সালাম মাহমুদ: অতুলনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ। সবুজ প্রকৃতির অপরূপ বৈচিত্রের এমন দেশ খুঁজে পাওয়া দুরূহ। যুগকে যুগ এই দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিমোহিত করেছে রথী মহারথীদের। বৃহত্তম ব-দ্বীপ নামের বাংলাদেশের আশ্চর্য সুন্দরতার কারণে কবি জীবনানন্দ দাশ লিখতে পেরেছিলেন সহস্র সুন্দর সুন্দর কবিতা। পৃথিবীর অন্য কোনো কবি প্রকৃতি নিয়ে এত কবিতা লিখেছেন কি না সন্দেহ আছে। বাংলার রূপে তিনি অভিভূত হয়ে লিখেছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার একটি— “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর”।

আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পর্যটন শিল্প কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইকো-ট্যুরিজম, যা বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে খুবই প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। ইকো-ট্যুরিজম বিকাশে বাংলাদেশের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। এ দেশের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র পৃথিবীর অন্য দেশ থেকে অনন্য ও একক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। ষড়ঋতুর দারুণ আবহাওয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা প্রাকৃতিক সম্পদ। এই প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তুলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে।

ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে স্থায়িত্বশীল উন্নত অর্থনীতি তৈরি করা সম্ভব। এটি স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে, সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। ইকো-ট্যুরিজম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রকৃতির সংরক্ষণের মধ্যে একটি সুসংহত সমন্বয় তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। যখন একজন পর্যটক একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ভ্রমণ করেন, তখন তার যাতায়াত, খাদ্য ও আবাসন বাবদ যে অর্থ ব্যয় হয়, তার একটি বড় অংশ স্থানীয় কমিউনিটির কাছে পৌঁছায়। এতে করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন সহজতর হয়।

ইকো-ট্যুরিজমে উন্নয়নে বিনিয়োগ করা এখন যেন উন্নয়নের মাইলফলকে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান ১০ শতাংশের বেশি। অনেক দেশ কেবল পর্যটনকে কেন্দ্র করেই তাদের জিডিপি-র বড় অংশ অর্জন করছে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরিবেশের সঙ্গে একাত্মতা বজায় রেখে ইকো-ট্যুরিজম খাতে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছানো এখন সময়ের অপেক্ষা।

ইকো-ট্যুরিজমের বিনিয়োগের স্বার্থে যে জায়গাগুলো হতে পারে বিনিয়োগের অন্যতম স্থান- বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, সিলেট চা বাগান, পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, সমুদ্র কন্যা কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, হাতিয়া বা নিঝুম দ্বীপের মতো দ্বীপগুলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির কাপ্তাই লেক ও অন্যান্য স্পট, বান্দরবানের সাজেক ভ্যালি, নীলগিরি, চিম্বুক পাহাড়, খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা, সিলেটের বিছানাকান্দি ও রাতারগুল, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, চলনবিল, বগুড়ার মহাস্থানগড়, বেহুলা লক্ষীন্দরের বাসরঘর, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া বন,চকরিয়ার বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, পাহাড়পুর, ময়নামতি, উয়ারী বটেশ্বর, ষাট গম্বুজ মসজিদসহ বিভিন্ন নদ-নদীর উপকূল, পাহাড়-পর্বত, বিভিন্ন জলপ্রপাত, হাওর, বনভূমি, উদ্যান ইত্যাদি পর্যটন এলাকা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। এছাড়াও গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অঞ্চলগুলো হতে পারে বিনিয়োগের খাত।

বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈচিত্র রক্ষা করে ইকো-রিসোর্ট স্থাপন করা যেতে পারে। আবার উত্তরাঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের পাশে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুললে ইতিহাস ও প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটবে।

সুষ্ঠু পরিকল্পনা, সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে দেশের পর্যটনশিল্প উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। পর্যটন ব্যবসায় নিয়োজিত উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ট্যুর সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিতে সরকার, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পর্যটন শুধু অবকাঠামো নয়, এটি একটি সেবামূলক শিল্প। তাই পর্যটকদের সাথে ব্যবহার এবং সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।

