উপসম্পাদকীয়——————–   আজ ০৪ মে বিশ্ব বাণিজ্য দিবস

খন রঞ্জন রায়: বিশ্ব বাণিজ্যের সাবলীল বিকাশ ও সার্থক অগ্রযাত্রাকে সমন্বয় করার আগ্রহ নিয়ে গঠিত হয়েছিল বিকল্পধারার বাণিজ্যনীতি অনুসরণকারী একটি নতুন সংস্থা। ১৯৮৯ সালে নেদারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ব্যাবসায়িদের মনোবৃত্তির নতুন এই সম্ভাবনাতে সকল মহাদেশের ৫০টি দেশের ১৬০টি বাণিজ্য সংস্থা যোগদান করেছিল।

বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাপনাকে সুসংহত, আন্তর্জাতিক সমন্বয়, ও সর্বজনীন সচেতনতার আকাক্সক্ষা নিয়ে গঠিত হয়েছিল আইফটি নামক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংগঠন। ব্যবসা-বাণিজ্যের মণিমাণিক্যকে সুগন্ধি কুসুম মাখিয়ে দুর্বার গতিতে চলতে থাকে এই সংগঠনের কার্যক্রম। যোগ্যতার অধিকারী হয়ে ২০০২ সালে তাদের সাধারণ অধিবেশনে বোধগম্য কারণে সিদ্ধান্ত নেয় ‘বিশ্ব বাণিজ্য দিবস’ পালনের।

সারা পৃথিবীতে উৎপাদিত হস্তগত পণ্যের বাজার, বিপনন, সংরক্ষণ, ও গুণগতমান নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে অগণিত সুরভিত কুসুমের মতো সশোভিত করতে বেছে নেয় ৪ মে তারিখ। অতুলনীয় ব্যুৎপত্তির অধিকারী হয়ে যোগ্য-বিদগ্ধ অনুসন্ধানধর্মী এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ নিখাদ নিরপেক্ষ বলে মেনে নেয় সবাই। বিশ্ব বাণিজ্যে ধনী-গরিব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা গুণে গুণমুগ্ধ উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য বৈষম্যদূরীকরণের সৌরভ বিলাচ্ছে এই দিবস।

অন্তরালের জঘন্য অপচেষ্টা সাফল্যজনকভাবে মোকাবিলা করছে। ঔদাসীন্য অদক্ষতা দেখিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার অভিরুচিতে তারা নেই। ফাঁকতালে ফায়দা লুটার অঘটন ঘটনপটীয়শিদের জ্বালা ধরিয়ে বদনামের মুখোমুখি দাঁড় করাতে সক্ষম হচ্ছে। অন্য অনেক সংগঠনের মতো তামাশায় পরিণত হয়ে সাগরের অতল তলে তলিয়ে যায়নি। তাঁরা ব্যবসায়িদের প্রতি পিতৃভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে ক্লেদমুক্ত থাকার চেষ্টা করছে।

ইতিহাসবিদ পিটার ওয়াটসন ও রমেশ মানিক্রমের বের করা হদিস অনুযায়ী বাণিজ্যের প্রদোষকাল শুরু হয়েছিল দেড় লক্ষ বছর আগে। এরপর থেকে এই বাণিজ্য ও বাণিজ্য ব্যবস্থার উপর দিয়ে বয়ে গেছে বহু ধূলিঝড়। অদম্য ক্রিয়াশীল এই ব্যবস্থার বিবেক স্বনির্ভর উদ্যোগে জাগ্রত হয়েছে। মুদ্রা বা অর্থ প্রবর্তনের পর বাণিজ্যের ঐতিহাসিক মানদণ্ডের যুগপটভূমি সৃষ্টি হয়। পণ্য ও পরিষেবার অদলবদল নীতি পর্ব থেকে পর্বান্তরে সহজতর হয়।

মধ্যযুগে ইউরোপে ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিকশিত হওয়ার পর থেকে বাণিজ্যের তুরুপের তাস হয় ‘মুদ্রা’। মুদ্রার উপর বাণিজ্যব্যবস্থা নিঃশর্ত সমর্পনের পূর্বে বাণিজ্য আদান-প্রদান নীতি প্রচলিত ছিল পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬ শতকে উত্তর ভারতে ছাপাঙ্কিতমুদ্রার তুঙ্গঁস্পর্শী প্রচলন শুরু হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলার মহাস্থান তাম্রলিপি, বানগড়, চন্দ্রকেতুগড়, মঙ্গলকোট প্রভৃতি নগরকেন্দ্র উৎখননের ফলে খ্রিষ্টপূর্ব ৩ শতক পর্যায় থেকে ছাপাঙ্কিত মুদ্রা আবিস্কার হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

