জিয়া হাবীব আহ্‌সান

একজন মানবাধিকার ও সুশাসনকর্মী হিসেবে সর্বদা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্য দূরীকরণে নানা ধর্মের অনুসারীদের সাথে কাজ করে আসছি। প্রত্যেক ধর্মের মূলমন্ত্র মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা এবং সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য হিংসা বিদ্বেষ মুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। আমাদের আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা উচিৎ। ইসলাম র্ধমালম্বীরা মনে করেন সনাতন, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন, শিখ যত ধর্মের মানুষ আছে সবাই এক আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.) এর সন্তান এবং বংশধর । অন্যান্য র্ধমালম্বীরাও মনে করেন আমরা একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট মানব সন্তান। ঐ দৃষ্টি ভঙ্গীতে আমরা সবাই ভাই ভাই, মাতৃকূল ও পিতৃকূলের আত্নীয় । যে যেই র্ধমই পালন করুন না কেন একে অপরের আত্নার-আত্নীয়। একে অপররে র্ধম সর্ম্পকে জানলে আন্তঃর্ধমীয় সংযোগ ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। জগতের যত ধর্মগুরু বা পথ প্রদর্শক রয়েছেন তাদের মত ও পথের নির্দেশগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তাঁরা সকলেই সত্য, সরলতা, প্রেম, পবিত্রতাকে সর্বোত্তম স্থান দিয়েছেন, এর দ্বারাই প্রেমময়ের সান্নিধ্য লাভ করা যায়। ইসলাম ধর্মের শেষ এবং শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-কেও বলা হয় প্রেমের নবী যাকে পৃথিবীর মধ্যস্থলে প্রেরণ করা হয় সমগ্র মানবজাতির শিক্ষক হিসেবে। তাই তাঁর নীতিতে জাতি ধর্ম বিশেষের চেয়ে পুরো মানবজাতির প্রতি সাম্যের সমাজ গঠনের আহ্ববান পরিলক্ষিত হয়। তিনি অন্যের ধর্মকে বা অন্যান্য সম্প্রদায়কে বিদ্বেষ পোষণ করা থেকে সবসময় বিরত থাকতে বলেছেন । সমগ্র সৃষ্টি একই প্রভুর সৃষ্টি, তাই সকলের প্রতি সহনশীলতাই হবে মানবের শ্রেষ্ঠ গুণ। প্রত্যেক ধর্মের মুনি-ঋষিদের মধ্যে কিছু বিষয়ে মিল পাওয়া যায়, যার ভিত্তিতে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কের অবতারণা করা যায়। যেমন: হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, বৈষম্যমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের আহ্ববান প্রত্যেক ধর্মের কমন আহ্ববান। স্বাধীনতা পরবর্তী তিন যুগ সময়ে মৌলিক অবকাঠামো, সামাজিক সেবাসমূহ এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে চমৎকার উন্নয়ন ঘটেছে। এই সময়ের মধ্যে অর্থনীতি একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ গতিতে এগিয়ে গেলেও জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাপক দুর্নীতি, লোক প্রশাসনে অদক্ষতা, জন-নিরাপত্তার অভাব, স্থানীয় সরকার প্রক্রিয়ায় অঙ্গীকারের অভাব এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের অভাব সে অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে এই মূহুর্তে বাংলাদেশের একটি কর্মতৎপর নাগরিক সমাজ দরকার যারা দেশের উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করতে পারেন । বাংলাদেশে প্রভাবশালী নেতা বা লিডারস্ অব ইনফ্লুয়েন্স (এলওআই)-এর ভূমিকা নিজেদের জ্ঞান, চিন্তা, নৈতিকতা, সততা, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের মাধ্যমে যাঁরা দেশের সামাজিক ও জনজীবনে ইতিবাচক প্রভাব রাখেন তাঁরাই সামাজে প্রভাব বিস্তারকারী নেতা। সহিষ্ণুতা বজায় রাখা, সামাজিক ঐক্য ও স্বার্থ রক্ষাসহ শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি দেশে যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে থাকেন এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের নেতা, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মী এবং সচেতন যুব সমাজ।

সুশাসন:
আমাদের দেশের সার্বিক পরিস্থিতির বিবেচনায় সুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে আমাদের জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুশাসন দেশে দুর্নীতি কমায়, সংখ্যালঘিষ্ঠ ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা ও চিন্তা-চেতনাকে মূল্য দেয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা প্রদান করে। সুশাসন সমাজের বর্তমান ও ভবিষৎ চাহিদা নিরূপনে উৎসাহ যোগায়।

সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতা কী
সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতা জাতীর উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা নিয়ে এই অংশে প্রভাবশালী নেতাদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে।সাধারণভাবে সহিষ্ণুতা বলতে আমরা ধৈর্য্য, সহনশীলতা, অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ইত্যাদি বুঝি।মানুষের মঙ্গলের কথা চিন্তা করলে ব্যাপক অর্থে সহিষ্ণুতা বা সহনশীলতা হলো, সকল নাগরিকের জন্যস্বাধীনতা, আইনের শাসন, মৌলিক ও মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং সুবিচারনিশ্চিত হয় এমন একটা অবস্থা। যেখানে জাতি ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী, নারী-পুরুষ ইত্যাদি পার্থক্য ভুলে মানবতা ও মানুষের অধিকারের উপর বিশ্বাস রেখে সকলে মিলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে। একে অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় এবং কেউ কারো ক্ষতি বা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। প্রত্যেকটি মানুষই নিজের ধর্ম, বিবেক এবং নিজের মত করে চিন্তা করার অধিকার রাখে। নিজের ধর্ম, মত বা চিন্তা অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া কারো কাম্য নয়। মানুষ যখন সকলের স্বার্থে ভাল কিছু করার উদ্দেশ্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, তখনই সেখানে সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতা বিরাজ করে।

পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা সৃষ্টির কারণ
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বা বিভিন্ন সমাজে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহিষ্ণুতা কমে যাওয়া ও শান্তি ভঙ্গের পিছনে নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। যেমন- বিভিন্ন জাতীগোষ্ঠী ও অর্থনৈতিক শ্রেণী বৈষম্য, রাজনৈতিক মত পার্থক্যের প্রতি অসহনশীলতা, পেশাগত শ্রেণী বৈষম্য, সাংস্কৃতিক বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী-পুরুষ বৈষম্য, অন্য ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতার অভাব ।

পারস্পরিক অসহিষ্ণুতার কুফল
পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা সৃষ্টি হলে তা অনেক কুফল বয়ে আনতে পারে; যেমন- ভুল বোঝাবুঝি ও বিরোধ, বিশৃংখলা, অনিশ্চিত পরিবেশ, সহিংসতা, দাঙ্গা, রায়ট, যুদ্ধ, ইত্যাদি, সম্পদ নষ্ট, শারীরিক ক্ষতি, প্রাণহানি, ইত্যাদি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে সহিষ্ণুতা
১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে মানুষের সমাধিকার ও পারস্পরিক সহিষ্ণুতা । যথা:
১) মানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকারসমূহে গোত্র, ধর্ম, বর্ণ, শিক্ষা, ভাষা, রাজনৈতিক মতামত, জাতীয় বা সামাজিক উৎপত্তি, জন্ম, সম্পত্তি বা অন্য কোনো মর্যাদা নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই সমান অধিকার থাকবে।
২) কোনো দেশ বা ভূখন্ডের রাজনৈতিক, সীমানাগত বা আর্ন্তজাতিক মর্যাদার ভিত্তিতে তার কোনো অধিবাসীর প্রতি কোনোরূপ বৈষম্য করা হবে না; সে দেশ বা ভূখন্ড স্বাধীনই হোক অথবা অছিভূক্ত, অস্বায়ত্বশাসিত কিংবা সার্বভৌমত্বের অন্য কোনো সীমাবদ্ধতায় বিরাজমান থাকুক (ধারা: ২)।

বাংলাদেশের সংবিধানে সহিষ্ণুতা
বাংলাদেশের সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদে সহিষ্ণুতা বিষয়ে বলা হয়েছে। যেমন:
১)ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র কোনো বৈষম্য করবেনা (অনু:২৮)।
২)আইন ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবেনা (অনু:৩…
৩)কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রনা দেওয়া যাবেনা কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক লাঞ্ছনা দেওয়া যাবেনা (অনু:৩৫)।
৪)শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়া এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদানের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে (অনু:৩৭)।
৫)প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে (অনু:৩৯)।

