বিভুরঞ্জন সরকার
বিএনপি নামের রাজনৈতিক দলটির নেতারা যখন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথা এক সুরে বলছেন, তখন পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একটি লেখা হাতে পেলাম। ‘ডানপন্থির বামে, বামপন্থির ডানে’ শিরোনামে খালেদা জিয়ার লেখাটি ২০০৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে। দিনটি ছিল বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

বহু বছর ধরে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও তিনি লেখালেখি করেন- এমন তথ্য কারো জানা ছিল না। ফলে পত্রিকায় ছাপা হওয়া তার প্রথম লেখাটি অনেকেরই মনোযোগ কেড়েছিল। বিবিসিখ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক আতাউস সামাদ দৈনিক সমকালে একটি কলাম লিখে খালেদা জিয়ার লেখালেখির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে লেখাটির বক্তব্য সম্পর্কে নিজের মতামতও দিয়েছিলেন। আতাউস সামাদও এখন আর বেঁচে নেই। আতাউস সামাদ লিখেছিলেন- ‘তিনি এমনিতেই বলেন কম আর লেখালেখি তো করেনই না, আমাদের দেশের বেশির ভাগ রাজনীতিবিদ বলেন বেশি বেশি আর লেখেন না একেবারেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সময় অনেক কথা বলতেন, বেশ লেখালেখিও করতেন। তার কয়েকটি বই আছে। তবে ইদানীং তিনিও সভা-সম্মেলনে যাচ্ছেন কম, তাই জাতীয় সংসদের অধিবেশন ছাড়া, যেখানে প্রতি সপ্তাহে একদিন নিজে সরাসরি সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দেন, আজকাল তার মুখের কথা শোনা যায় কম। তার লেখা ইদানীং চোখে পড়েনি। প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী নেতা বা নেত্রী মাঝেমধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পত্রপত্রিকায় লিখলে ভালো হয়।’

আরেকজন জনপ্রিয় কলাম লেখক, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন দৈনিক জনকণ্ঠে এক সংবাদভাষ্যে লিখেছিলেন- ‘আমি মনে করি রাজনৈতিক নেতাদের দু-এক পাতা লেখা উচিত। তারা খালি বক্তৃতা দিয়ে যান এবং পরে অনেক কিছু অস্বীকার করেন। লিখলে তার চিন্তাধারাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে জন্য একজন সিনিয়র লেখক হিসেবে বেগম জিয়ার সংবাদপত্রে লেখক হিসেবে আবির্ভাবকে আমি অভিনন্দন জানাই। অনেকে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বক্রোক্তি করেন। তার এই লেখা সেই বক্রোক্তি নস্যাৎ করে দেবে। কেননা সংহত ও সংযত ভাষায় তিনি তার চিন্তা প্রকাশ করেছেন এবং নামটিও সুন্দর- ডানপন্থির বামে, বামপন্থির ডানে। তার বক্তৃতা এতো সংহত-সুন্দর হলে তো কথাই ছিল না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পালাবদল ঘটত। আশা করি বেগম জিয়ার পথ অনুসরণ করে নেতানেত্রীরা তাদের ভাবনাচিন্তা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করবেন এবং হাতাহাতির রাজনীতির বদলে লেখালেখির রাজনীতির প্রবর্তন করবেন।’

বেগম জিয়ার এই লেখক হয়ে ওঠাকে অনেকেই স্বাগত জানিয়ে আশা করেছিলেন, তিনি লেখালেখি অব্যাহত রাখবেন এবং লেখক হিসেবে সত্যাশ্রয়ী হতে সচেষ্ট থাকবেন। মেঠো বক্তৃতা এবং লেখার বক্তব্য যদি একই রকম হয় তাহলে দলবাজদের খুশি করা গেলেও সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের প্রত্যাশা পূরণ করা যাবে না। এই বিবেচনায় বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম লেখাটি পাঠকদের খুব তৃপ্ত করতে পেরেছিল কি? রাজনীতি-বিশ্লেষকদের চোখে নতুন আলো ফেলতে পেরেছিল কি তার লেখার বক্তব্য?

