#নিরাপত্তা বাহিনী বলছে অপরাধ দমন,অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে অপারেশনাল বেস স্থাপন
চাইথোয়াই মারমা, খাগড়াছড়ি: খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি সীমান্তে জায়গার ক্ষতিপুরণ ছাড়া অবৈধভাবে দখল করে বিজিবির ৩টি ক্যাম্প স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে। তবে নিরাপত্তা বাহিনী বলছে- অপরাধ দমন, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ৩২ বিজিবি খাগড়াছড়ি ব্যাটালিয়নের সীমান্তে অপারেশনাল বেস স্থাপন করেছে।
জেলার পানছড়ি উপজেলার সীমান্ত সড়ক এলাকায় স্থানীয় পাহাড়ি বা আদিবাসীদের জায়গার ক্ষতিপুরণ ছাড়া দখল করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি)-এর ৩টি ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিজিবি’র লোগাং জোন(৩ বিজিবি) এই ক্যাম্পগুলো স্থাপনের কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ক্যাম্প স্থাপনের পূর্বে জায়গার মালিকদের সাথে কোনো আলাপ-আলোচনা না করেই বাগানের গাছ কেটে ফেলা এবং বুলডোজার দিয়ে মাটি সমান করার অভিযোগও তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খেদারাছড়ার শেষ মাথায় যে জায়গায় বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে, প্রথাগত দখল স্বত্ত সেই জায়গার মালিক হলেন জয়ন্ত মনি চাকমা(৩৫), পিতা: কাট্টল্যা চাকমা। তিনি ১নং লোগাং ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মধুরাম পাড়া(খেদারাছড়া) গ্রামের বাসিন্দা। ধুধুকছড়ার শেষ মাথায় ক্যাম্প স্থাপনের জন্য ব্যবহৃত জমির মালিকের নাম দেবরতন চাকমা(৩৫), পিতা: মৃত ধন্যমনি চাকমা। তিনি ১নং লোগাং ইউনিয়নের ২নং ওয়াডের উত্তর ধুধুকছড়া গ্রামের বাসিন্দা।
একইদিকে, শিলছড়ি(ট্রিগহাইট) এলাকায় যে জায়গায় ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে, সেই জায়গার মালিক বর্ণমনি ত্রিপুরা(২৫), পিতা: চান মোহন ত্রিপুরা। তিনি ৩নং পানছড়ি ইউনিয়নের ১নং ওয়াডের শিলছড়ি গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয় জায়গার মালিকদের অভিযোগ, বিজিবি কর্তৃপক্ষ তাদের সাথে কোনো প্রকার পূর্ব আলোচনা বা সম্মতি ছাড়াই এই ক্যাম্প স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ক্যাম্পের জন্য নির্ধারিত জায়গাগুলোতে থাকা তাদের সৃজিত বাগানের মূল্যবান সেগুন গাছসহ অন্যান্য গাছপালা কেটে সাবাড় করা হয়েছে এবং বুলডোজার দিয়ে পাহাড় ও মাটি কেটে জায়গাগুলো সমান করে ক্যাম্পের জন্য ঘর তৈরি করা হচ্ছে।
এদিকে, বিনা নোটিশে এবং জোরপূর্বক জমি দখল করে বিজিবির এই ক্যাম্প স্থাপনকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। নিজেদের বসতভিটা ও ভোগদখলীয় জায়গা-জমি হারানোর শঙ্কায় সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, নিরাপত্তা বাহিনী আন্তর্জাতিক সীমান্ত পাহাড়া জোরদার, চোরাচালান প্রতিরোধ, আন্ত:সীমান্ত অপরাধ দমন, অবৈধ অনুপ্রবেশ(পুশ-ইন) প্রতিরোধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাগড়াছড়ি ব্যাটালিয়ন(৩২ বিজিবি) সীমান্ত এলাকায় দু’টি টেম্পরারী অপারেশনাল বেস(টিওবি) স্থাপন করেছে।
গত রোববার(১৪ই জুন) তারিখের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় পুশ-ইনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া এবং বিজিবির অপারেশনাল কার্যক্রমে অধিকতর গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার মনোরমেরটিলা ও রিন্টুরজুম এলাকায় এই দুইটি অপারেশনাল বেস স্থাপন করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ি ব্যাটালিয়ন(৩২ বিজিবি) জানিয়েছে, নতুন টিওবি স্থাপনের ফলে সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকদ্রব্য চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাচার প্রতিরোধ এবং পার্বত্য অঞ্চলে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা মোকাবিলায় বিজিবি আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি বনজ সম্পদ রক্ষায় অবৈধভাবে কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য বনজ সম্পদ পাচার প্রতিরোধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সহজতর হবে।