সম্প্রতি নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর উৎখনন করে মুদ্রার অভিনবত্ব লুকিয়ে থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সন্ধানী আলো ফেলা এই নিদর্শন গাঙ্গেয় অববাহিকার পূর্বাঞ্চলেও বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছিল বলে প্রমাণ দেয়। ছাপাঙ্কিত মুদ্রা আদি উৎস হয়ে ক্রয়-বিক্রয় মাধ্যম হিসাবে বিশিষ্টতা অর্জন করেছিল। নতুন এই মুদ্রা ব্যবস্থার সম্মোহনী শক্তির কারণে এতদঞ্চলে বাণিজ্য খুব দ্রুত প্রসার লাভ করেছিল। গণ্ডক ও কাকিনি নামীয় মুদ্রার শাঁসজলে পুষ্ট হয়েছিল অত্র এলাকা। এর ঠিক পরপরই ক্রয়-বিক্রয়ের করতলগত মাধ্যম হিসাবে নাক গলাতে শুরু করে ‘কড়ি’।

খ্রিষ্টপূর্ব তিন শতক থেকে প্রচলিত হয়ে কড়ির কেরামতি চলছিল আরো কিছুকাল। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব দুই শতক থেকে বড়সড় ঝুঁকি নিয়ে বাংলায় কড়ির পাশাপাশি ছাপাঙ্কিত রৌপ্য, তাম্র ও স্বর্ণমুদ্রা বলিষ্ঠ্য কণ্ঠস্বর হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটায়। আদিগন্ত প্রসারিত এইসব মুদ্রার একক হিসাবে পূর্ণমানের দায়মোচন থেকে রক্ষা করে। তখন অর্ধেক ও সিকিমানের আসর বন্দনা শুরু হয়। তখন ছিল অখোদাইকৃত। এর যবনিকাপাত হয় কুষাণযুগে। অখোদাইকৃত মুদ্রার সমাপ্তিবিন্দুকে খুব বেশি প্রলম্বিত করে নাই। ভাবিকালের ইঙ্গিত বহন করে তেজস্বীভাব নিয়ে শুরু হয় ছাঁচে ঢালাই মুদ্রাব্যবস্থা। কুষাণ-রাঢ় এবং কুষাণ-বঙ্গ মুদ্রা হিসাবে অ্যাখায়িত এইসব তামার মুদ্রা বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে বঙ্গের – কলিঙ্গের সময়কাল পর্যন্ত দৃশ্যরচনা বৈভব তৈরি করেছিল। পুরী-কুষাণ মুদ্রার সাথে কলিঙ্গ মুদ্রার সাদৃশ্যপূর্ণ বিহ্বল-বিরহ থাকায় বঙ্গ-কলিঙ্গের সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগের আনাগোনা বেড়েছিল বলে অনুমান করা হয়।

গুপ্ত বংশের শাসনামলে খ্রিষ্টিয় পাঁচ-ছয় শতকে মুদ্রা ব্যবস্থার শীলিত শান্তায়ন ঘটতে থাকে। প্রচলিত আলো আবছায়ার ছাপাঙ্কিতমুদ্রা কাটছাঁট করে উন্নতমানের গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রা চালু করেছিল। স্নিগ্ধ প্রেমের মাধুরী মিশিয়ে এই মুদ্রার মগ্নতা থাকে আরো কিছুকাল। সমতটের রাজাদের শাসনামল সাত ও আট শতকে স্বর্ণমুদ্রা চরিত্রের দ্বিধাবিভক্তি ঘটে। স্বর্ণমানের খাঁটিত্বের সাথে কানায় কানায় গুঁজে দেওয়া হয় ‘খাদ’। অর্থজগতের অন্তর্নিহিত এই ব্যবস্থা বীভৎস রসের সঞ্চার করে।

মানুষের মাঝে অভিমান, ক্ষোভ, উদাসীনতা, নির্লিপ্ততা কাজ করতে থাকে। মুদ্রার আবরণে আভরণে তরবেতর ঘটিয়ে পাঁচমিশালী ঢং এ আকুল চাউনি নিয়ে মিশ্র অর্থনীতি চালু হয়। বিলীয়মান এই সমন্বয়ী সংস্কৃতি চলে প্রায় ৫ শত বছর। তৎসময়ে বাংলায় গদি আকড়ে থাকা পাল ও সেন রাজারা নতুন করে মুদ্রা নিয়ে কোনরূপ জিগির তুলেনি। পূর্ববৎ রাজাদের সারবস্তু আহরণ করে তার মগ্নতা দেখিয়ে সুবিবেচনা প্রস্তুত চলমান রৌপ্য মুদ্রা অব্যহত রাখে। এই মুদ্রার ছাপাঙ্কিত মনন-সৃজন ও রূপায়ণের সাথে আরবি মুদ্রার আংশিক অনুকরণ খুঁজে পাওয়া যায়। দীর্ঘ ঐতিহ্যনির্ভর বিপুল প্রভাব সঞ্চার করা ‘বাংলা’র সাথে আরবি, প্রাচ্য-প্রতিচ্য’র ব্যবসায়িদের নিবিড় সম্পর্কের ধারণা মেলে। আদিমযুগের আতীব্র প্রখরতা অতিক্রম করে মধ্যযুগে এসে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল।

