দি ক্রাইম ডেস্ক: টানা তিন দিন ধরে গোলাগুলি ও শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন টেকনাফ সীমান্তের বাসিন্দারা। কক্সবাজারের টেকনাফের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রাতভর থেমে থেমে গোলাগুলির ও বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে এপারের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও। রাত থেকে শুরু হয়ে এসব শব্দ অনেক ক্ষেত্রে সকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকায় সীমান্ত এলাকার বসতবাড়ি কেঁপে উঠছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার ৮ জানুয়ারি রাত থেকে শনিবার ১০ জানুয়ারি সকাল পর্যন্ত টানা তিন দিন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের হোয়াইক্যং সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় গোলাগুলি ও বিস্ফোরণ চলছে। মাঝে কিছু সময় থামলেও আবার শুরু হচ্ছে ভারী অস্ত্রের ব্যবহার, যা সীমান্তের এপারের মানুষকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানান, দেশটির জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে রাখাইন রাজ্যের একাধিক শহর, গ্রাম ও সীমান্ত চৌকি হাতছাড়া হয়ে গেছে। এসব এলাকার বড় একটি অংশ বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে ওইসব অঞ্চলে জান্তা বাহিনীর উপস্থিতি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
রোহিঙ্গারা আরও দাবি করেন, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপও সক্রিয় রয়েছে। এর জেরে রাখাইন সীমান্তজুড়ে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপ, আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘাত চলছে।
এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে। গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক জেলে পরিবার নাফ নদী ও চিংড়ি ঘেরে যেতে পারছেন না। সীমান্ত এলাকার বহু মানুষ ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন।
নাফ নদী ও চিংড়ি ঘেরে মাছ ধরে সংসার চালানো জেলে রাকিব হাসান বলেন, ‘আমরা এখনো মাছ ধরতে যেতে ভয় পাচ্ছি। রাখাইন সীমান্তে যেকোনো সময় গোলাগুলি হচ্ছে, সেখান থেকে গুলি এসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। টানা গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের কারণে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতের পর শুক্রবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত থেমে থেমে ভারী বোমা বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকার বাড়িঘর কেঁপে উঠছিল। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত আবারও ব্যাপক বিস্ফোরণ ও ভারী গুলির শব্দ শোনা গেছে। এখনো মাঝে মধ্যে দুই-একটি ফায়ারের শব্দ ভেসে আসছে।’
হোয়াইক্যং ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্তে ব্যাপক গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় শব্দগুলো আরও তীব্র হওয়ায় সীমান্ত এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। অনেক পরিবার ভয়ে ঘর ছেড়ে অন্যত্র সরে যাওয়ার কথা ভাবছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘হোয়াইক্যং সীমান্তের খুব কাছাকাছি এলাকায় এসব সংঘর্ষ চলছে। এর আগেও মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি এপারের বাসিন্দাদের শরীরে লেগেছে। এখনো স্থানীয়দের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে, যেকোনো সময় গুলি এসে পড়তে পারে। গোলাগুলির শব্দে বাড়িঘর কেঁপে উঠছে, এতে স্বাভাবিক জীবনযাপন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন নিয়মিতভাবে বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সতর্কতার সঙ্গে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজ করা হচ্ছে।