পর্যটন খাত ও ইকো-ট্যুরিজমকে গুরুত্ব দিয়ে একটি বিশেষায়িত ব্যাংক স্থাপন করা যেতে পারে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যটন খাতের জন্য বিশেষ সঞ্চয় স্কিম, ঋণদানের মাধ্যমে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বিনিয়োগের প্যাকেজ চালুর উদ্যোগ নিতে পারে, তবে এই খাতের চেহারা বদলে যাবে। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেলে গড়ে উঠতে পারে বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পট, সেখান থেকে আয় হতে পারে বিপুল পরিমাণ অর্থ। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তারা যারা পর্যটন নিয়ে কাজ করতে চান, তাদের জন্য সিড মানি বা প্রারম্ভিক মূলধনের জোগান দেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, বেসরকারি উদ্যোগ পারে ইকো-ট্যুরিজম বিপ্লবের সঙ্গী হতে। ট্যুর সম্পর্কিত সকল খাত এবং উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা গেলে এ শিল্পের প্রসার ঘটবে। অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইকো-সিস্টেম, আবাসস্থল, মানসম্মত খাদ্য, নিরাপত্তা ও ইমেজ বৃদ্ধি করা হতে পারে প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিং বা নেতিবাচক ধারণা দূর করতে শক্তিশালী ডিজিটাল প্রচারণার প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ইকো-ট্যুরিজম বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ সম্মিলিত একটি প্রয়াস। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণে এবং স্থায়িত্বশীল উন্নত অর্থনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটকদের দর্শনীয় গন্তব্য তৈরি করতে এই প্রয়াস সহায়ক হতে পারে। স্থানীয় জনগণের প্রশিক্ষণ, সহায়তা এবং সামাজিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ছাড়াও পর্যটকদের সংরক্ষণ এবং সম্পদের স্থায়িত্বশীল উন্নত অর্থনীতি বিনিয়োগের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

পর্যটন শিল্পের বিকাশে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং পর্যটন এলাকার সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে গাইড হিসেবে স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের নিয়োগ দিলে বেকারত্ব দূর হওয়ার পাশাপাশি পর্যটকরাও সঠিক তথ্য পাবেন।

পরিশেষে বলা যায়, এই সম্মিলিত প্রয়াস বাংলাদেশকে বিশ্বময় এবং স্থায়িত্বশীল পর্যটন হিসেবে উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে এবং এ খাত থেকে অধিক রাজস্ব আয় অর্জন সম্ভব হবে। যদি আমরা আমাদের নদী, পাহাড় আর অরণ্যকে আগলে রেখে আধুনিকতার স্পর্শ দিতে পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন রাজধানী।

কবির সেই ‘রূপসী বাংলা’ তখন কেবল কবিতার পাতায় নয়, বরং বিশ্ব পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত এক সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিতি পাবে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, দৈনিক কালের সমাজ, মহাসচিব, গ্লোবাল এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজমন জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

সালাম মাহমুদ: অতুলনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ। সবুজ প্রকৃতির অপরূপ বৈচিত্রের এমন দেশ খুঁজে পাওয়া দুরূহ। যুগকে যুগ এই দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিমোহিত করেছে রথী মহারথীদের। বৃহত্তম ব-দ্বীপ নামের বাংলাদেশের আশ্চর্য সুন্দরতার কারণে কবি জীবনানন্দ দাশ লিখতে পেরেছিলেন সহস্র সুন্দর সুন্দর কবিতা। পৃথিবীর অন্য কোনো কবি প্রকৃতি নিয়ে এত কবিতা লিখেছেন কি না সন্দেহ আছে। বাংলার রূপে তিনি অভিভূত হয়ে লিখেছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার একটি— “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর”।

আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পর্যটন শিল্প কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইকো-ট্যুরিজম, যা বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে খুবই প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। ইকো-ট্যুরিজম বিকাশে বাংলাদেশের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। এ দেশের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র পৃথিবীর অন্য দেশ থেকে অনন্য ও একক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। ষড়ঋতুর দারুণ আবহাওয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা প্রাকৃতিক সম্পদ। এই প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তুলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে।

ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে স্থায়িত্বশীল উন্নত অর্থনীতি তৈরি করা সম্ভব। এটি স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে, সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। ইকো-ট্যুরিজম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রকৃতির সংরক্ষণের মধ্যে একটি সুসংহত সমন্বয় তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। যখন একজন পর্যটক একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ভ্রমণ করেন, তখন তার যাতায়াত, খাদ্য ও আবাসন বাবদ যে অর্থ ব্যয় হয়, তার একটি বড় অংশ স্থানীয় কমিউনিটির কাছে পৌঁছায়। এতে করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন সহজতর হয়।

ইকো-ট্যুরিজমে উন্নয়নে বিনিয়োগ করা এখন যেন উন্নয়নের মাইলফলকে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান ১০ শতাংশের বেশি। অনেক দেশ কেবল পর্যটনকে কেন্দ্র করেই তাদের জিডিপি-র বড় অংশ অর্জন করছে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরিবেশের সঙ্গে একাত্মতা বজায় রেখে ইকো-ট্যুরিজম খাতে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছানো এখন সময়ের অপেক্ষা।

