খন রঞ্জন রায়: অসুখ, রোগ নিরাময় চিকিৎসাকৌশল, অস্ত্রোপচার, যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন, টিকার ব্যবহার ইত্যাদি হাজার বছর ধরে ধাপে ধাপে উন্নয়ন ঘটেছে। ফলশ্রুতিতে চিকিৎসাবিজ্ঞান বর্তমান পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। নব নব উদ্ভাবন, নতুন গবেষণা ইত্যাদি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ক্রমাগত নিয়ে যাচ্ছে উৎকর্ষতার শিখরে। এসব অর্জন একদিনে হয়নি! লেগেছে হাজার হাজার বছর, বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রয়াস, শ্রমসাধ্য গবেষণা, মানবকল্যাণে কাজ করার অদম্য স্পৃহা তাঁদের কাজকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। এসবের পেছনে যাঁদের অবদান, তাঁরা নমস্য, প্রেরণার উৎস। মানবকল্যাণব্রতে নির্ভিক স্বপ্নযাত্রী।

সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে চিকিৎসাসেবা অন্যতম। মানব সভ্যতার প্রসারণে নানা কল্যাণের পাশাপাশি অনেক অকল্যাণও বাসা বাঁধছে জীবন-সংসারে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে জীবনমান অটুট রাখতে চিকিৎসার কাছে অনেকটাই নির্ভরশীল। প্রত্যেক মানুষকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দৈহিক বা মানসিক অসুস্থতার সংস্পর্শে আসতে হয়। আর চিকিৎসকগণ এই মহান পেশাকে কর্মসেবার স্তর বিচেনায় প্রথম দিকে রাখেন। এর পেছনে রয়েছে শিক্ষা। মেডিক্যাল শিক্ষা। সাথে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ।

ব্যাক্তিকে মহান করতে, মানবপ্রেমী করতে, কল্যাণব্রতে নিবেদিত হতে নিয়ামক শক্তি হিসাবে ভূমিকা রাখে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট এই শিক্ষা প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থা মোনালিসার হাসির মতো রহস্যঘেরা, চমকপ্রদ। কোভিড পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। অর্থ আছে- চিত্ত আছে, যন্ত্রপাতি আছে, জায়গা আছে হাসপাতাল বানানো যাচ্ছে না। সব আছের সাথে নাই কেবল দক্ষতা।

দেশে প্রাতিষ্ঠানিক মেডিক্যাল কলেজভিত্তিক শিক্ষা চালু হয়েছে ১০ জুলাই ১৯৪৬ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে। ১৭৫৭ সালে ভারতবর্ষের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক দখলের পর এর ১০০ বছর পর ১৯৮৩ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। এর প্রায় ১০০ বছর পর প্রতিষ্ঠা ঢাকার মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থা। যদিও ১৯২০ সালে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহে মেডিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিডফোর্ড হাসপাতালের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৮৫৮ সাল। তখন দেশে চলছে ব্রিটিশ শাসন। তৎকালীন ঢাকার কালেক্টর রবার্ট মিটফোর্ড নিজ অর্থে বুড়িগঙ্গার তীরে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করেন। হাসপাতালটির নাম দেয়া হয় মিটফোর্ড হাসপাতাল।রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি কিছুদিন পরে এখানে মেডিকেল স্কুলও চালু করা হয়। তখন এলএমএফ কোর্স পড়ানো হতো।

ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, আবদুল লতিফসহ তৎকালীন ঢাকার অনেক প্রভাবশালী, বিত্তবান ও দানশীল ব্যক্তি হাসপাতালের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য নগদ অর্থ ও জমি দান করে গেছেন। ১৯৬২ সালে মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলকে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে রূপান্তর করা হয়। নাম দেয়া হয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। সংলগ্ন মিটফোর্ড হাসপাতাল পূর্ববত থেকে যায়। বর্তমানে এখানে এমবিবিএস শিক্ষা কোর্স ছাড়াও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা বিষয়ে অনেক স্নাতকোত্তর শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়েছে। এছাড়া তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পর্যায়ক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী, এ ৭টি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭১ সালে জগৎ কাঁপানো যুদ্ধের বিনিময়ে এই ভূখণ্ড উপনিবেশীক শাসন থেকে মুক্তি পায়। বাংলা হয় বাস্তব অর্থে স্বাধীন। স্বাধীন বাংলাদেশ চিকিৎসা শিক্ষার প্রসার ও মান পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গত ৫০ বছরে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ১০৭টি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকারি ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজে ৪ হাজার ২৩০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় প্রতিবছর। আর ৭০টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয় সাড়ে ৮ হাজার জন।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, জেলায় জেলায় আরো মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এছাড়াও দেশে দন্ত চিকিৎসা শিক্ষার ডেন্টাল কলেজও আছে ২৬টি। ৭০টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে কেবল ঢাকা বিভাগেই রয়েছে ৬০টি মেডিক্যাল কলেজ। ২০২১ সালে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ১৩ হাজার সীটের বিপরীতে ১ লাখ ২২ হাজার ছাত্র-ছাত্রী মেডিক্যালে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিয়েছে। যা ২রা এপ্রিল করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। দেখা গেছে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সবারই মেডিক্যালে পড়ার যোগ্যতা রয়েছে।

বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য বিভাগে ডাক্তারের পদ রয়েছে ২৪ হাজার ২৮টি। কর্মরত রয়েছেন ২২ হাজার ২৭৪ জন ডাক্তার। বিএমডিসি’র তথ্যানুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি ডাক্তার ও জনসংখ্যার অনুপাত ১:১৭২৪ জন। অর্থাৎ এক হাজার ৭২৪ জন মানুষের জন্য ডাক্তার রয়েছে মাত্র একজন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে চিকিৎসকের চাহিদাও ক্রমবর্ধমান। নানা হিসাব নিকাশ করে দেখানো হয়েছিল দেশে ১৬ কোটি মানুষের বিপরীতে ডাক্তারের চাহিদা ৬৩ হাজার ৩৯৫ জন। ২০২১ সালে ৬৭ হাজার ২৬৫ জন ছিল স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিবেচনায়।

চাহিদা আর যোগান বা পর্যাপ্ততা নিশ্চিত না করার ফলে রোগিরা যথারীতি বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালের দিকে ঝুঁকছে। অথবা বাধ্য হচ্ছে। হিসাবে দেখা গেছে চিকিৎসার খরচ মিটিয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছে ১৫ শতাংশ মানুষ। গরিব হচ্ছে প্রতিবছর ৬৪ লাখ মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কঠোর আইনকানুন শর্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তোয়াক্কা না দেখিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবাধে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।“বিল্ডিং অ্যাওয়ারনেস অব ইউভার্সেল হেলথ কভারেজ বাংলাদেশ অ্যাডভান্স দি এজেন্ডা ফরওয়ার্ড” ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে বাংলাদেশে জনপ্রতি পাবলিকের পকেট থেকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ। যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জনপ্রতি ব্যয়ের দিক থেকে ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় ভারত, ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ দিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে নেপাল, ৩৫ দশমিক ৬ নিয়ে সবার নিচে রয়েছে থাইল্যান্ড।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়নের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এ খাতে অপর্যাপ্ত ব্যয়, সরকারি ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণহীনতা, বাজেটে কম বরাদ্দ, বরাদ্দ অনুযায়ী সঠিকভাবে বণ্টন না করা, অতিরিক্ত পকেট মানি, সরকারি ও পকেট মানির বিস্তর ব্যবধান, নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত, স্বাস্থ্যবীমায় অনিহা, দাতাগোষ্ঠীর সহায়তা কমে যাওয়া ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর স্বল্প অংশগ্রহণের কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন করতে হলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সহযোগিতার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করাই যথার্থতা। গবেষণায় প্রমাণিত স্বাস্থ্যসেবার ৬০ শতাংশ মানুষ পায় অসংগঠিত খাত থেকে। সরকারি খাত থেকে সেবা আসে ১৪ শতাংশ। আর বেসরকারি খাত থেকে মানুষ ২৬ শতাংশ সেবা পায়। বেসরকারি খাতের অবদান ছাড়া কোনো দেশই সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে সাফল্যের পথে এগোতে পারেনি। এক্ষেত্রে চীন ও কিউবার মতো গুটি কয়েক দেশ ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তাঁদের সরকার ব্যবস্থাও ভিন্ন ধাঁচের।