খালেদা জিয়ার লেখাটির শুরু এভাবে- ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমান এসেছিলেন আকস্মিকভাবে। কিন্তু তার আগমন ছিল অবশ্যম্ভাবী। নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করতে সময়ের চাহিদা এবং দেশের দাবিতে তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন। কোনো চোরাগোপ্তা পথে নয়, রাতের অন্ধকারে ষড়যন্ত্র করে নয়, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর নতুন ভোরের আলোয় সর্বস্তরের লক্ষ কোটি মানুষ এবং দেশপ্রেমিক সৈনিকদের মুহুর্মুহু স্লোগান আর পুষ্পবর্ষণের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের অভিষেক হয়েছিল। দেশের নেতৃত্ব চলে এসেছিল তার হাতে।’

রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের অভিষেক সম্পর্কে খালেদা জিয়া যে সহজ-সরল নির্দোষ বর্ণনা দিয়েছন, প্রকৃত সত্য কি তাই? রাজনৈতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমান কি সত্যি আকস্মিকভাবে এসেছিলেন নাকি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তিনি তার আগমন অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিলেন? তার জীবনের কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে এটা প্রমাণ করতে কষ্ট হবে না যে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। এই উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়নের জন্য প্রকৃতপক্ষে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছেন, সহজ কথায় বললে উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য চোরাগোপ্তা এবং রাতের অন্ধকারে ষড়যন্ত্রের পথই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। এটা যারা অস্বীকার করে তারা ইতিহাসের সত্যকে হয় আড়াল করতে চায় অথবা স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করে। কিন্তু ইতিহাস তো আসলে কাউকেই মার্জনা করে না।

বেগম জিয়ার মতে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে জিয়া রাজনীতিতে এসেছিলেন। প্রশ্ন হলো, নেতৃত্বের এই শূন্যতা কীভাবে তৈরি হয়েছিল? বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে, জেলখানার মধ্যে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করে যারা দেশকে নেতৃত্বশূন্য করেছিল, তাদের সঙ্গে কি জিয়াউর রহমানের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না? জেনারেল কে এম সফিউল্লাহকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করায় জিয়াউর রহমান অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এই অসন্তোষ ও ক্ষোভ তিনি গোপন রাখতে পারেননি। অনেকেরই তা জানা। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যারা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন করার ষড়যন্ত্র করেছিল, তাদের সঙ্গে জিয়ার যে যোগাযোগ ছিল, তা মার্কিন গোপন দলিলপত্রের মাধ্যমে এখন প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আত্মস্বীকৃত খুনিরাও জিয়ার সম্পৃক্ততার কথা একাধিকার প্রকাশ্যে বলেছে। এই খুনিদের প্রতি যে জিয়ার বিশেষ দরদ বা অনুকম্পা ছিল সেটাও বোঝা গেছে তাদের বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দেয়া এবং হত্যার অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেয়ার ঘটনা থেকেই।

খালেদা জিয়া লিখেছেন- ‘শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাকশাল নামের একটি দল গঠন করে আর সব দল নিষিদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে দেশে এক দলের শাসন কায়েম করা হয়েছিল। গণতন্ত্র হরণ করা হয়েছিল। সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো খর্ব করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত করে তার হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল সর্বময় ক্ষমতা। ভোট ছাড়াই সরকারের মেয়াদ তিন বছরের জন্য বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম করা সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান আবির্ভূত হয়েছিলেন একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসন ব্যবস্থার জনক হিসেবে। এসব তৎপরতা ছিল আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিরোধী।’

