# জুলাইয়ের ২৩ দিনেই আক্রান্ত আগের ছয় মাসের চেয়ে বেশি

#উচ্চ ঝুঁকিতে নগরের ৮ ওয়ার্ড

রাজিব শর্মা: বর্ষা মৌসুম শুরু থেকেই চট্টগ্রামের নগর ও উপজেলায় আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। বছরের প্রথম ছয় মাস পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জুলাই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৯৮ জন। অথচ জুলাই মাসের প্রথম ২৩ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৬ জন, যা আগের ছয় মাসের মোট আক্রান্তের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বর্ষা অব্যাহত থাকলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে ডেঙ্গু মোকাবিলায় কী করছে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই ভর্তি হচ্ছেন নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে। চলতি মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে ভর্তি হওয়া ৩০৫ জনের ১৮৪ জনই নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। নগর থেকে ভর্তি হয়েছেন ১২১ জন। এবার ডেঙ্গুর উপসর্গে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানা বৃষ্টিপাত, বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এবং এডিস মশার দ্রুত বংশবিস্তার ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রধান প্রধাণ কারণ।সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা এখনই কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার না করলে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে আগামী দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চলতি বছরে সর্বোচ্চ আক্রান্ত জুলাই মাসে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যলয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫৪ জন। এ সময়ে মারা গেছেন দুজন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে আক্রান্ত ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন এবং মারা গেছেন একজন, মার্চে ২০ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মে মাসে ৩৭ জন, জুনে ১২২ জন এবং চলতি জুলাই মাসের ২৩ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৬ জন এবং মারা গেছেন একজন।

সংস্থাটির সূত্র আরও জানান, আক্রান্তদের মধ্যে নগরের ২৬০ জন এবং জেলার ২৬২ জন। অন্যান্য জেলার ১৩২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৩৭৬ জন, নারী ১৬৫ জন এবং শিশু ১১৩ জন। বিগত বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড ডেঙ্গুতে ২০২১ সালে ২৭১ জন আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মারা গেছেন পাঁচ জন। ২০২২ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন পাঁচ হাজার ৪৪৫ জন; ওই বছর মারা যান ৪১ জন। ২০২৩ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৪ হাজার ৮৭ জন; প্রাণ হারান ১০৭ জন। এটি ছিল চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছরগুলোর একটি। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমে চার হাজার ৩২৩ জনে নেমে এলেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৫। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন চার হাজার ৮৬৪ জন, ওই বছর ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কীটতাত্ত্বিক জরিপেও চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে উঠে এসেছে। জরিপে নগরের ১৮টি ওয়ার্ডে ৩৭০টি বাড়ি ও ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ৯৯টি বাড়ি এবং ১১৪টি পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। কনটেইনার ইনডেক্স ৩৩.০৪ শতাংশ, যেখানে ১০ শতাংশের বেশি হলেই ডেঙ্গু বিস্তারের উচ্চ ঝুঁকি ধরা হয়। হাউস ইনডেক্স ২৬.৭৬ শতাংশ এবং ব্রেটো ইনডেক্স ৩০.৮১ শতাংশও স্বাভাবিক মাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে।

উচ্চ ঝুঁকিতে নগরের ৮ ওয়ার্ড স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপে জালালাবাদ, পাঁচলাইশ, উত্তর কাট্টলী, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, আন্দারকিল্লা, পাথরঘাটা ও দক্ষিণ হালিশহর এই আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বাসাবাড়ির ছাদে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার বিস্তার বেশি হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই জ্বর নিয়ে রোগী বাড়ছে। চমেক চিকিৎসকদের ভাষ্য, জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসা অনেক রোগীর শরীরে ডেঙ্গুর লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত রেখেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা আরও বাড়ানো হবে এবং চিকিৎসক ও নার্সদের পৃথক টিম দায়িত্ব পালন করবে।