দেশের শিশুমৃত্যু হ্রাস, পুষ্টির উন্নতি, টিকাদানের হার বৃদ্ধি স্বাস্থ্য খাতের এসব সাফল্যে বেসরকারি খাতের কোনো ভূমিকা ছিল না। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারি খাতের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় বাড়ছে। স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশের বহু মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে এটি বড় ধরনের বাধা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রতিবছর সাড়ে ৫২ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। আর বড় ধরনের আকস্মিক স্বাস্থ্য ব্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে সোয়া দুই কোটি মানুষ। সর্বাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান করতে না পারার কারণে প্রতিবছর ৭০ লক্ষ লোক চিকিৎসার জন্য দেশের বাহিরে যেতে হয় বা যেতে হচ্ছে- যাচ্ছে। এই সংখ্যা বা হার কমিয়ে আনতে হলে চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেককে তাদের দায়িত্বের জায়গায় সচেতন হতে হবে। সংযুক্তি ঘটাতে হবে নিত্য নতুন সব প্রযুক্তি। সাথে প্রযুক্তিবিদ বা চিকিৎসা সহায়তাকর্মী। মূলত দুর্বলতা এখানেই। চিকিৎসা শিক্ষা বিশ্বের সর্বত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃত। এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হয় পরিমাণ ও গুণগত মান এই দুটি যথেষ্ট পরিমাণে বজায় রেখে জনশক্তি উৎপাদন করার পর তাদের এমনভাবে দেশের অভ্যন্তরে কাজের সুযোগ করে দিতে হয় যাতে জনগণ তাদের প্রাপ্য সেবাটি বুঝে নিতে পারে। দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সিংহভাগ শহরে অবস্থিত, অথচ মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ গ্রামে থাকে; এ এক চরম বৈষম্য। স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ না করা গেলে চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের শহরমুখিতা বাড়বে। তাতে শহরের যানজট বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যসেবার অবনতি ছাড়া আর কিছু হবে না।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে মেডিক্যাল কলেজ বঞ্চিত জেলাসমূহের লোকজনের চিকিৎসাপ্রীতি ও ভীতি অনেক আবেগি। বঞ্চিত জেলাসমূহের বেকার জনগোষ্ঠী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালকেন্দ্রিক নানাবিধ কর্মসংস্থান থেকে পিছিয়ে। সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে জনগণের অংশগ্রহণ, সকল বিভাগের সমন্বয়, সুষম স্বাস্থ্য বণ্টন যার প্রয়োজন শহর থেকে গ্রামে, ব্যক্তিগত হতে সামাজিক, প্রতিরোধ হতে প্রতিরোধ পর্যায়, পরিবর্তনের স্বাস্থ্যকে উন্নয়নের উপর স্থান দেয়া সেই সাথে উপযুক্ত কৌশল প্রণয়ন, গুণগত বিশ্লেষণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সবার জন্য সর্বত্র নিশ্চিত করতে পৃথিবীর অনেক দেশ ভার্চুয়াল ব্যবস্থাকে অনেক আগে থেকেই আত্মীকরণ করেছে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রদান থেকে শুরু করে নানাভাবে জনস্বাস্থ্য হুমকি মোকাবিলা করছে। এখানে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ছাড়াও সাধারণ জনশক্তিকে বিশ্বমানবতার কল্যাণে নিয়োজিত করেছে। আমাদের চিকিৎসা শিক্ষাকে যদি উন্নত দেশের সমমানে উন্নীত করা যায়, তাহলে দেশের বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়তে আসা এবং দেশের চিকিৎসকদের বিদেশে চিকিৎসা দেওয়া সহজতর হবে। তবে দেশের মানুষের চাহিদা অপূর্ণ রেখে এসব ভাবা কোনোক্রমেই সমীচীন হবে না।

আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বৈষম্যহীন জনমুখী রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, সংবিধান অনুসারে প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পত্রি দায়িত্ব। সেই সেবা দিতে আমাদের একটি সময়োপযোগী স্বাস্থ্য মানবসম্পদনীতি প্রণয়ন আবশ্যক। যে নীতি আদর্শ গ্রহণপূর্বক স্বাস্থ্য কাঠামোর বিবেচনা করে সর্বক্ষেত্রে, সবার জন্য সঠিক পরিমাণে সঠিক গুণগত মানের স্বাস্থ্য ও জনশক্তি গড়ে তুলবে।

পৃথিবীর কোন দেশ-ই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। উন্নত, সমৃদ্ধ, মধ্য উন্নত, অনুন্নত। পৃথিবীর সবদেশেই মেডিকেল কলেজগুলোতে অর্ধেকেরও বেশী। চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। দেশী-বিদেশী চিকিৎসক নার্স- মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের মেধা শ্রমের সমন্বয়ের মাধ্যমে আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞান স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এখানে একক কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন নেই। বরং মাথাভারি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহে গুণগত মানসম্পন্ন অন্তত ৫ শত চিকিৎসক, ১৫ শত নার্স ২৫ শত বিদেশী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ প্রদান করা গেলে এদেশের চিকিৎসা শিক্ষা এবং চিকিৎসা সেবার মান অতিদ্রুত আন্তর্জাতিক অবস্থানে উন্নতি ঘটবে। অধিক হারে বিদেশী ছাত্র-ছাত্রী বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজসমূহে ভর্তি হবে। চিকিৎসা ট্যুরিজমের উদ্ভব ঘটবে। দেশের কোন রুগী উন্নত চিকিৎসার আকাক্সক্ষা ও প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার মনোবাঞ্ছা পোষণ করবে না।

দেশের মানুষকে রোগমুক্ত করতে এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে সুস্থ মানুষের কোন বিকল্প নেই। শারীরিকভাবে সুস্থ মানুষেরাই পারে তাদের কর্ম ও দক্ষতার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের চাকা সচল করতে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি ব্যাপকভাবে চালু করতে হবে। দেশের উন্নয়ন স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। করোনা নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্ত্বক সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

ডিজিটাল বাংলাদেশ, ভিশন ২০৪১, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা, ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবে রূপ দিতেও স্বাস্থ্যকর নিরোগ জীবনযাপনে অভ্যস্থ্য জাতির প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রত্যেক জেলায় একটি করে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা নতুন করে আশার আলো যুগিয়েছে। তালেগুলে চিকিৎসাপ্রার্থী এই হতভাগ্য জাতিকে উদ্ধারব্রতে নিশ্চিত পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন, যথাযথ, যথার্থ বাস্তবায়ন। সংখ্যা যখন বাড়বে, গুণগত মান তখন প্রাসঙ্গিকভাবে- অবলীলায় উন্নত হবে।

দক্ষতা বৃদ্ধির তাগাদা অনুভব করবে। চালু হবে গ্র্যাজ্যুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, ডক্টরেট, পোস্ট ডক্টরাল শিক্ষা কোর্স কারিকুলাম। সাথে তাঁদের নির্ভরশীল সহযোগী হিসাবে প্যারা মেডিক্যাল শিক্ষা সংশ্লিষ্টতার ব্যাপক উন্নতি ঘটবে। তখনই জাতি চিকিৎসা খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠতে পারবে। এছাড়া নয়।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।

