রাজিব শর্মা: ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী সূর্য সেনের সহকর্মী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। বিপ্লবীদের দলে নাম লেখানোর অল্প দিনের মধ্যেই বিনোদবিহারী চৌধুরী মাস্টারদা সূর্যসেনের প্রিয়ভাজন হয়েউঠেছিলেন। ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুন্ঠনে বিনোদবিহারী চৌধুরী তাই হতে পেরেছিলেন সূর্যসেনের অন্যতম তরুণ সহযোগী । বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী একটি ইতিহাস, একজন কিংবদন্তি, মহীরুহ। কালোত্তীর্ণ তার জীবন। ছোটখাটো মানুষটির দীর্ঘ সক্রিয় জীবনের মূলে তার ঋজু চরিত্র। স্পষ্টভাষী তিনি, নিজের অবস্থানে বরাবর অবিচল। বজ্র কঠিন চিত্তে লক্ষ্যে অটুট। বিনোদ বিহারী চৌধুরী নামটি কল্পনামাত্র একজন অপরাজেয় মানুষের চিত্রকলা ভেসে ওঠে আমাদের সামনে। স্বাধিকার ও মানবমুক্তির সংগ্রামের প্রতিটি পর্বে যিনি ছিলেন বরাভয়। শোষণমুক্ত সমাজের জন্য আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষা, স্বপ্ন ও আকাঙ্খা তাঁর হাত ধরেই যেন বাস্তবতার ভিত্তি পায়। নতুন করে আশাবাদী করে তোলে মানুষকে।

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই এপ্রিলে, মাষ্টার দা সূর্যসেন মোট ৬৫ জন যোদ্ধা নিয়ে প্রায় রাত দশটার দিকে আক্রমণ করে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে অবস্থিত অস্ত্রাগার দখল করেন। সূর্যসেন  বিপ্লবীদেরকে চারটি ‘অ্যাকশন গ্রুপে’ ভাগ করেছিলেন। প্রথম দলের দায়িত্বে ছিল ফৌজি অস্ত্রাগার আক্রমণ, দ্বিতীয় দলে ছিল পুলিশ অস্ত্রাগার দখল, তৃতীয় দলের ছিল টেলিগ্রাফ ভবন দখল, চতুর্থ দলের ছিল রেললাইন উৎপাটন। বিনোদবিহারী চৌধুরী ছিলেন পুলিশ অস্ত্রাগার দখল করার গ্রুপে। উল্লেখ্য এই আক্রমণে বিপ্লবীরা সামরিক পোশাকে সজ্জিত ছিলেন।  বিনোদবিহারী চৌধুরী’র দলের সদস্যরা শাবল চালিয়ে আলমারি ভেঙে অস্ত্র সংগ্রহ করেন এবং অবশিষ্ট অস্ত্র ধ্বংস করে দেন।

প্রাথমিকভাবে বিজয় লাভের পর, সূর্যসেন বিপ্লবীদের নিয়ে সুলুক পাহাড়ে আশ্রয় নেন। ১৯শে এপ্রিল সারাদিন এই পাহাড়ে কাটিয়ে পরে ফতেয়াবাদে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে  সূর্যসেন সবাইকে নিয়ে জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নেন। ২২শে এপ্রিল বিকালে ট্রেনযোগে আগত বৃটিশ বাহিনীর জালালাবাদ পাহাড়ে অভিযান শুরু করে। জালালাবাদ যুদ্ধে প্রথম শহীদ হন ১৪ বৎসর বয়সী হরিগোপাল বল (টেগরা)। এরপর আগে পরে একে একে বিপ্লবীরা যুদ্ধে প্রাণ হারাতে থাকেন। জালালাবাদের যুদ্ধে শহীদ হন মোট ১১জন বিপ্লবী। এঁরা হলেন।  টেগরা বল, নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেন, বিধু ভট্টাচার্য, মতি কানুনগো, প্রভাশ বল, শশাঙ্ক দত্ত, নির্মল লালা, জিতেন দাস, মধু দত্ত জো পুলিন ঘোষ। এই যুদ্ধে কণ্ঠে গুলিবিদ্ধ হন বিনোদবিহারী। এই দিনের যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী জালালাবাদ পাহাড় দখল করতে পারে নি। তবে অবশিষ্ট বিপ্লবীদের নিয়ে সূর্যসেন রাতের অন্ধকারে জালালাবাদ পাহাড় ত্যাগ করেন। এই সময় বিনোদবিহারী চৌধুরী ছাড়াও বিনোদ দত্ত নামক অপর একজন বিপ্লবী আহত হয়েছিলেন। চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে ঐতিহাসিক সম্মুখযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বিনোদ বিহারী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘হঠাৎ একটা গুলি আমার গলার বাঁ দিকে ঢুকে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। ঘণ্টা খানেক অচেতন ছিলাম। লোকনাথ দা, শান্তি নাগ, বনহরি দত্তের ডাকে সংবিৎ ফিরে পেলাম। চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম সৈন্যসামন্ত নেই। গলায় তখন অসহ্য যন্ত্রণা। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে। বিপ্লবীরা লেঙ্গুট ছিঁড়ে আমার গলায় ব্যান্ডেজ করে দিলেন। আমাদের এক ক্লাসফ্রেন্ড রজত সেন। সে বলল, ‘তোর কষ্ট হচ্ছে খুব, না? তোকে তাহলে গুলি করে মেরে দিই?’ তখন শুনছি রজতকে উদ্দেশ করে লোকদা (বিপ্লবী লোকনাথ বল) বলছেন- না, ও বাঁচবে। ওকে গুলি করতে হবে না। ওকে আমরা নিয়ে যাব’। এভাবে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে বহুবার প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস করা, অক্সিলারি ফোর্সের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র লুট করেছেন।

বেশ কিছুদিন গোপনে চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। আর তখন তাঁকে মৃত কিংবা জীবিত ধরিয়ে দিতে ব্রিটিশ সরকার ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারি সূর্যসেনকে চট্টগ্রাম কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী। এ সময় সূর্যসেনের ঘনিষ্ঠ সহচর বিনোদ বিহারী সূর্যসেনের মৃত্যুতে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন।

বিনোদ বিহারী চৌধূরী ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালি থানায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবাকামিনী কুমার চৌধুরী ছিলেন পেশায় উকিল এবং মা রামা চৌধুরী ছিলেন গৃহিনী। তাঁর স্ত্রীর নাম বিভা চৌধুরী। ছেলের নাম বিবেকান্দ্র চৌধুরী। চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার রাঙ্গামাটিয়া বোর্ড স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাশুরু হয়েছিল৷ সেখান থেকে তিনি ফটিকছড়ির প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ফটিকছড়ি করোনেশন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, বোয়ালখালির পি.সি. সেন সারোয়ারতলি উচ্চ বিদ্যালয়, চিটাগাং কলেজে পড়াশোনা করেন। স্কুলে পড়ার সময় ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে, বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের অনুপ্রেরণায় তিনি তৎকালীন বিপ্লবী দল ‘যুগান্তর’-এ যোগ দেন। ১৯২৯ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তাঁকে রায় বাহাদুর বৃত্তি প্রদান করা হয়৷ কলেজে পড়ার সময়, বিপ্লবী দলের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন। এই সময় তাঁর সাথে সূর্যসেনের যোগাযোগ ঘটে। এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান -‘আমি যখন বিপ্লবী দলে আসি তখন মাস্টারদা জেলে। ১৯২৪ সালে ‘রাউলাট এ্যাক্ট’ অনুযায়ী চট্টগ্রামসহ বাংলা এবং ভারতের অন্য প্রদেশ, বিশেষত পাঞ্জাব ও মুম্বাইয়ে অনেক লোক বিনা বিচারে আটক হয়। মাস্টারদা খবর পেয়ে আত্মগোপন করেন। আসাম, যুক্তপ্রদেশ প্রভৃতি জায়গায় গোপনে সফর করে তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালান। দুই বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯২৬ সালে ‘ভারত রক্ষা আইন’-এ তিনি কলকাতা থেকে গ্রেফতার হন।  ‘২৮ সালের শেষের দিকে তিনি জেল থেকে বের হন। চট্টগ্রাম ফিরে তিনি আবার সংগঠনকে গোছাতে থাকেন। রামকৃষ্ণ বিশ্বাস, তারকেশ্বর দস্তিদার এঁদের কাছে তিনি আমার কথা শোনেন। ১৯২৯ সালের জুলাইতে আমি যখন চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হই, তখন তিনি আমার কাছে খবর পাঠান আমি যেন চট্টগ্রাম কলেজেই পড়ি এবং তাঁর সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম ছেড়ে কোথাও না যাই। আমি চট্টগ্রাম কলেজের হোস্টেলে থাকতাম।’ ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের রাজপুতনা দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী অবস্থাতেই পরীক্ষা দিয়ে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বিভাগে পাশ করেন। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ওই ক্যাম্পে বন্দী থাকাকালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করেন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজিতে এমএ ও বিএল (আইনে স্নাতক) পাশ করেন ইংরেজ সরকার কতৃক গৃহবন্দী অবস্থায়। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে বিনোদ বিহারী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে বিনোদ বিহারী চট্টগ্রাম কোর্টের আইন ব্যবসা শুরু করেন। এই সময় আইনজীবী কিরন দাশের মেয়ে বিভা দাশকে বিয়ে করেন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। কারাগারে থাকা অবস্থায় বিনোদবিহারী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান আইন পরিষদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কংগ্রেস নেতা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নেতৃত্বে ধর্মভিত্তিক পৃথক নির্বাচনের বদলে যুক্ত নির্বাচনের আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান দেশের সব রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণা করলে সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিনোদবিহারী অবসরে যান। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে ভারতের চর হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছিল। যুদ্ধের শেষে তিনি মুক্তিলাভ করেন। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর দুই ছেলে সুবীর চৌধুরী, বিবেকানন্দ চৌধুরীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা কলকাতায় স্থায়ী হন। কিন্তু সস্ত্রীক বাংলাদেশে থেকে যান। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বৈরশাসনবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে তিনি অংশ নেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন এবং  কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। এই সময় থেকে তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন শিক্ষকতাকে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে ২৯ ডিসেম্বর তাঁর সহধর্মিণী বিভা দাশ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে মোমিন সড়কের বাসাতেই। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল মৃত্যবরণ করেন।

কর্মজীবনে বিনোদ বিহারী চৌধূরী ১৯৩০ সালে কংগ্রেস চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৩৯ সালে দৈনিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৪০ সালে চট্টগ্রাম কোর্টের একজন আইনজীবি হিসাবে অনুশীলন শুরুকরেন। কিন্ত অবশেষে তিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন। এছাড়া ১৯৪০–১৯৪৬সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস নির্বাহী কমিটির সদস্য থাকার পাশাপাশি ১৯৪৬ সালে কংগ্রেস চট্টগ্রাম জেলাকমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ৩৭ বছর বয়সে পশ্চিম