সাধারণভাবে বেগম জিয়ার লেখার এই অংশের সঙ্গে অনেকেই হয়তো দ্বিমত প্রকাশ করবেন না। সত্যি যে, পঁচাত্তর সালে দেশের এক বিশেষ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করেছিলেন। বাকশাল ব্যবস্থাটা স্থায়ী নাকি অল্প সময়ের জন্য করা হয়েছিল, তিনি কোন বুঝ-বিবেচনা থেকে এটা করেছিলেন সে বিষয়ে তর্কে না গিয়েও বলা যায়, তার এই সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মেনে নেয়া যায় না। প্রশ্ন হলো, এ জন্য তাকে বর্বরভাবে হত্যা করা কি গণতন্ত্রসম্মত? এই নারকীয়তা কি সমর্থন করা যায়? বেগম জিয়া তার লেখায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নিন্দা-সমালোচনা করেননি। তিনি কি তাহলে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতা বদলকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলে মনে করেন? বঙ্গবন্ধুকে স্বৈরশাসন ব্যবস্থার জনক বলে চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করা থেকে বিরত না থাকলেও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করার ব্যাপারে তিনি ঠিকই বিরত থেকেছেন। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি পদে উন্নীত করে তার হাতে ‘সর্বময় ক্ষমতা’ তুলে দেয়া যদি নিন্দনীয় হয়ে থাকে তাহলে সামরিক শাসনের অধীনে জিয়াউর রহমান যে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তাতে কি তখন তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হননি? ভোট ছাড়াই সরকারের মেয়াদ তিন বছর বাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু যদি অন্যায় করে থাকেন তাহলে জেনারেল জিয়া কি করেছিলেন? তিনি কোন ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেছিলেন? একজন মিলিটারি ডিকটেটরকে ‘গণতন্ত্রী’ সাজিয়ে বেগম জিয়া সুখ অনুভব করতে পারেন, কিন্তু‘ ইতিহাস তাতে সায় দেবে কি?

খালেদা জিয়া লিখেছিলেন- ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব দিয়েছিল কিন্তু‘ পরে তারা যুগের চাহিদা মেটাতে পারেনি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পুরোভাগে আওয়ামী লীগ ছিল কিন্তু‘ পরে তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। সেই ব্যর্থতার পটভূমিতেই বিএনপির জন্ম, একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী রাজনীতি করার অঙ্গীকারে।’

বেগম জিয়া যেভাবে দুই লাইনের মধ্যে দেশের রাজনীতিতে অস্তিত্বহীন মুসলিম লীগ এবং প্রবল প্রতাপশালী দল আওয়ামী লীগকে এক কাতারে ফেলে এবং বাতিল করে দিয়ে বিএনপির জন্ম ঘোষণা করেছেন, বাস্তব ঘটনা অতটা সহজ-সরল হলে কি আর আজ বেগম জিয়াকে সংসদে মাত্র ত্রিশ-বত্রিশটি আসন নিয়ে বিরোধী দলের নেত্রী হয়ে দুঃখভারাক্রান্ত মনে দিনযাপন করতে হতো? কোথায় মুসলিম লীগ আর কোথায় আওয়ামী লীগ! বেগম জিয়ার আকর্ষণটা বোধ হয় মুসলিম লীগের দিকেই বেশি। মুসলিম লীগ আর আওয়ামী লীগের ব্যাপারে বেগম জিয়ার শব্দ ব্যবহারও লক্ষণীয়। মুসলিম লীগ যুগের চাহিদা মেটাতে পারেনি আর আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। রাজনীতি সম্পর্কে যাদের সামান্য জ্ঞানবুদ্ধি আছে তারা কি বেগম জিয়ার এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হতে পারবেন? সম্পূর্ণ ব্যর্থ একটি দল জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে কীভাবে ক্ষমতায় আসে? বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের চেয়ারপারসন হিসেবে বেগম জিয়া সংবাদপত্রে প্রথম একটি লেখা লিখলেন অথচ কীভাবে এই দলটির জন্ম হলো তা একটু বিস্তারিত উল্লেখ করলেন না কেন? বেগম জিয়া জানেন যে, বিএনপি নামক দলটি কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জন্ম লাভ করেনি। সেনা ছাউনিতে বসবাস করে, রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদ দখলে রেখে, সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে, সব সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে, নানা লোভ-প্রলোভন দেখিয়ে সুযোগসন্ধানীদের নিয়ে বিএনপির জন্ম দেয়া হয়েছিল সামরিক শাসকের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার অভিলাষে। বিএনপির জন্মকে যদি গৌরবের বলা হয় তাহলে একই প্রক্রিয়ায় এরশাদের জাতীয় পার্টির জন্ম দেয়াকে অগৌরবের বলা অনুচিত হবে।