ইসলামে সহিষ্ণুতা
ইসলাম অর্থ শান্তি । ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে সম্প্রীতি ও সহনশীলতার সাথে অবস্থান করা যা বর্তমান বাস্তবতায় সমগ্র বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত। পবিত্র ইসলামে সহিষ্ণুতা সম্পর্কে বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে।
১) যেখানে নম্রতা বা দয়া থাকেনা সেখানে সকল কল্যাণ অনুপস্থিত থাকে। (মুসনাদে আহমাদ হাদীস নং ২৩৭৯১)।
২) আল্লাহ্তায়ালা প্রত্যেককেই তাঁর প্রাপ্য অধিকার দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ, কিতাবুল ওয়াছায়া, হাদীস নং ২৪৮৬)।
৩) আল কুরআন অমুসলিমদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য ‘বিররুন’ শব্দটি ব্যবহার করেছে যা মাতা পিতার প্রতি সন্তানের ভালবাসা ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হয়।
৪) ১৯৯০ সালে কায়রো ঘোষণা নামে পরিচিত ১৯তম ওআইসি ইসলামী সম্মেলনে ইসলামে মানবাধিকার সম্পর্কিত ধারাগুলো হচ্ছে।
৫) জীবন হলো আল্লাহ প্রদত্ত একটি উপহার এবং প্রত্যেক ব্যক্তিরই জীবনধারণের সুনিশ্চিত অধিকার রয়েছে (ধারা: ২)
৬) প্রতিটি মানুষ স্বাধীন সত্ত্বা হিসাবে জন্মগ্রহণ করে। কাউকে দাসত্বে আনা, লাঞ্ছনা বা অবমাননা করা, শোষণ করার অধিকার কারো নেই (ধারা: ২১ এর ক)।
ইসলাম ধর্মে পৃথিবীর সকল মানুষ এক পরিবারের সদস্যের মত। যে কোনো ধর্মের মূল ভিত্তিগুলোর মধ্যে
একটি অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে মানবতা ও পরমতসহিষ্ণুতা।

হিন্দু ধর্মে সহিষ্ণুতা
পরমতসহিষ্ণুতা হিন্দু ধর্মের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট। হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ইশ্বর আরাধনার বিভিন্ন রকম মত ও পথের অবস্থান রয়েছে। শিব ভক্তদের বলা হয় শৈব, শক্তির পূজারী হলেন শ্বাক্য, বিষ্ণুর পূজারী হলেন বৈষ্ণব। তবে সাধারণ ক্ষেত্রে এই বৈচিত্র থাকলেও তাঁদের ভেতরে পরম ঐক্যের সন্ধান পাওয়া যায়। হিন্দু ধর্মে বহু দেব দেবীর পূজা অর্চনার অবকাশ থাকলেও সব পুজার গন্তব্য স্থল যে এক পরমেশ্বর এই তথ্যটি হিন্দু ধর্মের মর্মবানী। —একং সদ্বিপ্রা বহুধাবদন্তি’। অর্থাৎ সদ্-বস্তু এক, পন্ডিতগণ তাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করেছেন । ১৮৯৩ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, ‚আমরা শুধু সকল ধর্মকে সহ্য করি না বরং সকল ধর্মকেই আমি সত্য বলে বিশ্বাস করি।”প্রতিটি জীবের মধ্যেই ঈশ্বর রয়েছেন। এই উপলব্ধিতেই তিনি বলেন-“বহুরূপে সম্মুখে তোমায় ছাড়ি কোথা খুঁজিছো ঈশ্বর জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”।

বৌদ্ধ ধর্মে সহিষ্ণুতা
বৌদ্ধ ধর্মীয়রা মৈত্রীপরায়ণ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন পদ্ধতিতে বিশ্বাসী। তাঁরা বুদ্ধের অহিংসা নীতি, সংযম ও ধৈর্য্য-সংহতির মন্ত্রে উজ্জীবিত। তাঁরা বিশ্বাস করেন ‚বৈরিতা দিয়ে বৈরিতা কখনো প্রশমিত হয় না বরং বৃদ্ধি পায়। অহিংসা ও মৈত্রী দিয়েই বৈরিতা প্রশমিত হয়। এটাই জাগতিক নিয়ম।”বৌদ্ধমতে জীবন সমৃদ্ধির জন্য করুণা ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন অপরিহার্য। এ দুটি ছাড়া জীবন কখনো পরিপূর্ণতা সাধন করে না। জীবনকে পূর্ণ মনুষ্যত্বে পর্যবসিত করতে হলে দয়া, সেবা, দান, মমতা, ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, পরোপকারিতা, সমব্যাথি হওয়া প্রভৃতি ধর্মগুণের প্রয়োজন হয়। এগুলোই একজন মানুষকে করুণাবান ও মৈত্রীবান হতে শেখায়। বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থ —ধম্মপদের’ ২২৩ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে- ‚মৈত্রীর দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে, অসাধুতাকে জয় করবে সাধুতার দ্বারা, কৃপনকে দান দ্বারা এবং মিথ্যাবাদীকে সত্য দ্বারা জয় করবে।”একই সূত্রের ৬ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে- “পরস্পরকে বঞ্চনা করো না, কাউকে অবজ্ঞা করো না, হিংসা বা আক্রোশের বশবর্তী হয়ে পরস্পরের মধ্যে দুঃখোৎপাদনের চেষ্টা করো না।”পরিশেষে বলা যায় বৌদ্ধ ধর্মের মূল মন্ত্রই হলো “অহিংসা পরম ধর্ম।”

খ্রীষ্টান ধর্মে সহিষ্ণুতা
খ্রীষ্ট ধর্মে যুগে যুগে মানুষের প্রতি সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সম্প্রীতি ও সহযোগিতা বিষয়ে বাইবেলের কিছু উদ্ধৃতি: যীশু খ্ৰীষ্ট বলেছেন, ‚শান্তি স্থাপন করে যারা, ধন্য তাঁরা, তাঁরাই পরমেশ্বরের সন্তান বলে পরিচিত হবে” (মথি ৫:৯); তোমরা তোমাদের শত্রুকে ভালবাস, যারা তোমাদের ঘৃণা করে, তাঁদের উপকার কর, যারা তোমাদের অভিশাপ দেয়, তোমরা তাঁদের শুভ কামনা কর, যারা তোমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, তাঁদের মঙ্গল প্রার্থনা কর” আন্ত:ধর্মীয় নেতাগণ সম্প্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মীয় সভা-সমাবেশে, সালিশ বিচারে, মসজিদ, মন্দির, গীর্জা ও উপাসনালয়ে ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে আলোচনার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এর ফলে বিভিন্ন শ্রেণীর, জাতির ও ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আবাসস্থল হয়ে উঠবে আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ।

বিভিন্ন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নারী ও পুরুষের মধ্যে ন্যায় ও সাম্য
প্রাচীনকালে নারীকে অকেজো, অকল্যাণকর ও সভ্যতা-সংস্কৃতির পরিপন্থী ও প্রতিবন্ধক মনে করে দুরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে ইসলামে মনে করা হয় মানব জীবন-ধারায় নারী ও পুরুষ সমানভাবে উভয়ে উভয়ের পরিপূরক, নারীকে সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ রূপেই সৃষ্টি করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ঘোষণা করেছেন- ʻদুনিয়ার জিনিসগুলোর মধ্য থেকে নারী ও সুগন্ধীকে আমার নিকট প্রিয়তম বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

নারী-পুরুষের মৌলিক অধিকারে সাম্য:
ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের অধিকার আইনের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সে আইন সর্ব দিক দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ। তা সমাজে ও রাষ্ট্রে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত না থাকার কারণেই আজ নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

অর্থনৈতিক জীবনে সাম্য:
ইসলামী শরীয়তে নারী-পুরুষের সবার জন্যই সীমার মধ্যে থেকে আয় উপার্জনের অনুমতি রয়েছে। প্রত্যেকেই নিজ শ্রমের মজুরি লাভ করার অধিকারী। নারী বা পুরুষ কারো মালিকানায় কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। স্বামী নিজ স্ত্রীর ধনসম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। স্ত্রীও পারে না নিজ স্বামীর সম্পত্তি নিজ ইচ্ছামত ব্যবহার করতে বা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করতে।

ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর সম্মান: ইসলাম নারীকে মেয়ে, স্ত্রী এবং মা হিসেবেও মর্যাদা দিতে ও সম্মান করতে নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘোষণা হোল, ‘যার তিনটি কন্যাসন্তান বা তিনজন বোন অথবা দুটি কন্যাসন্তান বা দুজন বোন থাকে আর সে তাদের সাথে সদাচারণ করে এবং তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে তার জন্য জান্নাত রয়েছে।’ [সুনান তিরমিযী] স্ত্রী হিসেবেও নারীর মর্যাদার ব্যাপারে আল্লাহ্র ঘোষণা অত্যন্ত স্পষ্ট আল্লাহ্ অন্যতম নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যেন তাদের কাছে তোমরা বসবাস করতে পারো এবং তিনিই তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ [সূরা আর-রূম, আয়াত:২১] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন-‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম।’ [সুনান তিরমিযী] ইসলামি বিধানে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য সমান অধিকার বিধিবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত করেছে। এমনকি প্রয়োজনের ভিত্তিতে যুক্তিযুক্তভাবেই পুরুষকে পরিবারের প্রধান হওয়ার পদে অধিষ্ঠিত করলেও তাকে স্বেচ্ছাচারি বা অত্যাচারি হবার সুযোগ দেয়নি। আল্লাহর বাণী হলো, ‘স্ত্রীদের যেমনি দায়-দায়িত্ব রয়েছে তেমনি ন্যায়সংগত অধিকারও রয়েছে। তবে তাঁদের ওপর পুরুষদের কিছু অগ্রাধিকার রয়েছে।’ [সূরা আল-বাকারা, আয়ত: ২২৯] (সূত্র: ধর্মীয় নেতাদের জন্য উন্নয়নমূলক অভিভাষণ, মসজিদ কাউন্সিল, মার্চ ২০০৮)

