মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, পেকুয়া: কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায় মামলা তদন্ত করতে গিয়ে এক নারীকে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব ও ঘুস দাবির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে খোদ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের এক উপ-পরিদর্শকের বিরুদ্ধে! এ ঘটনায় ওই পুলিশ কর্মকর্তাসহ দুই জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন ভূক্তভোগী এক নারী।
সম্প্রতি এলাকায় এঘটনা জানাজানি হলে সর্বত্রে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার নাম মোঃ শামিম মিয়া (বিপি নং ৭৯৯৮০৫২০১৯)। তিনি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কক্সবাজার কার্যালয়ে উপ- পরিদর্শক পদে কর্মরত রয়েছে। ভূক্তভোগী ওই নারী গত মাসের ১৮ ডিসেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেছেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য চকরিয়া-পেকুয়া সার্কেল এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপারকে নির্দেশনা দিয়েছেন। মামলায় পুলিশ কর্মকর্তা ছাড়াও আসামী করা হয়েছে মহেশখালী উপজেলার গোরকঘাটা এলাকার মৃত রামপদ দে এর ছেলে উজ্জল কুমারকেও। মামলার বাদি ভূক্তভোগী নারী (২৮) এর বাড়ি চকরিয়া পৌরসভার পালাকাটা গ্রামে। (সংগত কারণে ভূক্তভোগী নারীর নাম গোপন রাখা হলো)
মামলার আবেদনে ভূক্তভোগী নারী দাবি করেছেন, মহেশখালী পৌরসভার গোরকঘাটা এলাকার উজ্জল কুমার নামের এক যুবক প্রলোভনে ফেলে ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণ করায় তিনি বাদী হয়ে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিগত ২৭-০৪-২০২২ইংরেজী তারিখে একটি ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং ১৩৫/২০২২ইং। উক্ত মামলা তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণিত হয় এবং মামলাটি বর্তমানে একই আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এরপর আসামী উজ্জল কুমার গত ২৬-০৬-২০২২ইং তারিখ চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হয়রানীর উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা ও সাজানো মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং সিআর- ৮০৯/২২ইং।
উজ্জল কুমারের দায়েরকৃত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিদর্শক (এস আই) শামিম মিয়াকে তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মামলার আবেদনে ভূক্তভোগী নারী আরো উল্লেখ করেছেন, মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে পুলিশের এসআই শামিম মিয়া মামলা তদন্তকালীন সময়ে তার সঙ্গে শারীরিকভাবে মেলামেশার প্রস্তাব দেন এবং এক লাখ টাকা ঘুষ দাবী করেন। পিবিআইয়ের পুলিশ কর্মকর্তা বিগত ০৯-০৮- ২০২২ইং তারিখে কক্সবাজারে অজ্ঞাত বাসায় তাকে ডেকে নিয়ে যায় এবং তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা ঘুষ দাবী করেন এবং অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেন। তার দাবী মতে ঘুষের টাকা না দিলে মামলার প্রতিবেদন বিরুদ্ধে দেওয়ার হুমকি দেয় ওই পুলিশ কর্মকর্তা। ওই পুলিশ কর্মকর্তার প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় বিগত ১৫-০৪-২০২৩ইং তারিখে ভূক্তভোগী নারীকে দোষী সাব্যস্থ করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন এসআই শামিম মিয়া। এরপর গত ০৩-১১-২০২৩ইং তারিখ ভোর অনুমান ৪.৪১ ঘটিকার সময় ভূক্তভোগী নারীর ইমো নাম্বারে ভিডিও কল দেয় পুলিশ কর্মকর্তা শামিম মিয়া। এরপর পুলিশ কর্মকর্তা উক্ত নারীর ইমো নাম্বারে কেমন আছো, আসো আমার পাশে আছো আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও আমাকে আদর দাও, কেন দেবা না তোমার মনে চায় না, তাহলে আসো আমার বুকে আসো তোমার সাথে সেক্স করবো, কেন রাগ করেছ বল, ভিডিও কল দিয়ে তোমার দুধগুলো দেখাও আমার ভালো লাগবে আমার ঘুম আসতেছে না। এসব আপত্তিকর ক্ষুদে বার্তা প্রেরণ করেন। উক্ত ক্ষুদে বার্তার বিপরীতে মামলার বাদী ভূক্তভোগী নারী লিখেন আপনি আমার, বিপক্ষে মিথ্যা মামলার আসামী বানাইছেন, এতে আমার মানহানি হয়েছ্ বলে রিপ্লাই দেন। এরপর পুলিশের ওই কর্মকর্তা পুনরায় ওই নারীকে ইমোর ম্যাসেনজারে লিখেন তোমাকে অনেক সুযোগ দিয়েছি তুমি আমাকে বলনি কেন, কেন বোঝনা তুমি জানো না শামীম ভাই কক্সবাজার ব্যাচেলর থাকতো শামীম ভাইয়ের কি মন নাই্; মর্মে আরো বিভিন্ন অশ্লীল বার্তা প্রেরণ করেন। এভাবে ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরো কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য সম্বলিত ক্ষুদে বার্তা ওই নারীর ইমো নম্বরে ম্যাসেনজারে প্রেরণ করে।
ভুক্তভোগী নারী বলেন, ধর্ষণ মামলার আসামী উজ্জল কুমারের সাথে যোগসাজশ করে পুলিশ কর্মকর্তা শামিম মিয়া তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে না পেরে ও দাবিকৃত এক লাখ টাকা ঘুষ না পেয়ে আদালতে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এরপর ইমো নাম্বারে অশ্লীল বার্তা পাঠিয়ে তার জীবন বিষিয়ে তুলেছেন। তিনি এ ঘটনায় ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিচার দাবি করেছেন।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিদর্শক (এস আই) শামিম মিয়ার কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই নারীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত একটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। মামলা তদন্তে করতে গিয়ে ওই নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিই। এরপর বিভিন্ন সময় ওই নারীর ইমো নাম্বারে কথা হয় তার সাথে। বিভিন্ন সময় গভীর রাতেও ওই নারীর সাথে ম্যাসেনজারে তার কথা হয়েছে। ম্যাসেনজারে ভূল বসত ওই নারীর সাথে তার কিছু অশ্লীল বাক্য বিনিময় হয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তা শামিম
মিয়া স্বীকার করেন।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিদর্শক তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ৬ মাস পূর্বে এস আই শামীম কক্সবাজার পিবিআই থেকে বদলী হয়ে নোয়াখালী জেলার পিবিআই অফিসে যোগদান করেছেন। তিনি ঘটনার ব্যাপারে কিছুই জানেনা।
ভুক্তভোগী নারীর দায়েরকৃত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চকরিয়া- পেকুয়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রকিব উর রাজা বলেন, নির্বাচনের কারণে মামলার আসামীদের নোটিশ দিযে ডাকা হয়নি।দু’য়েক দিনের মধ্যে তাঁর কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য মামলার আসামীদের ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হবে।