ইকো-ট্যুরিজমের বিনিয়োগের স্বার্থে যে জায়গাগুলো হতে পারে বিনিয়োগের অন্যতম স্থান- বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, সিলেট চা বাগান, পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, সমুদ্র কন্যা কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, হাতিয়া বা নিঝুম দ্বীপের মতো দ্বীপগুলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির কাপ্তাই লেক ও অন্যান্য স্পট, বান্দরবানের সাজেক ভ্যালি, নীলগিরি, চিম্বুক পাহাড়, খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা, সিলেটের বিছানাকান্দি ও রাতারগুল, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, চলনবিল, বগুড়ার মহাস্থানগড়, বেহুলা লক্ষীন্দরের বাসরঘর, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া বন,চকরিয়ার বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, পাহাড়পুর, ময়নামতি, উয়ারী বটেশ্বর, ষাট গম্বুজ মসজিদসহ বিভিন্ন নদ-নদীর উপকূল, পাহাড়-পর্বত, বিভিন্ন জলপ্রপাত, হাওর, বনভূমি, উদ্যান ইত্যাদি পর্যটন এলাকা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। এছাড়াও গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অঞ্চলগুলো হতে পারে বিনিয়োগের খাত।

বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈচিত্র রক্ষা করে ইকো-রিসোর্ট স্থাপন করা যেতে পারে। আবার উত্তরাঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের পাশে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুললে ইতিহাস ও প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটবে।

সুষ্ঠু পরিকল্পনা, সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে দেশের পর্যটনশিল্প উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। পর্যটন ব্যবসায় নিয়োজিত উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ট্যুর সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিতে সরকার, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পর্যটন শুধু অবকাঠামো নয়, এটি একটি সেবামূলক শিল্প। তাই পর্যটকদের সাথে ব্যবহার এবং সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।

পর্যটন খাত ও ইকো-ট্যুরিজমকে গুরুত্ব দিয়ে একটি বিশেষায়িত ব্যাংক স্থাপন করা যেতে পারে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যটন খাতের জন্য বিশেষ সঞ্চয় স্কিম, ঋণদানের মাধ্যমে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বিনিয়োগের প্যাকেজ চালুর উদ্যোগ নিতে পারে, তবে এই খাতের চেহারা বদলে যাবে। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেলে গড়ে উঠতে পারে বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পট, সেখান থেকে আয় হতে পারে বিপুল পরিমাণ অর্থ। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তারা যারা পর্যটন নিয়ে কাজ করতে চান, তাদের জন্য সিড মানি বা প্রারম্ভিক মূলধনের জোগান দেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, বেসরকারি উদ্যোগ পারে ইকো-ট্যুরিজম বিপ্লবের সঙ্গী হতে। ট্যুর সম্পর্কিত সকল খাত এবং উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা গেলে এ শিল্পের প্রসার ঘটবে। অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইকো-সিস্টেম, আবাসস্থল, মানসম্মত খাদ্য, নিরাপত্তা ও ইমেজ বৃদ্ধি করা হতে পারে প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিং বা নেতিবাচক ধারণা দূর করতে শক্তিশালী ডিজিটাল প্রচারণার প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ইকো-ট্যুরিজম বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ সম্মিলিত একটি প্রয়াস। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণে এবং স্থায়িত্বশীল উন্নত অর্থনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটকদের দর্শনীয় গন্তব্য তৈরি করতে এই প্রয়াস সহায়ক হতে পারে। স্থানীয় জনগণের প্রশিক্ষণ, সহায়তা এবং সামাজিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ছাড়াও পর্যটকদের সংরক্ষণ এবং সম্পদের স্থায়িত্বশীল উন্নত অর্থনীতি বিনিয়োগের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

পর্যটন শিল্পের বিকাশে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং পর্যটন এলাকার সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে গাইড হিসেবে স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের নিয়োগ দিলে বেকারত্ব দূর হওয়ার পাশাপাশি পর্যটকরাও সঠিক তথ্য পাবেন।

পরিশেষে বলা যায়, এই সম্মিলিত প্রয়াস বাংলাদেশকে বিশ্বময় এবং স্থায়িত্বশীল পর্যটন হিসেবে উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে এবং এ খাত থেকে অধিক রাজস্ব আয় অর্জন সম্ভব হবে। যদি আমরা আমাদের নদী, পাহাড় আর অরণ্যকে আগলে রেখে আধুনিকতার স্পর্শ দিতে পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন রাজধানী।

কবির সেই ‘রূপসী বাংলা’ তখন কেবল কবিতার পাতায় নয়, বরং বিশ্ব পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত এক সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিতি পাবে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, দৈনিক কালের সমাজ, মহাসচিব, গ্লোবাল এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজমন জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।