১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের বিনিময় ব্যবস্থা অনিবার্যভাবে সীমা থেকে অসীমে পৌঁছে। বাংলায় মুদ্রা অর্থনীতি ক্রমসৃজ্যমান উন্মেষ ঘটে। ষোল শতকের শেষ দিকে বাণিজ্য ব্যবস্থায় অত্র এলাকার সূতী² হাতিয়ার হয়ে ওঠে ‘চট্টগ্রাম বন্দর’। ১৫২৬ সালে বাবর কর্তৃক মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর মোগল শাসনামলে রাজদরবারের বিলাসবহুল দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য ত্রিবেনি মেলবন্ধন ঘটে বাংলায় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর সাথে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সাথে বাংলার সম্পৃক্তি যুগবৎভাবে ঘটে বন্দর আর উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর বিচিত্র সৃজনশীলতায়। মোগল শাসন সাবালক হয়ে সুসংহতভাবে বহির্বাণিজ্যের সাথে কঠিন ব্রতে অবতীর্ণ হয়। ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজদের ‘পর্তুপিকোয়েনো’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটিয়ে বাংলার জয়জয়ন্তীতে আবির্ভাব সঞ্চার করে বিদেশী বণিক। শুরু হয় মোগল শাসকদের সংকটযন্ত্রণার বিচিত্র পথ। তা চলে ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।

বিভেদ বিতণ্ডা জাগিয়ে বাংলায় পর্তুগীজ বাণিজ্যের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে। সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে হকচকিয়ে বাংলায় আগমন ঘঠে ইংরেজ-ওলন্দাজ-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বিচিত্র গতিসম্পন্ন প্রকাশোন্মুখতা নিয়ে বাংলায় শুরু করে কেনাবেচা অর্থনীতির একাধিপত্য। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধ জয় করে বাংলার রাজনীতি ও অর্থনীতির একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করে তারা। মায়ামমতা ভেঙ্গেচুরে বাংলা অঞ্চলের প্রতিদ্ব›দ্বীদের হটিয়ে একরোখা আনুগত্যের সৃজন জোয়ার জাগায়। ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ওলন্দাজরাই বাণিজ্যের সমগ্রতাসন্ধানের ত্রিঐক্যচর্চা চিরক্লান্তিহীন করে অনাস্বাদিত এক নান্দনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলা বিদায় নিয়েছিল।

শাসনব্যবস্থায় অসম অপব্যবহার করে শক্তি আর দুর্বলতার নিদর্শন নিয়ে দেশত্যাগ করলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বেলায় জিয়নকাঠি হিসাবে বাংলাকেই আঁকড়ে রেখেছিল। রেশম, সুতিবস্ত্র এবং নানা ধরণের খাদ্যপণ্যের সস্তামূল্যের কারণে সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা ঐতিহ্যনির্ভর এই বাংলায় আসতে শুরু করে। একদিন দুইদিনে নয়। ঐতিহাসিককাল থেকেই। অসম অনুসারী হিসাবে সপ্তদশ শতকেই ব্রিটেন, হল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্কসহ আরো অনেক দেশ অত্র এলাকায় বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। সোনা ও রূপার বিনিময়ে অনির্দিষ্ট পথে বাংলা থেকে সিল্ক, সুতিবস্ত্র, আফিম, সোরা, চিনি, চাল, গম, ঘি, সরিষার তেল, মোম, সোহাগা, লাক্ষা, কড়ি ও চটের বস্তাসহ অপ্রচলিত আরো কিছু বিলাসীদ্রব্য নিয়ে যেতে থাকে। আমদানী-রপ্তানির নীতিবাক্য মূলত অসম থেকেই শুরু হয়। ব্যবসার ব্যবস্থার বিবিধ মাত্রা সঞ্চার করে কেতাবি নাম দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক-বৈদেশিক বাণিজ্য। বাংলায় শুরু হয় রপ্তানিমুখী অর্থনীতির মুক্তধারার বাঁধভাঙ্গা জোয়ার।

অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করায় অনেক দেশে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ঘেরাটোপে আটকে নানাবিধ সামগ্রীর চাহিদার প্রতি মিশ্র মেলবন্ধন তৈরি হয়। কোন দেশের কী পরিমাণ সামগ্রী প্রয়োজন তা নিরূপণ উদঘাটনের গঠনবিন্যাসে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ভোগ্যপণ্য চাহিদা মিটাতে গিয়ে রপ্তানিনীতির সাথে আমদানিনীতির হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শুরু হয়।

চিরকালের সঙ্গে সমসাময়িককালের অর্থনীতির মেলবন্ধন বিঘ্নিত হতে থাকে। চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বে আসেনি। স্বদেশ-সমাজের ভাবনাবিলাসী স্বাভাবিক বোঝাপড়া দোরোখা নীতিতে পড়ে। উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিনির্ভরতার প্রতি আকুলি বিকুলি বাড়তে থাকে। গ্রহণ-বর্জনের বিতণ্ডায় না গেলেও আতীব্র-আততি জাগে আমদানিনীতিতে। প্রথম দিকে ইউরোপের শিল্পবিপ্লব আমাদের অনিষ্ট কল্পনার সৃষ্টি হয়। তৎপরবর্তীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি বাংলার ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারাতে থাকে।

নব্য চরিত্র বিশেষের সামগ্রীর বিবিধ প্রয়োগে আন্তর্জাতিক বাজার দখলে যায়। বাংলাদেশ হয়ে পড়ে আমদানিনির্ভর। মনস্তত্ত¡ নির্ভর পণ্যের কারণে অনির্দেশ্যভাবে খুঁজে নেওয়া হয় আমদানিকে। বৈদেশিক বাণিজ্যনীতির অর্থব্যবস্থায় ক্রমাগত অবনতি ঘটতে থাকে। অধিক আলোড়িত বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। ঘাটতি বাণিজ্য উত্তরণের সাক্ষ্য হিসাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় খাত গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করা হয়।

আমদানি ব্যবস্থার একাধিপত্যের বদলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। বার্ষিকী-পঞ্চ বার্ষিকী ব্যবসাবান্ধব পরিকল্পনার কাঠামোতে শিল্পনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রয়োগসাধ্য সম্ভব উৎসখাত খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। খোলাবাজার, মুক্তবাজার অর্থনীতি নীতির ফলশ্রুতি বিদেশি পণ্যের নামযশের কাছে নিজস্ব পণ্যের কদরদাবির ধরণ পাল্টে যায়। নিজস্বতা নিয়ে অন্যদের তুড়ি মেরে বুক ফুলিয়ে চলার আকুল আকুতি জানানো হয়।

পণ্য বৈচিত্র্যায়ণ ও গুণগত মান বৃদ্ধির মাধ্যমে রপ্তানিযোগ্য পণ্যসমূহের বিপণনযোগ্যতা বাড়ানোর তেকোনা বিন্যাস ঘটানো হয়। রপ্তানিমুখী শিল্প স্থাপনায় উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধকরণ এবং বিদেশে বাংলাদেশি পণ্যসমূহের বাজার বিস্তৃতি ও সুসংহতকরণে আঁকাচোরা কায়দা নিরূপণ করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পূর্ণ-পরিপূর্ণভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ নীতি শাখা, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় রপ্তানি কমিশন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড, ইনস্টিটিউট, আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরসমূহ পণ্য ও সেবারপ্তানির বাজার সম্প্রসারণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দূরত্ব ঘুচাতে চেষ্টা চালাচ্ছে।

হাজারো উপদ্রব সহ্য করে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ কল্পনার মুগ্ধতায় এই সম্পর্কিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে যোগাযোগ, রপ্তানির স্বার্থে দরকষাকষি, ব্যাবসা সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন, পণ্যের ট্যারিফ নির্ধারণ, বাণিজ্য সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম, তথ্য উপাত্ত সংরক্ষণ ইত্যাদির মাধ্যমে বিস্তৃত আধার থেকে বেরিয়ে আসার ঠোকাঠুকি করে। কারো সাথে সুবিচার পায়, কাউকে বুকে টানতে পারে, কখনো বা ঘনায়মান অন্ধকারে নিপতিত হয়।

একান্তভাবে যুক্ত হয়ে জানানুসন্ধ্যানে সৃজন সামর্থ্যে অভিভ‚ত হয়। কখনোবা শর্তারোপের চর্চিত দুষ্কাল ভাষ্য নিয়ে বিতণ্ডায় মাতে। তাবৎ বিচিত্র এই রূপ-রূপান্তরণ জীবন্ত ক্রিয়াশীল হয়। অনেকক্ষেত্রে কিংবদন্তিতুল্য। এরপরও বাংলাদেশে দিন দিন বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি আর মুদ্রা হিসাবের উলম্ফনে নীতিনির্ধারণীমহলের দিশেহারা অবস্থা। রপ্তানির চেয়ে আমদানি বাড়ার গতি জলবৎ তরলং।

উর্ধ্বমুখী বৈষম্যপূর্ণ এই অবস্থার লাগাম টানতেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা চেতনাপ্রবাহের মধ্যস্থতায় ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা করে। ধনী ও গরিব রাষ্ট্রগুলোর সিক্ত বালু রাশিতে বসে বৈষম্যদূরীকরণসহ প্রযুক্তি আদান প্রদান সংক্রান্ত বিষয়টিতে ক্রমশ গুরত্ব দেয়। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের উৎপাদকদের স্বার্থের বিষয়টি জনসম্মুখে তুলে ধরে। ক্ষুদ্র উৎপাদক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যবসাসংক্রান্ত খোলামেলা ভাব বিনিময় চর্চার অংশ ‘বিশ্ব বাণিজ্য দিবস’। বাণিজ্যের নেতিবাচক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে অতৃপ্তি-আকাঙ্ক্ষাতে আলোর দাপাদাপি হোক আজকের দিনে এই প্রত্যাশা।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।

