মাহবুবুর রহমান: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ছাড়া অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গভীর আগ্রহ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার বিদেশী রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দেখতে হবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা, বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: গণতন্ত্র নাকি স্থিতিশীলতা?
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাধারণত কোনো সরকারকে মূল্যায়ন করে দুটি প্রধান মানদণ্ডে—গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
আদর্শগতভাবে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনকে গুরুত্ব দেয়। তাদের কাছে একটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে ভোটার উপস্থিতি, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর।
অন্যদিকে চীন, রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে। তাদের কাছে সরকার কীভাবে ক্ষমতায় এলো তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সরকার কতটা কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারছে।
এই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারে।
অংশগ্রহণের ঘাটতি ও বৈধতার প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত দলটির বিস্তৃত সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। এই দল নির্বাচনের বাইরে থাকায় একটি বড় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক মতামত সরাসরি প্রতিফলিত হয়নি—এমন ধারণা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও তৈরি হতে পারে।
পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে এটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। তারা জানতে চাইবে—
ভোটার উপস্থিতি কতটা ছিল?
বিরোধী কণ্ঠ সংসদে কতটা প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে?
নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক পরিবেশ কতটা উন্মুক্ত?
যদি দেখা যায় যে নির্বাচন ছিল সীমিত অংশগ্রহণমূলক এবং বিরোধী রাজনৈতিক মত প্রকাশে বাধা রয়েছে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে কূটনৈতিক চাপ, মানবাধিকার বিষয়ক সমালোচনা কিংবা বাণিজ্যিক শর্ত আরোপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষ করে জিএসপি সুবিধা, শ্রম অধিকার এবং মানবাধিকার প্রশ্ন আবারও আলোচনায় আসতে পারে।
বাস্তব রাজনীতি: সরকার থাকলে সম্পর্ক থাকবেই
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধু আদর্শ দিয়ে পরিচালিত হয় না—বাস্তব স্বার্থই এখানে প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বঙ্গোপসাগর, ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য করিডর—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
এই কারণে যেই সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বড় শক্তিগুলো পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেবে—এমন সম্ভাবনা কম।
চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের স্বার্থে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। রাশিয়া পারমাণবিক ও জ্বালানি খাতে সম্পর্ক বজায় রাখবে। ভারত সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে নতুন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে।
অর্থাৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে—প্রশ্ন হলো সম্পর্কের গভীরতা ও আস্থার মাত্রা কতটুকু হবে।
বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি: রাজনীতি নয়, পরিবেশ
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ।
তারা দেখতে চাইবে—
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন
নীতিনির্ধারণ কতটা স্থিতিশীল
চুক্তি ও বিনিয়োগ সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত
শ্রম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে কি না
আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনের পর যদি নতুন সরকার দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করে, আমলাতন্ত্রকে কার্যকর করে এবং বিনিয়োগবান্ধব বার্তা দেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
কিন্তু যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মঘট বা প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, তাহলে বৈদেশিক বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।
অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা: আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার মূল চাবিকাঠি
বিদেশীরা শেষ পর্যন্ত দেখবে—দেশের ভেতরে পরিস্থিতি কেমন।
যদি নতুন সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি চর্চা করে, বিরোধী মতকে সম্মান জানায় এবং সহিংসতা এড়িয়ে চলে, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা ধীরে ধীরে বাড়বে।
কিন্তু যদি প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু হয়, সাবেক শাসকগোষ্ঠীর সমর্থকদের কোণঠাসা করা হয়, কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়—তাহলে বিদেশী মহলে সন্দেহ আরও গভীর হবে।
বিশেষ করে পশ্চিমা কূটনীতিকদের কাছে তখন প্রশ্ন উঠবে—এই সরকার কতটা গণতান্ত্রিক মানদণ্ড মেনে চলছে?
অতীত অভিজ্ঞতা কী বলে?
বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে—যেসব সরকার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তারা শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছে। ভিসা নীতি, নিষেধাজ্ঞার হুমকি কিংবা মানবাধিকার প্রতিবেদনের মাধ্যমে সেই চাপ প্রকাশ পেয়েছে।
একই সঙ্গে এটাও সত্য—সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি সরকার কার্যকর প্রশাসন দেখাতে পারে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে এবং বড় ধরনের মানবাধিকার সংকট এড়াতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
পরিশেষে বলতে হয়- আওয়ামী লীগ ছাড়া ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়—এটি একটি প্রক্রিয়া।
শুরুতে পশ্চিমা বিশ্ব সন্দিহান থাকবে, পর্যবেক্ষণ করবে ভোটের গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক পরিবেশ। আঞ্চলিক শক্তিগুলো বাস্তব স্বার্থে সম্পর্ক বজায় রাখবে। বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করবে স্থিতিশীলতার জন্য।
শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—
১. সরকার কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি করে
২. দেশে আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে কি না
৩. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা রক্ষা করা হয়
আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন নিজেই সরকারকে অবৈধ করে তোলে না। কিন্তু বড় একটি রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি বৈধতার প্রশ্নকে জটিল করে তোলে—যার সমাধান সম্ভব কেবল দায়িত্বশীল শাসন ও গণতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমে।
বিদেশীরা শেষ পর্যন্ত আদর্শের চেয়ে বাস্তবতা দেখবে। আর সেই বাস্তবতা যদি হয় স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও উন্নয়নমুখী—তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জায়গা করে নেবে।
না হলে, ২০২৬ সালের নির্বাচন ইতিহাসে আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে।
মাহবুবুর রহমান, সাংবাদিক, লেখক ও কলামিষ্ট।




