ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে আবারও তীব্র রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট কিংবা তাঁকে সরাতে চাওয়া বিরোধী পক্ষ—কোনো জোটই পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশটির প্রধান তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল—চ্যানেল ১১, ১২ ও ১৩-এর বুথফেরত জরিপে দেখা গেছে, পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনো পক্ষই পাচ্ছে না। প্রাপ্ত পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর জোটের পক্ষে প্রায় ৫০টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে, আর বিরোধী জোটের ঘরে যেতে পারে ৫০ থেকে ৫২টি আসন। এর মধ্যে চ্যানেল ১৩-এর রাত ১টার জরিপে দুই শিবিরের আসনসংখ্যা সমান ৫১টি করে দেখানো হয়েছে।
দলভিত্তিক ফলাফলে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৪ থেকে ২৫টি আসন পেয়ে পরবর্তী নেসেটের বৃহত্তম দল হিসেবে অবস্থান ধরে রাখতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ২১ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এবারের জরিপে আরব দলগুলোর সাফল্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। জয়েন্ট লিস্ট ও রা'আমের মতো আরব দলগুলো যৌথভাবে ১৭ থেকে ১৮টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা নতুন সরকার গঠনে তাদের প্রভাবশালী ভূমিকায় দাঁড় করাতে পারে। তবে বিরোধী জোটের অধিকাংশ নেতাই আরব দলগুলোকে সাথে নিয়ে সরকার গঠনের পথ নাকচ করে দিয়েছেন। ফলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো আসন সংখ্যা থাকলেও বিকল্প সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করা বিরোধী শিবিরের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিরোধী শিবিরের অন্যান্য শরিকদের মধ্যে নাফতালি বেনেটের বিইয়াখাদ পার্টি ১২ থেকে ১৪টি, ইয়াইর গোলানের ডেমোক্র্যাটস পার্টি ৯ থেকে ১০টি এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু ৭ থেকে ৯টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু জোটের শরিক ইতামার বেন-গভিরের ওৎজমা ইয়েহুদিত পার্টি ৬ থেকে ৭টি এবং বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট পার্টি-জেহুত ৬টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি অতি-গোঁড়া ইহুদিদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম সম্মিলিতভাবে ১২ থেকে ১৩টি আসন পেতে পারে।
জরিপের ফল প্রকাশের পর বিরোধী নেতারা তা নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরে নেতানিয়াহু সরকারের ওপর জনগণের অনাস্থার কথা জোর দিয়ে বলছেন। গাদি আইজেনকোট বলেন, প্রাথমিক বুথফেরত জরিপের ফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জায়নবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ও ইসরায়েলের অধিকাংশ সাধারণ নাগরিকের নেতানিয়াহু এবং তাঁর ৭ অক্টোবরের হামলার সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারের ওপর কোনো আস্থা নেই। একইভাবে বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদ দাবি করেছেন, নেতানিয়াহুর জোট বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে এবং জনগণ তাদের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার বার্তা দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটস পার্টির চেয়ারম্যান ইয়াইর গোলান জানান, দেশটিতে প্রকৃত পরিবর্তনের সরকার গঠনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং তারা শরিকদের সঙ্গে নিজেদের ব্যবধান দূর করে দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
তবে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা আপাতদৃষ্টিতে কম। কারণ আইজেনকোট নেতানিয়াহুর অধীনে, এমনকি পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রিত্বের ব্যবস্থাতেও সরকার গঠনে রাজি নন। বিরোধী জোটের অন্যান্য শরিকরাও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। সব ভোট গণনার পর নেসেটের চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হবে। অতীতেও বুথফেরত জরিপের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলের অমিল দেখা গেছে। তাই দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে ইসরায়েলকে আবারও নতুন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হতে পারে। প্রসঙ্গত, দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকার ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার সময় ক্ষমতায় ছিল, যার পর থেকেই বিরোধীরা নিরাপত্তা ব্যর্থতার তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠন ও তাঁর জবাবদিহির দাবি জানিয়ে আসছেন।
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫: ৫৮আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬: ০৭




