কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরসহ সমগ্র হাওড়াঞ্চলে কৃষিকাজে স্থানীয় নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ও নির্ভরতা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ধান রোপণ, চারা তোলা, আগাছা পরিষ্কার করা, ধান শুকানো এবং ফসল বাছাইয়ের মতো শ্রমঘন কাজে এখন নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। হাওড়ের কৃষি অর্থনীতিতে পুরুষ কৃষিশ্রমিকের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও গ্রামীণ নারীদের নিজস্ব কর্মসংস্থানের চাহিদাই এই পরিবর্তনের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাজিতপুরে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ১৫ হাজার ৪৯১ হেক্টর, যার মধ্যে এক ফসলি জমি রয়েছে ৭ হাজার ৫৫০ হেক্টর। এই উপজেলায় প্রায় ৩৬ হাজার ৪০০ কৃষক পরিবার বসবাস করে। এখানকার প্রধান ফসলের তালিকায় ধান, ভুট্টা, সরিষা, পাট ও বিভিন্ন জাতের সবজি রয়েছে। হাওড়ের বিস্তৃত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নারী শ্রমিকের সুনির্দিষ্ট সংখ্যাভিত্তিক একক সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় নারীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে পুরো কিশোরগঞ্জজুড়ে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। ধান কাটার সময়ে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিয়েও পুরুষ শ্রমিক মেলানো দায় হয়ে পড়েছিল, এমনকি দৈনিক ২ হাজার টাকা মজুরি দিয়েও অনেক স্থানে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
বাজিতপুরের দিঘিরপাড়ের আছানপুর, বোয়ালি-শিবপুর ও শিয়ালদীপাড় গ্রামের কৃষক মোক্তাদির, জুলহাস ও মিনহাজুল জানান, হাওড়ের ফসল সময়মতো ঘরে তুলতে না পারলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। সেই চাপ সামলাতেই তারা দ্রুত কাজ শেষ করতে পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি নারী শ্রমিকের ওপর ভরসা বাড়াচ্ছেন। তবে চাহিদা বাড়লেও মজুরির প্রশ্নে নারীরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
বাজিতপুরসহ পার্শ্ববর্তী নিকলী, অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার সাম্প্রতিক চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ধান রোপণ ও পরিচর্যার সমান পরিশ্রমের কাজে যুক্ত থেকেও নারীদের আয় অনেক কম। যেখানে একজন পুরুষ শ্রমিক দিনে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বা তারও বেশি মজুরি পান, সেখানে নারী শ্রমিকদের দৈনিক দেয়া হচ্ছে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। জেলার হাওড়ভিত্তিক কৃষি শ্রমবাজারে এই অসামঞ্জস্য এক প্রকট বৈষম্য তৈরি করেছে।
মাঠে কর্মরত নারী শ্রমিক মর্জিনা, হাসুবিবি, খাদিজা ও কমলি বেগম জানান, সংসারের খরচ চালানো, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন কেনাকাটার প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়েই তারা এ কাজে নামছেন। মজুরি কম হলেও বেঁচে থাকার তাগিদে এবং কাজের সুযোগ হাতছাড়া না করতেই তারা এই অল্প পারিশ্রমিকে শ্রম দিচ্ছেন। ২০২৪ সালের শ্রমবাজার মূল্যায়নের তথ্যেও তরুণী নারীদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে; বাজিতপুরের তরুণীদের ওপর করা এক জরিপে দেখা যায়, ১২ শতাংশ তরুণী কৃষিতে এবং ৮৮ শতাংশ সেবা খাতে যুক্ত রয়েছেন।
কৃষি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কৃষিতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়লে গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার হবে এবং পুরুষ শ্রমিকের ঘাটতি কমবে। তবে সস্তা শ্রম হিসেবে নারীদের ব্যবহার করা হলে এবং এই নিম্ন মজুরির প্রচলন অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে সমাজে বৈষম্য আরও স্থায়ী রূপ নেবে। তাই তাদের কাজের ধরণ অনুযায়ী ন্যায্য পারিশ্রমিক নির্ধারণের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে পানীয় জল, বিশ্রামের নিরাপদ পরিবেশ, নিরাপদ যাতায়াত ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
এই বিষয়ে বাজিতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফুল আলম জানান, বাজিতপুরের কোনো কোনো হাওড়ে নারী শ্রমিকের উপস্থিতি বেশি, তাদের প্রকৃত সংখ্যা কত, কাজের ধরণ, পুরুষ ও নারীর মজুরি বৈষম্য এবং ঋতুভেদে আয়ের তারতম্য মূল্যায়নে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে জরিপকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।




