(চট্টগ্রাম)
রানা চক্রবর্তী: ত্রিপুরার ‘রাজমালা’ গ্রন্থানুসারে, সুলতান হোসেন শাহের সমকালীন ত্রিপুরা-রাজ ধন্যমাণিক্য দু’বার চট্টগ্রাম জয় করেছিলেন-প্রথমে ১৫১৩-১৪ খৃষ্টাব্দে, এবং এরপরে ১৫১৪-১৫ খৃষ্টাব্দে। কিন্তু সেই দু’বারই চট্টগ্রামে ত্রিপুরা-রাজের অধিকার খুব স্বল্পকাল স্থায়ী হয়েছিল।
কারণ-জোআঁ-দে-বারোস–এর লেখা ‘Da Asia’ এবং অন্যান্য পর্তুগীজ গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, সমকালীন পর্তুগীজ বণিক জোআঁ-দে-সিলভেরা ১৫১৮ খৃষ্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে দেখতে পেয়েছিলেন যে, ওই শহরটি তখন বাংলার সুলতানের অধিকারভুক্ত ছিল। অন্যদিকে চট্টগ্রামের স্থানীয় প্রবাদ, আরাকান দেশের ইতিহাস এবং রাজমালা গ্রন্থের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করলে বুঝতে পারা যায় যে, চট্টগ্রামের অধিকার নিয়ে তখন গৌড়, ত্রিপুরা ও আরাকানের রাজাদের মধ্যে প্রায়শঃই যুদ্ধ লেগে থাকত। অতীতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই মর্মে একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিল যে, সুলতান হোসেন শাহের রাজত্বকালে মগেরা চট্টগ্রাম অধিকার করে নিয়েছিলেন।
১৮৭১ খৃষ্টাব্দে মৌলভী হামিদুল্লাহ খান লিখিত ‘তারিখ-ই-হামিদী’ গ্রন্থটি থেকে জানা যায় যে, সেই সময়ে সুলতান হোসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহের নেতৃত্বে বাংলার সৈন্যবাহিনী মগদের বিতাড়িত করে পুনরায় চট্টগ্রাম অধিকার করে নিয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যে, চট্টগ্রামবাসী সমসাময়িক কবি কবীন্দ্র পরমেশ্বরের মহাভারতে এবিষয়ে কোন কিছুর উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় না।
বরং তাতে পরাগল খান সম্বন্ধে যে কথাগুলি পাওয়া যায়, সেগুলো এরকম-
“নৃপতি হুসেন শাহ গৌড়ের ঈশ্বর।
তান এক সেনাপতি হওন্ত লস্কর॥
লস্কর পরাগল খান মহামতি।
সুবর্ণ বসন পাইল অশ্ব বায়ুগতি॥
লস্করী বিষয় পাই আইবন্ত চলিয়া।
চাটিগ্রামে চলি আইল হরষিত হৈয়া॥
পুত্রপৌত্রে রাজ্য করে খান মহামতি।
পুরাণ শুনন্ত নিতি হরষিত মতি॥”
এখানে শুধুমাত্র একথাই বলা হয়েছে যে, তৎকালীন বাংলার সুলতান হোসেন শাহ পরাগল খানকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু হোসেন শাহ যে তখন শত্রুদের কাছ থেকে চট্টগ্রাম জয় করেছিলেন, এরকম কোন কথার কোন ইঙ্গিত কবীন্দ্র পরমেশ্বর বা শ্রীকর নন্দী অন্ততঃ কোথাও দেননি। তাছাড়া ১৩৯৭ থেকে ১৫১৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম যে অধিকাংশ সময়েই বাংলার সুলতানেরই অধিকারভুক্ত ছিল, একথা-সমসাময়িক শিলালিপি, সাহিত্য ও বিদেশীদের ভ্রমণ-বিবরণী থেকে জানতে পারা যায়।
৮০০ হিজরা বা ১৩৯৭ খৃষ্টাব্দে বিহারের দরবেশ মুজাফফর শামস বলখি যখন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজে চড়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হয়েছিলেন, তখনকার চট্টগ্রাম যে বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, একথা গিয়াসুদ্দীনকে লেখা মুজাফফর শামস বলখির চিঠি থেকেই জানতে পারা যায়। (Proceedings of the 19th Session of Indian History Congress, 1959, p: 217-220 দ্রষ্টব্যঃ) ১৪০৯, ১৪১২ ও ১৪১৫ খৃষ্টাব্দে চীন থেকে রাজপ্রতিনিধিদের তিনটি দল তৎকালীন বাংলার রাজধানী পাণ্ডুয়ায় এসেছিল। সেগুলির মধ্যে প্রথম দু’টি দলের সদস্য দুই দলেব সদস্য মা-হোয়ান তাঁর ‘য়িং-য়া-শ্যং-লান’ গ্রন্থে এবং তৃতীয় দলের সদস্য ফেই-শিন তাঁর ‘শিং-ছা-শ্যং-লান’ গ্রন্থে সেই সফরের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