খালেদা জিয়া তার লেখা শেষ করেছিলেন এইভাবে- ‘আমাদের ডানে যাদের অবস্থান তারা ডানপন্থি, আমাদের বামে যাদের অবস্থান তারা বামপন্থি। আমাদের অবস্থান ডানপন্থির বামে এবং বামপন্থির ডানে। আমাদের অবস্থান কেন্দ্রে এবং এ দেশের রাজনীতির কেন্দ্র আমরাই। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই এ দেশের মূল ধারা। বিএনপিই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।’

আতাউস সামাদ বেগম জিয়ার লেখার অনেক বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করলেও শেষ দুই লাইনে বেগম জিয়া যে দাবি করেছেন তার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। আতাউস সামাদ লিখেছেন, প্রথমত দাবিটি অবাস্তব। বাস্তবের সঙ্গে এর মিল নেই। দ্বিতীয়ত, আমরা যেহেতু বহু দলীয় ও বহুমতের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তাই আমরা দেশে একাধিক জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চাই, কোনো একটি মাত্র নয়। বস্তুত বেগম জিয়া যেভাবে লেখার উপসংহার টেনেছেন তা শব্দের চাতুর্য ছাড়া আর কিছু নয়। বিএনপি যদি সত্যি কেন্দ্রের অর্থাৎ মধ্যপন্থার দল হতো, তাহলে দ্বিধাহীন চিত্তে তার প্রশংসা করা যেত। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, জাতীয় স্বার্থের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বার্থের অনুকূল অর্থনৈতিক কর্মসূচিই মধ্যপন্থার রাজনীতির বড় বৈশিষ্ট্য- যা থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে বিএনপির রাজনীতি।

সে জন্য অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করেন, বিএনপির রাজনীতি বামের ডানে তাতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু ডানের বামে কোনোভাবেই নয়। ধর্মীয় ও উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মাখামাখি করে তাদের রাজনীতি বরং এখন ডানেরও ডানে গিয়েছে। মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ‘ডান বা বামপন্থি নয় বিএনপি হচ্ছে পেছনপন্থি’। পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণা নিয়েই বিএনপি এখনো অগ্রসর হচ্ছে এবং সরকার পতনের খোয়াব দেখছে।

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
bibhu54@yahoo.com

বিভুরঞ্জন সরকার
বিএনপি নামের রাজনৈতিক দলটির নেতারা যখন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথা এক সুরে বলছেন, তখন পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একটি লেখা হাতে পেলাম। ‘ডানপন্থির বামে, বামপন্থির ডানে’ শিরোনামে খালেদা জিয়ার লেখাটি ২০০৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে। দিনটি ছিল বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

বহু বছর ধরে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও তিনি লেখালেখি করেন- এমন তথ্য কারো জানা ছিল না। ফলে পত্রিকায় ছাপা হওয়া তার প্রথম লেখাটি অনেকেরই মনোযোগ কেড়েছিল। বিবিসিখ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক আতাউস সামাদ দৈনিক সমকালে একটি কলাম লিখে খালেদা জিয়ার লেখালেখির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে লেখাটির বক্তব্য সম্পর্কে নিজের মতামতও দিয়েছিলেন। আতাউস সামাদও এখন আর বেঁচে নেই। আতাউস সামাদ লিখেছিলেন- ‘তিনি এমনিতেই বলেন কম আর লেখালেখি তো করেনই না, আমাদের দেশের বেশির ভাগ রাজনীতিবিদ বলেন বেশি বেশি আর লেখেন না একেবারেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সময় অনেক কথা বলতেন, বেশ লেখালেখিও করতেন। তার কয়েকটি বই আছে। তবে ইদানীং তিনিও সভা-সম্মেলনে যাচ্ছেন কম, তাই জাতীয় সংসদের অধিবেশন ছাড়া, যেখানে প্রতি সপ্তাহে একদিন নিজে সরাসরি সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দেন, আজকাল তার মুখের কথা শোনা যায় কম। তার লেখা ইদানীং চোখে পড়েনি। প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী নেতা বা নেত্রী মাঝেমধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পত্রপত্রিকায় লিখলে ভালো হয়।’