উপসম্পাদকীয়——————–   আজ ০৪ মে বিশ্ব বাণিজ্য দিবস

খন রঞ্জন রায়: বিশ্ব বাণিজ্যের সাবলীল বিকাশ ও সার্থক অগ্রযাত্রাকে সমন্বয় করার আগ্রহ নিয়ে গঠিত হয়েছিল বিকল্পধারার বাণিজ্যনীতি অনুসরণকারী একটি নতুন সংস্থা। ১৯৮৯ সালে নেদারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ব্যাবসায়িদের মনোবৃত্তির নতুন এই সম্ভাবনাতে সকল মহাদেশের ৫০টি দেশের ১৬০টি বাণিজ্য সংস্থা যোগদান করেছিল।

বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাপনাকে সুসংহত, আন্তর্জাতিক সমন্বয়, ও সর্বজনীন সচেতনতার আকাক্সক্ষা নিয়ে গঠিত হয়েছিল আইফটি নামক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংগঠন। ব্যবসা-বাণিজ্যের মণিমাণিক্যকে সুগন্ধি কুসুম মাখিয়ে দুর্বার গতিতে চলতে থাকে এই সংগঠনের কার্যক্রম। যোগ্যতার অধিকারী হয়ে ২০০২ সালে তাদের সাধারণ অধিবেশনে বোধগম্য কারণে সিদ্ধান্ত নেয় ‘বিশ্ব বাণিজ্য দিবস’ পালনের।

সারা পৃথিবীতে উৎপাদিত হস্তগত পণ্যের বাজার, বিপনন, সংরক্ষণ, ও গুণগতমান নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে অগণিত সুরভিত কুসুমের মতো সশোভিত করতে বেছে নেয় ৪ মে তারিখ। অতুলনীয় ব্যুৎপত্তির অধিকারী হয়ে যোগ্য-বিদগ্ধ অনুসন্ধানধর্মী এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ নিখাদ নিরপেক্ষ বলে মেনে নেয় সবাই। বিশ্ব বাণিজ্যে ধনী-গরিব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা গুণে গুণমুগ্ধ উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য বৈষম্যদূরীকরণের সৌরভ বিলাচ্ছে এই দিবস।

অন্তরালের জঘন্য অপচেষ্টা সাফল্যজনকভাবে মোকাবিলা করছে। ঔদাসীন্য অদক্ষতা দেখিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার অভিরুচিতে তারা নেই। ফাঁকতালে ফায়দা লুটার অঘটন ঘটনপটীয়শিদের জ্বালা ধরিয়ে বদনামের মুখোমুখি দাঁড় করাতে সক্ষম হচ্ছে। অন্য অনেক সংগঠনের মতো তামাশায় পরিণত হয়ে সাগরের অতল তলে তলিয়ে যায়নি। তাঁরা ব্যবসায়িদের প্রতি পিতৃভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে ক্লেদমুক্ত থাকার চেষ্টা করছে।

ইতিহাসবিদ পিটার ওয়াটসন ও রমেশ মানিক্রমের বের করা হদিস অনুযায়ী বাণিজ্যের প্রদোষকাল শুরু হয়েছিল দেড় লক্ষ বছর আগে। এরপর থেকে এই বাণিজ্য ও বাণিজ্য ব্যবস্থার উপর দিয়ে বয়ে গেছে বহু ধূলিঝড়। অদম্য ক্রিয়াশীল এই ব্যবস্থার বিবেক স্বনির্ভর উদ্যোগে জাগ্রত হয়েছে। মুদ্রা বা অর্থ প্রবর্তনের পর বাণিজ্যের ঐতিহাসিক মানদণ্ডের যুগপটভূমি সৃষ্টি হয়। পণ্য ও পরিষেবার অদলবদল নীতি পর্ব থেকে পর্বান্তরে সহজতর হয়।

মধ্যযুগে ইউরোপে ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিকশিত হওয়ার পর থেকে বাণিজ্যের তুরুপের তাস হয় ‘মুদ্রা’। মুদ্রার উপর বাণিজ্যব্যবস্থা নিঃশর্ত সমর্পনের পূর্বে বাণিজ্য আদান-প্রদান নীতি প্রচলিত ছিল পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬ শতকে উত্তর ভারতে ছাপাঙ্কিতমুদ্রার তুঙ্গঁস্পর্শী প্রচলন শুরু হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলার মহাস্থান তাম্রলিপি, বানগড়, চন্দ্রকেতুগড়, মঙ্গলকোট প্রভৃতি নগরকেন্দ্র উৎখননের ফলে খ্রিষ্টপূর্ব ৩ শতক পর্যায় থেকে ছাপাঙ্কিত মুদ্রা আবিস্কার হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