তাঁদের দু’জনেরই লেখা থেকে জানা যায় যে, সেই সময়কার চট্টগ্রামও বাংলার সুলতানেরই অধিকারে ছিল এবং চীনা রাজপ্রতিনিধিরা সেই বন্দরেই প্রথম অবতরণ করেছিলেন। এমনকি ১৪১৭ ও ১৪১৮ খৃষ্টাব্দেও চট্টগ্রাম যে গৌড়ের রাজার অধিকারে ছিল, একথার ঐতিহাসিক প্রমাণ হল যে, ১৩৩৯ ও ১৩৪০ শকাব্দে দনুজমর্দনদেব ও মহেন্দ্রদেবের মুদ্রা ‘চাটিগ্রাম’–এর টাঁকশাল থেকেই উৎকীর্ণ করা হয়েছিল। তাছাড়া সুলতান জলালুদ্দীন মুহম্মদ শাহের (১৪১৫-১৬ ও ১৪১৮-৩৩ খৃষ্টাব্দ) অনেক মুদ্রাও চট্টগ্রামের টাঁকশালেই তৈরি করা হয়েছিল।
অবশ্য আরাকানী কিংবদন্তী অনুসারে আরাকানরাজ মেং-খরি (১৪৩৪-৫৯ খৃষ্টাব্দে) চট্টগ্রামের ‘রামু’ নামক অঞ্চল জয় করেছিলেন এবং তাঁর পুত্র ও পরবর্তী রাজা বসোআহ্প্যু (১৪৫৯-৮২ খৃষ্টাব্দ) চট্টগ্রাম শহর জয় করেছিলেন। আরাকানী কিংবদন্তীর একথা যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতে হয় যে, চট্টগ্রামে আরাকান-রাজের সেই অধিকার কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কারণ- রাস্তি খান কর্তৃক নির্মিত চট্টগ্রামের একটি মসজিদের ৮৭৮ হিজিরার ২৫শে রমজান তারিখের শিলালিপি থেকে জানতে পারা যায় যে, ১৪৭৪ খৃষ্টাব্দে চট্টগ্রাম সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের শাসনাধীনে ছিল। এছাড়া একটু আগেই বলা হয়েছে যে, ১৫১৮ খৃষ্টাব্দের চট্টগ্রামে বাংলার সুলতানের অধিকার সম্বন্ধে জোআঁ-দে-সিভেরার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য পাওয়া যায়।
রাজমালা গ্রন্থের সাক্ষ্য সম্বন্ধে অতীতে ডঃ হবিবুল্লাহ লিখেছিলেন-
“According to Rajmala, … the Arakanese king took advantage of Husain’s preoccupation with Tipperah and occupied Chittagong.” (History of Bengal, D. U., Vol. II, p: 149-50)
কিন্তু রাজমালার ধন্যমাণিক্যখণ্ডে ঠিক একথা পাওয়া যায় না, বরং- সাহিত্য পরিষদে সংরক্ষিত থাকা পুঁথিতে এবিষয়ে পাওয়া যায় –
“পুনরপি ধন্যমাণিক্য মহারাজা।
চাটীগ্রাম লইবারে পাঠাইলে প্রজা॥
মারণে কাটনে ভঙ্গ দিল গৌড় সেনা।
রসাংমর্দন নারায়ণকে বৈসাইল থানা॥
রাম্বু আদি ছত্রসীক মারিয়া লইল।
রসাঙ্গ নিকটে জাইয়া পুষ্করণি দিল॥
রসাঙ্গ মারিতে গীয়াছিল সেনাপতি।
সেই হতে রসাঙ্গমর্দন নাম খ্যাতি॥”
আবার মুদ্রিত গ্রন্থে উপরোক্ত অংশটির পাঠ এরকম দেখা যায়-
“গৌড়াই মল্লিক ভঙ্গ দিল যুদ্ধ হৈতে।
শ্রীধন্যমাণিক্য চলে চাটিগ্রাম লৈতে॥
চাটিগ্রাম হতে ভঙ্গ দিল গৌড় সেনা।
রসাঙ্গমর্দন নারায়ণকে বসাইল থানা॥
রাম্বু ছত্রসিক রাজা আমল করিল।
রসাঙ্গ জিনিয়া কিল্লা পুষ্কর্ণী খনিল॥
নিজ রসাঙ্গ লৈতে নারে সেনাপতি।
রসাঙ্গমর্দন নারায়ণ তার হৈল খ্যাতি॥”
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, উপরোক্ত কোন পাঠেই কিন্তু আরাকান বা রসাঙ্গের রাজার চট্টগ্রাম অধিকারের কথা পাওয়া যায় না। উপরোক্ত অংশে শুধু একথাই বলা হয়েছিল যে, ত্রিপুরারাজের জনৈক সেনাপতি রসাঙ্গ আক্রমণ করে রসাঙ্গমর্দন উপাধি পেয়েছিলেন। যাই হোক, উপরোক্ত অংশে ত্রিপুরারাজের সেনাপতি কর্তৃক রামু (রানু) অধিকারের কথা রয়েছে। আগেই বলা হয়েছে যে, আরাকানী কিংবদন্তীর মতে আরাকানরাজ মেং-খরি (১৪৩৪-৫৯ খৃষ্টাব্দ) বাংলার রাজার অধিকারভুক্ত রামু অঞ্চল