রাজধানীর ভাটারায় অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বাংলোয় গভীর রাতে পরিচালিত অভিযান, ৮৫ জন আটক এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাদের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযান বলা হলেও এর পেছনে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ স্বার্থের দ্বন্দ্ব কাজ করেছে কি না, তা নিয়ে বাহিনীর ভেতরে-বাইরে জোর আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বদলি-বাণিজ্য ও হাউজিং সোসাইটিতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধের জেরে এ অভিযান চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশের একাধিক সূত্র থেকে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের প্রশাসনিক প্রভাবের মূলে ছিল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ (পিএম-২) শাখা পরিচালনা, মাঠপর্যায়ের এসআই ও এএসআইদের বদলি সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এর (পিওএইচএস-১) দপ্তর সম্পাদকের পদে নিয়োজিত ছিলেন। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পদায়নের ক্ষেত্র তৈরি করতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, পছন্দের জায়গায় পদায়নকে কেন্দ্র করে জহির একটি অনানুষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন।
তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে আব্দুল্লাহ আল জহির জানান, বদলি বা পদোন্নতির দায়িত্বে থেকে তিনি কোনো ধরনের অনিয়ম করেননি। তিনি বলেন, “বিভাগে এ নিয়ে যে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত আছি। তবে অন্য কেউ এ সুবিধা নিতে হয়তো আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাতে পারেন।” নিজ মালিকানাধীন বাংলোয় অভিযান প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, পুরো ঘটনাটি লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে যে এটি কতটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।
অন্যদিকে, ভাটারায় সাড়ে ছয় কাঠা জমির ওপর জহিরের নির্মিত তিনতলা বাড়ি এবং তার অর্থের উৎস নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার কাজে ব্যবহৃত এই বাড়ির পাশাপাশি ১৪৩ একর জমিতে গড়ে ওঠা প্রায় ১,১০০ প্লটবিশিষ্ট পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল। সদর দপ্তরের একাধিক সূত্রের মতে, বদলি শাখা এবং আবাসন প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে গড়ে ওঠা গোষ্ঠীগত বিরোধের কারণে এই অভিযান চালানো হয়ে থাকতে পারে, যদিও সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা গোষ্ঠীকে সরাসরি দায়ী করার মতো তথ্য কেউ দেননি।
অভিযান পরিচালনার ভিত্তি নিয়েও বড় ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশ কর্মকর্তা ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, ওই বাড়িতে পার্টির বিষয়ে তাদের কাছে আগে থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। কেবল ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের নির্দেশে রাত আড়াইটায় এই বড় আকারের অভিযান চালানো হয়। কোনো প্রাথমিক গোয়েন্দা যাচাই ছাড়া কেবল মৌখিক নির্দেশে কেন অভিযান চালানো হলো এবং কিসের ভিত্তিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযানের স্থান থেকে জব্দকৃত দ্রব্যের তালিকার সঙ্গে পুলিশের দাবির মধ্যেও বড় বৈষম্য দেখা গেছে। পুলিশের দাবি ছিল, ওই বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পার্টি ও মাদকসেবন চলছিল। অথচ জব্দ তালিকায় দেখানো হয়েছে সামান্য পরিমাণ মদ, একটি খালি হুইস্কির বোতল এবং মাত্র একটি ইয়াবা বড়ি। এছাড়া আটক ব্যক্তিদের মাদক সেবনের বিষয়টি যাচাই করার জন্য কোনো চিকিৎসা পরীক্ষা বা মাদক শনাক্তকরণ পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না কিংবা আদালতে কী প্রমাণ জমা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে পারেনি।
বিচারিক প্রক্রিয়ার গতি নিয়েও আইন অঙ্গনে আলোচনা চলছে। অভিযানে আটক ৮৫ জনের মধ্যে ৫৯ জন পুরুষকে এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা এবং ২৬ জন নারীকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। জনউপদ্রব সৃষ্টি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিভিন্ন ধারায় দ্রুততম সময়ে এই শাস্তি দেওয়া হয়। তবে আটক প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ ছিল কি না এবং নারী ও পুরুষদের ক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদে কেন ভিন্নতা আনা হলো, তার সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা মেলেনি।
সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলামের বক্তব্যেও এসব প্রশ্নের সুরাহা মেলেনি। তিনি জানান, ওই বাড়িতে উপস্থিত ব্যক্তিদের পেশা বা তাদের সমবেত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে ডিবি স্পষ্ট হতে পারেনি। অভিযানে সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সন্তানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা আটক হয়েছেন বলে যে দাবি উঠেছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, অভিযানের সময় মাদকসেবনের প্রমাণের বিষয়টি যেমন যাচাই করা দরকার, তেমনি অভ্যন্তরীণ কোনো কোন্দল এই অভিযানের পেছনে ভূমিকা রেখেছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত।




