মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরান প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনা করছে—গোয়েন্দা সূত্রে এমন খবর পাওয়ার পর ওই অঞ্চল থেকে জরুরি কর্মী ও তাঁদের পরিবারকে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে একদফা সপরিবার কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক মনে হওয়ায় সম্প্রতি অনেকেই কর্মস্থলে ফিরে এসে কাজ গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু ফের নতুন করে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় মার্কিন দূতাবাস ও মিশনগুলোতে চরম বিশৃঙ্খলা, ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএসএ) মুখপাত্র নিকি গেমার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বছরের শুরুর দিকে পরিবারগুলো যে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, এবারও ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। কর্মস্থলে ফিরে সবকিছু মাত্র গুছিয়ে নেওয়ার পর পরই পুনরায় চলে যাওয়ার নির্দেশে সেখানকার কূটনীতিকরা স্বাভাবিকভাবেই হতাশ, বিভ্রান্ত ও তীব্র ক্ষুব্ধ। বিষয়টি নিয়ে সিএনএনকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এক মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের বর্তমান দূতাবাস ও মিশনগুলোর কার্যক্রমের পরিস্থিতিকে শুধু বিশৃঙ্খলা বললে অনেক কম বলা হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গত ২১ অক্টোবর এক জরুরি নির্দেশনায় সৌদি আরবে অবস্থিত আমেরিকান দূতাবাস থেকে জরুরি নন—এমন কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অবিলম্বে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। সেখানে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান হামলাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়। এর পাশাপাশি সংঘাত দ্রুত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও বারবার সতর্কবার্তা জারি করেছে দপ্তরটি। তবে কেবল সৌদি আরবই নয়; বরং জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকেও অত্যন্ত নীরবে কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন। বার্তা সংস্থা এএফপি ও সিএনএনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের পর থেকে উদ্ভূত উত্তেজনার মধ্যে কূটনীতিকদের নিরাপত্তায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের তড়িঘড়ি কর্মী সরানোর কারণ স্পষ্ট হয় মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে। গত ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে একটি ‘অগোপনীয়’ মেমো পাঠান। মেমোতে গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও বিশ্বের নানা অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতিকদের নিশানা করার তৎপরতা ইরান বহুগুণ বাড়িয়েছে এবং কিছু প্রাণঘাতী হামলার ছক চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের ওপর হুমকির মাত্রা এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গোয়েন্দা মূল্যায়নে এমন ইঙ্গিতও মিলেছে যে, ইরানি এজেন্টরা ইতোমধ্যে আমেরিকার অভ্যন্তরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং ইউরোপেও নির্দিষ্ট কিছু মার্কিন লক্ষ্যবস্তু তারা ঠিক করে রেখেছে।
পেন্টাগনের দেওয়া তথ্যমতে, ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২১ জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। তবে নিউইয়র্ক টাইমসকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান ও তাদের মিত্র হুতিদের হামলার আশঙ্কার প্রেক্ষিতেই বিভিন্ন দেশের মার্কিন মিশনগুলোতে লোকবল কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কিংবা ইউরোপে সামরিক হামলা কার্যকর করার মতো বড় ধরনের সক্ষমতা ইরানের কতটুকু রয়েছে, তা নিয়ে ভিন্নমতও আছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেন, আমেরিকা বা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো সামর্থ্য তেহরানের সীমিত।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মূল সামরিক শক্তি নিহিত রয়েছে দেশটির সুবিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনভান্ডারের ওপর। ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ—দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই রয়েছে দেশটির হাতে। ইরানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ফলে তরল জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি দ্রুত উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা যায়। আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেজিলের পাল্লা প্রায় ২০০০ কিলোমিটার, এমাদের ১৭০০, গাদরের ২০০০, শাহাব-৩-এর ১৩০০ এবং খোররামশাহর ২০০০ কিলোমিটার। ইরান প্রতিনিয়ত তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় এই আর্সেনালে ১৫০০ থেকে ২০০০ কিলোমিটার পাল্লার শাহাব-৩, এমাদ, গাদর-১, খোররামশাহ, সেজিল, খাইবার শেকান ও হজ কাসেমের মতো মধ্যমপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। কঠিন জ্বালানিভিত্তিক সেজিল ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত উৎক্ষেপণে সক্ষম। এছাড়া ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পাল্লার স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ফাতেহ, জলফাগর, কিয়াম-১, শাহাব-১ ও শাহাব-২। ২০২৪ সালের ২০ মার্চ ইরান থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে মার্কিন ও ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর চেষ্টার পর তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দিয়েগো গার্সিয়ায় ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র অন্তত ৩০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিল বলে বিবিসি তাদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করে। কিন্তু ইসরায়েল বারবারই দাবি করেছে, ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৪০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এমনটি হলে ইউরোপের বড় অংশ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় চলে আসতে পারে। এছাড়া হালকা ওয়ারহেড ব্যবহার করে ইরান চার হাজার কিলোমিটার দূরের লন্ডন বা প্যারিসের মতো ইউরোপীয় শহরগুলোতেও আঘাত হানতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২৬ অক্টোবর মিসিসিপিতে এক নির্বাচনী জনসভায় দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপ তো বটেই, মার্কিন মূল ভূখণ্ডের সান ডিয়েগো ও লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম।
ইরানের সামরিক শক্তির অপর স্তম্ভ হলো ড্রোন কর্মসূচি, যা ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় শুরু হয়েছিল। শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ, হেসা এবং কুদস এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজের তৈরি শাহেদ-১০১, শাহেদ-১২৯, শাহেদ-১৪৯, শাহেদ-১৭১, শাহেদ-১৩৬, আরাশ-২, আবাবিল ও মোহাজের সিরিজের ড্রোন অত্যন্ত নিখুঁত ও সাশ্রয়ী হামলার জন্য কুখ্যাত। এর মধ্যে শাহেদ-১৩৬ ড্রোনটি রাশিয়া 'গেরান-২' নামে এবং হুতিরা 'ওয়াইদ-২' নামে ব্যবহার করে থাকে। এর পাশাপাশি নিজেদের হামলা ঠেকিয়ে রাখা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কেরমানশাহ ও সেমনানসহ বিভিন্ন provinces এ অন্তত পাঁচটি ভূগর্ভস্থ 'মিসাইল সিটি' বা গোপন ঘাঁটি তৈরি করেছে ইরান। ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো সুড়ঙ্গ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল দেশটি এবং ২০২৩ সালে শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ দ্রুতগামী 'হাইপারসনিক' ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির দাবিও করে আইআরএনএ।
শুধু সরাসরি সামরিক আঘাতই নয়, নতুন করে ওয়াশিংটন বা ইসরায়েল সংঘাত বাড়ালে উপসাগরের তলদেশে থাকা যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ফাইবার অপটিক কেবলগুলোতে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছে ইরান। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশটির দুই জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, ইন্টারনেট কেবলগুলো এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করা হবে যাতে সহজে মেরামত করা না যায়। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) রাজনৈতিক বিভাগের উপপ্রধান ইয়াদউল্লাহ জাভানি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালির নিচে থাকা সাতটি বড় ইন্টারনেট কেবলকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। একই সঙ্গে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, এবারে আক্রান্ত হলে তাদের পাল্টা হামলায় কোন সীমারেখা থাকবে না এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ-মাইন ও দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহার করে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় অর্থনৈতিক ধস নামানো হবে। যুদ্ধ ও অস্ত্র সংক্রান্ত সমস্ত সামরিক তথ্যের জন্য আল-জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি ও দ্য কনভারসেশনের আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।