জয় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু রাজমালা গ্রন্থের মতে ত্রিপুরার রাজা ওই অঞ্চল জয় করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, আসলে ওই অঞ্চলটি তখন তিন রাজ্যের সীমান্তে অবস্থিত হওয়ার জন্য একেক সময়ে এক একটি রাজ্যের অধিকারভুক্ত হয়েছিল। সুলতান হোসেন শাহের আক্রমণে ধন্যমাণিক্য পশ্চাদপসরণ করবার সময়ে আরাকান-রাজ চট্টগ্রাম অধিকার করুন বা না করুন, সেখানকার সীমান্তবর্তী কিছু অঞ্চল যে নিশ্চই অধিকার কবেছিলেন, সেবিষয়ে সন্দেহের অবকাশ অল্প।
অতীতে অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ১৩৫৬ বঙ্গাব্দের সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় প্রকাশিত (পৃ: ১৬-৩২) একটি প্রবন্ধে প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছিলেন যে, ‘রামের অভিষেক’ কাব্যের কবি ভবানীনাথের পৃষ্ঠপোষক রাজা জয়ছন্দ-
(১) চক্রশালা নামক জায়গার রাজা ছিলেন, ও
(২) তিনি জাতিতে মগ ছিলেন এবং ১৪৮২ থেকে ১৫১৩ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত চট্টগ্রাম তাঁর অধিকারে ছিল।
দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্যের প্রথম সিদ্ধান্তের যথার্থতা সম্বন্ধে বর্তমান সময়ের গবেষকদের মনে কোন সন্দেহ না থাকলেও, তাঁরা তাঁর দ্বিতীয় সিদ্ধান্তকে ভিত্তিহীন বলে প্রতিপন্ন করেছেন। জয়ছন্দ জাতিতে যে মগ ছিলেন, একজন স্বাধীন রাজা ছিলেন, এবং ঠিক ঐ সময়েই বর্তমান ছিলেন, সেকথা জোর দিয়ে বলবার মত কোন প্রমাণ ইতিহাস থেকে অন্ততঃ পাওয়া যায় না।
তবে প্রত্যক্ষ কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ না থাকলেও, আরাকানের মগদের সাময়িকভাবে চট্টগ্রাম অধিকার করে নেওয়ার প্রবাদটি সত্যি বলেই মনে হয়। কারণ-জোআঁ-দে-বারোস লিখিত ‘Da Asia’ গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, ১৫১৮ খৃষ্টাব্দে পর্তুগীজ বণিক জোআঁ-দে-সিলভেরা যখন চট্টগ্রাম বন্দরে অবতরণ করতে না পেরে আরাকান অভিমুখে রওনা হয়েছিলেন, আরাকানের তৎকালীন রাজা তখন বাংলার সুলতানের প্রজা ছিলেন। এই মূল্যবান ঐতিহাসিক তথ্যটি পূর্বোক্ত প্রবাদের সমর্থনেই কিন্তু কথা বলে। অর্থাৎ ইতিপূর্বে আরাকানরাজ মেং-সোআ-মউন ১৪৩০ খৃষ্টাব্দে বাংলার সুলতান জলালুদ্দীন মুহম্মদ শাহের অধীনতা স্বীকার করে তাঁর সামন্ত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর পরবর্তী রাজারা বাংলার অধীনতা অস্বীকার তো করেছিলেনই, উপরন্তু তাঁরা বাংলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে অংশবিশেষ পর্যন্ত অধিকার করে নিয়েছিলেন।
সেই অবস্থায় ১৫১৮ খৃষ্টাব্দে যখন আরাকানরাজ আবার বাংলার সুলতানের সামন্তে পরিণত হয়েছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়, তখন মাঝে কোন একসময়ে যে বাংলার রাজার সঙ্গে যুদ্ধে আরাকানরাজের পরাজয় ঘটেছিল, সেবিষয়ে বর্তমান সময়ের ঐতিহাসিকদের মনে কোন সন্দেহ নেই। এর থেকে মনে হয় যে, তখন এভাবে ঘটনাগুলি যথাক্রমে সংঘটিত হয়েছিল (১) আরাকানরাজের চট্টগ্রাম অধিকার, (২) তাঁকে উচ্ছেদ করবার জন্য হোসেন শাহের সেখানে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ, (৩) তাঁদের হাতে আরাকানরাজের উচ্ছেদ, এবং (৪) যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করে তাঁর বাংলার রাজার সামন্তে পরিণত হওয়া। ১৫১৮ খৃষ্টাব্দের আগেই এই ব্যাপারগুলি ঘটে গিয়েছিল।লেখকঃ রানা চক্রবর্তী,বিশিষ্ঠ প্রাবন্ধিক




