অধ্যাপক ড.মুনতাসীর মামুন : গণতান্ত্রিক দেশ বটে কিন্তু কোনো বিষয়ে সমালোচনা করলে নীতি নির্ধারক বা মন্ত্রীরা ব্যক্তিগতভাবে নেন। তাদের আত্মশ্লাঘা এতই স্ফিত হয়েছে যে, মনে হয় যাবতীয় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আধার তারা। অথচ বিদ্যা বুদ্ধি অভিজ্ঞতায় আমরা তাদের চেয়ে খাটো এ কথা পাগলও বলবে না। এ নিবন্ধকে তারা তাদের সমালোচনা মনে করে ক্ষুব্ধ হতে পারেন। নাগরিকরা এখন বাংলাদেশ হতে চাচ্ছে আর বাংলাদেশ পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে তাহলে মনে হবে প্রলাপ বকছি। পাকিস্তানের ইমরান খানও এখন বাংলাদেশের কথা বলছেন যিনি চরম বাংলাদেশবিদ্বেষী। বলতে পারেন, ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে।’
পাকিস্তান একটি দেশ নয়, প্রত্যয় যার অন্তর্গত ধর্ম, জঙ্গিবাদ, সামরিক একনায়কতন্ত্র, আমলায়ন, মুষ্টিমেয় জমিদার জোতদার ও শিল্পপতিদের শোষণ নিপীড়ন। তাদের নীতি উপরে আল্লা নিচে মিলিটারি। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা সেখানে ব্লাসফেমি। এই শাসকের অন্যতম সহযোগী অর্ধশিক্ষিত মাদরাসার শিক্ষকরা। ধর্ম সেখানে সব নিয়ন্ত্রণ করে শুধু উল্লিখিত তারা এর বাইরে।
১৯৪৭ থেকে সাত বছরের মাথায় যারা পাকিস্তান এনেছিল তাদের পতন ঘটেছিল তরুণ, মধ্যবিত্ত ও আওয়ামী লীগের উত্থানের কারণে। কিন্তু মুসলিম লীগাররা একটি কাজে সাফল্য অর্জন করেছিল তা হলো পাকিস্তান প্রত্যয় বা পাকিস্তানি মন বা মানসজগৎ সৃষ্টিতে যেটিকে বলা যেতে পারে পাকিস্তানি ছিটমহল। ১৯৭১ সালে আমরা ভেবেছিলাম পাকিস্তানি ছিটমহল অপসারিত হয়েছে কিন্তু তা ভুল। ১৯৭৫ সালে আবার জেনারেল ও জেনারেল পত্নীরাও তাদের সহচর ১৯৭১-এর ঘাতকরা পাকিস্তান আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন।
শেখ হাসিনা এই পাকিস্তায়ন ভাঙার চেষ্টা করেছেন কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নয়। বিশেষ করে হিজাবিদের সঙ্গে আপস তার অনেক অর্জন বিনষ্ট করেছে। নীতিনির্ধারক বা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ধারণা তারা আমলাতন্ত্র ও হিজাবিদের নানা সুযোগ সুবিধা ও প্রশ্রয় দিয়ে নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। আসলে, তারাই এখন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা অর্থনীতিতে আগ্রহী নয়। তারা ঠিকই বুঝেছেন সংস্কৃতিকে হিজাবায়ন বা হিজাব পরাতে পারলে জয় অনিবার্য। বাংলাদেশ লড়াই যে মূলত সাংস্কৃতিক লড়াই এটা আমরা অনেকে ভুলে যাই।
কয়েকদিন আগে কপালে টিপ পরা নিয়ে তুমুল হইচই হলো। পাকিস্তান ঔপনিবেশিক আমলে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করা হলো, টিপ পরা নিয়েও ছিল অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। বলা হতো এটি পাকিস্তানি সংস্কৃতি নয়। তখন অনেক তরুণী টিপ পরা শুরু করলেন প্রতিবাদ হিসেবে। আসলে টিপ পরা হিন্দু সংস্কৃতি নয় (টিপ নিয়ে বিড়ম্বিত লতা সমাদ্দার বলেছেন, হিন্দু নারী হিসেবে স্বাভাবিকভাবে তিনি টিপ পরেন) এটি অনার্য সংস্কৃতি। এবং আমরা অধিকাংশই অনার্য বংশধর।