পাকিস্তান কংগ্রেসের সদস্য হন তিনি ৷১৯৫৮ সালে আউয়ূব খান সামরিক আইন জারী করে রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করলে বিনোদ বিহারী চৌধুরী রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬৯ সালে আউয়ূব বিরোধী গণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে ভারতের মিজোরাম দিয়ে কলকাতায় উপস্থিত হন এবং শরনার্থী কল্যাণ সমিতি গঠন করে সভাপতি হিসেবে তরুণ-যুবকদের সংগঠিত করতে থাকেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনা করেন এবং শরনার্থী শিবিরগুলোতে বহু প্রাইমারী স্কুল গড়ে তোলেন। জীবন সায়াহ্নে উপনিত হয়েও প্রচলিত রাজনীতির ধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে জনকল্যাণমূক সেবাধর্মী রাজনীতির ধারা প্রতিষ্ঠায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্যে শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত-অবহেলিত, অপমানিত জনগনের আকুল আর্তি সরকার ও সকল রাজনৈতিক দলের কাছে পৌঁছে দেবার লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারীর নির্বাচনে (অনুষ্ঠিত হয়নি) চট্টগ্রাম-৯ নির্বাচনী আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তার সুযোগ্য জীবনসঙ্গী- সকল মুক্তি সংগ্রামের প্রেরণাদানকারী চট্টগ্রামের অন্যতম সেরা বিদ্যালয় অর্পণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষিকা মহীয়সী নারীর প্রতিকৃতি বিভা চৌধুরী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর শততম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে তাঁকে ছেড়ে অনন্তের পানে যাত্রা করেছেন যা তার জীবনের অন্যতম বড় অপূর্ণতা। এইদেশ প্রেমিক সদানিবেদিতপ্রাণ দম্পতির দুই সন্তান- অকাল প্রয়াত স্বর্গীয় সুবীর চৌধুরী এবং স্বর্গীয় বিবেকানন্দ চৌধুরী ভারতপ্রবাসী ছিলেন। খেয়লী বিধাতার ইশারায় বিপ্লবী এই যোদ্ধা তাঁর মৃত্যুর পূর্বেই হারিয়ে ফেলেছিলেন ২ পুত্রকেই। ১০০ বছরের পথপরিক্রমা অতিক্রম করে ১০১ ও ১০২ পেরিয়ে ১০৩তম জন্মমাধদিন পালনের পর থেমে গেছে তাঁর জীবন। বয়স তাঁকে ভারাক্রান্ত করতে না পারলেও প্রকৃতির চিরায়ত সত্য তাঁকে থামতে বাধ্য করেছে। ১০ এপ্রিল ২০১৩ ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বার্ধক্য জনিত জটিলতায় তিনি এই নশ্বর দেহ ত্যাগ করেন। সুদীর্ঘ জীবনে সমাজ ও রাষ্ট্রের যেকোনো দুর্দিনে তিনি ছিলেন সোচ্চার। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংগ্রাম, মানবমুক্তির তিনি ছিলেন এক অনমনীয় অপ্রতিরোধ্য পতাকা। শতবর্ষাধিক বয়সের একটি বটবৃক্ষ ডালপালা পত্র ও পল্লবে আজ দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার ছায়ার বিস্তার- যার ছায়াতলে আমরা নিশ্চিন্তে- নিরাপদে আজও জীবন যাপন করছি অবিরাম। তাঁর একটি বাক্য আমাদের কানে প্রতিফলিত হয় বার বার, “সত্য বড় কঠিন, সেই কঠিনেরে ভালবাসিও”। সত্য ও সুন্দরের এই অভিযাত্রীকে আজ ১০৪ তম জন্ম জয়ন্তীতে সবার অন্তরের উষ্ণ অভিনন্দন, সবার হৃদয়-নিংড়ানো বিনম্র অভিবাদন। মৃত্যুঞ্জয়ী এই বিপ্লবীর আদর্শ প্রতিফলিত হোক আমাদের সকলের মাঝে। ত্রিকালদর্শী এই চিরবিপ্লবী মানুষটির আজ ৭ম তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল তিনি বার্ধক্য জনিত জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভারতে মৃত্যুবরণ করেন।

অগ্নিযুগের বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখকঃ সংবাদকর্মী ও অনলাইন এ্যাক্টিভিটিস্ট, বাংলাদেশ।