হিন্দু ধর্মে বিশ্ব সৃষ্টির আদিলগ্নের কথা শাস্ত্র বাক্য থেকে জানা যায়। তাতে বলা হয়েছে স্রষ্টা বিশ্বের তাবৎ বস্তু সৃষ্টি করে মানব সৃষ্টির প্রয়াস নেন। সৃষ্টিকর্তা বিশ্ব চরাচরে মানব জীবন প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে মনু ও শতরূপা নামে দুই পুরুষ-নারী সৃষ্টি করেন। এ যুগলের মধ্য দিয়েই মানব জাতির ক্রমবিকাশ হয়েছে। এই পৌরাণিক কাহিনীর মধ্যে দিয়ে নারী-পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। বিশেষত বংশবিস্তারের প্রশ্নে, শুধু পুরুষ বা শুধু নারী সন্তান উৎপাদনে অক্ষম। উভয়ের সহযোগে সন্তান সন্তুতি তথা বংশবিস্তার সম্ভব হয়ে থাকে। এ তত্ত্বটি উপলব্ধি করেই নারী-পুরুষের সাম্যবাদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।সাম্যদৃষ্টি সমাজ জীবনের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সর্বত্র সমভাবে রক্ষিত হয় না।ফলে দৈহিক শক্তিতে বলীয়ান, কর্মশক্তিতে দক্ষ, উপার্জনশীল পুরুষের তুলনায় দুর্বল দেহ, আর্থিক নির্ভরশীল নারীকে অনেক সময় নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হতে হয়। এমতাবস্থায় হিন্দু ধর্মের দৃষ্টিকোন থেকে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরকরণের জন্য শাস্ত্রীয় ভাষায় বলা হয়, যেখানে নারী ও পুরুষ পরস্পর পরস্পরের প্রতি সন্তুষ্ট বা সহযোগিতা মনোভাপন্ন থাকেন সেখানে কল্যাণ
নিশ্চিতভাবে অবস্থান করে।

বৌদ্ধ ধর্মে
জাতি, ধর্ম ও বর্ণের যেমন ভেদাভেদ নেই, বৈষম্য নেই; তেমনি নারী-পুরুষের মধ্যেও কোনো পার্থক্য করা হয়নি। মহাকারুণিক ভগবান বুদ্ধ সকল মানব জাতিকে একই দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেছেন। তার মতে মানুষের কর্মগুণই মানুষকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। বুদ্ধ মনে করতেন নারী-পুরুষ উভয়েই মানব- মানবী। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ, দু:খ, বেদনা, মেধা, কর্মসাধনা ও প্রজ্ঞাশক্তি একিই । বুদ্ধপূর্ব যুগে প্রাচীন ভারতবর্ষে নারীদের অধিকার ছিল সীমিত। নানা গোত্র ও বর্ণের নারীদের মধ্যে ছিল নানান শ্রেণী বৈষম্য। সে হিসেবে বিধবা, ক্রীতদাসী, বারবণিতা তথা নানা নিম্ন শ্রেণীর নারীদেরকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো এবং তাদেরকে সকল ধর্ম-কর্ম থেকে বাদ দেয়া হতো। সমাজে তারা নিগৃহীতা হিসেবে ধিক্কার পেত। এসব নির্যাতিত, অধিকারবঞ্চিত ও নিগৃহীত নারীদেরকে বুদ্ধ মানব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি এসব নারীদেরকে স্নেহ, মমতা, মৈত্রী, করুণা ও মুদিতা দিয়ে শীল, সমাধি, প্রজ্ঞাময় জীবনে আলোকিত করেছেন। তারা জীবনের দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করে অমৃতময় নির্বাণ লাভ করেছেন। এ থেকে বোঝা যায় বৌদ্ধধর্মে মাতৃজাতি নারীদের স্থান কত উচ্চে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো লিঙ্গ বৈষম্য বা ভেদাভেদ নেই। আর এই বৈষম্যের জন্য যা কাজ করছে তা হল আমাদের পুরুষ শাষিত সমাজ ব্যবস্থা এবং সেই সাথে ধর্মীয়
গ্রন্থসমূহের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে না ধরা।

খ্ৰীষ্টধর্মে
আজও নারী সমাজ অবহেলিত, নিপীড়িত, নির্যাতীত যা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানব সমাজে হওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। আমাদের দেশে ও বিশ্বের প্রায় বেশিরভাগ মানুষই ঈশ্বরকে বা সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করে, যিনি সকল মানুষকে সমান অধিকার দিয়েছেন, সকলকে সমভাবে শ্রদ্ধা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। বাইবেল সাক্ষ্য দেয় ঈশ্বর সৃষ্টির সময় মানুষকে নারী ও পুরুষ করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাঁদের উভয়কেই তাঁরই প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি করেছেন। তিনি উভয়কেই স্বাধীনতা, জ্ঞান বুদ্ধি দান করেছেন। আন্ত:ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সদস্য হিসাবে আপনাদের এ বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন ধর্মীয় বইয়ের তথ্যসূত্র জানা আছে। যার আলোকে আপনারা সাধারন মানুষের সচেতনতা সৃষ্টিতে উদ্যোগী হয়ে নারীদের উন্নয়নে ও তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনেক ভূমিকা রাখতে পারেন।

জাতীয় উন্নয়ন ও আন্তঃসম্পর্কীয় বিষয়সমূহ
একটি দেশের সার্বিক জাতীয় উন্নয়ন তখনই ঘটে যখন দেশের সর্বস্তরের ব্যক্তিবর্গের বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। আন্ত:ধর্মীয় নেতাগণ আমাদের সমাজের, দেশের তথা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় যে ভূমিকা রাখেন তার মূল্য অপরিসীম। আন্ত:ধর্মীয় নেতাগণ ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে জাতীয় সমস্যা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, সম্প্রীতি বা সহিষ্ণুতা, নারী ও পুরুষের মধ্যে ন্যায় ও সাম্য, সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাবলীর গুণাগুণ বিচার, মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকার ব্যবস্থা ও সমাজ প্রতিষ্ঠায় জনসাধারণের সামনে তুলে ধরে তাঁদের মতামত সংগঠনে আন্ত:ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই সমাজের অন্যান্য প্রভাবশালী নেতৃবর্গের পাশাপাশি আন্ত:ধর্মীয় নেতাগণ বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নে সহযোগিতা করতে পারেন। বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের আন্তঃসম্পর্কীয় তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেমন: ক) দুর্নীতি দমন খ) জেন্ডার সমতা ও গ) যুব উন্নয়ন।

দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা
দুর্নীতি প্রতিরোধ জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত আন্ত:ধর্মীয় নেতা হিসেবে নিচের ভূমিকাগুলো রাখা যেতে পারে- দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্মীয় সভা-সমাবেশে, সেমিনারে আলোচনা করে, নিজের পরিধির মধ্যে কাউকে দুর্নীতি করতে দেখলে তাকে একক বা যৌথভাবে বাধা দিয়ে, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হয়ে, দুর্নীতিবাজকে ঘৃণা করে।

সম্প্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতা রক্ষায় ভূমিকা
স্থানীয় পর্যায়ে সম্প্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতা রক্ষায় এবং সকল নাগরিকের শান্তিপূর্ণ বসবাস ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে আন্ত:ধর্মীয় নেতা হিসেবে আপনি নীচের ভূমিকাগুলো রাখতে পারেন: নারী পুরুষ সকলের জন্য সমমর্যাদা ও মত প্রকাশে সমান সুযোগ সৃষ্টি করে, সালিশ-বিচার ইত্যাদির ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, এলাকার সকল নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম, ও সামাজিক রীতিনীতি পালনের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করে, সকল নাগরিকের নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভোট প্রদান, নির্বাচিত হওয়া ও নেতৃত্ব প্রদানে উৎসাহিত করে ও ভোট প্রদানের সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করে, ধর্ম, বিশ্বাস, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিজ নিজ সম্পদ ভোগ ও ব্যবহার এবং তা রক্ষায় সহযোগিতা করে, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় বিশেষভাবে সহযোগিতা করে
সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে।