এ ঘটনার রেশ ফুরাতে না ফুরাতে সিলেটের এক কোর্ট ইন্সপেক্টর ফেসবুকে লিখলেন, মেয়েরা যে বক্ষবন্ধনী পরে তাতে স্তনের উপরাংশ খোলা থাকে। এটি উচিত নয়। তার কিছুদিন আগে খুব সম্ভব মুন্সিগঞ্জের এক বিজ্ঞান শিক্ষক ক্লাসে বিজ্ঞান পড়াতে গিয়ে ধর্মের ব্যাখ্যা দেন। রেকর্ড করা সেই শিক্ষক ও ছাত্রদের কথোপকথন শুনেছি একজনের ফেসবুকে। তিনি এমন কিছু বলেননি যার জন্য ছাত্রদের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা যায় এবং জামিন অস্বীকার করা হয়।
সেই ছাত্র বলেছে তার জ্ঞানের উৎস ওয়াজ। মুজিব শতবর্ষে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা সমর্থন করে এবং ভাস্কর্য ইসলামবিরোধী বলে ‘পুলিশ সদস্যদের ফেসবুক ও সরাসরি মাইকে ঘৃণ্য বক্তব্য’ দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন আগে দেখা গেলো পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে। বছর দুয়েক আগে এক আমলা অফিস আদেশ জারি করেছিলেন কীভাবে পাজামা পরতে হবে তার নির্দেশ দিয়ে। রমনা বটমূলের বর্ষবরণও বেদাত ঘোষিত হয়েছিল।
এক ছাত্র জানালেন, গিটার হাতে এক তরুণ লেকে ঢুকছিল। এক আনসার বা পুলিশ সদস্য তাকে বাধা দেয় এই বলে যে, লেকে গান করা যাবে না। একান্তে তরুণ তরুণী আলাপ করলেও বাধা দেয় নিরাপত্তা রক্ষীরা। এরকম ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে, কটিই বা সংবাদপত্রে আসে। আরও আছে, ফেসবুক ও ইউটিউবে প্রতিদিন ওয়াজিদের ওয়াজ নসিহতে যাদের মূল টার্গেট নারী ও প্রগতিশীলরা। সেল ফোনে কিছু ‘টিভির’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে যে সব অশোভন ও মিথ্যা কথা বলা হয় তা দেখলে বা শুনলে বিস্মিত হতে হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে অর্জন করেছেন, দেশের যে ইমেজ তৈরি করেছেন তার সঙ্গে এগুলো যায় না। মনে হবে আমরা এখনও ‘মধ্যযুগে’ বসবাস করছি। এসব ঘটনায় জড়িত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ, আনসার, আমলা, এমনকি শিক্ষকও। গত কয়েক বছর কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করার আমার সুযোগ হয়েছে। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, যুগ্মসচিব পর্যায় পর্যন্ত অধিকাংশ, মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত কোনো কাজ হলে তাতে যত রকম বাধা সৃষ্টি করা যায় করেন। শুনেছি, সত্য নাও হতে পারে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে ইনকিলাবের ঢাবির এক সময়ের রিপোর্টার ও শিবিরকর্মী একজন কর্মকর্তা। প্রশাসনের একটি বড় অংশে এরা এখন নিশ্চুপ সংখ্যাগরিষ্ঠ। ঠিক সময়ে যারা উঠে দাঁড়াবে।
এসব যে হচ্ছে এগুলো কী বিএনপি বা বিএনপি-জামায়াত আমলে হয়েছে? না, শেখ হাসিনার আমলেও হয়েছে। এসব পদায়নের সঙ্গে তো জড়িত সরকার সমর্থকরা। আসলেই কি তারা আওয়ামী লীগ সমর্থক? আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা যে এখন করুণ তা বলাই বাহুল্য। ওবায়দুল কাদের প্রতিদিন যেই ভাষণই দেন না কেন। সবকিছুর জন্য বিএনপি দায়ী একথা বারবার বললেই সত্য হবে না।