এছাড়াও পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সীমান্ত নজরদারি বৃদ্ধিতে মনোরমেরটিলা ও রিন্টুরজুম টিওবিগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বাহিনী বিজিবি সূত্রে জানা যায়, অপারেশনাল বেস স্থাপনের আগে স্থানীয় কারবারি, হেডম্যান, জমির মালিক, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে উপযোগী স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ভূমি অফিসের মাধ্যমে জমি বন্দোবস্তের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি কিছু স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে ফেসবুকে এ বিষয়ে মিথ্যা, বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে বলে অভিযোগ করেছে খাগড়াছড়ি ব্যাটালিয়ন। এ বিষয়ে বাহিনীর পক্ষ থেকে দেশবাসীকে গুজব ও অপপ্রচার সম্পর্কে সচেতন থাকার এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য বিশ্বাস না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর সূত্রে জানা গেছে, পানছড়ি উপজেলার লোগাং ইউনিয়নে খাগড়াছড়ি ব্যাটালিয়ন(৩২ বিজিবি) এর তত্বাবধানে খেদারাছড়া ও ধুধুকছড়া, সীমানা আদাম এলাকায় এবং চেঙ্গী ইউনিয়নে পানছড়ি জোন(৩ বিজিবি) এর তত্বাবধানে শিলছড়ি, কজইছড়ি এলাকায় মোট ৩টি ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে।
এলাকা জায়গার মালিকদের অভিযোগ, বিজিবি কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো প্রকার পূর্ব সম্মতি বা আইনি নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ এই ক্যাম্প স্থাপনের কাজ শুরু করে। ইতোমধ্যে ক্যাম্পের জন্য নির্ধারিত জায়গাগুলোতে থাকা তাদের কষ্টার্জিত ও সৃজিত বাগানের মূল্যবান সেগুন গাছসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছপালা কেটে সাবাড় করা হয়েছে। এরপর বুলডোজার দিয়ে মাটি সমান করে সেখানে ক্যাম্পের জন্য ঘর তৈরির কাজ ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী এক জমির মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের জীবিকা ও মাথা গোঁজার একমাত্র অবলম্বন এই জায়গা ও বাগানগুলো। কোনো আলোচনা না করে, কোনো ক্ষতিপূরণ না দিয়ে এভাবে জোর করে বাগান কেটে ফেলা এবং জমি দখল করা সম্পূর্ণ অন্যায়।”বিনা নোটিশে এবং জোরপূর্বক জমি দখলের এই ঘটনায় উক্ত এলাকার সাধারণ পাহড়ি বা আদিবাসী জুম্মদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নিজেদের বসতভিটা, বাগান ও ঐতিহ্যগতভাবে ভোগদখলীয় জায়গা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের আশঙ্কা, এভাবে ক্যাম্প স্থাপন করে সাধারণ জুম্মদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে তারা পৈত্রিক ভূমিহীন হয়ে পড়বেন। এ বিষয়ে স্থানীয় হেড়ম্যান, পাড়ার প্রধান/কার্বারীরা সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অবিলম্বে এই জোরপূর্বক উচ্ছেদ বন্ধ এবং ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
পানছড়ি জোন(৩ বিজিবি) অধিনায়কের মূখপাত্র নাম প্রকাশে অনিছুক বলেন, সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে যে কোন স্থানে নিরাপত্তা স্বার্থের ক্যাম্প স্থাপন করতে হচ্ছে। এটি রাষ্ট্রীয় পন্থী বা ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের একটু ক্ষতি হলেও তাদের করার কোন উপায় নেই। আমরা সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী।
উল্লেখ্য, পানছড়ি উপজেলাতে পাহাড়ি বা আদিবাসী জুম্মদের জায়গা দখল করে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের গুরত্বর অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ বেড়েছে। পানছড়ি উপজেলার লোগাং ও চেঙ্গী ইউনিয়নে স্থানীয় পহাড়ি বা আদিবাসী জুম্মদের জায়গা দখল করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি)-এর ৩টি নতুন ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খাগড়াছড়ি ব্যাটালিয়ন(৩২ বিজিবি) ও পানছড়ি জোন(৩ বিজিবি) এর তত্বাবধানে এই ক্যাম্পগুলো স্থাপনের কার্যক্রম চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।