নারী-পুরুষ সম্পর্ক উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা
গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের সকল কর্মকাণ্ডে নারী-পুরুষ সকলের অংশগ্রহণ। তাই আন্ত:ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সদস্য হিসেবে আপনার উচিত স্ব স্ব এলাকায় বসবাসকারী জনগণের মধ্যে নারী-পুরুষ সম্পর্ক উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে সহযোগিতা করা। বিশেষ করে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নারী-পুরুষ বৈষম্য কমিয়ে আনতে ও ন্যয্য প্রতিষ্ঠায় নারীদের সহায়তা করা। এর জন্য আপনি নিচের কাজগুলো করতে পারেন:
নারী শিক্ষায় উৎসাহ প্রদান ও সহযোগিতা করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহযোগী থেকে এবং তাঁদের প্রতি মর্যাদাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনে উৎসাহিত করে, পরিবার ও পরিবারের বাইরে নারী নির্যাতন, যৌতুক প্রদান, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করা ও এ বিষয়ে অন্যান্যদের সচেতন করে, নারীর প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণ ও পরিবেশ সৃষ্টি করে, পরিবার ও সমাজে নারীর স্বাধীন মত প্রকাশে উৎসাহ দেয়া ও তার পরিবেশ সৃষ্টি করে, ভোট প্রদান, ভোটে অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব প্রদান, শিক্ষা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে নিজে অংশগ্রহণ করা ও অন্যান্য নারীদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে পরিবার ও পরিবারের বাইরে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীর জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করে।

যুব উন্নয়নে ভূমিকা
একটি সুস্থ, সুন্দর ও সুশৃংখল সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নারী উন্নয়নে আন্ত:ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সদস্য হিসেবে আপনি নিচের কাজগুলো করতে পারেন: ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষায় উৎসাহিত করে ঝুঁকিপূর্ণ যুবসমাজকে সঠিক ও সুশৃংখল জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করে, মানবিক মূল্যবোধ প্রচারের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য এলাকার যুব সমাজকে পরিকল্পিত এবং সুশৃংখল জীবন যাপনের পরামর্শ দিয়ে, পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে এই বয়স থেকেই তাঁদের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে, উন্নয়ন কাজে জড়িত করে যুবসমাজকে এইচআইভি/এইডস, যৌনরোগ ও মাদকাসক্তি থেকে রক্ষা করে, লেখাপড়ার পাশাপাশি যে কোনো সামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িত করে তাঁদের উদ্দেশ্যহীন আড্ডা ও অনৈতিক কাজকর্মে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে, বাল্য বিবাহ ও যৌতুক সম্পর্কে যুবসমাজকে সচেতন হতে সহযোগিতা করে, যুব সমাজকে সংগঠিত হতে উৎসাহিত করে সমাজসেবামূলক কাজে লিপ্ত করে, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করে, যুব সমাজকে উপযুক্ত শিক্ষাগ্রহণ এবং অলস সময় না কাটিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার ব্যাপারে উৎসাহিত করে কর্মসংস্থান ও অর্থ উপার্জনের জন্য ঋণ প্রাপ্তি ও ক্ষুদ্র বা ব্যবসায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা ।

‚জগতের বক্ষে ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট গণতন্ত্রমূলক ধর্ম। প্রশান্ত মহাসাগর হতে আরম্ভ করে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্য্যন্ত সমস্ত মানব- মন্ডলীকে উদারনীতির একসূত্রে আবদ্ধ করিয়া ইসলাম পার্থিব উন্নতির চরম উৎকর্য লাভ করিয়াছে।“ –আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় অনাচার, জুলুম বা নারী নির্যাতনের ইতিহাস তাদের মাঝে নেই। তাই সকলকে যার যার ধর্ম নেতার চরিত্র অনুসরনেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব । এক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা প্রনিধানযোগ্য। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর অবদানের অনস্বীকার্য । রাম কৃষ্ণের বাণী বাংলার তিন ‚স” দিয়ে সহ্য, সহ্য এবং সহ্য করবার আহবান জানান। আর নারীর মর্যাদা প্রসংগে বলেন, সনাতন ধর্মের দেব দেবীদের মধ্যে বেশীর ভাগই নারী, অতঃপর নারীকে সম্মান করা দেবীকে সম্মানের সমতুল্য । ধর্মনেতাদের আলোচনায় একটি বক্তব্যই সকলের কথায় প্রতিফলিত হয় তা হচ্ছে, ‘যারা অন্যায়, জুলুম নির্যাতন করে তাদের কোন ধর্ম নেই’। আর ধর্মগুরুদের কাজই হচ্ছে অধার্মিকদের ধর্মের পথে আনা। প্রত্যেক ধর্মই ভালো ও সত্যের কথা বলে। মুসলমানরা পরকালে বিশ্বাস করে। অন্যান্য ধর্মের মানুষ পুনঃজন্মে বিশ্বাস করে এবং পাপের শাস্তির কথা চিন্তা করলে অপরাধ প্রবনতা কমে যায়। তাই সকল ধর্মই এ অর্থে সার্বজনীন। প্রত্যেক ধর্মই অন্যকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। দুর্নীতি প্রতিরোধ, সহনশীলতা, নারী ও যুব উন্নয়নে একজন ধর্ম নেতার (সনাতন, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলমান) ভূমিকা অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ । বাংলাদেশের পটভূমিতে এ ধরনের সম্পর্ক (বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর) খুবই স্বাভাবিক, কেননা এ দেশে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে চমৎকার সম্প্রীতি বিরাজ করছে। এ দেশ যেন বিভিন্ন ধর্মের মিলন মেলা ও নানা রঙের নানা বর্ণের ফুলের বাগান । এদেশের প্রত্যেকেই সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা উচিৎ । খ্রীষ্টান ধর্মের ফাদার বেভারেন হেমেন হালদার একটি গল্পের মাধ্যমে সহনশীলতার উদাহরন পেশ করেন। তার ভাষায়- একজাম্পল ইজ বেটার দ্যান এডভাইস (Example is better than advice). তিনি বলেন, “ধর্মগুরু বলেন, তোমাকে যদি কেউ এক গালে চড় দেয় তবে তুমি তাকে অন্য গাল পেতে দাও যেন সে সহনশীলতা দেখে নিজেই অনুতপ্ত হয় এবং নিজেকে শুদ্ধ করে। কিন্তু তিনি একথাও বলেন যেখানে অন্যায় অনাচার সহনশীলতা দিয়ে প্রতিরোধ করা যায় না সেখানে শক্ত হাতে তা প্রতিরোধ করতে হবে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না আর এভাবেই দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যায়। নারীর মর্যাদা প্রসংগে তিনি বলেন, খ্রীষ্টান ধর্ম নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান দিতে বলে কেননা নারী ইশ্বরকে (যীশু) ধারন করে। বৌদ্ধ ধর্মের গুরু সুমন বিপু ভিক্ষু বলেন, পঞ্চশীল পালন করে সাধু ও নন্দিত হওয়া যায় এবং এই সমাজে কখনো সাধু ব্যক্তি দ্বারা অপকর্ম হতে পারে না। তাই তিনি সমাজ সংস্কার ও উন্নয়নে সাধু ব্যক্তি হবার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন। সকলকে পজিটিভ বা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে কাজ করার আহ্ববান জানাই।

দুর্নীতি দমন
আন্তঃদলীয় ও আন্তঃধর্মীয় সভা, প্রশাসনকে আইনের বাস্তবায়নে সহযোগিতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা, ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্নীতি প্রতিহত করার উপর গুরুত্বারোপ করা দরকার। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ আর আমাদের সকলকে সম্মিলিতভাবে সমাজের অনাচার দূর করতে হবে। সকলেই একসাথে মিলে মিশে থাকতে পারে যদি তারা স্ব-স্ব ধর্ম সঠিকভাবে পালন করে। প্রত্যেক ধর্মের লোক একে অন্যের প্রতি সহানুভুতিশীল হবে। অধিকার আদায়ে সহযোগীতা করবে। স্ব-স্ব ধর্ম পালন করলেও সমাজে অধিকার ও দায়িত্ব পালনে সকলকে একত্রে কাজ করতে হবে। নৈতিক শিক্ষায় সকলকেই শিক্ষিত হতে হবে। সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব মূলক, সৌহার্দ্যমূলক সম্প্রীতি গড়ে তুললেই নারী উন্নয়ন, যুব উন্নয়ন এর জন্য এক সংগে কাজ করা সম্ভব । ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি কখনও কোন অন্যায় করতে পারেন না। তাই ধর্ম ব্যতীত এই পৃথিবীতে শান্তি শৃঙ্খলা আনা কখনই সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সত্যিই ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাঃ বলেছেন ‚যারা সংখ্যলঘুদের নির্যাতন করবে কেয়ামতের মাঠে তিনি আল্লাহ্‌র নিকট নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়ে ঐ নির্যাতনকারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন”। সামাজিক সম্প্রীতিরক্ষায় প্রয়োজন পরমত সহিষ্ণুতা, সকল ধর্মের সমন্বয়ে সামাজিক সংগঠন করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে বা সমস্যার সমাধানে মতবিনিময় করার ব্যবস্থা, পরনিন্দা বা গীবতচর্চা পরিহার করা। নিজ নিজ ধর্ম চর্চার মাধ্যমে যুব উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত, সহনশীল ও আন্তঃধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: আইনবিদ, কলামিষ্ট, সু-শাসন ও মানবাধিকারকর্মী।