এবার আসি দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে যে ধারণার সৃষ্টি করা হয়েছে তা নিয়ে। গত সপ্তাহে এক সেমিনারে শিক্ষার্থী ও মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত একটি জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। টঙ্গীর সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ১০৫ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি জরিপে। তাদের কুড়িটি প্রশ্ন করা হয়। এর মধ্যে ১৫টির উত্তর তারা দিতে পারেননি।
দৈনিক কালের কণ্ঠের সংবাদ অনুসারে ‘শিক্ষার্থীরা শহীদ বলতে শুধু সালাম, রফিক, জব্বার ও বরকতকেই বোঝে। প্রথম সরকার সম্পর্কে কিছুই বলতে পারে না।’ জাতীয় চার নেতা হিসেবে তারা যাদের কথা বলেছে তারা হলেন- বঙ্গবন্ধু, জিয়াউর রহমান, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া এবং এইচ এম এরশাদ। অর্থাৎ জাতীয় চার নেতার মধ্যে (পাঁচ নেতা) তিনজনই পাকিস্তানি বাংলাদেশি। ৩ নভেম্বর সম্পর্কে তারা জানে না। মুক্তিবাহিনী, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধের পার্থক্য একজনও ধরতে পারেননি। ৯১ ভাগ উত্তর দিয়েছেন খন্দকার মোশতাক ছিলেন প্রথম শহীদ, সেক্টর কমান্ডার, কবি ও ভাষণসৈনিক। [কালের কণ্ঠ ৩.৪.২০২২]
এ ধরনের উত্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থক থেকে শিক্ষক অনেকে অবাক হতে পারেন। কিন্তু, অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। আজ থেকে প্রায় ২৫-৩০ বছর আগে বিএম কলেজে গিয়েছিলাম অনার্স কী বিএ পরীক্ষার ভাইভা নিতে। অধিকাংশই বলতে পারেনি বিজয় দিবস কবে, স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছিল কবে। এর আগেও এক জরিপ করেছিলাম স্কুলের শিক্ষার্থীদের ওপর। ফলাফল একই। সে থেকে আর কোনো ভাইভা নিতে যাইনি।
শেখ হাসিনার আগের আমলগুলোতে এরকম হওয়ার একটা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু শেখ হাসিনার আমলে? তার শাসনের একযুগ হয়ে গেলো। তার আমলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মেগা উন্নতি হলো, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মেগাপতন হলো কেন? বাংলাদেশে থেকেও কেন এতো মানুষ মানসিকভাবে উদ্বাস্তু। বিদেশে যারা উদ্বাস্তু হয়ে যান সেখানে নাগরিকত্ব নিতে হলে ওই দেশের ভাষা ও ইতিহাসের পরীক্ষা দিতে হয়। এখানে সব আমলে ইতিহাসকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে। আওয়ামী লীগের আমলে এটি শোনা কি মর্মান্তিক নয় খন্দকার মোশতাক হলেন কবি, সেক্টর কমান্ডার ও প্রথম শহীদ।
এসব ঘটনা পাকিস্তান আমলে হতো। এখনও পাকিস্তানে হয়। বাংলাদেশে কেন এসব হবে? মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার ইতিহাসে যারা ভুল তথ্য দিচ্ছে তারা বর্তমান প্রজন্ম। পাকিস্তান আমলে, বিএনপি আমলে ইতিহাস বদলে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাস ছিল ইসলাম বিষয়ক বিবরণ। এখন ভুল ইতিহাস বলছে। পাঠ্যবইয়ে এসব সাধারণ বিষয় পড়ানো হয় শুরু থেকে। ওইভাবে ইতিহাস পড়ানো হয় না বটে, কিন্তু স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বঙ্গবন্ধু এসব নিয়ে পড়ানো হয়। তাহলে গলদটা কোথায়? শিক্ষক ঠিক মতো পড়াচ্ছেন না? পরিবার থেকে নজর দেওয়া হচ্ছে না?
