তুষার কান্তি বসাক: গতকাল নোয়াখালীতে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদ সাতদফা দাবীতে সারা দেশে গণ অনশন কর্মসুচী পালন করে। তাদের সাতদফা দাবীর মধ্যে একটি দাবী আছে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন।
আজ থেকে ২২ বছর আগে ২০০১ সালে অক্টোবরে নির্বাচন পূর্বাপর ধর্ষণ নির্যাতন ঘুম হত্যার যে মহোৎসব হয়েছিল তা নিয়ে পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে আদালাতে একটি রীট মামলা দায়েরও হয়েছিল। সে রীটের আলোকে মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতি সাহাব উদ্দীন কে নিয়ে একটি বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশনও গঠিত হয়েছিল। তদন্ত কমিশন ৫০০০ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের নিকট জমাও দিয়েছিলেন। অথচ আওয়ামীলীগ একটানা ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর আজো পর্যন্ত তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে বিচারের প্রক্রিয়াতো হয়নি তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট আলোর মুখও দেখেনি। বরং এ চৌদ্দ বছরে হিন্দু পাড়ায় আক্রমন দেশত্যাগের হুমকী পিছনের ঘটনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাই আজ সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠন একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
২২ বছর আগে ভোলার অন্নদা প্রসাদ গ্রামের হিন্দু নারী ধর্ষনের ঘটনা তুলে ধরে আজকে পর্ব এখানে শেষ করবো। পাঠকদের মতামতের উপর নির্ভর করবে ধারাবাহিক চালিয়ে যাবো কি না? ২০০১ সালে অক্টোবরের নির্বাচনের পরপর একটি ঘটনা ভোলার লর্ডহার্ডিজ ইউনিয়নের সংখ্যালঘু নারী সুজতার জীবনে ঘটে গিয়েছিল। তারই একটি বাস্তব গল্প তুলে ধরছি।
এ সুজাতা মান্না দে’র কফি হাউজের সুজাতা নয়। সব সুজাতাই মান্না দে’র কফি হাউজের সুজাতার কপাল নিয়ে জন্ম নেয় না। নেয়নি।
কফি হাউজের সুজাতা যদিও লাখপতি স্বামী নিয়ে সুখে আছেন। আছেন হীরে আর জহরতে আগা গোড়া মোড়া সে বাড়ি-গাড়ি সবকিছু। কিন্তু ভোলার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের সুজতার আজ কিছুই নেই। কোথায় আছে তার খোঁজও কেউ সঠিক ভাবে দিতে পারেন না। ২০০১ সালের নির্বাচন পর্বাপর সারাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মা কন্যা পুত্রবধূযে হয়েছেন গণিয়মতের মাল সে খবর অনেকটাই অন্তরালে থেকে গেছে। শুধু গণমাধ্যমে সাহসী কন্যা পূর্নিমা রানী শীল সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করলেও গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন অসংখ্য পুর্নিমা রানী শীল। তেমনি একজন ভোলার সুজাতা দাস।
ভোলার লর্ড হাডিঞ্জ ইউনিয়নের সুজতার স্বামীর নাম যাদব দাস। ২০০১ সালের ১ লা অক্টোবর নির্বাচনের পরদিন রাতে সংঘবদ্ধ ধর্ষনের শিকার হন যাদবের স্ত্রী সুজতা ও মা বিষ্ণুপ্রিয়া। সুজতা তখন ছিলেন কয়েক মাসের অন্তসত্ত্বা। শ্বাশুড়ি ও পুত্রবধূ ধর্ষনের ওই ঘটনা প্রায় দেড় মাসপর গণমাধ্যমে আসে। এরপর ২০০১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পুলিশ বাধ্য হয়ে মামলা নেয়। সুজতা বাদী হয়ে ওই মামলায় কালাম, হারুন, মোতাহার, নান্টু ও আলমগীর নামে পাঁচজনকে আসামি করেন। বাড়িঘর লুটের মামলায় বাদী হয়েছিল বিষ্ণুপ্রিয়া।ওই মামলার কি হয়েছে কারো জানা নেই। শুধু জানা যায়, দু’জন বছর খানেক হাজত খেটেছে। বাকীরা ছিল পলাতক। পরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। শ্বাশুড়ি বিষ্ণুপ্রিয়া ও সন্তান সম্ভবা সুজাতা ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হলেও এখন আর কেউ বিষ্ণুপ্রিয়া ও সুজাতাদের খোঁজ রাখেন না।
সুজতাদের এর আগেও একবার কপাল পুড়েছে। ১৯৯২ সালে ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙ্গারপর। ঘর পুড়েছে। ঘর ভেঙ্গেছে। তার সাথে মনও ভেঙ্গেছে। যাকে তারা ‘ঘরপোড়া দাঙ্গা’ বলে। আর ২০০১ সালে হয়েছে শ্বাশুড়িসহ ধর্ষিত। যাকে তারা ‘বেইজ্জতির দাঙ্গা’ বলে। সুজাতারা কোথায় আছেন গ্রামের কেউ না জানলেও প্রতিবেশী প্রফুল্ল হালদার জানান সুজাতারা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। কোথায় গেছেন তা সঠিক ভাবে বলতে না পারলেও সন্দেহ করছেন ‘ক্রান্তির চর’ অথবা ‘চর টাকিমারি’।
জানা যায়, ভারতের জলপাইগুড়ির চরগুলোই বাংলাদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে ছেড়ে যাওয়া গরিবের আশ্রয়।
সুজতাদের বাড়িটি এখন কিনে নিয়েছেন লালু মাঝি। তিনি একজন নদী ভাঙ্গা মানুষ। লালু মাঝি থেকে জানা যায় সুজাতারা জমি বিক্রি করে দেওয়ার পরও বছর খানেক ছিলেন এই বাড়িতে। তিনি ওদের থেকে যেতে বলেছেন তবুও ওরা চলে গেল।
লালু মাঝি খুব দু:খের সঙ্গে বলেন, ‘মাইনষে কিল্লাই দেশ ছাড়ে? সহজেতো কেউ দেশ ছাড়ে না। সুজাতা যখন বেইজ্জত হইছিল তন হেতির হেডে যে মাইয়াটা আছিল হেতি অন ডাঙ্গর অইছে। এই দেশে থাইকলে মাইয়াটার বিয়াশাদি লই বিপদে হড়ন লাইগত’।
Post Views: 623



