দি ক্রাইম ডেস্ক: একসময় ঘন প্রাকৃতিক বন, সেগুন, গর্জন, চিকরাশি, গামাড়িসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ, বাঁশঝাড় এবং বিচিত্র বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাস ছিল খাগড়াছড়ির বনাঞ্চলে। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বছরের পর বছর অবৈধভাবে গাছ কাটা, দুর্বল নজরদারি এবং বন সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে হাড়িয়ে গেছে প্রাকৃতিক বন। রিজার্ভ ফরেস্টের বিস্তীর্ণ এলাকাও আজ ফাঁকা। এমন বাস্তবতায় জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে নতুন করে সবুজায়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বন বিভাগ।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে সবুজায়নের মাধ্যমে বন ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প ২০২৫-২০২৬’-এর আওতায় আলুটিলা রিজার্ভ ফরেস্টের ফাঁকা হয়ে যাওয়া অংশে দেশীয় বনজ, ঔষধি ও চিরসবুজ প্রজাতির গাছ রোপণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ২০ একর এলাকায় চিকরাশি, গামাড়ি, গর্জন, চম্পাফুল, আমলকি, হরিতকী ও বহেরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির চারা লাগানো হবে। পাশাপাশি আরও ১৫ একর এলাকায় বাঁশ বাগান গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আলুটিলা সড়কের দুই পাশের কিছু গাছ এখনো টিকে থাকলেও বনভূমির ভেতরের অনেক মূল্যবান সেগুন গাছ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে কেটে নেওয়া হয়েছে।
এসব ঘটনা একদিনে ঘটেনি। বছরের পর বছর বন উজাড় হলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি দেখা যায়নি। ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বড় অংশ ফাঁকা হয়ে পড়েছে, যা এখন নতুন করে গাছ লাগিয়ে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে।
একটি প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হতে খুব বেশি সময় লাগে না, কিন্তু সেই বন আগের অবস্থায় ফিরতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে। শুধু চারা রোপণ করলেই একটি পরিণত বন তৈরি হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা, অবৈধ গাছ কাটা বন্ধে কঠোর নজরদারি, বনভূমি দখল প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগণকে বন সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা।
রিছাং ঝর্ণা এলাকার বাসিন্দা শান্তিময় ত্রিপুরা বলেন, আগে এই বন অনেক ঘন ছিল। নানা ধরনের গাছ আর বন্যপ্রাণী দেখা যেত। এখন আগের মতো বন নেই। নতুন করে গাছ লাগানো হলে অবশ্যই ভালো হবে, তবে সেগুলো যেন আগের মতো কেটে নেওয়া না হয়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দা কৈলাশ ত্রিপুরা বলেন, শুধু চারা লাগালেই হবে না। বন পাহারার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করলে বন রক্ষা করা সহজ হবে।
আলুটিলার মতো পাহাড়ি বনাঞ্চলে বাঁশের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বাঁশ পাহাড়ের মাটি শক্ত করে ধরে রাখে, ভূমিধসের ঝুঁকি কমায় এবং বহু পাখি, সরীসৃপ ও ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। একইভাবে গর্জন, গামাড়ি, চিকরাশি, আমলকি, হরিতকী ও বহেরার মতো দেশীয় বৃক্ষ শুধু বনকে সবুজই করে না, বরং খাদ্যশৃঙ্খল, কার্বন শোষণ এবং বন্যপ্রাণীর টিকে থাকার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
খাগড়াছড়ি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফরিদ মিঞা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে আলুটিলা রিজার্ভ ফরেস্টে বাঁশ এবং বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রিজার্ভ ফরেস্টে সেগুন গাছ রয়েছে। তবে সেগুন বছরের কয়েক মাস পাতাহীন থাকে। তাই সেগুনের ফাঁকে সারাবছর সবুজ থাকে এমন দেশীয় বৃক্ষ রোপণ করা হবে।
তিনি বলেন, ঝোপঝাড় তৈরি হলে জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হবে। এছাড়া পাহাড়ের ঢাল, ছড়া ও ঝিরির পাশে বাঁশ লাগানো হবে। বাঁশঝাড় থাকলে পানি সংরক্ষণে সহায়তা করবে, মাটির ক্ষয় কমবে এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও এর সুফল পাবেন।
তিনি আরও জানান, সারাবছর সবুজ থাকে এমন বৃক্ষ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ রোপণের মাধ্যমে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক বনায়নের অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায় ৫০০টি চারা এবং জেলার ছয় উপজেলায় মোট ৬৫ হাজার চারা বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বিভিন্ন সময়ে বন উজাড়ের ঘটনা ঘটলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই দেখা গেছে। তাই বন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, এবার শুধু চারা রোপণ করলেই চলবে না, রোপণের পর নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বন পাহারা জোরদার করা, বনভূমি দখল ও অবৈধ গাছ কাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার বিকল্প নেই।