এসব কিছু একটি সূত্রে গাঁথা মানসিকতা বা মানসিক জগৎ। পাকিস্তানিদের এবং বিএনপি-জামায়াতের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তারা আমাদের মানসজগতে পাকিস্তানি ছিটমহল সৃষ্টি করতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ ও বামপন্থিদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এই ছিটমহল তারা সরাতে পারেননি। চেষ্টাও করেননি। এবং এর ফলাফল হচ্ছে এসব।
পুলিশের এ ধরনের আচরণ নতুন নয়। বলা হয়েছে একজনকে সাময়িক বরখাস্ত, আরেকজনকে রংপুরে বদলি করা হয়েছে। বদলি করা যেন বিরাট শাস্তি। সরকারের আমলানির্ভরতার একটি ক্ষেত্র পুলিশও। সে জন্য তাদের শাস্তি কদাচিত হয়। এখনও হবে না। ফলে, এটি কমবেও না। পুলিশের প্রশিক্ষণেও গলদ আছে কি না সেটাও ভেবে দেখতে হবে। পাকিস্তান আমলে ম্যানুয়েল কতোটা বাদ দেয়া হয়েছে? বিদেশে নিরাপত্তা বাহিনীকে সংবিধানও জানতে হয়।
কোনো মানুষকে মানসিকভাবে উদ্বাস্তু করতে হলে তাকে তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু, পরিণাম কী হতে পারে? পাকিস্তানের কথাই ধরা যাক। পাকিস্তানে সত্য ইতিহাস পড়ানো হয় না এবং সেখানে চালু করা হয়েছে পাকিস্তান স্টাডিজ। খানিকটা ইতিহাস খানিকটা অর্থনীতি, খানিকটা পৌরনীতির মিশেল যাতে ইতিহাসের ভাগ কমে যায়। বাংলাদেশেও চালু করা হয়েছিল বাংলাদেশ স্টাডিজ। বাংলাদেশের কলেজগুলোতে ইসলামের ইতিহাস খোলা হয়, ইতিহাস নয়, সরকারি কলেজগুলোতেও।
মাধ্যমিকে অংক, বিজ্ঞান থেকে ড্রিল টিচার আছেন, ইতিহাসের শিক্ষক নেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সব ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিল। কোনো ভিসি তা মানেননি। অর্থাৎ সরকারের পছন্দসই ভিসিরা বাংলাদেশের অভ্যুদয় পড়াতে রাজি নন। এরা হচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক। পাঠ্যবইয়ে পাকিস্তান আমল থেকেই ডানপন্থায় যাতে শরিক হয় ছাত্ররা তাই করা হয়েছে। এখনও তার ব্যতিক্রম নয়। ডা. দীপু মনি মাধ্যমিকে পরিবেশ পরিচিতি বা ওই ধরনের বইয়ের বদলে ইতিহাস ও সমাজ চালু করতে যাচ্ছেন। তাকে সাধুবাদ জানিয়েছি। কিন্তু, শুনেছি সৃজনশীলতার নামে ইতিহাস যা হচ্ছে তা হবে সৃজনশীল ইতিহাস।
ছোট ছোট ঘটনা, কিন্তু অনবরত ঘটছে এবং প্রতিকার হচ্ছে না। নিজের দেশ সম্পর্কে আমাদের উত্তরসূরিরা জানছে না- এ অভিযোগ অনেক দিনের। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর নিরসনে কী করছে জানি না। কিন্তু এ প্রজন্ম নিজের ইতিহাস না জেনে যখন বড় হবে তখন এ দেশের কোনো কিছুর সঙ্গেই তার আত্মিক সম্পর্ক থাকবে না। বাঙালি সংস্কৃতি মনে হবে ‘হিন্দু সংস্কৃতি’ যেমনটি বলতো পাকিস্তানিরা সে বাঙালি নয়, পাকিস্তানি-ই হয়তো হবে। ধরা যাক গ্রেফতারকৃত বিজ্ঞান শিক্ষকের কথা। তাকে গ্রেফতার করা হয়, কিন্তু যে ছাত্র তার অনুমতি না নিয়ে বক্তব্য রেকর্ড করেছে তাকে গ্রেফতার করা হয় না।