সম্প্রতি নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর উৎখনন করে মুদ্রার অভিনবত্ব লুকিয়ে থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সন্ধানী আলো ফেলা এই নিদর্শন গাঙ্গেয় অববাহিকার পূর্বাঞ্চলেও বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছিল বলে প্রমাণ দেয়। ছাপাঙ্কিত মুদ্রা আদি উৎস হয়ে ক্রয়-বিক্রয় মাধ্যম হিসাবে বিশিষ্টতা অর্জন করেছিল। নতুন এই মুদ্রা ব্যবস্থার সম্মোহনী শক্তির কারণে এতদঞ্চলে বাণিজ্য খুব দ্রুত প্রসার লাভ করেছিল। গণ্ডক ও কাকিনি নামীয় মুদ্রার শাঁসজলে পুষ্ট হয়েছিল অত্র এলাকা। এর ঠিক পরপরই ক্রয়-বিক্রয়ের করতলগত মাধ্যম হিসাবে নাক গলাতে শুরু করে ‘কড়ি’।

খ্রিষ্টপূর্ব তিন শতক থেকে প্রচলিত হয়ে কড়ির কেরামতি চলছিল আরো কিছুকাল। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব দুই শতক থেকে বড়সড় ঝুঁকি নিয়ে বাংলায় কড়ির পাশাপাশি ছাপাঙ্কিত রৌপ্য, তাম্র ও স্বর্ণমুদ্রা বলিষ্ঠ্য কণ্ঠস্বর হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটায়। আদিগন্ত প্রসারিত এইসব মুদ্রার একক হিসাবে পূর্ণমানের দায়মোচন থেকে রক্ষা করে। তখন অর্ধেক ও সিকিমানের আসর বন্দনা শুরু হয়। তখন ছিল অখোদাইকৃত। এর যবনিকাপাত হয় কুষাণযুগে। অখোদাইকৃত মুদ্রার সমাপ্তিবিন্দুকে খুব বেশি প্রলম্বিত করে নাই। ভাবিকালের ইঙ্গিত বহন করে তেজস্বীভাব নিয়ে শুরু হয় ছাঁচে ঢালাই মুদ্রাব্যবস্থা। কুষাণ-রাঢ় এবং কুষাণ-বঙ্গ মুদ্রা হিসাবে অ্যাখায়িত এইসব তামার মুদ্রা বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে বঙ্গের – কলিঙ্গের সময়কাল পর্যন্ত দৃশ্যরচনা বৈভব তৈরি করেছিল। পুরী-কুষাণ মুদ্রার সাথে কলিঙ্গ মুদ্রার সাদৃশ্যপূর্ণ বিহ্বল-বিরহ থাকায় বঙ্গ-কলিঙ্গের সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগের আনাগোনা বেড়েছিল বলে অনুমান করা হয়।

গুপ্ত বংশের শাসনামলে খ্রিষ্টিয় পাঁচ-ছয় শতকে মুদ্রা ব্যবস্থার শীলিত শান্তায়ন ঘটতে থাকে। প্রচলিত আলো আবছায়ার ছাপাঙ্কিতমুদ্রা কাটছাঁট করে উন্নতমানের গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রা চালু করেছিল। স্নিগ্ধ প্রেমের মাধুরী মিশিয়ে এই মুদ্রার মগ্নতা থাকে আরো কিছুকাল। সমতটের রাজাদের শাসনামল সাত ও আট শতকে স্বর্ণমুদ্রা চরিত্রের দ্বিধাবিভক্তি ঘটে। স্বর্ণমানের খাঁটিত্বের সাথে কানায় কানায় গুঁজে দেওয়া হয় ‘খাদ’। অর্থজগতের অন্তর্নিহিত এই ব্যবস্থা বীভৎস রসের সঞ্চার করে।

মানুষের মাঝে অভিমান, ক্ষোভ, উদাসীনতা, নির্লিপ্ততা কাজ করতে থাকে। মুদ্রার আবরণে আভরণে তরবেতর ঘটিয়ে পাঁচমিশালী ঢং এ আকুল চাউনি নিয়ে মিশ্র অর্থনীতি চালু হয়। বিলীয়মান এই সমন্বয়ী সংস্কৃতি চলে প্রায় ৫ শত বছর। তৎসময়ে বাংলায় গদি আকড়ে থাকা পাল ও সেন রাজারা নতুন করে মুদ্রা নিয়ে কোনরূপ জিগির তুলেনি। পূর্ববৎ রাজাদের সারবস্তু আহরণ করে তার মগ্নতা দেখিয়ে সুবিবেচনা প্রস্তুত চলমান রৌপ্য মুদ্রা অব্যহত রাখে। এই মুদ্রার ছাপাঙ্কিত মনন-সৃজন ও রূপায়ণের সাথে আরবি মুদ্রার আংশিক অনুকরণ খুঁজে পাওয়া যায়। দীর্ঘ ঐতিহ্যনির্ভর বিপুল প্রভাব সঞ্চার করা ‘বাংলা’র সাথে আরবি, প্রাচ্য-প্রতিচ্য’র ব্যবসায়িদের নিবিড় সম্পর্কের ধারণা মেলে। আদিমযুগের আতীব্র প্রখরতা অতিক্রম করে মধ্যযুগে এসে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল।