রাজিব শর্মা: ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী সূর্য সেনের সহকর্মী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। বিপ্লবীদের দলে নাম লেখানোর অল্প দিনের মধ্যেই বিনোদবিহারী চৌধুরী মাস্টারদা সূর্যসেনের প্রিয়ভাজন হয়েউঠেছিলেন। ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুন্ঠনে বিনোদবিহারী চৌধুরী তাই হতে পেরেছিলেন সূর্যসেনের অন্যতম তরুণ সহযোগী । বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী একটি ইতিহাস, একজন কিংবদন্তি, মহীরুহ। কালোত্তীর্ণ তার জীবন। ছোটখাটো মানুষটির দীর্ঘ সক্রিয় জীবনের মূলে তার ঋজু চরিত্র। স্পষ্টভাষী তিনি, নিজের অবস্থানে বরাবর অবিচল। বজ্র কঠিন চিত্তে লক্ষ্যে অটুট। বিনোদ বিহারী চৌধুরী নামটি কল্পনামাত্র একজন অপরাজেয় মানুষের চিত্রকলা ভেসে ওঠে আমাদের সামনে। স্বাধিকার ও মানবমুক্তির সংগ্রামের প্রতিটি পর্বে যিনি ছিলেন বরাভয়। শোষণমুক্ত সমাজের জন্য আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষা, স্বপ্ন ও আকাঙ্খা তাঁর হাত ধরেই যেন বাস্তবতার ভিত্তি পায়। নতুন করে আশাবাদী করে তোলে মানুষকে।

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই এপ্রিলে, মাষ্টার দা সূর্যসেন মোট ৬৫ জন যোদ্ধা নিয়ে প্রায় রাত দশটার দিকে আক্রমণ করে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে অবস্থিত অস্ত্রাগার দখল করেন। সূর্যসেন  বিপ্লবীদেরকে চারটি ‘অ্যাকশন গ্রুপে’ ভাগ করেছিলেন। প্রথম দলের দায়িত্বে ছিল ফৌজি অস্ত্রাগার আক্রমণ, দ্বিতীয় দলে ছিল পুলিশ অস্ত্রাগার দখল, তৃতীয় দলের ছিল টেলিগ্রাফ ভবন দখল, চতুর্থ দলের ছিল রেললাইন উৎপাটন। বিনোদবিহারী চৌধুরী ছিলেন পুলিশ অস্ত্রাগার দখল করার গ্রুপে। উল্লেখ্য এই আক্রমণে বিপ্লবীরা সামরিক পোশাকে সজ্জিত ছিলেন।  বিনোদবিহারী চৌধুরী’র দলের সদস্যরা শাবল চালিয়ে আলমারি ভেঙে অস্ত্র সংগ্রহ করেন এবং অবশিষ্ট অস্ত্র ধ্বংস করে দেন।

প্রাথমিকভাবে বিজয় লাভের পর, সূর্যসেন বিপ্লবীদের নিয়ে সুলুক পাহাড়ে আশ্রয় নেন। ১৯শে এপ্রিল সারাদিন এই পাহাড়ে কাটিয়ে পরে ফতেয়াবাদে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে  সূর্যসেন সবাইকে নিয়ে জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নেন। ২২শে এপ্রিল বিকালে ট্রেনযোগে আগত বৃটিশ বাহিনীর জালালাবাদ পাহাড়ে অভিযান শুরু করে। জালালাবাদ যুদ্ধে প্রথম শহীদ হন ১৪ বৎসর বয়সী হরিগোপাল বল (টেগরা)। এরপর আগে পরে একে একে বিপ্লবীরা যুদ্ধে প্রাণ হারাতে থাকেন। জালালাবাদের যুদ্ধে শহীদ হন মোট ১১জন বিপ্লবী। এঁরা হলেন।  টেগরা বল, নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেন, বিধু ভট্টাচার্য, মতি কানুনগো, প্রভাশ বল, শশাঙ্ক দত্ত, নির্মল লালা, জিতেন দাস, মধু দত্ত জো পুলিন ঘোষ। এই যুদ্ধে কণ্ঠে গুলিবিদ্ধ হন বিনোদবিহারী। এই দিনের যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী জালালাবাদ পাহাড় দখল করতে পারে নি। তবে অবশিষ্ট বিপ্লবীদের নিয়ে সূর্যসেন রাতের অন্ধকারে জালালাবাদ পাহাড় ত্যাগ করেন। এই সময় বিনোদবিহারী চৌধুরী ছাড়াও বিনোদ দত্ত নামক অপর একজন বিপ্লবী আহত হয়েছিলেন। চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে ঐতিহাসিক সম্মুখযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বিনোদ বিহারী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘হঠাৎ একটা গুলি আমার গলার বাঁ দিকে ঢুকে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। ঘণ্টা খানেক অচেতন ছিলাম। লোকনাথ দা, শান্তি নাগ, বনহরি দত্তের ডাকে সংবিৎ ফিরে পেলাম। চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম সৈন্যসামন্ত নেই। গলায় তখন অসহ্য যন্ত্রণা। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে। বিপ্লবীরা লেঙ্গুট ছিঁড়ে আমার গলায় ব্যান্ডেজ করে দিলেন। আমাদের এক ক্লাসফ্রেন্ড রজত সেন। সে বলল, ‘তোর কষ্ট হচ্ছে খুব, না? তোকে তাহলে গুলি করে মেরে দিই?’ তখন শুনছি রজতকে উদ্দেশ করে লোকদা (বিপ্লবী লোকনাথ বল) বলছেন- না, ও বাঁচবে। ওকে গুলি করতে হবে না। ওকে আমরা নিয়ে যাব’। এভাবে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে বহুবার প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস করা, অক্সিলারি ফোর্সের সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র লুট করেছেন।

বেশ কিছুদিন গোপনে চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। আর তখন তাঁকে মৃত কিংবা জীবিত ধরিয়ে দিতে ব্রিটিশ সরকার ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারি সূর্যসেনকে চট্টগ্রাম কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী। এ সময় সূর্যসেনের ঘনিষ্ঠ সহচর বিনোদ বিহারী সূর্যসেনের মৃত্যুতে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন।

বিনোদ বিহারী চৌধূরী ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালি থানায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবাকামিনী কুমার চৌধুরী ছিলেন পেশায় উকিল এবং মা রামা চৌধুরী ছিলেন গৃহিনী। তাঁর স্ত্রীর নাম বিভা চৌধুরী। ছেলের নাম বিবেকান্দ্র চৌধুরী। চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার রাঙ্গামাটিয়া বোর্ড স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাশুরু হয়েছিল৷ সেখান থেকে তিনি ফটিকছড়ির প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ফটিকছড়ি করোনেশন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, বোয়ালখালির পি.সি. সেন সারোয়ারতলি উচ্চ বিদ্যালয়, চিটাগাং কলেজে পড়াশোনা করেন। স্কুলে পড়ার সময় ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে, বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের অনুপ্রেরণায় তিনি তৎকালীন বিপ্লবী দল ‘যুগান্তর’-এ যোগ দেন। ১৯২৯ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তাঁকে রায় বাহাদুর বৃত্তি প্রদান করা হয়৷ কলেজে পড়ার সময়, বিপ্লবী দলের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন। এই সময় তাঁর সাথে সূর্যসেনের যোগাযোগ ঘটে। এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান -‘আমি যখন বিপ্লবী দলে আসি তখন মাস্টারদা জেলে। ১৯২৪ সালে ‘রাউলাট এ্যাক্ট’ অনুযায়ী চট্টগ্রামসহ বাংলা এবং ভারতের অন্য প্রদেশ, বিশেষত পাঞ্জাব ও মুম্বাইয়ে অনেক লোক বিনা বিচারে আটক হয়। মাস্টারদা খবর পেয়ে আত্মগোপন করেন। আসাম, যুক্তপ্রদেশ প্রভৃতি জায়গায় গোপনে সফর করে তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালান। দুই বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯২৬ সালে ‘ভারত রক্ষা আইন’-এ তিনি কলকাতা থেকে গ্রেফতার হন।  ‘২৮ সালের শেষের দিকে তিনি জেল থেকে বের হন। চট্টগ্রাম ফিরে তিনি আবার সংগঠনকে গোছাতে থাকেন। রামকৃষ্ণ বিশ্বাস, তারকেশ্বর দস্তিদার এঁদের কাছে তিনি আমার কথা শোনেন। ১৯২৯ সালের জুলাইতে আমি যখন চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হই, তখন তিনি আমার কাছে খবর পাঠান আমি যেন চট্টগ্রাম কলেজেই পড়ি এবং তাঁর সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম ছেড়ে কোথাও না যাই। আমি চট্টগ্রাম কলেজের হোস্টেলে থাকতাম।’ ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের রাজপুতনা দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী অবস্থাতেই পরীক্ষা দিয়ে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বিভাগে পাশ করেন। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ওই ক্যাম্পে বন্দী থাকাকালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করেন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজিতে এমএ ও বিএল (আইনে স্নাতক) পাশ করেন ইংরেজ সরকার কতৃক গৃহবন্দী অবস্থায়। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে বিনোদ বিহারী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে বিনোদ বিহারী চট্টগ্রাম কোর্টের আইন ব্যবসা শুরু করেন। এই সময় আইনজীবী কিরন দাশের মেয়ে বিভা দাশকে বিয়ে করেন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। কারাগারে থাকা অবস্থায় বিনোদবিহারী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান আইন পরিষদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কংগ্রেস নেতা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নেতৃত্বে ধর্মভিত্তিক পৃথক নির্বাচনের বদলে যুক্ত নির্বাচনের আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান দেশের সব রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণা করলে সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিনোদবিহারী অবসরে যান। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে ভারতের চর হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছিল। যুদ্ধের শেষে তিনি মুক্তিলাভ করেন। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর দুই ছেলে সুবীর চৌধুরী, বিবেকানন্দ চৌধুরীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা কলকাতায় স্থায়ী হন। কিন্তু সস্ত্রীক বাংলাদেশে থেকে যান। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বৈরশাসনবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে তিনি অংশ নেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন এবং  কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। এই সময় থেকে তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন শিক্ষকতাকে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে ২৯ ডিসেম্বর তাঁর সহধর্মিণী বিভা দাশ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে মোমিন সড়কের বাসাতেই। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল মৃত্যবরণ করেন।

কর্মজীবনে বিনোদ বিহারী চৌধূরী ১৯৩০ সালে কংগ্রেস চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৩৯ সালে দৈনিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৪০ সালে চট্টগ্রাম কোর্টের একজন আইনজীবি হিসাবে অনুশীলন শুরুকরেন। কিন্ত অবশেষে তিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন। এছাড়া ১৯৪০–১৯৪৬সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস নির্বাহী কমিটির সদস্য থাকার পাশাপাশি ১৯৪৬ সালে কংগ্রেস চট্টগ্রাম জেলাকমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ৩৭ বছর বয়সে