ধর্ম অবমাননার জন্য [কোন কোন ক্ষেত্রে ঠিক] হিন্দুজনকে গ্রেফতার করা হয়, কিন্তু ফেসবুক/ইউটিউবে যারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিচ্ছে তাদের গ্রেফতার করা হয় না। সরকারের একটি স্ট্যান্ডার্ড উত্তর- আমাদের কিছু করার নেই। তাহলে বিটিআরসির দরকার কী? শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জঘন্য অপপ্রচার রোধে কোনো ব্যবস্থা নেই। যে সব পুলিশ ন্যক্কারজনক কাণ্ডের জনক যে কাণ্ডের জন্য দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় তাদের কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে এমন কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। পুলিশ পুলিশকে না দেখিলে কে দেখিবে! এরকম অনেক ফিরিস্তি দেওয়া যায়। কিন্তু দেওয়ার দরকার নেই।
বিএনপি জামায়াত আমলে এগুলো হতো, পাকিস্তায়নের প্রক্রিয়া হিসেবে। এখনও তা ঘটছে কেন? একটিই উত্তর সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে, যা শেখ হাসিনার হাত নয় প্রতিক্রিয়ার হাতকে শক্তিশালী করছে। মুসলিম লীগ, বিএনপি-জামায়াতের সবচেয়ে বড় সাফল্য আমাদের মননে পাকিস্তানি ছিটমহলের সৃষ্টি। আওয়ামী লীগ ও বামপন্থিদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এই ছিটমহল অপসারণের প্রচেষ্টা গ্রহণ না করা।
শেখ হাসিনা উন্নয়ন যে পর্যায়ে নিচ্ছেন, তাতে বাংলাদেশ উন্নত হবে। সে উন্নত দেশে উন্নয়ন নিয়ে কেউ কথা বলবে না। কিন্তু, দেশের সংস্কৃতি হবে পাকিস্তান। এত ব্যয় করে মুজিববর্ষ বা বাংলাদেশের ৫০ বছর পালন করে লাভ হবে কী?
বিদেশি টাকায় মডেল মসজিদ স্থাপনকে কেউ সমালোচনা করেনি। কিন্তু নিজের টাকায় এর পাশাপাশি মডেল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়লে তা হতো অতীব প্রশংসনীয়। কিন্তু সেটি যদি না হয় তাহলে এটি হবে ভারসাম্যহীন যার পরিণতি হতে পারে বর্তমান ভারত। আমাদের জেনারেশন, এমনকি শেখ হাসিনারও তা কাম্য নয়।
আমাদের মননে বাঙালিত্বের বীজ শুধু বপন নয় তা বিকশিত না করলে তার পরিণতি হবে মর্মান্তিক। সৌদি আরব সেটি বুঝে তাদের পুরোনো ধ্যান ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। মহিলাদের একা হজের অনুমতি পর্যন্ত দিচ্ছে, ভাবা যায়! সেই মনন বৃদ্ধিতে সাংস্কৃতিক জিডিপি বৃদ্ধি অবশ্যই কাম্য। শেখ হাসিনা যদি এটি না পারেন তাহলে আর কেউ তা পারবে কি না সন্দেহ। বাঙালি সংস্কৃতিহীন বাংলাদেশ জীবিতকালে তিনি নিশ্চয় কামনা করেন না।
লেখক: লেখক, ইতিহাসবিদ। বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Post Views: 897