আরেকজন জনপ্রিয় কলাম লেখক, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন দৈনিক জনকণ্ঠে এক সংবাদভাষ্যে লিখেছিলেন- ‘আমি মনে করি রাজনৈতিক নেতাদের দু-এক পাতা লেখা উচিত। তারা খালি বক্তৃতা দিয়ে যান এবং পরে অনেক কিছু অস্বীকার করেন। লিখলে তার চিন্তাধারাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে জন্য একজন সিনিয়র লেখক হিসেবে বেগম জিয়ার সংবাদপত্রে লেখক হিসেবে আবির্ভাবকে আমি অভিনন্দন জানাই। অনেকে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বক্রোক্তি করেন। তার এই লেখা সেই বক্রোক্তি নস্যাৎ করে দেবে। কেননা সংহত ও সংযত ভাষায় তিনি তার চিন্তা প্রকাশ করেছেন এবং নামটিও সুন্দর- ডানপন্থির বামে, বামপন্থির ডানে। তার বক্তৃতা এতো সংহত-সুন্দর হলে তো কথাই ছিল না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পালাবদল ঘটত। আশা করি বেগম জিয়ার পথ অনুসরণ করে নেতানেত্রীরা তাদের ভাবনাচিন্তা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করবেন এবং হাতাহাতির রাজনীতির বদলে লেখালেখির রাজনীতির প্রবর্তন করবেন।’

বেগম জিয়ার এই লেখক হয়ে ওঠাকে অনেকেই স্বাগত জানিয়ে আশা করেছিলেন, তিনি লেখালেখি অব্যাহত রাখবেন এবং লেখক হিসেবে সত্যাশ্রয়ী হতে সচেষ্ট থাকবেন। মেঠো বক্তৃতা এবং লেখার বক্তব্য যদি একই রকম হয় তাহলে দলবাজদের খুশি করা গেলেও সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের প্রত্যাশা পূরণ করা যাবে না। এই বিবেচনায় বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম লেখাটি পাঠকদের খুব তৃপ্ত করতে পেরেছিল কি? রাজনীতি-বিশ্লেষকদের চোখে নতুন আলো ফেলতে পেরেছিল কি তার লেখার বক্তব্য?

খালেদা জিয়ার লেখাটির শুরু এভাবে- ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমান এসেছিলেন আকস্মিকভাবে। কিন্তু তার আগমন ছিল অবশ্যম্ভাবী। নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করতে সময়ের চাহিদা এবং দেশের দাবিতে তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন। কোনো চোরাগোপ্তা পথে নয়, রাতের অন্ধকারে ষড়যন্ত্র করে নয়, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর নতুন ভোরের আলোয় সর্বস্তরের লক্ষ কোটি মানুষ এবং দেশপ্রেমিক সৈনিকদের মুহুর্মুহু স্লোগান আর পুষ্পবর্ষণের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের অভিষেক হয়েছিল। দেশের নেতৃত্ব চলে এসেছিল তার হাতে।’

রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের অভিষেক সম্পর্কে খালেদা জিয়া যে সহজ-সরল নির্দোষ বর্ণনা দিয়েছন, প্রকৃত সত্য কি তাই? রাজনৈতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমান কি সত্যি আকস্মিকভাবে এসেছিলেন নাকি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তিনি তার আগমন অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিলেন? তার জীবনের কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে এটা প্রমাণ করতে কষ্ট হবে না যে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। এই উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়নের জন্য প্রকৃতপক্ষে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছেন, সহজ কথায় বললে উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য চোরাগোপ্তা এবং রাতের অন্ধকারে ষড়যন্ত্রের পথই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। এটা যারা অস্বীকার করে তারা ইতিহাসের সত্যকে হয় আড়াল করতে চায় অথবা স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করে। কিন্তু ইতিহাস তো আসলে কাউকেই মার্জনা করে না।