খন রঞ্জন রায়: অসুখ, রোগ নিরাময় চিকিৎসাকৌশল, অস্ত্রোপচার, যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন, টিকার ব্যবহার ইত্যাদি হাজার বছর ধরে ধাপে ধাপে উন্নয়ন ঘটেছে। ফলশ্রুতিতে চিকিৎসাবিজ্ঞান বর্তমান পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। নব নব উদ্ভাবন, নতুন গবেষণা ইত্যাদি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ক্রমাগত নিয়ে যাচ্ছে উৎকর্ষতার শিখরে। এসব অর্জন একদিনে হয়নি! লেগেছে হাজার হাজার বছর, বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রয়াস, শ্রমসাধ্য গবেষণা, মানবকল্যাণে কাজ করার অদম্য স্পৃহা তাঁদের কাজকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। এসবের পেছনে যাঁদের অবদান, তাঁরা নমস্য, প্রেরণার উৎস। মানবকল্যাণব্রতে নির্ভিক স্বপ্নযাত্রী।

সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে চিকিৎসাসেবা অন্যতম। মানব সভ্যতার প্রসারণে নানা কল্যাণের পাশাপাশি অনেক অকল্যাণও বাসা বাঁধছে জীবন-সংসারে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে জীবনমান অটুট রাখতে চিকিৎসার কাছে অনেকটাই নির্ভরশীল। প্রত্যেক মানুষকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দৈহিক বা মানসিক অসুস্থতার সংস্পর্শে আসতে হয়। আর চিকিৎসকগণ এই মহান পেশাকে কর্মসেবার স্তর বিচেনায় প্রথম দিকে রাখেন। এর পেছনে রয়েছে শিক্ষা। মেডিক্যাল শিক্ষা। সাথে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ।

ব্যাক্তিকে মহান করতে, মানবপ্রেমী করতে, কল্যাণব্রতে নিবেদিত হতে নিয়ামক শক্তি হিসাবে ভূমিকা রাখে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট এই শিক্ষা প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থা মোনালিসার হাসির মতো রহস্যঘেরা, চমকপ্রদ। কোভিড পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। অর্থ আছে- চিত্ত আছে, যন্ত্রপাতি আছে, জায়গা আছে হাসপাতাল বানানো যাচ্ছে না। সব আছের সাথে নাই কেবল দক্ষতা।

দেশে প্রাতিষ্ঠানিক মেডিক্যাল কলেজভিত্তিক শিক্ষা চালু হয়েছে ১০ জুলাই ১৯৪৬ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে। ১৭৫৭ সালে ভারতবর্ষের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক দখলের পর এর ১০০ বছর পর ১৯৮৩ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। এর প্রায় ১০০ বছর পর প্রতিষ্ঠা ঢাকার মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থা। যদিও ১৯২০ সালে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহে মেডিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিডফোর্ড হাসপাতালের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৮৫৮ সাল। তখন দেশে চলছে ব্রিটিশ শাসন। তৎকালীন ঢাকার কালেক্টর রবার্ট মিটফোর্ড নিজ অর্থে বুড়িগঙ্গার তীরে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করেন। হাসপাতালটির নাম দেয়া হয় মিটফোর্ড হাসপাতাল।রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি কিছুদিন পরে এখানে মেডিকেল স্কুলও চালু করা হয়। তখন এলএমএফ কোর্স পড়ানো হতো।

ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, আবদুল লতিফসহ তৎকালীন ঢাকার অনেক প্রভাবশালী, বিত্তবান ও দানশীল ব্যক্তি হাসপাতালের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য নগদ অর্থ ও জমি দান করে গেছেন। ১৯৬২ সালে মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলকে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে রূপান্তর করা হয়। নাম দেয়া হয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। সংলগ্ন মিটফোর্ড হাসপাতাল পূর্ববত থেকে যায়। বর্তমানে এখানে এমবিবিএস শিক্ষা কোর্স ছাড়াও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা বিষয়ে অনেক স্নাতকোত্তর শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়েছে। এছাড়া তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পর্যায়ক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী, এ ৭টি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭১ সালে জগৎ কাঁপানো যুদ্ধের বিনিময়ে এই ভূখণ্ড উপনিবেশীক শাসন থেকে মুক্তি পায়। বাংলা হয় বাস্তব অর্থে স্বাধীন। স্বাধীন বাংলাদেশ চিকিৎসা শিক্ষার প্রসার ও মান পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গত ৫০ বছরে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ১০৭টি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকারি ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজে ৪ হাজার ২৩০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় প্রতিবছর। আর ৭০টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয় সাড়ে ৮ হাজার জন।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, জেলায় জেলায় আরো মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এছাড়াও দেশে দন্ত চিকিৎসা শিক্ষার ডেন্টাল কলেজও আছে ২৬টি। ৭০টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে কেবল ঢাকা বিভাগেই রয়েছে ৬০টি মেডিক্যাল কলেজ। ২০২১ সালে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ১৩ হাজার সীটের বিপরীতে ১ লাখ ২২ হাজার ছাত্র-ছাত্রী মেডিক্যালে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিয়েছে। যা ২রা এপ্রিল করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। দেখা গেছে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সবারই মেডিক্যালে পড়ার যোগ্যতা রয়েছে।

বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য বিভাগে ডাক্তারের পদ রয়েছে ২৪ হাজার ২৮টি। কর্মরত রয়েছেন ২২ হাজার ২৭৪ জন ডাক্তার। বিএমডিসি’র তথ্যানুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি ডাক্তার ও জনসংখ্যার অনুপাত ১:১৭২৪ জন। অর্থাৎ এক হাজার ৭২৪ জন মানুষের জন্য ডাক্তার রয়েছে মাত্র একজন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে চিকিৎসকের চাহিদাও ক্রমবর্ধমান। নানা হিসাব নিকাশ করে দেখানো হয়েছিল দেশে ১৬ কোটি মানুষের বিপরীতে ডাক্তারের চাহিদা ৬৩ হাজার ৩৯৫ জন। ২০২১ সালে ৬৭ হাজার ২৬৫ জন ছিল স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিবেচনায়।

চাহিদা আর যোগান বা পর্যাপ্ততা নিশ্চিত না করার ফলে রোগিরা যথারীতি বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালের দিকে ঝুঁকছে। অথবা বাধ্য হচ্ছে। হিসাবে দেখা গেছে চিকিৎসার খরচ মিটিয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছে ১৫ শতাংশ মানুষ। গরিব হচ্ছে প্রতিবছর ৬৪ লাখ মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কঠোর আইনকানুন শর্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তোয়াক্কা না দেখিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবাধে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।“বিল্ডিং অ্যাওয়ারনেস অব ইউভার্সেল হেলথ কভারেজ বাংলাদেশ অ্যাডভান্স দি এজেন্ডা ফরওয়ার্ড” ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে বাংলাদেশে জনপ্রতি পাবলিকের পকেট থেকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ। যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জনপ্রতি ব্যয়ের দিক থেকে ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় ভারত, ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ দিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে নেপাল, ৩৫ দশমিক ৬ নিয়ে সবার নিচে রয়েছে থাইল্যান্ড।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়নের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এ খাতে অপর্যাপ্ত ব্যয়, সরকারি ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণহীনতা, বাজেটে কম বরাদ্দ, বরাদ্দ অনুযায়ী সঠিকভাবে বণ্টন না করা, অতিরিক্ত পকেট মানি, সরকারি ও পকেট মানির বিস্তর ব্যবধান, নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত, স্বাস্থ্যবীমায় অনিহা, দাতাগোষ্ঠীর সহায়তা কমে যাওয়া ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর স্বল্প অংশগ্রহণের কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন করতে হলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সহযোগিতার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করাই যথার্থতা। গবেষণায় প্রমাণিত স্বাস্থ্যসেবার ৬০ শতাংশ মানুষ পায় অসংগঠিত খাত থেকে। সরকারি খাত থেকে সেবা আসে ১৪ শতাংশ। আর বেসরকারি খাত থেকে মানুষ ২৬ শতাংশ সেবা পায়। বেসরকারি খাতের অবদান ছাড়া কোনো দেশই সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে সাফল্যের পথে এগোতে পারেনি। এক্ষেত্রে চীন ও কিউবার মতো গুটি কয়েক দেশ ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তাঁদের সরকার ব্যবস্থাও ভিন্ন ধাঁচের।

