আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো বলেছেন, কিয়েভের প্রতি ন্যাটো যে হারে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে তাতে একটি পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব। রাশিয়ার পরাজয়ের আশঙ্কার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাস্তবতা। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, রাশিয়া যদি ইউক্রেনে পরাজয়ের আশঙ্কা করে তবে তারা পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করবে। শুক্রবার বেলারুশের আইনপ্রণেতা ও নাগরিকদের উদ্দেশে টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে তিনি একথা বলেন।
ক্ষুব্ধ লুকাশেঙ্কো তার ভাষণে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কারণে ইউক্রেনে একটি পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এর মানেই হলো দিগন্তে পরমাণু দাবানলসহ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনুভূত হচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কট্টর মিত্র লুকাশেঙ্কোর এই বক্তব্যকে অনেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, লুকাশেঙ্কোর মাধ্যমে এটি পুতিনের অগ্রিম বার্তা। এই ভাষণে লুকাশেঙ্কো হুঁশিয়ারি দেন, পুতিন যদি ভয় পান যে তার বাহিনী ইউক্রেনের কাছে পরাজিত হতে চলেছে, তবে তাকে তার পারমাণবিক অস্ত্র খুলতে বাধ্য করা হবে। পারমাণবিক শক্তিকে পরাজিত করা অসম্ভব। যদি রুশ নেতৃত্ব বুঝতে পারে যে পরিস্থিতি রাশিয়ার বিচ্ছিন্নতার কারণ হতে পারে, তবে তারা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র ব্যবহার করবে।
তিনি বলেন, পশ্চিমারা বেলারুশের সীমান্তে পোল্যান্ডে তাদের সামরিক বাহিনী গড়ে তুলছে এবং আমাদের আক্রমণ ও ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে।
যুদ্ধবিরতির আহ্বান : লুকাশেঙ্কো ইউক্রেনে ‘যুদ্ধবিরতি’ এবং মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে কোনো রকম পূর্বশর্ত ছাড়াই আলোচনার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আমাদের এখনই থামতে হবে, একটা সুনামি শুরু হওয়ার আগেই। আমি শত্রুতা অবসানের পরামর্শ দেয়ার ঝুঁকি নেব।
১৯৯৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা লুকাশেঙ্কো আরো বলেন, সমস্ত আঞ্চলিক, পুনর্গঠন, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সমস্যাগুলো আলোচনার টেবিলে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে এবং করা উচিত।
জনগণকে প্রস্তুত থাকতে বলেছে : এদিকে আরটি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার দেশের জনগণকে পারমাণবিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। এরই মধ্যে রুশ নেতারা এবং ভাষ্যকাররা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার বিষয়ে কথা বলা শুরু করেছেন। সম্ভবত তাদের পরমাণু অস্ত্রের সম্ভাব্য ব্যবহারের জন্য রাশিয়ার জনসাধারণকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছেন। পুতিন মস্কোর চারপাশে বায়ু প্রতিরক্ষাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করার নির্দেশ দিয়েছেন।
টার্গেট কি লন্ডন : ইউক্রেন যুদ্ধ সম্পদের খেলায় পরিণত হয়েছে। রাশিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্ব (মার্কিন ও ন্যাটো জোট) উভয় পক্ষই সম্পদের বেসামাল খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু শুধু একপক্ষকে দেখা যাচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। রাশিয়ার এমন একটি ঝাঁকুনি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ইউরোপকে ধ্বংস করে দিতে পারে। রাশিয়া যদি সত্যিই ১ হাজার ফুট উচ্চতা দিয়ে পরমাণু অস্ত্র পাঠায়, তাহলে ব্রিটেনের উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুতিনের পোসাইডন পরমাণু একটি উপকূলীয় শহর ধ্বংস করতে পারে এবং লন্ডনের মতো শহরে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করতে পারে। ভ্লাদিমির পুতিনের ঘোষণায় আছে, তিনি বেলারুশ থেকে পারমাণবিক-টিপড ইস্কান্দার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবেন যা আর্মাগেডনের সম্ভাবনার উপরে চলে যেতে পারে। ইস্কান্দার একটি স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যা পোল্যান্ড এবং ইউক্রেনের মূল ভূখণ্ডকে ধ্বংস করে দিতে পারে। ব্রিটেন যখন ইউক্রেনে চ্যালেঞ্জার ট্যাঙ্কগুলোকে অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়াম অ্যাম্যুনেশন দিয়ে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তখনই যে কোনো মুহূর্তে ইস্কান্দার বা এর চেয়েও ভারী মাত্রার ক্ষেপনাস্ত্র যে কোনো সময় লন্ডনে ছোড়া হতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।
ভয় বাড়ছে ইউরোপে : ইউক্রেন যুদ্ধের মূল ক্রীড়নক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলেও ভয় বাড়ছে ইউরোপের। পারমাণবিক যুদ্ধের মূল্য তাদেরই বেশি দিতে হতে পারে। যদি যুদ্ধটা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে ইউরোপের জন্য ফলাফল হবে বিপর্যয়কর।
স্টিফেন ব্রায়েন সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসি এবং ইয়র্কটাউন ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো টুইটারে বলেন, রাশিয়ার সামরিক বাহিনী সাইবেরিয়ায় তার ইয়ারস আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার দিয়ে এরই মধ্যে মহড়া শুরু করেছে। এমনকি নিউ স্টার্ট চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রের তথ্য বিনিময় করাও বন্ধ করে দিয়েছে রাশিয়া।
গত মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা নিউ স্টার্ট চুক্তিতে রাশিয়ার অংশগ্রহণ স্থগিত করার প্রতিক্রিয়ায় মস্কোকে তার পারমাণবিক অস্ত্রের মজুতের বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করাও বন্ধ করবে।
রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তাদের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা এবং নির্দিষ্ট ঘাঁটিতে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম বোমারু বিমানের মতো বিষয়ে তথ্যের অর্ধবার্ষিক আদান-প্রদান নিউ স্টার্ট চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল।
মহড়া শুরু : গত বুধবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে যে দেশটির আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল (আইসিবিএম) লঞ্চারগুলোর মহড়া শুরু করেছে যা রাশিয়ার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। এগুলো সাইবেরিয়ার ৩টি অঞ্চল জুড়ে মোতায়েন করা আছে। এই মহড়ায় বিদেশি স্যাটেলাইট এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার নজর গোপন করার ব্যবস্থা জড়িত আছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহড়া কতক্ষণ স্থায়ী হবে বা কোন কোন অনুশীলনের সঙ্গে উৎক্ষেপন করা হবে তা উল্লেখ করা হয়নি। এসব আইসিবিএম প্রায় ১১,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী ট্রাকগুলো একটি ঘাঁটিতে মহড়া দিচ্ছে এবং পূর্ব সাইবেরিয়ার প্রায় ৩শ যানবাহন এবং ৩ হাজার সৈন্য এই মহড়ায় অংশ নেয়।
রাশিয়ার কাছে তথাকথিত কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে যা স্থল, আকাশ এবং সমুদ্র থেকে চালু করা যেতে পারে। সেগুলো চালু করার এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তুতির লক্ষণ নেই তবুও পারমাণবিক ওয়ারহেডগুলোর নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে। বেলারুশে পরিকল্পিত ইস্কান্দার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন সেই চিত্রটিই ফুটিয়ে তুলবে।
মার্কিন নাগরিকদের রাশিয়া ত্যাগের নির্দেশ : এদিকে রাশিয়ায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের শিগগিরই রাশিয়া ত্যাগ করার আহবান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। গতকাল মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে এই আহ্বান জানানো হয়।