বেগম জিয়ার মতে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে জিয়া রাজনীতিতে এসেছিলেন। প্রশ্ন হলো, নেতৃত্বের এই শূন্যতা কীভাবে তৈরি হয়েছিল? বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে, জেলখানার মধ্যে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করে যারা দেশকে নেতৃত্বশূন্য করেছিল, তাদের সঙ্গে কি জিয়াউর রহমানের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না? জেনারেল কে এম সফিউল্লাহকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করায় জিয়াউর রহমান অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এই অসন্তোষ ও ক্ষোভ তিনি গোপন রাখতে পারেননি। অনেকেরই তা জানা। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যারা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন করার ষড়যন্ত্র করেছিল, তাদের সঙ্গে জিয়ার যে যোগাযোগ ছিল, তা মার্কিন গোপন দলিলপত্রের মাধ্যমে এখন প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আত্মস্বীকৃত খুনিরাও জিয়ার সম্পৃক্ততার কথা একাধিকার প্রকাশ্যে বলেছে। এই খুনিদের প্রতি যে জিয়ার বিশেষ দরদ বা অনুকম্পা ছিল সেটাও বোঝা গেছে তাদের বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দেয়া এবং হত্যার অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেয়ার ঘটনা থেকেই।

খালেদা জিয়া লিখেছেন- ‘শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাকশাল নামের একটি দল গঠন করে আর সব দল নিষিদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে দেশে এক দলের শাসন কায়েম করা হয়েছিল। গণতন্ত্র হরণ করা হয়েছিল। সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো খর্ব করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত করে তার হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল সর্বময় ক্ষমতা। ভোট ছাড়াই সরকারের মেয়াদ তিন বছরের জন্য বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম করা সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান আবির্ভূত হয়েছিলেন একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসন ব্যবস্থার জনক হিসেবে। এসব তৎপরতা ছিল আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিরোধী।’

সাধারণভাবে বেগম জিয়ার লেখার এই অংশের সঙ্গে অনেকেই হয়তো দ্বিমত প্রকাশ করবেন না। সত্যি যে, পঁচাত্তর সালে দেশের এক বিশেষ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করেছিলেন। বাকশাল ব্যবস্থাটা স্থায়ী নাকি অল্প সময়ের জন্য করা হয়েছিল, তিনি কোন বুঝ-বিবেচনা থেকে এটা করেছিলেন সে বিষয়ে তর্কে না গিয়েও বলা যায়, তার এই সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মেনে নেয়া যায় না। প্রশ্ন হলো, এ জন্য তাকে বর্বরভাবে হত্যা করা কি গণতন্ত্রসম্মত? এই নারকীয়তা কি সমর্থন করা যায়? বেগম জিয়া তার লেখায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নিন্দা-সমালোচনা করেননি। তিনি কি তাহলে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতা বদলকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলে মনে করেন? বঙ্গবন্ধুকে স্বৈরশাসন ব্যবস্থার জনক বলে চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করা থেকে বিরত না থাকলেও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করার ব্যাপারে তিনি ঠিকই বিরত থেকেছেন। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি পদে উন্নীত করে তার হাতে ‘সর্বময় ক্ষমতা’ তুলে দেয়া যদি নিন্দনীয় হয়ে থাকে তাহলে সামরিক শাসনের অধীনে জিয়াউর রহমান যে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তাতে কি তখন তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হননি? ভোট ছাড়াই সরকারের মেয়াদ তিন বছর বাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু যদি অন্যায় করে থাকেন তাহলে জেনারেল জিয়া কি করেছিলেন? তিনি কোন ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেছিলেন? একজন মিলিটারি ডিকটেটরকে ‘গণতন্ত্রী’ সাজিয়ে বেগম জিয়া সুখ অনুভব করতে পারেন, কিন্তু‘ ইতিহাস তাতে সায় দেবে কি?

খালেদা জিয়া লিখেছিলেন- ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব দিয়েছিল কিন্তু‘ পরে তারা যুগের চাহিদা মেটাতে পারেনি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পুরোভাগে আওয়ামী লীগ ছিল কিন্তু‘ পরে তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। সেই ব্যর্থতার পটভূমিতেই বিএনপির জন্ম, একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী রাজনীতি করার অঙ্গীকারে।’

