুন স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনের আকাশে নতুন কর্মসূচি- মুখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ এবং লাল রং দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নিজের প্রোফাইলের ছবিতে রক্তের ছবি আঁকার অভিনব কৌশলে আবার নতুন করে কমপ্লিট শাটডাউন দুনিয়া তোলপাড় করে দিলো।
সর্বোপরি জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। সম্পত্তির ক্ষতি মেটানো সম্ভব কিন্তু প্রাণহানির ক্ষতি অপূরণীয়। আমরা জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি কোনোটাই চাই না। কিন্তু প্রাণহানির ক্ষতির সঙ্গে সম্পত্তির ক্ষতির কোনো তুলনাই চলে না। আমরা রাজপথে ও অন্যত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আর কোনো প্রাণহানি দেখতে চাই না।