জিয়া হাবীব আহ্‌সান

একজন মানবাধিকার ও সুশাসনকর্মী হিসেবে সর্বদা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্য দূরীকরণে নানা ধর্মের অনুসারীদের সাথে কাজ করে আসছি। প্রত্যেক ধর্মের মূলমন্ত্র মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা এবং সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য হিংসা বিদ্বেষ মুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। আমাদের আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা উচিৎ। ইসলাম র্ধমালম্বীরা মনে করেন সনাতন, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন, শিখ যত ধর্মের মানুষ আছে সবাই এক আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.) এর সন্তান এবং বংশধর । অন্যান্য র্ধমালম্বীরাও মনে করেন আমরা একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট মানব সন্তান। ঐ দৃষ্টি ভঙ্গীতে আমরা সবাই ভাই ভাই, মাতৃকূল ও পিতৃকূলের আত্নীয় । যে যেই র্ধমই পালন করুন না কেন একে অপরের আত্নার-আত্নীয়। একে অপররে র্ধম সর্ম্পকে জানলে আন্তঃর্ধমীয় সংযোগ ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। জগতের যত ধর্মগুরু বা পথ প্রদর্শক রয়েছেন তাদের মত ও পথের নির্দেশগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তাঁরা সকলেই সত্য, সরলতা, প্রেম, পবিত্রতাকে সর্বোত্তম স্থান দিয়েছেন, এর দ্বারাই প্রেমময়ের সান্নিধ্য লাভ করা যায়। ইসলাম ধর্মের শেষ এবং শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-কেও বলা হয় প্রেমের নবী যাকে পৃথিবীর মধ্যস্থলে প্রেরণ করা হয় সমগ্র মানবজাতির শিক্ষক হিসেবে। তাই তাঁর নীতিতে জাতি ধর্ম বিশেষের চেয়ে পুরো মানবজাতির প্রতি সাম্যের সমাজ গঠনের আহ্ববান পরিলক্ষিত হয়। তিনি অন্যের ধর্মকে বা অন্যান্য সম্প্রদায়কে বিদ্বেষ পোষণ করা থেকে সবসময় বিরত থাকতে বলেছেন । সমগ্র সৃষ্টি একই প্রভুর সৃষ্টি, তাই সকলের প্রতি সহনশীলতাই হবে মানবের শ্রেষ্ঠ গুণ। প্রত্যেক ধর্মের মুনি-ঋষিদের মধ্যে কিছু বিষয়ে মিল পাওয়া যায়, যার ভিত্তিতে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কের অবতারণা করা যায়। যেমন: হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, বৈষম্যমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের আহ্ববান প্রত্যেক ধর্মের কমন আহ্ববান। স্বাধীনতা পরবর্তী তিন যুগ সময়ে মৌলিক অবকাঠামো, সামাজিক সেবাসমূহ এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে চমৎকার উন্নয়ন ঘটেছে। এই সময়ের মধ্যে অর্থনীতি একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ গতিতে এগিয়ে গেলেও জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাপক দুর্নীতি, লোক প্রশাসনে অদক্ষতা, জন-নিরাপত্তার অভাব, স্থানীয় সরকার প্রক্রিয়ায় অঙ্গীকারের অভাব এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের অভাব সে অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে এই মূহুর্তে বাংলাদেশের একটি কর্মতৎপর নাগরিক সমাজ দরকার যারা দেশের উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করতে পারেন । বাংলাদেশে প্রভাবশালী নেতা বা লিডারস্ অব ইনফ্লুয়েন্স (এলওআই)-এর ভূমিকা নিজেদের জ্ঞান, চিন্তা, নৈতিকতা, সততা, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের মাধ্যমে যাঁরা দেশের সামাজিক ও জনজীবনে ইতিবাচক প্রভাব রাখেন তাঁরাই সামাজে প্রভাব বিস্তারকারী নেতা। সহিষ্ণুতা বজায় রাখা, সামাজিক ঐক্য ও স্বার্থ রক্ষাসহ শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি দেশে যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে থাকেন এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের নেতা, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মী এবং সচেতন যুব সমাজ।

সুশাসন:
আমাদের দেশের সার্বিক পরিস্থিতির বিবেচনায় সুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে আমাদের জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুশাসন দেশে দুর্নীতি কমায়, সংখ্যালঘিষ্ঠ ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা ও চিন্তা-চেতনাকে মূল্য দেয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা প্রদান করে। সুশাসন সমাজের বর্তমান ও ভবিষৎ চাহিদা নিরূপনে উৎসাহ যোগায়।

সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতা কী
সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতা জাতীর উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা নিয়ে এই অংশে প্রভাবশালী নেতাদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে।সাধারণভাবে সহিষ্ণুতা বলতে আমরা ধৈর্য্য, সহনশীলতা, অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ইত্যাদি বুঝি।মানুষের মঙ্গলের কথা চিন্তা করলে ব্যাপক অর্থে সহিষ্ণুতা বা সহনশীলতা হলো, সকল নাগরিকের জন্যস্বাধীনতা, আইনের শাসন, মৌলিক ও মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং সুবিচারনিশ্চিত হয় এমন একটা অবস্থা। যেখানে জাতি ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী, নারী-পুরুষ ইত্যাদি পার্থক্য ভুলে মানবতা ও মানুষের অধিকারের উপর বিশ্বাস রেখে সকলে মিলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে। একে অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় এবং কেউ কারো ক্ষতি বা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। প্রত্যেকটি মানুষই নিজের ধর্ম, বিবেক এবং নিজের মত করে চিন্তা করার অধিকার রাখে। নিজের ধর্ম, মত বা চিন্তা অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া কারো কাম্য নয়। মানুষ যখন সকলের স্বার্থে ভাল কিছু করার উদ্দেশ্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, তখনই সেখানে সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতা বিরাজ করে।

পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা সৃষ্টির কারণ
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বা বিভিন্ন সমাজে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহিষ্ণুতা কমে যাওয়া ও শান্তি ভঙ্গের পিছনে নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। যেমন- বিভিন্ন জাতীগোষ্ঠী ও অর্থনৈতিক শ্রেণী বৈষম্য, রাজনৈতিক মত পার্থক্যের প্রতি অসহনশীলতা, পেশাগত শ্রেণী বৈষম্য, সাংস্কৃতিক বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী-পুরুষ বৈষম্য, অন্য ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতার অভাব ।

পারস্পরিক অসহিষ্ণুতার কুফল
পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা সৃষ্টি হলে তা অনেক কুফল বয়ে আনতে পারে; যেমন- ভুল বোঝাবুঝি ও বিরোধ, বিশৃংখলা, অনিশ্চিত পরিবেশ, সহিংসতা, দাঙ্গা, রায়ট, যুদ্ধ, ইত্যাদি, সম্পদ নষ্ট, শারীরিক ক্ষতি, প্রাণহানি, ইত্যাদি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে সহিষ্ণুতা
১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে মানুষের সমাধিকার ও পারস্পরিক সহিষ্ণুতা । যথা:
১) মানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকারসমূহে গোত্র, ধর্ম, বর্ণ, শিক্ষা, ভাষা, রাজনৈতিক মতামত, জাতীয় বা সামাজিক উৎপত্তি, জন্ম, সম্পত্তি বা অন্য কোনো মর্যাদা নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই সমান অধিকার থাকবে।
২) কোনো দেশ বা ভূখন্ডের রাজনৈতিক, সীমানাগত বা আর্ন্তজাতিক মর্যাদার ভিত্তিতে তার কোনো অধিবাসীর প্রতি কোনোরূপ বৈষম্য করা হবে না; সে দেশ বা ভূখন্ড স্বাধীনই হোক অথবা অছিভূক্ত, অস্বায়ত্বশাসিত কিংবা সার্বভৌমত্বের অন্য কোনো সীমাবদ্ধতায় বিরাজমান থাকুক (ধারা: ২)।

বাংলাদেশের সংবিধানে সহিষ্ণুতা
বাংলাদেশের সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদে সহিষ্ণুতা বিষয়ে বলা হয়েছে। যেমন:
১)ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র কোনো বৈষম্য করবেনা (অনু:২৮)।
২)আইন ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবেনা (অনু:৩…
৩)কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রনা দেওয়া যাবেনা কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক লাঞ্ছনা দেওয়া যাবেনা (অনু:৩৫)।
৪)শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়া এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদানের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে (অনু:৩৭)।
৫)প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে (অনু:৩৯)।