বেগম জিয়া যেভাবে দুই লাইনের মধ্যে দেশের রাজনীতিতে অস্তিত্বহীন মুসলিম লীগ এবং প্রবল প্রতাপশালী দল আওয়ামী লীগকে এক কাতারে ফেলে এবং বাতিল করে দিয়ে বিএনপির জন্ম ঘোষণা করেছেন, বাস্তব ঘটনা অতটা সহজ-সরল হলে কি আর আজ বেগম জিয়াকে সংসদে মাত্র ত্রিশ-বত্রিশটি আসন নিয়ে বিরোধী দলের নেত্রী হয়ে দুঃখভারাক্রান্ত মনে দিনযাপন করতে হতো? কোথায় মুসলিম লীগ আর কোথায় আওয়ামী লীগ! বেগম জিয়ার আকর্ষণটা বোধ হয় মুসলিম লীগের দিকেই বেশি। মুসলিম লীগ আর আওয়ামী লীগের ব্যাপারে বেগম জিয়ার শব্দ ব্যবহারও লক্ষণীয়। মুসলিম লীগ যুগের চাহিদা মেটাতে পারেনি আর আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। রাজনীতি সম্পর্কে যাদের সামান্য জ্ঞানবুদ্ধি আছে তারা কি বেগম জিয়ার এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হতে পারবেন? সম্পূর্ণ ব্যর্থ একটি দল জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে কীভাবে ক্ষমতায় আসে? বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের চেয়ারপারসন হিসেবে বেগম জিয়া সংবাদপত্রে প্রথম একটি লেখা লিখলেন অথচ কীভাবে এই দলটির জন্ম হলো তা একটু বিস্তারিত উল্লেখ করলেন না কেন? বেগম জিয়া জানেন যে, বিএনপি নামক দলটি কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জন্ম লাভ করেনি। সেনা ছাউনিতে বসবাস করে, রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদ দখলে রেখে, সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে, সব সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে, নানা লোভ-প্রলোভন দেখিয়ে সুযোগসন্ধানীদের নিয়ে বিএনপির জন্ম দেয়া হয়েছিল সামরিক শাসকের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার অভিলাষে। বিএনপির জন্মকে যদি গৌরবের বলা হয় তাহলে একই প্রক্রিয়ায় এরশাদের জাতীয় পার্টির জন্ম দেয়াকে অগৌরবের বলা অনুচিত হবে।

খালেদা জিয়া তার লেখা শেষ করেছিলেন এইভাবে- ‘আমাদের ডানে যাদের অবস্থান তারা ডানপন্থি, আমাদের বামে যাদের অবস্থান তারা বামপন্থি। আমাদের অবস্থান ডানপন্থির বামে এবং বামপন্থির ডানে। আমাদের অবস্থান কেন্দ্রে এবং এ দেশের রাজনীতির কেন্দ্র আমরাই। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই এ দেশের মূল ধারা। বিএনপিই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।’

আতাউস সামাদ বেগম জিয়ার লেখার অনেক বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করলেও শেষ দুই লাইনে বেগম জিয়া যে দাবি করেছেন তার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। আতাউস সামাদ লিখেছেন, প্রথমত দাবিটি অবাস্তব। বাস্তবের সঙ্গে এর মিল নেই। দ্বিতীয়ত, আমরা যেহেতু বহু দলীয় ও বহুমতের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তাই আমরা দেশে একাধিক জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চাই, কোনো একটি মাত্র নয়। বস্তুত বেগম জিয়া যেভাবে লেখার উপসংহার টেনেছেন তা শব্দের চাতুর্য ছাড়া আর কিছু নয়। বিএনপি যদি সত্যি কেন্দ্রের অর্থাৎ মধ্যপন্থার দল হতো, তাহলে দ্বিধাহীন চিত্তে তার প্রশংসা করা যেত। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, জাতীয় স্বার্থের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বার্থের অনুকূল অর্থনৈতিক কর্মসূচিই মধ্যপন্থার রাজনীতির বড় বৈশিষ্ট্য- যা থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে বিএনপির রাজনীতি।

সে জন্য অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করেন, বিএনপির রাজনীতি বামের ডানে তাতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু ডানের বামে কোনোভাবেই নয়। ধর্মীয় ও উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মাখামাখি করে তাদের রাজনীতি বরং এখন ডানেরও ডানে গিয়েছে। মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ‘ডান বা বামপন্থি নয় বিএনপি হচ্ছে পেছনপন্থি’। পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণা নিয়েই বিএনপি এখনো অগ্রসর হচ্ছে এবং সরকার পতনের খোয়াব দেখছে।

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
bibhu54@yahoo.com