পশ্চিম পাকিস্তান কংগ্রেসের সদস্য হন তিনি ৷১৯৫৮ সালে আউয়ূব খান সামরিক আইন জারী করে রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করলে বিনোদ বিহারী চৌধুরী রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬৯ সালে আউয়ূব বিরোধী গণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে ভারতের মিজোরাম দিয়ে কলকাতায় উপস্থিত হন এবং শরনার্থী কল্যাণ সমিতি গঠন করে সভাপতি হিসেবে তরুণ-যুবকদের সংগঠিত করতে থাকেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনা করেন এবং শরনার্থী শিবিরগুলোতে বহু প্রাইমারী স্কুল গড়ে তোলেন। জীবন সায়াহ্নে উপনিত হয়েও প্রচলিত রাজনীতির ধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে জনকল্যাণমূক সেবাধর্মী রাজনীতির ধারা প্রতিষ্ঠায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্যে শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত-অবহেলিত, অপমানিত জনগনের আকুল আর্তি সরকার ও সকল রাজনৈতিক দলের কাছে পৌঁছে দেবার লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারীর নির্বাচনে (অনুষ্ঠিত হয়নি) চট্টগ্রাম-৯ নির্বাচনী আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তার সুযোগ্য জীবনসঙ্গী- সকল মুক্তি সংগ্রামের প্রেরণাদানকারী চট্টগ্রামের অন্যতম সেরা বিদ্যালয় অর্পণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষিকা মহীয়সী নারীর প্রতিকৃতি বিভা চৌধুরী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর শততম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে তাঁকে ছেড়ে অনন্তের পানে যাত্রা করেছেন যা তার জীবনের অন্যতম বড় অপূর্ণতা। এইদেশ প্রেমিক সদানিবেদিতপ্রাণ দম্পতির দুই সন্তান- অকাল প্রয়াত স্বর্গীয় সুবীর চৌধুরী এবং স্বর্গীয় বিবেকানন্দ চৌধুরী ভারতপ্রবাসী ছিলেন। খেয়লী বিধাতার ইশারায় বিপ্লবী এই যোদ্ধা তাঁর মৃত্যুর পূর্বেই হারিয়ে ফেলেছিলেন ২ পুত্রকেই। ১০০ বছরের পথপরিক্রমা অতিক্রম করে ১০১ ও ১০২ পেরিয়ে ১০৩তম জন্মমাধদিন পালনের পর থেমে গেছে তাঁর জীবন। বয়স তাঁকে ভারাক্রান্ত করতে না পারলেও প্রকৃতির চিরায়ত সত্য তাঁকে থামতে বাধ্য করেছে। ১০ এপ্রিল ২০১৩ ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বার্ধক্য জনিত জটিলতায় তিনি এই নশ্বর দেহ ত্যাগ করেন। সুদীর্ঘ জীবনে সমাজ ও রাষ্ট্রের যেকোনো দুর্দিনে তিনি ছিলেন সোচ্চার। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংগ্রাম, মানবমুক্তির তিনি ছিলেন এক অনমনীয় অপ্রতিরোধ্য পতাকা। শতবর্ষাধিক বয়সের একটি বটবৃক্ষ ডালপালা পত্র ও পল্লবে আজ দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার ছায়ার বিস্তার- যার ছায়াতলে আমরা নিশ্চিন্তে- নিরাপদে আজও জীবন যাপন করছি অবিরাম। তাঁর একটি বাক্য আমাদের কানে প্রতিফলিত হয় বার বার, “সত্য বড় কঠিন, সেই কঠিনেরে ভালবাসিও”। সত্য ও সুন্দরের এই অভিযাত্রীকে আজ ১০৪ তম জন্ম জয়ন্তীতে সবার অন্তরের উষ্ণ অভিনন্দন, সবার হৃদয়-নিংড়ানো বিনম্র অভিবাদন। মৃত্যুঞ্জয়ী এই বিপ্লবীর আদর্শ প্রতিফলিত হোক আমাদের সকলের মাঝে। ত্রিকালদর্শী এই চিরবিপ্লবী মানুষটির আজ ৭ম তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল তিনি বার্ধক্য জনিত জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভারতে মৃত্যুবরণ করেন।

অগ্নিযুগের বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখকঃ সংবাদকর্মী ও অনলাইন এ্যাক্টিভিটিস্ট, বাংলাদেশ।