উপজেলা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে সিভিল সার্জন। এদিকে নগরের পাশাপাশি উপজেলাগুলোতে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছে। এ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ দেখা গেলেও সর্তক অবস্থানে নিয়ন্ত্রণ করছেন জেলা সিভিল সার্জন। পাশাপাশি রোগীদের জন্য আলাদা বেড, চিকিৎসা সরঞ্জামাদির সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জেলার সব সরকারি হাসপাতালকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কনটেইনার ইনডেক্স ১০ শতাংশের বেশি হলে সেটিকে উচ্চ ঝুঁকি ধরা হয়। আমাদের সর্বশেষ জরিপে এই হার ৩৩ শতাংশেরও বেশি পাওয়া গেছে, যা উদ্বেগজনক। এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে। সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে দেরি করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে।’ চসিকের বিশেষ অভিযান ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ, নালা-নর্দমা পরিষ্কার, ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে অভিযান পরিচালনা করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, হাসপাতাল, কাঁচাবাজার এবং আবাসিক এলাকায়ও বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার জন্মস্থান ধ্বংস করা। মাত্র দুই থেকে তিন মিলিলিটার পরিষ্কার পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই বাসার ছাদ, ফুলের টব, এসির ট্রে, ডাবের খোসা, টায়ার কিংবা যে কোনো পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘চসিক প্রতিদিন মশকনিধন অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রতিটি পরিবারকে প্রতি শনিবার অন্তত এক ঘণ্টা সময় দিয়ে নিজের বাসা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। পরিচ্ছন্নতা একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে না পারলে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে স্থায়ী সফলতা আসবে না।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফগিং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের একটি অংশমাত্র। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করা। এজন্য সপ্তাহে অন্তত একদিন বাসা, ছাদ, বারান্দা ও আঙিনা পরিষ্কার করতে হবে। ফুলের টব, এসির ট্রে, ড্রাম, অব্যবহৃত টায়ার, ডাবের খোসা কিংবা যেকোনো পাত্রে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত ফেলে দিতে হবে।

তারা আরও বলছেন, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-নালা ভরাট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও ডেঙ্গু বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। তাই শুধু মশা নিধন নয়, দীর্ঘমেয়াদে উন্নত নগর ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।

চিকিৎসকদের পরামর্শ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। দুই দিনের বেশি জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমি, পেটব্যথা কিংবা শরীরে লালচে দাগ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

এফসিপিএস ইন্টার্ণ চিকিৎসক প্রশান্ত পাল বলেন, নিজের ইচ্ছামতো ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা বিপজ্জনক হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি, ওআরএস, তরল খাবার গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা রক্তচাপ কমে গেলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি।

# জুলাইয়ের ২৩ দিনেই আক্রান্ত আগের ছয় মাসের চেয়ে বেশি

#উচ্চ ঝুঁকিতে নগরের ৮ ওয়ার্ড

রাজিব শর্মা: বর্ষা মৌসুম শুরু থেকেই চট্টগ্রামের নগর ও উপজেলায় আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। বছরের প্রথম ছয় মাস পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জুলাই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৯৮ জন। অথচ জুলাই মাসের প্রথম ২৩ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৬ জন, যা আগের ছয় মাসের মোট আক্রান্তের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বর্ষা অব্যাহত থাকলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে ডেঙ্গু মোকাবিলায় কী করছে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই ভর্তি হচ্ছেন নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে। চলতি মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে ভর্তি হওয়া ৩০৫ জনের ১৮৪ জনই নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। নগর থেকে ভর্তি হয়েছেন ১২১ জন। এবার ডেঙ্গুর উপসর্গে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানা বৃষ্টিপাত, বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এবং এডিস মশার দ্রুত বংশবিস্তার ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রধান প্রধাণ কারণ।সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা এখনই কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার না করলে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে আগামী দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চলতি বছরে সর্বোচ্চ আক্রান্ত জুলাই মাসে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যলয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫৪ জন। এ সময়ে মারা গেছেন দুজন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে আক্রান্ত ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন এবং মারা গেছেন একজন, মার্চে ২০ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মে মাসে ৩৭ জন, জুনে ১২২ জন এবং চলতি জুলাই মাসের ২৩ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৬ জন এবং মারা গেছেন একজন।

