পাঁচ দিনেও মেলেনি ইয়াবার হদিস, তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন; সিসিটিভি ফুটেজে দু’কনস্টেবলের উপস্থিতি
সুকান্ত বিকাশ ধর, সাতকানিয়া: লোহাগাড়ায় ট্রাক থামিয়ে ৩০ হাজার ইয়াবা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে সাতকানিয়া থানার এক উপপরিদর্শক (এসআই) ও দুই কনস্টেবলকে ক্লোজড করা হয়েছে। তাঁদের জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে ঘটনার পাঁচ দিন পরও কথিত লুট হওয়া ইয়াবা উদ্ধার না হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে জেলা পুলিশ। বুধবার (২৮ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম পিপিএম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে তাঁদের থানা থেকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।
ওই দিন রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুল আলীম।
ক্লোজড হওয়া তিন পুলিশ সদস্য হলেন- সাতকানিয়া থানার এসআই এস এম মাহবুবুল ইসলাম, কনস্টেবল ফয়েজ আহমেদ ও গাজী মো. মহসিন।
পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ,
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ইউনিয়নের এম চর হাটসংলগ্ন মাইরগ্গ্যারচর ফকিরহাট এলাকার একটি নির্জন সড়কে মোটরসাইকেল দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে একটি নীল রঙের মিনিট্রাক থামানো হয়। এরপর পুলিশের কথিত দুই সোর্স রবিন ও মোমিনের সহযোগিতায় ট্রাকটি সাতকানিয়ার কেরানীহাট এলাকায় নিয়ে এর চালকের আসনের নিচে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা ৩০ হাজার ইয়াবা সরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
যেভাবে থামানো হয় ট্রাক
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার দুপুরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ইসলামনগর এলাকায় ঢাকা মেট্রো-ড-১২-৭৫৩৮ নম্বরের একটি নীল রঙের মিনিট্রাক সড়কের পাশে রেখে খাবার খাচ্ছিলেন চালক নাছির। এ সময় পুলিশের কথিত সোর্স রবিন ও মোমিনের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়।
পরে মাতামুহুরী নদীর সেতুসংলগ্ন একটি পাম্প স্টেশন থেকে জ্বালানি নিয়ে বান্দরবানের লামার উদ্দেশে রওনা হন নাছির। সেখানে পৌঁছে অপর এক মাদক বহনকারীর কাছ থেকে ৩০ হাজার ইয়াবা সংগ্রহ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ইয়াবাগুলো ট্রাকের চালকের আসনের নিচে তৈরি করা বিশেষ জায়গায় লুকিয়ে রেখে তিনি লোহাগাড়ার পুটিবিলা সড়ক হয়ে ফকিরহাট এলাকায় যাচ্ছিলেন। সেখানে ট্রাকে সবজি বোঝাই করার কথা ছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, গন্তব্যে পৌঁছানোর কিছু আগে থেকেই একটি মোটরসাইকেল ও একটি নোহা গাড়ি নিয়ে রবিন, মোমিন এবং দুই কনস্টেবল ফয়েজ ও গাজী মো. মহসিন ট্রাকটির পিছু নেন। একপর্যায়ে নির্জন সড়কে মোটরসাইকেল দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ট্রাকটি থামানো হয়। পরে কনস্টেবল মহসিন ট্রাকের জানালা খুলে চালকের পাশের আসনে বসেন এবং নাছিরকে হাতকড়া পরান। এরপর কনস্টেবল ফয়েজও চালকের পাশের আসনে বসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে ট্রাকটি আমিরাবাদ ও ঠাকুরদীঘি ঘুরিয়ে কেরানীহাট রেলক্রসিংসংলগ্ন একটি এলপিজি পাম্পে নেওয়া হয়। সেখানে চালককে নামিয়ে তল্লাশি চালিয়ে আসনের নিচে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা ইয়াবাগুলো বের করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এরপর এসআই মাহবুব মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছালে অন্যরা ট্রাকের চাবি ও চালককে তাঁর জিম্মায় দিয়ে সরে যান বলে জানা গেছে। পরে এসআই মাহবুব চালককে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা?
চালক নাছিরের দাবি, ইয়াবা সরিয়ে নেওয়ার পর ঘটনাটি আড়াল করতে তাঁকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। একপর্যায়ে ট্রাকটি ওবাইদিয়া মাদ্রাসার গেটসংলগ্ন সড়ক বিভাগের একটি পরিত্যক্ত ভবনের সামনে নেওয়া হয়। সেখানে এসআই মাহবুব ও এক কনস্টেবল তাঁর কাছে ট্রাকে ইয়াবা থাকার অভিযোগ তুলে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
নাছিরের ভাষ্য, এর মধ্যে আরও দুই পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে আসেন। তাঁদের কাছে তিনি জানান, কয়েক ঘণ্টা ধরে ট্রাকটি বিভিন্ন স্থানে ঘোরানো হয়েছে এবং তল্লাশিও চালানো হয়েছে। এ কথা শোনার পর ওই দুই পুলিশ সদস্য আর তল্লাশি করতে রাজি হননি বলে তাঁর দাবি।
পরে এসআই মাহবুব ট্রাকে তল্লাশি করা হয়নি—এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও ধারণ করে তাঁকে ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ করেন নাছির। এরপর তিনি ট্রাক নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর উদ্দেশে রওনা হন।
চালক নাছির আরও দাবি করেন, ট্রাকে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার তার ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং মনিটরের মেমোরি কার্ড ফরম্যাট করে দেওয়া হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দুই কনস্টেবল
এ ঘটনায় দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন এ প্রতিবেদক। ফুটেজে কনস্টেবল গাজী মো. মহসিনকে চালকের পাশে এবং ফয়েজ আহমেদকে ট্রাকের সামনে অবস্থান করতে দেখা যায় বলে জানা গেছে। তবে তাঁদের দুজনের মুখেই মাস্ক ছিল। পরে থানার একাধিক উপপরিদর্শক, সহকারী উপপরিদর্শক ও কনস্টেবল ফুটেজে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ট্রাকচালক নাছির বলেন, ‘আমি লামা থেকে লোহাগাড়া আসার পথে মাইরগ্গ্যারচর ফকিরহাট এলাকায় পৌঁছালে রবিন ও কনস্টেবল ফয়েজ মোটরসাইকেল দিয়ে আমার ট্রাকের গতিরোধ করেন। পরে হাতকড়া পরিয়ে আমাকে নামানো হয়। ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে তিনটি প্যাকেটে রাখা ৩০ হাজার ইয়াবা নিয়ে যান তাঁরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইয়াবা নিয়ে যাওয়ার পর কয়েকজন আমাকে বিভিন্ন স্থানে ঘোরান। পরে এসআই মাহবুব আমার ট্রাকে ইয়াবা আছে বলে অভিযোগ তুলে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু এর আগেই অন্য একটি দল ট্রাক থেকে ইয়াবা নিয়ে গিয়েছিল। পরে তল্লাশি না করার বিষয়ে ভিডিও ধারণ করে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’
অভিযোগ অস্বীকার দুই কনস্টেবলের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কনস্টেবল ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আপনাকে কিছু জানাতে পারব না। কারণ, ঘটনার দিন রাতে আমি থানায় ছিলাম।’
অপর কনস্টেবল গাজী মো. মহসিন বলেন, ‘আমি সেখানে ছিলাম না। তাই এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নই।’
পুলিশের কথিত সোর্স রবিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। অপর সোর্স মোমিনের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
এসআই মাহবুবের বক্তব্য
এসআই এস এম মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে আমরা একটি ট্রাক থামিয়েছিলাম। পরে ট্রাকচালক আগেই তল্লাশি করা হয়েছে বলে জানালে আমি সোর্সকে বকাঝকা করি। এরপর ট্রাকটিতে আর তল্লাশি না চালিয়ে চালকের ভিডিও নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দিই।’
কনস্টেবল ফয়েজ আহমেদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুব বলেন, প্রায় এক বছর আগে তাঁর সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়লে ব্যস্ততার কারণে ফয়েজকে দিয়ে সন্তানকে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন। ওই সময় ফয়েজ তাঁর সন্তানের সেবা-যত্ন করেছিলেন। সেখান থেকেই তাঁদের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি হয়।
সোর্স রবিনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, রবিনের বাবা মাছ ব্যবসায়ী বাবুলকে একবার রাজনৈতিক মামলায় আটক করা হয়েছিল। ওই সময় রবিন থানায় এলে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে মাদক পাচারসংক্রান্ত কোনো তথ্য জানা থাকলে তাঁকে জানাতে বলেছিলেন।
ইয়াবা ছিল কি না, নিশ্চিত নয় পুলিশ
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর তদন্ত শুরু করা হয়েছে। কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় তাঁদের আপাতত ক্লোজড করা হয়েছে।
তবে ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কী ইয়াবা উদ্ধার করব, ইয়াবা ছিল কি না, তা-ও এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঘটনার সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।’
এদিকে, অভিযোগে ৩০ হাজার ইয়াবা সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত সেগুলোর উদ্ধার কিংবা প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ট্রাকটি থামানো, কথিত তল্লাশি, ইয়াবা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।




