বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২৯টি দেশের নাগরিকদের লোভনীয় বেসামরিক চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন। ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী বিদেশি নাগরিকদের এভাবে জবরদস্তিমূলক ও প্রতারণামূলকভাবে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জাতিসংঘ প্যানেলের এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশ করেছে।
ইউক্রেন বিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা তাদের একটি হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরে। কমিশন জানায়, মূলত অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, প্রান্তিক এবং কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন বিদেশি নাগরিকদের সুযোগ নিয়ে মস্কো এই কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। অনুসন্ধানে বিশ্বের ৪৮টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে অন্তত ২৯টি দেশের ক্ষেত্রে এমন প্রতারণামূলক নিয়োগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় ট্রাভেল এজেন্সি ও স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের রুশ ভাষায় প্রস্তুত করা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়, যার ভাষাগত অর্থ তাদের জানা ছিল না। পরে যখন তারা বুঝতে পারেন যে তাদের সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে হবে, তখন তারা হতভম্ব হয়ে পড়েন।
জাতিসংঘের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হওয়া ২৯টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, বেলারুশ, আজারবাইজান, বলিভিয়া, ব্রাজিল, বতসোয়ানা, ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভাদর, ঘানা, হন্ডুরাস, জর্ডান, কেনিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, পেরু, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সোমালিয়া, তাজিকিستان, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন ও জিম্বাবুয়ে।
একই সঙ্গে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলার কারণে বেসামরিক মানুষের চরম দুর্ভোগের চিত্র প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে আনা হয়েছে। তীব্র শীতের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে লাখ লাখ মানুষকে দুর্দশায় ফেলার এই আচরণকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে কমিশন।
কমিশনের চেয়ারম্যান এরিক মোসে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে এই আক্রমণগুলো যুদ্ধাপরাধ, কারণ এগুলো সরাসরি বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে। এর ফলে বরফশীতল অন্ধকারে সাধারণ মানুষকে অমানবিক কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়েছে।’’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যুৎ না থাকায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় লিফট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বয়স্ক মানুষরা নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে ব্যর্থ হন। পাশাপাশি হাসপাতালের লাইফ-সাপোর্টে থাকা আশঙ্কাজনক রোগীরাও পড়েন মারাত্মক প্রাণঝুঁকিতে। ২০২৫-২৬ সালের তীব্র শীতে কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান করা ২৫৫ জন ভুক্তভোগী, চিকিৎসক ও নাগরিক সমাজ প্রতিনিধির প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার কূটনৈতিক মিশন। মস্কো জানিয়েছে, তারা জাতিসংঘের এই কমিশনের প্রতিবেদন বা তাদের কোনো পর্যবেক্ষণকে স্বীকৃতি দেয় না। রাশিয়ার দাবি, তাদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ভুয়া তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।




