হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাবা হাসানুজ্জামানকে কথা দিয়েছিল সাফিয়া হাসিন আরোশী—সে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই থামাবে না। দন্ত চিকিৎসক বাবাও আশা বেঁধেছিলেন, পরিবারের পাঁচ সদস্য একসঙ্গে হাসপাতালে গেলেও সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু ডেঙ্গুর জটিলতার কাছে হেরে গিয়ে ২৫ অক্টোবর বেলা ১টা ২৬ মিনিটে বিআরবি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় মারা যায় ১৪ বছর বয়সী আরোশী। ২০১১ সালের ১১ জুলাই জন্ম নেওয়া আরোশী একাডেমিয়ার মিরপুর ক্যাম্পাসের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
চিকিৎসক হাসানুজ্জামান ও শারমীন আক্তার দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে আরোশীই ছিল সবার বড়। তাদের মেজ মেয়ে সায়রা হাসিন সরোশী ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে সাকেরা হাসিন রোদশী প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তারা সবাই একই স্কুলে পড়াশোনা করত। গত ১৯ অক্টোবর প্রথমে আরোশীর জ্বর আসে এবং পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু পজিটিভ ধরা পড়ে। এর পরপরই অন্য দুই বোনও জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং তাদের শরীরেও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। শুরুতে বাসায় রেখেই তরল খাবার ও নিয়মিত প্লাটিলেট পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছিল। তবে আরোশী খেতে পারলেও ক্রমাগত বমি হতে থাকায় শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। চিকিৎসকের পরামর্শে ২২ অক্টোবর ধানমন্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে তিন বোনকে ভর্তি করানো হয়।
পরদিন ২৩ অক্টোবর আরোশীর শারীরিক জটিলতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেলে তাকে সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেকে বিআরবি হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে মেয়ের কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়া এবং প্লাজমা লিকেজের কথা জানতে পারেন বাবা-মা। আইসিইউতে মেয়েকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বাবা যখন তাকে ফাইটার বলে ফাইট করতে বলছিলেন, তখনো আরোশী শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করার কথা জানিয়েছিল। মেয়ের করুণ অবস্থা দেখে বাবা তার কাছে ক্ষমা চান, সময়মতো সব শখ পূরণ করতে না পারা কিংবা বকা দেওয়ার জন্য মাফ চান। তখনো মুখে হালকা হাসি এনে বাবাকে উল্টো সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল আরোশী। মারা যাওয়ার আগে তার নাক ও মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হতে দেখলে মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
আরোশী যেদিন মারা যায়, সে সময় ধানমন্ডির হাসপাতালে মেজ বোন সরোশীর শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালো থাকায় তাকে ছুটি দেওয়া হয়, আর ছোট বোন রোদশীর অবস্থা ছিল খারাপ। ছোট বোন যেন ভেঙে না পড়ে, সেজন্য তাকে বোনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি; তাকে হাসপাতালে দেখাশোনা করছিলেন এক মামা ও মামি। অ্যাম্বুলেন্সে বড় বোনের মরদেহ নিয়ে নোয়াখালী যাওয়ার পথে গাড়িতে বাবার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল মেজ বোন সরোশী। নোয়াখালীর মাইজদীতে দাদা চিকিৎসক নুরুজ্জামান চৌধুরী ও দাদি আনোয়ারা বেগমের কবরের পাশে আরোশীকে দাফন করা হয়। তবে হাসপাতালে থাকা অসুস্থ ছোট দুই মেয়ের চিন্তায় দাফন শেষ করেই দ্রুত ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হয় বাবা-মাকে। বড় বোনের বিয়োগের পর থেকে অন্য দুই বোন প্রায় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে এবং কান্নাতেই তাদের দিন কাটছে।
নোয়াখালীতে দাফনের আগে ঢাকার মাটিকাটা, বাগানবাড়ি এলাকার এসিওরেন্স সিটিতে চিকিৎসক হাসানুজ্জামানের নিজ ফ্ল্যাটে আরোশীর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সালে তিন বছর বয়স থেকে সেখানেই বেড়ে উঠেছিল সে। বিআরবি হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়ার ঠিক আগে আরোশী তার মুঠোফোনের হোয়াটসঅ্যাপে মা, প্রিয় বন্ধু ও চাচাতো বোনদের কাছে কিছু বার্তা পাঠিয়েছিল, যেখানে মায়ের কাছে লেখা বার্তাতেও তার দুই ছোট বোনের কথা উল্লেখ ছিল। গত ৪ অক্টোবর মায়ের জন্মদিনে একটি ঝুলন্ত শোপিস উপহার দিয়ে আরোশী বলেছিল, মিষ্টি আওয়াজ হলেই যেন তাকে মনে করা হয়। এখন সেই আওয়াজ শুনলেই চমকে ওঠেন মা। মা শারমীন আক্তার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ার সময় আরোশী গর্ভে আসে, পরে মেয়েকে সময় দিতে গিয়ে আর পড়াশোনা চালানো হয়নি।
পরিবারের স্মৃতিজুড়ে এখন শুধুই আরোশী। তার রুমে গুছিয়ে রাখা পড়ার টেবিল, তার পাশে সমুদ্রসৈকতের একটি অসমাপ্ত ছবি আঁকা রয়েছে। টেবিলে সাজানো রয়েছে পড়াশোনা, নাচ, ছবি আঁকা, ব্যাডমিন্টন ও ভলিবল খেলায় পাওয়া বিভিন্ন সম্মাননার ক্রেস্ট ও সনদ। নানা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নুরুল হক ও খালা নাজনীন আক্তারসহ স্বজনদের মুঠোফোনে শুধুই তার ছবি। মেজ বোন সরোশী এখন বড় বোনের পোশাক পরে তার উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করে।
মেয়েকে বাঁচাতে চিকিৎসায় কোনো অবহেলা হয়নি বলে জানান বাবা হাসানুজ্জামান। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর বাবা ও ভাইসহ পরিবারে প্রায় ১৪ জন চিকিৎসক রয়েছেন। ডেঙ্গুর চারটি ভেরিয়েন্টের মধ্যে কোনটি আক্রান্ত করেছে তা বোঝা কঠিন এবং রোগটি স্বজন বা পেশা বিচার করে না। বয়স বিবেচনায় ছোট দুই মেয়ের সুস্থতা নিয়ে শঙ্কা থাকলেও বড় মেয়ে চলে গেল। আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, করোনা মহামারির সময় সরকারি পর্যায়ে যে তৎপরতা ছিল, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। নিজস্ব আবাসিক এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও বাইরের পরিবেশ ব্যক্তিপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ফলে স্বজন হারানোর হাহাকার কেবল আক্রান্ত পরিবারগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।