১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের বিনিময় ব্যবস্থা অনিবার্যভাবে সীমা থেকে অসীমে পৌঁছে। বাংলায় মুদ্রা অর্থনীতি ক্রমসৃজ্যমান উন্মেষ ঘটে। ষোল শতকের শেষ দিকে বাণিজ্য ব্যবস্থায় অত্র এলাকার সূতী² হাতিয়ার হয়ে ওঠে ‘চট্টগ্রাম বন্দর’। ১৫২৬ সালে বাবর কর্তৃক মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর মোগল শাসনামলে রাজদরবারের বিলাসবহুল দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য ত্রিবেনি মেলবন্ধন ঘটে বাংলায় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর সাথে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সাথে বাংলার সম্পৃক্তি যুগবৎভাবে ঘটে বন্দর আর উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর বিচিত্র সৃজনশীলতায়। মোগল শাসন সাবালক হয়ে সুসংহতভাবে বহির্বাণিজ্যের সাথে কঠিন ব্রতে অবতীর্ণ হয়। ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজদের ‘পর্তুপিকোয়েনো’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটিয়ে বাংলার জয়জয়ন্তীতে আবির্ভাব সঞ্চার করে বিদেশী বণিক। শুরু হয় মোগল শাসকদের সংকটযন্ত্রণার বিচিত্র পথ। তা চলে ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।

বিভেদ বিতণ্ডা জাগিয়ে বাংলায় পর্তুগীজ বাণিজ্যের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে। সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে হকচকিয়ে বাংলায় আগমন ঘঠে ইংরেজ-ওলন্দাজ-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বিচিত্র গতিসম্পন্ন প্রকাশোন্মুখতা নিয়ে বাংলায় শুরু করে কেনাবেচা অর্থনীতির একাধিপত্য। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধ জয় করে বাংলার রাজনীতি ও অর্থনীতির একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করে তারা। মায়ামমতা ভেঙ্গেচুরে বাংলা অঞ্চলের প্রতিদ্ব›দ্বীদের হটিয়ে একরোখা আনুগত্যের সৃজন জোয়ার জাগায়। ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ওলন্দাজরাই বাণিজ্যের সমগ্রতাসন্ধানের ত্রিঐক্যচর্চা চিরক্লান্তিহীন করে অনাস্বাদিত এক নান্দনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলা বিদায় নিয়েছিল।

শাসনব্যবস্থায় অসম অপব্যবহার করে শক্তি আর দুর্বলতার নিদর্শন নিয়ে দেশত্যাগ করলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বেলায় জিয়নকাঠি হিসাবে বাংলাকেই আঁকড়ে রেখেছিল। রেশম, সুতিবস্ত্র এবং নানা ধরণের খাদ্যপণ্যের সস্তামূল্যের কারণে সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা ঐতিহ্যনির্ভর এই বাংলায় আসতে শুরু করে। একদিন দুইদিনে নয়। ঐতিহাসিককাল থেকেই। অসম অনুসারী হিসাবে সপ্তদশ শতকেই ব্রিটেন, হল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্কসহ আরো অনেক দেশ অত্র এলাকায় বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। সোনা ও রূপার বিনিময়ে অনির্দিষ্ট পথে বাংলা থেকে সিল্ক, সুতিবস্ত্র, আফিম, সোরা, চিনি, চাল, গম, ঘি, সরিষার তেল, মোম, সোহাগা, লাক্ষা, কড়ি ও চটের বস্তাসহ অপ্রচলিত আরো কিছু বিলাসীদ্রব্য নিয়ে যেতে থাকে। আমদানী-রপ্তানির নীতিবাক্য মূলত অসম থেকেই শুরু হয়। ব্যবসার ব্যবস্থার বিবিধ মাত্রা সঞ্চার করে কেতাবি নাম দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক-বৈদেশিক বাণিজ্য। বাংলায় শুরু হয় রপ্তানিমুখী অর্থনীতির মুক্তধারার বাঁধভাঙ্গা জোয়ার।

অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করায় অনেক দেশে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ঘেরাটোপে আটকে নানাবিধ সামগ্রীর চাহিদার প্রতি মিশ্র মেলবন্ধন তৈরি হয়। কোন দেশের কী পরিমাণ সামগ্রী প্রয়োজন তা নিরূপণ উদঘাটনের গঠনবিন্যাসে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ভোগ্যপণ্য চাহিদা মিটাতে গিয়ে রপ্তানিনীতির সাথে আমদানিনীতির হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শুরু হয়।

চিরকালের সঙ্গে সমসাময়িককালের অর্থনীতির মেলবন্ধন বিঘ্নিত হতে থাকে। চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বে আসেনি। স্বদেশ-সমাজের ভাবনাবিলাসী স্বাভাবিক বোঝাপড়া দোরোখা নীতিতে পড়ে। উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিনির্ভরতার প্রতি আকুলি বিকুলি বাড়তে থাকে। গ্রহণ-বর্জনের বিতণ্ডায় না গেলেও আতীব্র-আততি জাগে আমদানিনীতিতে। প্রথম দিকে ইউরোপের শিল্পবিপ্লব আমাদের অনিষ্ট কল্পনার সৃষ্টি হয়। তৎপরবর্তীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি বাংলার ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারাতে থাকে।

