নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: রাজধানীর অভিজাত বনানী, মহাখালী ও কড়াইল বস্তি এলাকার ত্রাস, অন্যতম শীর্ষ মাদক কারবারি এবং অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আব্দুর রহমান মাসুম ওরফে ‘মোল্লা মাসুম’ এখন এক আতঙ্কের নাম। একে একে গুরুতর অপরাধের পাহাড় জমলেও আইনের ফাঁকফোকর ও রহস্যজনক কারণে তিনি প্রতিবারই পার পেয়ে যাচ্ছেন।
সর্বশেষ পুবাইল থানা এলাকায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি ফের পুরনো রূপে ফিরেছেন। কুমিল্লা থেকে শুরু করে রাজধানীর মহাখালী ওয়্যারলেস গেইট, টঙ্গী এবং বনানী -গুলশান-বাড্ডা এলাকার অপরাধ জগতের এক ভয়ংকর সন্ত্রাসী এই মাসুমকে নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখন চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোল্লা মাসুমের পৈতৃক নিবাস কুমিল্লা জেলায়। বিটিসিএলে তাঁর বাবার চাকরির সুবাদে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে রাজধানীর মহাখালী ওয়্যারলেস গেইট সংলগ্ন বিটিসিএল পূর্ব কলোনিতে। পরবর্তীতে তাঁর বাবা চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করলে পরিবারটি কলোনি ছেড়ে টঙ্গীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। তবে কলোনিতে বড় হওয়ার সুবাদে ওয়্যারলেস গেইট ও আশপাশের এলাকার প্রতিটি অলিগলি এবং স্থানীয় অপরাধ নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে তাকে বড় মাপের অপরাধী হতে সাহায্য করে।
মাদক ব্যবসার সঙ্গে মাসুমের সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। অপরাধ জগতের শুরুর দিকে তিনি কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ফেনসিডিল এনে রাজধানীতে বিক্রি করতেন। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছোটখাটো মাদক কারবারই পরবর্তীতে বিশাল সাম্রাজ্যে রূপ নেয়। বর্তমানে তিনি বনানী, বাড্ডা ও গুলশান এলাকার ইয়াবা ব্যবসার অন্যতম প্রধান ‘মহাজন’ হিসেবে পরিচিত। শুধু নিজে মাদক ব্যবসা করেই তিনি ক্ষান্ত হননি; বরং এলাকার বহু উঠতি বয়সি তরুণ ও যুবসমাজকে নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে এবং অর্থের লোভ দেখিয়ে তাদের নিজের মাদক ব্যবসায় যুক্ত করেছেন। তাঁর এই অন্ধকার সিন্ডিকেটে জড়িয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য তরুণের ভবিষ্যৎ।
পেশাদার এই অপরাধী মাদকের বিশাল চালানসহ সম্প্রতি পুবাইল থানা এলাকায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন। কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচ আর প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তিনি জামিন লাভ করেন। কারাবাসের সেই মেয়াদ শেষ না হতেই কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি কড়াইল বস্তি ও এর আশপাশের এলাকায় নিজের মাদক সাম্রাজ্য আরও জোরদার করেন। বারবার গ্রেপ্তার এবং স্বল্প সময়ে জামিনে বেরিয়ে আসার এই চক্রের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মোল্লা মাসুমের বেপরোয়া মনোভাবের প্রমাণ মিলেছিল গত বছরই। এলাকার আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি মাথায় হেলমেট পরে প্রকাশ্য দিবালকে মহাখালী ওয়্যারলেস গেইট এলাকায় হাজির হন। সে সময় তিনি হাতে অবৈধ পিস্তল উঁচিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করতে তিন রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন। জনবহুল এলাকায় এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটলেও সেদিন পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দেওয়ার পরও পুলিশি পদক্ষেপের এই ঘাটতি তাকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। ফাঁকা গুলি ছোঁড়ার উদ্যেশ্য ছিল চাঁদাবাজির রাজ্যে তাঁর প্রতি ভয় সৃষ্টি করা।
উত্তরায় জিএম কাদেরের বাসায় হামলার মূল হোতা
শুধু মাদক ও স্থানীয় চাঁদাবাজিই নয়, রাজনৈতিক ও স্পর্শকাতর অপরাধেও জড়িয়ে রয়েছে মোল্লা মাসুমের নাম। গত মাসে রাজধানীর উত্তরায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরের বাসভবনে হামলার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার মূল হোতা ছিলেন এই মোল্লা মাসুম। অথচ এত বড় একটি অপরাধ সংঘটিত করার পরও পুলিশ এখনও পর্যন্ত তাঁকে গ্রেফতার করতে পারেনি। চোখের সামনে ঘুরে বেড়ানো সত্ত্বেও এই শীর্ষ অপরাধীকে গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, এঘটনার পর মাসুমকে গ্রেফতার না করার মূল কারণ রাজনৈতিক ছত্রছায়া।
মোল্লা মাসুমের অপরাধ জগতের ইতিহাস বেশ পুরনো। এর আগে ২০১৮ সালে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল এবং অপহরণ মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। সে সময়ও তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি নিজের অপরাধের পরিসর আরও বাড়িয়ে দেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মোল্লা মাসুম নিছক কোনো সাধারণ অপরাধী নন; তিনি মূলত একজন পেশাদার কন্ট্রাক্ট কিলার ও ক্রাইম অপারেটর। টাকার বিনিময়ে বা আধিপত্য ধরে রাখতে তিনি চুক্তিতে যে কোনো ধরনের গুরুতর অপরাধ সংঘটন করতে সিদ্ধহস্ত। কিশোর গ্যাংয়ের ব্যবহার, অবৈধ অস্ত্রের প্রদর্শন এবং বিভিন্ন শক্তির ছত্রছায়ায় তিনি নিজের একটি দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট চালিয়ে যাচ্ছেন।
কুমিল্লার শিকড় থেকে শুরু করে টঙ্গী ও রাজধানীর মহাখালী ওয়্যারলেস গেইট হয়ে বনানী-গুলশান পর্যন্ত বিস্তৃত মোল্লা মাসুমের এই অপরাধ সাম্রাজ্য গুটিয়ে ফেলতে এবং তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অবিলম্বে এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিন বাতিল করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং তাঁর নেপথ্যের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।




