দি ক্রাইম ডেস্ক: একটি বোয়িং ৭৭৭ বিমান চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলে প্রায় ৫ লাখ টাকা ল্যান্ডিং চার্জ পরিশোধ করতে হয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ রানওয়ে ব্যবহার বাবদ সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স থেকে এয়ারক্রাফটের ওজন হিসাব করে এই টাকা আদায় করে। ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকায় নামতে না পারা ৪টি ফ্লাইটকে কলকাতা এবং একটি ফ্লাইটকে ব্যাংককে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। অথচ এই ৫টি বিমান ঢাকার পরিবর্তে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলে অন্তত ২৫ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হতো। একই দিনে ঢাকার অপর ৪টি ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করায় সিভিল এভিয়েশনের অন্তত ২০ লাখ টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় হয়েছে। যদি সবগুলো ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করত তাহলে আয় হতো অন্তত ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু শাহ আমানত বিমানবন্দরের সক্ষমতা না থাকায় অপর ৫টি ফ্লাইটকে কলকাতা এবং ব্যাংক পাঠানো হয়েছে। এতে বাংলাদেশ বিমানের বড় অংকের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়েছে।
ঝড়, কুয়াশাসহ প্রাকৃতিক নানা বিপর্যয় এবং যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বিভিন্ন সময় অনেক ফ্লাইট এদিক–ওদিক পাঠানো হয়। ঢাকার বিকল্প হিসেবে শাহ আমানত বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হলে সিভিল এভিয়েশনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পেত। বিষয়টি মাথায় রেখে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়ার একটি প্রকল্প আড়াই বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাড়ে আট বছর ধরে চলছে।
সূত্রে জানা যায়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এই বিমানবন্দরে ২ হাজার ৯৪০ মিটার বা ৯ হাজার ৬৪৬ ফুট দীর্ঘ এবং ৪৫ মিটার বা ১৪৮ ফুট প্রস্থ একটি রানওয়ে রয়েছে। এই রানওয়ে ব্যবহার করে বোয়িং ৭৭৭ থেকে শুরু করে বড় ধরনের অধিকাংশ বিমান ওঠানামা করতে পারে। কেবলমাত্র এয়ারবাস ৩৮০ (ডাবল ডেকার) এখানে অবতরণ করতে পারবে না।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরে বড় আকারের এয়ারক্রাফটের নিরাপদে ওঠানামার লক্ষ্যে নেওয়া হয় রানওয়ে ও ট্যাঙিওয়ে শক্তিশালীকরণ প্রকল্প। ৬২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে গৃহীত প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৮ সালে। কথা ছিল আড়াই বছরে অর্থাৎ ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে। কিন্তু আড়াই বছর মেয়াদি প্রকল্পটি সাড়ে আট বছরেও শেষ হয়নি। মীর আক্তার–সিএএমসিই জেভি প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে। ইতোমধ্যে আগামী জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ আবার বাড়ানো হয়েছে।
শুরুতে প্রকল্পটির আওতায় রানওয়ে ও ট্যাঙিওয়ের পেভমেন্ট শক্তিশালীকরণ, সাইড স্ট্রিপ গ্রেডিং ও এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম (এজিএল) উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে এজিএল সিস্টেমকে সিএটি–১ থেকে সিএটি–২ মানে উন্নীত করার সিদ্ধান্তে টেন্ডার আইটেমে পরিবর্তন ও নন–টেন্ডার আইটেম সংযোজন করা হয়। প্রকল্পের সময় বাড়ার সাথে সাথে ব্যয়ও অনেকটা বেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, আসলে প্রকল্পটির কাজ সময়মতো শুরু করা সম্ভব হয়নি। ২০১৮ সালের জুনে কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের দিকে। করোনার কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৮ মাস কাজ থমকে থাকে। এরপর রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং ডলার সংকটে আমদানিনির্ভর উপকরণ এসবিএস মডিফায়েড অ্যাসফল্ট, বিটুমিন, জয়েন্ট সিলিং কম্পাউন্ড ও এজিএল সিস্টেম আমদানিতে বেগ পেতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ করা সম্ভব হয়নি। সংশোধিত কাজগুলোসহ প্রকল্পটি যাতে দ্রুত শেষ করা সম্ভব হয় সেজন্য আগামী জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একজন প্রকৌশলী বলেন, ‘চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ট্যাঙিওয়ে শক্তি বৃদ্ধিকরণ’ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল বোয়িং–৭৭৭–এর মতো বড় উড়োজাহাজ নিরাপদে ওঠানামার সক্ষমতা তৈরি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর বিমানবন্দরটির এজিএল (এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং) সিস্টেম ক্যাটাগরি–১ থেকে ক্যাটাগরি–২ এ উন্নীত হবে; যা বড় বিমানগুলোর নিরাপদ ওঠানামার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দুর্যোগ দুর্বিপাকে যখন দৃষ্টিসীমা কমে যায় তখন এখনকার চেয়ে বাড়তি সুবিধা মিলবে।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এ্যাপ্রন বা এয়ারক্রাফট পার্কিং এ্যাপ্রন এরিয়া সম্প্রসারণ করা গেলে দুর্যোগ বা জরুরি মুহূর্তে আরো বেশি বিমান নিরাপদে অবতরণ করানো সম্ভব হবে। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, গত ২ জানুয়ারি যদি ৯টি ফ্লাইটকে চট্টগ্রামে অবতরণ করানো সম্ভব হতো তাহলে ওই বিমানগুলোর বিপুল অর্থের জ্বালানি সাশ্রয়, যাত্রীদের ভোগান্তি হ্রাস এবং সর্বোপরি নিরাপত্তা ঝুঁকি কমে যেত। রাজস্ব আয় হতো সরকারের।
বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল জানান, প্রকল্পের সিভিল অংশের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। এখন ইলেক্ট্রোমেকানিক্যালের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। পুরোদমে কাজ চলছে। ওগুলো দ্রুত শেষ করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, শাহ আমানত বিমানবন্দরে গত অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয় ২৭০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। বর্তমানে এই বিমানবন্দর ব্যবহার করে ছয়টি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে দুটি দেশীসহ চারটি এয়ারলাইন্স। প্রতিদিন গড়ে আন্তর্জাতিক রুটে ১৬টি এবং অভ্যন্তরীণ রুটে ৩৫টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। এ বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৫ হাজারের বেশি যাত্রী দেশে–বিদেশে যাতায়াত করেন।