নব্য চরিত্র বিশেষের সামগ্রীর বিবিধ প্রয়োগে আন্তর্জাতিক বাজার দখলে যায়। বাংলাদেশ হয়ে পড়ে আমদানিনির্ভর। মনস্তত্ত¡ নির্ভর পণ্যের কারণে অনির্দেশ্যভাবে খুঁজে নেওয়া হয় আমদানিকে। বৈদেশিক বাণিজ্যনীতির অর্থব্যবস্থায় ক্রমাগত অবনতি ঘটতে থাকে। অধিক আলোড়িত বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। ঘাটতি বাণিজ্য উত্তরণের সাক্ষ্য হিসাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় খাত গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করা হয়।

আমদানি ব্যবস্থার একাধিপত্যের বদলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। বার্ষিকী-পঞ্চ বার্ষিকী ব্যবসাবান্ধব পরিকল্পনার কাঠামোতে শিল্পনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রয়োগসাধ্য সম্ভব উৎসখাত খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। খোলাবাজার, মুক্তবাজার অর্থনীতি নীতির ফলশ্রুতি বিদেশি পণ্যের নামযশের কাছে নিজস্ব পণ্যের কদরদাবির ধরণ পাল্টে যায়। নিজস্বতা নিয়ে অন্যদের তুড়ি মেরে বুক ফুলিয়ে চলার আকুল আকুতি জানানো হয়।

পণ্য বৈচিত্র্যায়ণ ও গুণগত মান বৃদ্ধির মাধ্যমে রপ্তানিযোগ্য পণ্যসমূহের বিপণনযোগ্যতা বাড়ানোর তেকোনা বিন্যাস ঘটানো হয়। রপ্তানিমুখী শিল্প স্থাপনায় উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধকরণ এবং বিদেশে বাংলাদেশি পণ্যসমূহের বাজার বিস্তৃতি ও সুসংহতকরণে আঁকাচোরা কায়দা নিরূপণ করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পূর্ণ-পরিপূর্ণভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ নীতি শাখা, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় রপ্তানি কমিশন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড, ইনস্টিটিউট, আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরসমূহ পণ্য ও সেবারপ্তানির বাজার সম্প্রসারণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দূরত্ব ঘুচাতে চেষ্টা চালাচ্ছে।

হাজারো উপদ্রব সহ্য করে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ কল্পনার মুগ্ধতায় এই সম্পর্কিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে যোগাযোগ, রপ্তানির স্বার্থে দরকষাকষি, ব্যাবসা সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন, পণ্যের ট্যারিফ নির্ধারণ, বাণিজ্য সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম, তথ্য উপাত্ত সংরক্ষণ ইত্যাদির মাধ্যমে বিস্তৃত আধার থেকে বেরিয়ে আসার ঠোকাঠুকি করে। কারো সাথে সুবিচার পায়, কাউকে বুকে টানতে পারে, কখনো বা ঘনায়মান অন্ধকারে নিপতিত হয়।

একান্তভাবে যুক্ত হয়ে জানানুসন্ধ্যানে সৃজন সামর্থ্যে অভিভ‚ত হয়। কখনোবা শর্তারোপের চর্চিত দুষ্কাল ভাষ্য নিয়ে বিতণ্ডায় মাতে। তাবৎ বিচিত্র এই রূপ-রূপান্তরণ জীবন্ত ক্রিয়াশীল হয়। অনেকক্ষেত্রে কিংবদন্তিতুল্য। এরপরও বাংলাদেশে দিন দিন বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি আর মুদ্রা হিসাবের উলম্ফনে নীতিনির্ধারণীমহলের দিশেহারা অবস্থা। রপ্তানির চেয়ে আমদানি বাড়ার গতি জলবৎ তরলং।

উর্ধ্বমুখী বৈষম্যপূর্ণ এই অবস্থার লাগাম টানতেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা চেতনাপ্রবাহের মধ্যস্থতায় ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা করে। ধনী ও গরিব রাষ্ট্রগুলোর সিক্ত বালু রাশিতে বসে বৈষম্যদূরীকরণসহ প্রযুক্তি আদান প্রদান সংক্রান্ত বিষয়টিতে ক্রমশ গুরত্ব দেয়। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের উৎপাদকদের স্বার্থের বিষয়টি জনসম্মুখে তুলে ধরে। ক্ষুদ্র উৎপাদক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যবসাসংক্রান্ত খোলামেলা ভাব বিনিময় চর্চার অংশ ‘বিশ্ব বাণিজ্য দিবস’। বাণিজ্যের নেতিবাচক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে অতৃপ্তি-আকাঙ্ক্ষাতে আলোর দাপাদাপি হোক আজকের দিনে এই প্রত্যাশা।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।