ইসলামে সহিষ্ণুতা
ইসলাম অর্থ শান্তি । ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে সম্প্রীতি ও সহনশীলতার সাথে অবস্থান করা যা বর্তমান বাস্তবতায় সমগ্র বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত। পবিত্র ইসলামে সহিষ্ণুতা সম্পর্কে বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে।
১) যেখানে নম্রতা বা দয়া থাকেনা সেখানে সকল কল্যাণ অনুপস্থিত থাকে। (মুসনাদে আহমাদ হাদীস নং ২৩৭৯১)।
২) আল্লাহ্তায়ালা প্রত্যেককেই তাঁর প্রাপ্য অধিকার দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ, কিতাবুল ওয়াছায়া, হাদীস নং ২৪৮৬)।
৩) আল কুরআন অমুসলিমদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য ‘বিররুন’ শব্দটি ব্যবহার করেছে যা মাতা পিতার প্রতি সন্তানের ভালবাসা ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হয়।
৪) ১৯৯০ সালে কায়রো ঘোষণা নামে পরিচিত ১৯তম ওআইসি ইসলামী সম্মেলনে ইসলামে মানবাধিকার সম্পর্কিত ধারাগুলো হচ্ছে।
৫) জীবন হলো আল্লাহ প্রদত্ত একটি উপহার এবং প্রত্যেক ব্যক্তিরই জীবনধারণের সুনিশ্চিত অধিকার রয়েছে (ধারা: ২)
৬) প্রতিটি মানুষ স্বাধীন সত্ত্বা হিসাবে জন্মগ্রহণ করে। কাউকে দাসত্বে আনা, লাঞ্ছনা বা অবমাননা করা, শোষণ করার অধিকার কারো নেই (ধারা: ২১ এর ক)।
ইসলাম ধর্মে পৃথিবীর সকল মানুষ এক পরিবারের সদস্যের মত। যে কোনো ধর্মের মূল ভিত্তিগুলোর মধ্যে
একটি অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে মানবতা ও পরমতসহিষ্ণুতা।

হিন্দু ধর্মে সহিষ্ণুতা
পরমতসহিষ্ণুতা হিন্দু ধর্মের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট। হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ইশ্বর আরাধনার বিভিন্ন রকম মত ও পথের অবস্থান রয়েছে। শিব ভক্তদের বলা হয় শৈব, শক্তির পূজারী হলেন শ্বাক্য, বিষ্ণুর পূজারী হলেন বৈষ্ণব। তবে সাধারণ ক্ষেত্রে এই বৈচিত্র থাকলেও তাঁদের ভেতরে পরম ঐক্যের সন্ধান পাওয়া যায়। হিন্দু ধর্মে বহু দেব দেবীর পূজা অর্চনার অবকাশ থাকলেও সব পুজার গন্তব্য স্থল যে এক পরমেশ্বর এই তথ্যটি হিন্দু ধর্মের মর্মবানী। —একং সদ্বিপ্রা বহুধাবদন্তি’। অর্থাৎ সদ্-বস্তু এক, পন্ডিতগণ তাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করেছেন । ১৮৯৩ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, ‚আমরা শুধু সকল ধর্মকে সহ্য করি না বরং সকল ধর্মকেই আমি সত্য বলে বিশ্বাস করি।”প্রতিটি জীবের মধ্যেই ঈশ্বর রয়েছেন। এই উপলব্ধিতেই তিনি বলেন-“বহুরূপে সম্মুখে তোমায় ছাড়ি কোথা খুঁজিছো ঈশ্বর জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”।

বৌদ্ধ ধর্মে সহিষ্ণুতা
বৌদ্ধ ধর্মীয়রা মৈত্রীপরায়ণ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন পদ্ধতিতে বিশ্বাসী। তাঁরা বুদ্ধের অহিংসা নীতি, সংযম ও ধৈর্য্য-সংহতির মন্ত্রে উজ্জীবিত। তাঁরা বিশ্বাস করেন ‚বৈরিতা দিয়ে বৈরিতা কখনো প্রশমিত হয় না বরং বৃদ্ধি পায়। অহিংসা ও মৈত্রী দিয়েই বৈরিতা প্রশমিত হয়। এটাই জাগতিক নিয়ম।”বৌদ্ধমতে জীবন সমৃদ্ধির জন্য করুণা ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন অপরিহার্য। এ দুটি ছাড়া জীবন কখনো পরিপূর্ণতা সাধন করে না। জীবনকে পূর্ণ মনুষ্যত্বে পর্যবসিত করতে হলে দয়া, সেবা, দান, মমতা, ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, পরোপকারিতা, সমব্যাথি হওয়া প্রভৃতি ধর্মগুণের প্রয়োজন হয়। এগুলোই একজন মানুষকে করুণাবান ও মৈত্রীবান হতে শেখায়। বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থ —ধম্মপদের’ ২২৩ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে- ‚মৈত্রীর দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে, অসাধুতাকে জয় করবে সাধুতার দ্বারা, কৃপনকে দান দ্বারা এবং মিথ্যাবাদীকে সত্য দ্বারা জয় করবে।”একই সূত্রের ৬ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে- “পরস্পরকে বঞ্চনা করো না, কাউকে অবজ্ঞা করো না, হিংসা বা আক্রোশের বশবর্তী হয়ে পরস্পরের মধ্যে দুঃখোৎপাদনের চেষ্টা করো না।”পরিশেষে বলা যায় বৌদ্ধ ধর্মের মূল মন্ত্রই হলো “অহিংসা পরম ধর্ম।”

খ্রীষ্টান ধর্মে সহিষ্ণুতা
খ্রীষ্ট ধর্মে যুগে যুগে মানুষের প্রতি সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সম্প্রীতি ও সহযোগিতা বিষয়ে বাইবেলের কিছু উদ্ধৃতি: যীশু খ্ৰীষ্ট বলেছেন, ‚শান্তি স্থাপন করে যারা, ধন্য তাঁরা, তাঁরাই পরমেশ্বরের সন্তান বলে পরিচিত হবে” (মথি ৫:৯); তোমরা তোমাদের শত্রুকে ভালবাস, যারা তোমাদের ঘৃণা করে, তাঁদের উপকার কর, যারা তোমাদের অভিশাপ দেয়, তোমরা তাঁদের শুভ কামনা কর, যারা তোমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, তাঁদের মঙ্গল প্রার্থনা কর” আন্ত:ধর্মীয় নেতাগণ সম্প্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মীয় সভা-সমাবেশে, সালিশ বিচারে, মসজিদ, মন্দির, গীর্জা ও উপাসনালয়ে ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে আলোচনার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এর ফলে বিভিন্ন শ্রেণীর, জাতির ও ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আবাসস্থল হয়ে উঠবে আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ।

বিভিন্ন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নারী ও পুরুষের মধ্যে ন্যায় ও সাম্য
প্রাচীনকালে নারীকে অকেজো, অকল্যাণকর ও সভ্যতা-সংস্কৃতির পরিপন্থী ও প্রতিবন্ধক মনে করে দুরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে ইসলামে মনে করা হয় মানব জীবন-ধারায় নারী ও পুরুষ সমানভাবে উভয়ে উভয়ের পরিপূরক, নারীকে সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ রূপেই সৃষ্টি করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ঘোষণা করেছেন- ʻদুনিয়ার জিনিসগুলোর মধ্য থেকে নারী ও সুগন্ধীকে আমার নিকট প্রিয়তম বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

নারী-পুরুষের মৌলিক অধিকারে সাম্য:
ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের অধিকার আইনের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সে আইন সর্ব দিক দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ। তা সমাজে ও রাষ্ট্রে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত না থাকার কারণেই আজ নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

অর্থনৈতিক জীবনে সাম্য:
ইসলামী শরীয়তে নারী-পুরুষের সবার জন্যই সীমার মধ্যে থেকে আয় উপার্জনের অনুমতি রয়েছে। প্রত্যেকেই নিজ শ্রমের মজুরি লাভ করার অধিকারী। নারী বা পুরুষ কারো মালিকানায় কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। স্বামী নিজ স্ত্রীর ধনসম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। স্ত্রীও পারে না নিজ স্বামীর সম্পত্তি নিজ ইচ্ছামত ব্যবহার করতে বা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করতে।

ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর সম্মান: ইসলাম নারীকে মেয়ে, স্ত্রী এবং মা হিসেবেও মর্যাদা দিতে ও সম্মান করতে নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘোষণা হোল, ‘যার তিনটি কন্যাসন্তান বা তিনজন বোন অথবা দুটি কন্যাসন্তান বা দুজন বোন থাকে আর সে তাদের সাথে সদাচারণ করে এবং তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে তার জন্য জান্নাত রয়েছে।’ [সুনান তিরমিযী] স্ত্রী হিসেবেও নারীর মর্যাদার ব্যাপারে আল্লাহ্র ঘোষণা অত্যন্ত স্পষ্ট আল্লাহ্ অন্যতম নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যেন তাদের কাছে তোমরা বসবাস করতে পারো এবং তিনিই তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ [সূরা আর-রূম, আয়াত:২১] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন-‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম।’ [সুনান তিরমিযী] ইসলামি বিধানে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য সমান অধিকার বিধিবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত করেছে। এমনকি প্রয়োজনের ভিত্তিতে যুক্তিযুক্তভাবেই পুরুষকে পরিবারের প্রধান হওয়ার পদে অধিষ্ঠিত করলেও তাকে স্বেচ্ছাচারি বা অত্যাচারি হবার সুযোগ দেয়নি। আল্লাহর বাণী হলো, ‘স্ত্রীদের যেমনি দায়-দায়িত্ব রয়েছে তেমনি ন্যায়সংগত অধিকারও রয়েছে। তবে তাঁদের ওপর পুরুষদের কিছু অগ্রাধিকার রয়েছে।’ [সূরা আল-বাকারা, আয়ত: ২২৯] (সূত্র: ধর্মীয় নেতাদের জন্য উন্নয়নমূলক অভিভাষণ, মসজিদ কাউন্সিল, মার্চ ২০০৮)

হিন্দু ধর্মে বিশ্ব সৃষ্টির আদিলগ্নের কথা শাস্ত্র বাক্য থেকে জানা যায়। তাতে বলা হয়েছে স্রষ্টা বিশ্বের তাবৎ বস্তু সৃষ্টি করে মানব সৃষ্টির প্রয়াস নেন। সৃষ্টিকর্তা বিশ্ব চরাচরে মানব জীবন প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে মনু ও শতরূপা নামে দুই পুরুষ-নারী সৃষ্টি করেন। এ যুগলের মধ্য দিয়েই মানব জাতির ক্রমবিকাশ হয়েছে। এই পৌরাণিক কাহিনীর মধ্যে দিয়ে নারী-পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। বিশেষত বংশবিস্তারের প্রশ্নে, শুধু পুরুষ বা শুধু নারী সন্তান উৎপাদনে অক্ষম। উভয়ের সহযোগে সন্তান সন্তুতি তথা বংশবিস্তার সম্ভব হয়ে থাকে। এ তত্ত্বটি উপলব্ধি করেই নারী-পুরুষের সাম্যবাদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।সাম্যদৃষ্টি সমাজ জীবনের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সর্বত্র সমভাবে রক্ষিত হয় না।ফলে দৈহিক শক্তিতে বলীয়ান, কর্মশক্তিতে দক্ষ, উপার্জনশীল পুরুষের তুলনায় দুর্বল দেহ, আর্থিক নির্ভরশীল নারীকে অনেক সময় নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হতে হয়। এমতাবস্থায় হিন্দু ধর্মের দৃষ্টিকোন থেকে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরকরণের জন্য শাস্ত্রীয় ভাষায় বলা হয়, যেখানে নারী ও পুরুষ পরস্পর পরস্পরের প্রতি সন্তুষ্ট বা সহযোগিতা মনোভাপন্ন থাকেন সেখানে কল্যাণ
নিশ্চিতভাবে অবস্থান করে।

বৌদ্ধ ধর্মে
জাতি, ধর্ম ও বর্ণের যেমন ভেদাভেদ নেই, বৈষম্য নেই; তেমনি নারী-পুরুষের মধ্যেও কোনো পার্থক্য করা হয়নি। মহাকারুণিক ভগবান বুদ্ধ সকল মানব জাতিকে একই দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেছেন। তার মতে মানুষের কর্মগুণই মানুষকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। বুদ্ধ মনে করতেন নারী-পুরুষ উভয়েই মানব- মানবী। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ, দু:খ, বেদনা, মেধা, কর্মসাধনা ও প্রজ্ঞাশক্তি একিই । বুদ্ধপূর্ব যুগে প্রাচীন ভারতবর্ষে নারীদের অধিকার ছিল সীমিত। নানা গোত্র ও বর্ণের নারীদের মধ্যে ছিল নানান শ্রেণী বৈষম্য। সে হিসেবে বিধবা, ক্রীতদাসী, বারবণিতা তথা নানা নিম্ন শ্রেণীর নারীদেরকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো এবং তাদেরকে সকল ধর্ম-কর্ম থেকে বাদ দেয়া হতো। সমাজে তারা নিগৃহীতা হিসেবে ধিক্কার পেত। এসব নির্যাতিত, অধিকারবঞ্চিত ও নিগৃহীত নারীদেরকে বুদ্ধ মানব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি এসব নারীদেরকে স্নেহ, মমতা, মৈত্রী, করুণা ও মুদিতা দিয়ে শীল, সমাধি, প্রজ্ঞাময় জীবনে আলোকিত করেছেন। তারা জীবনের দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করে অমৃতময় নির্বাণ লাভ করেছেন। এ থেকে বোঝা যায় বৌদ্ধধর্মে মাতৃজাতি নারীদের স্থান কত উচ্চে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো লিঙ্গ বৈষম্য বা ভেদাভেদ নেই। আর এই বৈষম্যের জন্য যা কাজ করছে তা হল আমাদের পুরুষ শাষিত সমাজ ব্যবস্থা এবং সেই সাথে ধর্মীয়
গ্রন্থসমূহের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে না ধরা।

খ্ৰীষ্টধর্মে
আজও নারী সমাজ অবহেলিত, নিপীড়িত, নির্যাতীত যা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানব সমাজে হওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। আমাদের দেশে ও বিশ্বের প্রায় বেশিরভাগ মানুষই ঈশ্বরকে বা সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করে, যিনি সকল মানুষকে সমান অধিকার দিয়েছেন, সকলকে সমভাবে শ্রদ্ধা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। বাইবেল সাক্ষ্য দেয় ঈশ্বর সৃষ্টির সময় মানুষকে নারী ও পুরুষ করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাঁদের উভয়কেই তাঁরই প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি করেছেন। তিনি উভয়কেই স্বাধীনতা, জ্ঞান বুদ্ধি দান করেছেন। আন্ত:ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সদস্য হিসাবে আপনাদের এ বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন ধর্মীয় বইয়ের তথ্যসূত্র জানা আছে। যার আলোকে আপনারা সাধারন মানুষের সচেতনতা সৃষ্টিতে উদ্যোগী হয়ে নারীদের উন্নয়নে ও তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনেক ভূমিকা রাখতে পারেন।

জাতীয় উন্নয়ন ও আন্তঃসম্পর্কীয় বিষয়সমূহ
একটি দেশের সার্বিক জাতীয় উন্নয়ন তখনই ঘটে যখন দেশের সর্বস্তরের ব্যক্তিবর্গের বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। আন্ত:ধর্মীয় নেতাগণ আমাদের সমাজের, দেশের তথা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় যে ভূমিকা রাখেন তার মূল্য অপরিসীম। আন্ত:ধর্মীয় নেতাগণ ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে জাতীয় সমস্যা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, সম্প্রীতি বা সহিষ্ণুতা, নারী ও পুরুষের মধ্যে ন্যায় ও সাম্য, সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাবলীর গুণাগুণ বিচার, মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকার ব্যবস্থা ও সমাজ প্রতিষ্ঠায় জনসাধারণের সামনে তুলে ধরে তাঁদের মতামত সংগঠনে আন্ত:ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই সমাজের অন্যান্য প্রভাবশালী নেতৃবর্গের পাশাপাশি আন্ত:ধর্মীয় নেতাগণ বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নে সহযোগিতা করতে পারেন। বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের আন্তঃসম্পর্কীয় তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেমন: ক) দুর্নীতি দমন খ) জেন্ডার সমতা ও গ) যুব উন্নয়ন।

দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা
দুর্নীতি প্রতিরোধ জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত আন্ত:ধর্মীয় নেতা হিসেবে নিচের ভূমিকাগুলো রাখা যেতে পারে- দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্মীয় সভা-সমাবেশে, সেমিনারে আলোচনা করে, নিজের পরিধির মধ্যে কাউকে দুর্নীতি করতে দেখলে তাকে একক বা যৌথভাবে বাধা দিয়ে, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হয়ে, দুর্নীতিবাজকে ঘৃণা করে।

সম্প্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতা রক্ষায় ভূমিকা
স্থানীয় পর্যায়ে সম্প্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতা রক্ষায় এবং সকল নাগরিকের শান্তিপূর্ণ বসবাস ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে আন্ত:ধর্মীয় নেতা হিসেবে আপনি নীচের ভূমিকাগুলো রাখতে পারেন: নারী পুরুষ সকলের জন্য সমমর্যাদা ও মত প্রকাশে সমান সুযোগ সৃষ্টি করে, সালিশ-বিচার ইত্যাদির ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, এলাকার সকল নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম, ও সামাজিক রীতিনীতি পালনের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করে, সকল নাগরিকের নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভোট প্রদান, নির্বাচিত হওয়া ও নেতৃত্ব প্রদানে উৎসাহিত করে ও ভোট প্রদানের সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করে, ধর্ম, বিশ্বাস, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিজ নিজ সম্পদ ভোগ ও ব্যবহার এবং তা রক্ষায় সহযোগিতা করে, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় বিশেষভাবে সহযোগিতা করে
সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে।

নারী-পুরুষ সম্পর্ক উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা
গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের সকল কর্মকাণ্ডে নারী-পুরুষ সকলের অংশগ্রহণ। তাই আন্ত:ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সদস্য হিসেবে আপনার উচিত স্ব স্ব এলাকায় বসবাসকারী জনগণের মধ্যে নারী-পুরুষ সম্পর্ক উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে সহযোগিতা করা। বিশেষ করে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নারী-পুরুষ বৈষম্য কমিয়ে আনতে ও ন্যয্য প্রতিষ্ঠায় নারীদের সহায়তা করা। এর জন্য আপনি নিচের কাজগুলো করতে পারেন:
নারী শিক্ষায় উৎসাহ প্রদান ও সহযোগিতা করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহযোগী থেকে এবং তাঁদের প্রতি মর্যাদাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনে উৎসাহিত করে, পরিবার ও পরিবারের বাইরে নারী নির্যাতন, যৌতুক প্রদান, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করা ও এ বিষয়ে অন্যান্যদের সচেতন করে, নারীর প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণ ও পরিবেশ সৃষ্টি করে, পরিবার ও সমাজে নারীর স্বাধীন মত প্রকাশে উৎসাহ দেয়া ও তার পরিবেশ সৃষ্টি করে, ভোট প্রদান, ভোটে অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব প্রদান, শিক্ষা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে নিজে অংশগ্রহণ করা ও অন্যান্য নারীদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে পরিবার ও পরিবারের বাইরে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীর জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করে।

যুব উন্নয়নে ভূমিকা
একটি সুস্থ, সুন্দর ও সুশৃংখল সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নারী উন্নয়নে আন্ত:ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সদস্য হিসেবে আপনি নিচের কাজগুলো করতে পারেন: ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষায় উৎসাহিত করে ঝুঁকিপূর্ণ যুবসমাজকে সঠিক ও সুশৃংখল জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করে, মানবিক মূল্যবোধ প্রচারের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য এলাকার যুব সমাজকে পরিকল্পিত এবং সুশৃংখল জীবন যাপনের পরামর্শ দিয়ে, পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে এই বয়স থেকেই তাঁদের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে, উন্নয়ন কাজে জড়িত করে যুবসমাজকে এইচআইভি/এইডস, যৌনরোগ ও মাদকাসক্তি থেকে রক্ষা করে, লেখাপড়ার পাশাপাশি যে কোনো সামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িত করে তাঁদের উদ্দেশ্যহীন আড্ডা ও অনৈতিক কাজকর্মে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে, বাল্য বিবাহ ও যৌতুক সম্পর্কে যুবসমাজকে সচেতন হতে সহযোগিতা করে, যুব সমাজকে সংগঠিত হতে উৎসাহিত করে সমাজসেবামূলক কাজে লিপ্ত করে, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করে, যুব সমাজকে উপযুক্ত শিক্ষাগ্রহণ এবং অলস সময় না কাটিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার ব্যাপারে উৎসাহিত করে কর্মসংস্থান ও অর্থ উপার্জনের জন্য ঋণ প্রাপ্তি ও ক্ষুদ্র বা ব্যবসায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা ।

‚জগতের বক্ষে ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট গণতন্ত্রমূলক ধর্ম। প্রশান্ত মহাসাগর হতে আরম্ভ করে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্য্যন্ত সমস্ত মানব- মন্ডলীকে উদারনীতির একসূত্রে আবদ্ধ করিয়া ইসলাম পার্থিব উন্নতির চরম উৎকর্য লাভ করিয়াছে।“ –আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় অনাচার, জুলুম বা নারী নির্যাতনের ইতিহাস তাদের মাঝে নেই। তাই সকলকে যার যার ধর্ম নেতার চরিত্র অনুসরনেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব । এক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা প্রনিধানযোগ্য। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর অবদানের অনস্বীকার্য । রাম কৃষ্ণের বাণী বাংলার তিন ‚স” দিয়ে সহ্য, সহ্য এবং সহ্য করবার আহবান জানান। আর নারীর মর্যাদা প্রসংগে বলেন, সনাতন ধর্মের দেব দেবীদের মধ্যে বেশীর ভাগই নারী, অতঃপর নারীকে সম্মান করা দেবীকে সম্মানের সমতুল্য । ধর্মনেতাদের আলোচনায় একটি বক্তব্যই সকলের কথায় প্রতিফলিত হয় তা হচ্ছে, ‘যারা অন্যায়, জুলুম নির্যাতন করে তাদের কোন ধর্ম নেই’। আর ধর্মগুরুদের কাজই হচ্ছে অধার্মিকদের ধর্মের পথে আনা। প্রত্যেক ধর্মই ভালো ও সত্যের কথা বলে। মুসলমানরা পরকালে বিশ্বাস করে। অন্যান্য ধর্মের মানুষ পুনঃজন্মে বিশ্বাস করে এবং পাপের শাস্তির কথা চিন্তা করলে অপরাধ প্রবনতা কমে যায়। তাই সকল ধর্মই এ অর্থে সার্বজনীন। প্রত্যেক ধর্মই অন্যকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। দুর্নীতি প্রতিরোধ, সহনশীলতা, নারী ও যুব উন্নয়নে একজন ধর্ম নেতার (সনাতন, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলমান) ভূমিকা অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ । বাংলাদেশের পটভূমিতে এ ধরনের সম্পর্ক (বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর) খুবই স্বাভাবিক, কেননা এ দেশে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে চমৎকার সম্প্রীতি বিরাজ করছে। এ দেশ যেন বিভিন্ন ধর্মের মিলন মেলা ও নানা রঙের নানা বর্ণের ফুলের বাগান । এদেশের প্রত্যেকেই সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা উচিৎ । খ্রীষ্টান ধর্মের ফাদার বেভারেন হেমেন হালদার একটি গল্পের মাধ্যমে সহনশীলতার উদাহরন পেশ করেন। তার ভাষায়- একজাম্পল ইজ বেটার দ্যান এডভাইস (Example is better than advice). তিনি বলেন, “ধর্মগুরু বলেন, তোমাকে যদি কেউ এক গালে চড় দেয় তবে তুমি তাকে অন্য গাল পেতে দাও যেন সে সহনশীলতা দেখে নিজেই অনুতপ্ত হয় এবং নিজেকে শুদ্ধ করে। কিন্তু তিনি একথাও বলেন যেখানে অন্যায় অনাচার সহনশীলতা দিয়ে প্রতিরোধ করা যায় না সেখানে শক্ত হাতে তা প্রতিরোধ করতে হবে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না আর এভাবেই দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যায়। নারীর মর্যাদা প্রসংগে তিনি বলেন, খ্রীষ্টান ধর্ম নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান দিতে বলে কেননা নারী ইশ্বরকে (যীশু) ধারন করে। বৌদ্ধ ধর্মের গুরু সুমন বিপু ভিক্ষু বলেন, পঞ্চশীল পালন করে সাধু ও নন্দিত হওয়া যায় এবং এই সমাজে কখনো সাধু ব্যক্তি দ্বারা অপকর্ম হতে পারে না। তাই তিনি সমাজ সংস্কার ও উন্নয়নে সাধু ব্যক্তি হবার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন। সকলকে পজিটিভ বা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে কাজ করার আহ্ববান জানাই।

দুর্নীতি দমন
আন্তঃদলীয় ও আন্তঃধর্মীয় সভা, প্রশাসনকে আইনের বাস্তবায়নে সহযোগিতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা, ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্নীতি প্রতিহত করার উপর গুরুত্বারোপ করা দরকার। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ আর আমাদের সকলকে সম্মিলিতভাবে সমাজের অনাচার দূর করতে হবে। সকলেই একসাথে মিলে মিশে থাকতে পারে যদি তারা স্ব-স্ব ধর্ম সঠিকভাবে পালন করে। প্রত্যেক ধর্মের লোক একে অন্যের প্রতি সহানুভুতিশীল হবে। অধিকার আদায়ে সহযোগীতা করবে। স্ব-স্ব ধর্ম পালন করলেও সমাজে অধিকার ও দায়িত্ব পালনে সকলকে একত্রে কাজ করতে হবে। নৈতিক শিক্ষায় সকলকেই শিক্ষিত হতে হবে। সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব মূলক, সৌহার্দ্যমূলক সম্প্রীতি গড়ে তুললেই নারী উন্নয়ন, যুব উন্নয়ন এর জন্য এক সংগে কাজ করা সম্ভব । ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি কখনও কোন অন্যায় করতে পারেন না। তাই ধর্ম ব্যতীত এই পৃথিবীতে শান্তি শৃঙ্খলা আনা কখনই সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সত্যিই ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাঃ বলেছেন ‚যারা সংখ্যলঘুদের নির্যাতন করবে কেয়ামতের মাঠে তিনি আল্লাহ্‌র নিকট নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়ে ঐ নির্যাতনকারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন”। সামাজিক সম্প্রীতিরক্ষায় প্রয়োজন পরমত সহিষ্ণুতা, সকল ধর্মের সমন্বয়ে সামাজিক সংগঠন করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে বা সমস্যার সমাধানে মতবিনিময় করার ব্যবস্থা, পরনিন্দা বা গীবতচর্চা পরিহার করা। নিজ নিজ ধর্ম চর্চার মাধ্যমে যুব উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত, সহনশীল ও আন্তঃধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: আইনবিদ, কলামিষ্ট, সু-শাসন ও মানবাধিকারকর্মী।