দেশের শিশুমৃত্যু হ্রাস, পুষ্টির উন্নতি, টিকাদানের হার বৃদ্ধি স্বাস্থ্য খাতের এসব সাফল্যে বেসরকারি খাতের কোনো ভূমিকা ছিল না। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারি খাতের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় বাড়ছে। স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশের বহু মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে এটি বড় ধরনের বাধা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রতিবছর সাড়ে ৫২ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। আর বড় ধরনের আকস্মিক স্বাস্থ্য ব্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে সোয়া দুই কোটি মানুষ। সর্বাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান করতে না পারার কারণে প্রতিবছর ৭০ লক্ষ লোক চিকিৎসার জন্য দেশের বাহিরে যেতে হয় বা যেতে হচ্ছে- যাচ্ছে। এই সংখ্যা বা হার কমিয়ে আনতে হলে চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেককে তাদের দায়িত্বের জায়গায় সচেতন হতে হবে। সংযুক্তি ঘটাতে হবে নিত্য নতুন সব প্রযুক্তি। সাথে প্রযুক্তিবিদ বা চিকিৎসা সহায়তাকর্মী। মূলত দুর্বলতা এখানেই। চিকিৎসা শিক্ষা বিশ্বের সর্বত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃত। এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হয় পরিমাণ ও গুণগত মান এই দুটি যথেষ্ট পরিমাণে বজায় রেখে জনশক্তি উৎপাদন করার পর তাদের এমনভাবে দেশের অভ্যন্তরে কাজের সুযোগ করে দিতে হয় যাতে জনগণ তাদের প্রাপ্য সেবাটি বুঝে নিতে পারে। দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সিংহভাগ শহরে অবস্থিত, অথচ মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ গ্রামে থাকে; এ এক চরম বৈষম্য। স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ না করা গেলে চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের শহরমুখিতা বাড়বে। তাতে শহরের যানজট বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যসেবার অবনতি ছাড়া আর কিছু হবে না।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে মেডিক্যাল কলেজ বঞ্চিত জেলাসমূহের লোকজনের চিকিৎসাপ্রীতি ও ভীতি অনেক আবেগি। বঞ্চিত জেলাসমূহের বেকার জনগোষ্ঠী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালকেন্দ্রিক নানাবিধ কর্মসংস্থান থেকে পিছিয়ে। সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে জনগণের অংশগ্রহণ, সকল বিভাগের সমন্বয়, সুষম স্বাস্থ্য বণ্টন যার প্রয়োজন শহর থেকে গ্রামে, ব্যক্তিগত হতে সামাজিক, প্রতিরোধ হতে প্রতিরোধ পর্যায়, পরিবর্তনের স্বাস্থ্যকে উন্নয়নের উপর স্থান দেয়া সেই সাথে উপযুক্ত কৌশল প্রণয়ন, গুণগত বিশ্লেষণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সবার জন্য সর্বত্র নিশ্চিত করতে পৃথিবীর অনেক দেশ ভার্চুয়াল ব্যবস্থাকে অনেক আগে থেকেই আত্মীকরণ করেছে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রদান থেকে শুরু করে নানাভাবে জনস্বাস্থ্য হুমকি মোকাবিলা করছে। এখানে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ছাড়াও সাধারণ জনশক্তিকে বিশ্বমানবতার কল্যাণে নিয়োজিত করেছে। আমাদের চিকিৎসা শিক্ষাকে যদি উন্নত দেশের সমমানে উন্নীত করা যায়, তাহলে দেশের বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়তে আসা এবং দেশের চিকিৎসকদের বিদেশে চিকিৎসা দেওয়া সহজতর হবে। তবে দেশের মানুষের চাহিদা অপূর্ণ রেখে এসব ভাবা কোনোক্রমেই সমীচীন হবে না।

আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বৈষম্যহীন জনমুখী রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, সংবিধান অনুসারে প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পত্রি দায়িত্ব। সেই সেবা দিতে আমাদের একটি সময়োপযোগী স্বাস্থ্য মানবসম্পদনীতি প্রণয়ন আবশ্যক। যে নীতি আদর্শ গ্রহণপূর্বক স্বাস্থ্য কাঠামোর বিবেচনা করে সর্বক্ষেত্রে, সবার জন্য সঠিক পরিমাণে সঠিক গুণগত মানের স্বাস্থ্য ও জনশক্তি গড়ে তুলবে।

পৃথিবীর কোন দেশ-ই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। উন্নত, সমৃদ্ধ, মধ্য উন্নত, অনুন্নত। পৃথিবীর সবদেশেই মেডিকেল কলেজগুলোতে অর্ধেকেরও বেশী। চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। দেশী-বিদেশী চিকিৎসক নার্স- মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের মেধা শ্রমের সমন্বয়ের মাধ্যমে আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞান স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এখানে একক কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন নেই। বরং মাথাভারি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহে গুণগত মানসম্পন্ন অন্তত ৫ শত চিকিৎসক, ১৫ শত নার্স ২৫ শত বিদেশী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ প্রদান করা গেলে এদেশের চিকিৎসা শিক্ষা এবং চিকিৎসা সেবার মান অতিদ্রুত আন্তর্জাতিক অবস্থানে উন্নতি ঘটবে। অধিক হারে বিদেশী ছাত্র-ছাত্রী বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজসমূহে ভর্তি হবে। চিকিৎসা ট্যুরিজমের উদ্ভব ঘটবে। দেশের কোন রুগী উন্নত চিকিৎসার আকাক্সক্ষা ও প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার মনোবাঞ্ছা পোষণ করবে না।

দেশের মানুষকে রোগমুক্ত করতে এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে সুস্থ মানুষের কোন বিকল্প নেই। শারীরিকভাবে সুস্থ মানুষেরাই পারে তাদের কর্ম ও দক্ষতার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের চাকা সচল করতে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি ব্যাপকভাবে চালু করতে হবে। দেশের উন্নয়ন স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। করোনা নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্ত্বক সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

ডিজিটাল বাংলাদেশ, ভিশন ২০৪১, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা, ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবে রূপ দিতেও স্বাস্থ্যকর নিরোগ জীবনযাপনে অভ্যস্থ্য জাতির প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রত্যেক জেলায় একটি করে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা নতুন করে আশার আলো যুগিয়েছে। তালেগুলে চিকিৎসাপ্রার্থী এই হতভাগ্য জাতিকে উদ্ধারব্রতে নিশ্চিত পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন, যথাযথ, যথার্থ বাস্তবায়ন। সংখ্যা যখন বাড়বে, গুণগত মান তখন প্রাসঙ্গিকভাবে- অবলীলায় উন্নত হবে।

দক্ষতা বৃদ্ধির তাগাদা অনুভব করবে। চালু হবে গ্র্যাজ্যুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, ডক্টরেট, পোস্ট ডক্টরাল শিক্ষা কোর্স কারিকুলাম। সাথে তাঁদের নির্ভরশীল সহযোগী হিসাবে প্যারা মেডিক্যাল শিক্ষা সংশ্লিষ্টতার ব্যাপক উন্নতি ঘটবে। তখনই জাতি চিকিৎসা খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠতে পারবে। এছাড়া নয়।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।