সংস্থাটির সূত্র আরও জানান, আক্রান্তদের মধ্যে নগরের ২৬০ জন এবং জেলার ২৬২ জন। অন্যান্য জেলার ১৩২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৩৭৬ জন, নারী ১৬৫ জন এবং শিশু ১১৩ জন। বিগত বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড ডেঙ্গুতে ২০২১ সালে ২৭১ জন আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মারা গেছেন পাঁচ জন। ২০২২ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন পাঁচ হাজার ৪৪৫ জন; ওই বছর মারা যান ৪১ জন। ২০২৩ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৪ হাজার ৮৭ জন; প্রাণ হারান ১০৭ জন। এটি ছিল চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছরগুলোর একটি। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমে চার হাজার ৩২৩ জনে নেমে এলেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৫। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন চার হাজার ৮৬৪ জন, ওই বছর ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কীটতাত্ত্বিক জরিপেও চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে উঠে এসেছে। জরিপে নগরের ১৮টি ওয়ার্ডে ৩৭০টি বাড়ি ও ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ৯৯টি বাড়ি এবং ১১৪টি পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। কনটেইনার ইনডেক্স ৩৩.০৪ শতাংশ, যেখানে ১০ শতাংশের বেশি হলেই ডেঙ্গু বিস্তারের উচ্চ ঝুঁকি ধরা হয়। হাউস ইনডেক্স ২৬.৭৬ শতাংশ এবং ব্রেটো ইনডেক্স ৩০.৮১ শতাংশও স্বাভাবিক মাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে।

উচ্চ ঝুঁকিতে নগরের ৮ ওয়ার্ড স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপে জালালাবাদ, পাঁচলাইশ, উত্তর কাট্টলী, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, আন্দারকিল্লা, পাথরঘাটা ও দক্ষিণ হালিশহর এই আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বাসাবাড়ির ছাদে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার বিস্তার বেশি হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই জ্বর নিয়ে রোগী বাড়ছে। চমেক চিকিৎসকদের ভাষ্য, জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসা অনেক রোগীর শরীরে ডেঙ্গুর লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত রেখেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা আরও বাড়ানো হবে এবং চিকিৎসক ও নার্সদের পৃথক টিম দায়িত্ব পালন করবে।

উপজেলা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে সিভিল সার্জন। এদিকে নগরের পাশাপাশি উপজেলাগুলোতে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছে। এ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ দেখা গেলেও সর্তক অবস্থানে নিয়ন্ত্রণ করছেন জেলা সিভিল সার্জন। পাশাপাশি রোগীদের জন্য আলাদা বেড, চিকিৎসা সরঞ্জামাদির সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জেলার সব সরকারি হাসপাতালকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কনটেইনার ইনডেক্স ১০ শতাংশের বেশি হলে সেটিকে উচ্চ ঝুঁকি ধরা হয়। আমাদের সর্বশেষ জরিপে এই হার ৩৩ শতাংশেরও বেশি পাওয়া গেছে, যা উদ্বেগজনক। এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে। সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে দেরি করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে।’ চসিকের বিশেষ অভিযান ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ, নালা-নর্দমা পরিষ্কার, ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে অভিযান পরিচালনা করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, হাসপাতাল, কাঁচাবাজার এবং আবাসিক এলাকায়ও বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার জন্মস্থান ধ্বংস করা। মাত্র দুই থেকে তিন মিলিলিটার পরিষ্কার পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই বাসার ছাদ, ফুলের টব, এসির ট্রে, ডাবের খোসা, টায়ার কিংবা যে কোনো পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘চসিক প্রতিদিন মশকনিধন অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রতিটি পরিবারকে প্রতি শনিবার অন্তত এক ঘণ্টা সময় দিয়ে নিজের বাসা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। পরিচ্ছন্নতা একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে না পারলে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে স্থায়ী সফলতা আসবে না।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফগিং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের একটি অংশমাত্র। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করা। এজন্য সপ্তাহে অন্তত একদিন বাসা, ছাদ, বারান্দা ও আঙিনা পরিষ্কার করতে হবে। ফুলের টব, এসির ট্রে, ড্রাম, অব্যবহৃত টায়ার, ডাবের খোসা কিংবা যেকোনো পাত্রে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত ফেলে দিতে হবে।

তারা আরও বলছেন, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-নালা ভরাট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও ডেঙ্গু বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। তাই শুধু মশা নিধন নয়, দীর্ঘমেয়াদে উন্নত নগর ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।

চিকিৎসকদের পরামর্শ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। দুই দিনের বেশি জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমি, পেটব্যথা কিংবা শরীরে লালচে দাগ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

এফসিপিএস ইন্টার্ণ চিকিৎসক প্রশান্ত পাল বলেন, নিজের ইচ্ছামতো ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা বিপজ্জনক হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি, ওআরএস, তরল খাবার গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা রক্তচাপ কমে গেলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি।