অনুসন্ধানী প্রতিবেদন——
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন সেক্টরে সংস্কারের হাওয়া লাগলেও, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে তা রূপ নিয়েছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ারে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) মালিকানাধীন এবং শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘সিডিএ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ’- এ ছাত্র আন্দোলনের ‘সমন্বয়ক’ ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাব খাটিয়ে একটি শিক্ষক সিন্ডিকেট কর্তৃক ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং সাধারণ শিক্ষকদের ওপর নিপীড়নের চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গভর্নিং বডির দুই শিক্ষক প্রতিনিধি মাসুদ রানা ও মোঃ নাসির উদ্দীন পুরো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা ‘সমন্বয়কদের’প্রভাব প্রদর্শন করে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মিসেস সোহানা রহমানকে জোরপূর্বক ও অন্যায়ভাবে পদত্যাগে বাধ্য করেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বা গভর্নিং বডির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়াই গায়ের জোরে একজন প্রশাসনিক প্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্কুলের আর্থিক ও প্রশাসনিক খাতকে নিজেদের কুক্ষিগত করা।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মিসেস সোহানা রহমানকে জোরপূর্ক বিদায় করার পর, অবৈধভাবে এই আসনে বসানো হয় আবু হেনা মোস্তফা কামালকে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়, যাতে শিক্ষক প্রতিনিধি মাসুদ রানা ও নাসির উদ্দীনের যৌথ সিন্ডিকেট ব্যাকস্টেজে থেকে তাদের অনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারে। গত প্রায় দেড় বছর ধরে এই চক্রের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে একচ্ছত্র ‘ঘুষ বাণিজ্যের’অভিযোগ উঠেছে। তৎমধ্যে নিয়মনীতির কোন তোয়াক্কা না করে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীকে অবৈধভাবে ভর্তি করানো হয়েছে।
এছাড়াও স্কুলের কোচিং ফি, পরীক্ষার খাতা বিক্রি এবং শিক্ষার্থীদের ডায়েরী, আইডি কার্ড, কম্পিউটার সামগ্রী ও যাবতীয় স্টেশনারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
সুত্রটি জানায়, বর্তমান এ সংকটের শিকড় মূলত ২০২১ সালের একটি ঘটনা। ২০১৭ সালে এই স্কুলে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৭ জন যোগ্য শিক্ষক ও কর্মচারীকে ২০২১ সালে স্থায়ী করার সময় কালীन এই সিডিএ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ নুরুল আলম এর ত্বত্তবধানে শিক্ষক প্রতিনিধি এরশাদ হোসেন, শিরিন সুলতানা এবং বর্তমান চক্রের মাসুদ রানা, নাসির উদ্দীন ও শামীমা সুলতানা (শিরিন সুলতানার আপন বোন) মিলে একটি বড় অঙ্কের ঘুষ দাবি করে। কিন্তু এই ১৭ জন শিক্ষক-কর্মচারী ঘুষ না দিয়েই নিয়ম অনুযায়ী চাকরি স্থায়ী করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঘুষ না পেয়ে ক্ষিপ্ত হওয়া এই সিন্ডিকেটটি তখন থেকেই এই ১৭ জনের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশীয় প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে, মাসুদ রানা ও নাসির উদ্দীনের সিন্ডিকেটটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ‘সমন্বয়কদের’ভুল বুঝিয়ে এবং তাদের মাধ্যমে তদবির করিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)এ ওই ১৭ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটি ভুয়া ও ভিত্তিহীন অভিযোগ দাখিল করে। বর্তমানে এই ভুয়া অভিযোগের ভিত্তিতেই নিরীহ শিক্ষকদের দুদকের মাধ্যমে হেনস্তা করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী মহলের অভিযোগ।
তারা হলেন-সায়েরা বিবি (সহকারী শিক্ষক), ফারহানা আক্তার (সহকারী শিক্ষক), দিনার বিনতে তালেব (জুনিয়র শিক্ষক), জেসমিন আকতার (জুনিয়র শিক্ষক), শাহানা মুশতারী (জুনিয়র শিক্ষক), ফাহমিদা কাদের শোভা (জুনিয়র শিক্ষক), খালেদা বেগম (জুনিয়র শিক্ষক), মারিয়া নার্জিছ (জুনিয়র শিক্ষক), শারমিন জাহান, হাছিনা আক্তার, তৌহিদা মমতাজ (জুনিয়র শিক্ষক), দোলা রায় (জুনিয়র শিক্ষক), অ্যানি নাগ, পিংকি রানী দে (সহকারী শিক্ষক), স্বপ্না সেন, ফাহমিদা সুলতানা এবং ইসমত আরা বেগম।
তদন্তের নামে ক্ষমতার অপব্যবহারের আরও একটি নজির স্থাপন করেছেন বর্তমান অধ্যক্ষ আবু হেনা মোস্তফা কামাল। গভর্নিং বডির সভাপতি তথা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যানের কোনো রকম পূর্বানুমোদন বা নির্দেশ ব্যতিরেকেই, তিনি দুদকের চিঠির অজুহাতে নিজস্ব পছন্দের লোক দিয়ে একটি একপেশে তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
কমিটির সদস্যরা হলেন-মোহাম্মদ বায়োজিদ, দেবাশীষ রঞ্জন সুশীল, শামীমা সুলতানা (যিনি নিজে ঘুষ সিন্ডিকেটের অন্যতম অভিযুক্ত) এবং মাহমুদা পারভীন।
সুত্রটি আরো জানান, চউক-এর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চউক চেয়ারম্যানকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে, নিজস্ব সিন্ডিকেটের লোক দিয়ে একটি সাজানো ও একপেশে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে সরাসরি দুদকে প্রেরণ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। মূলত মাসুদ রানা ও নাসির উদ্দীনের অন্যায় অপকর্ম আড়াল করতেই এই নাটক সাজানো হয়েছে। দুদকের উচিত চউক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গ্রহণ করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা। সাধারণত কোন নিয়োগ এ অনিয়ম হলে নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ কমিটির সদস্যদের চাইতেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্বারা কমিটি গঠন করে অনিয়মের তদন্ত করা আবশ্যক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি, উপরন্তু দুনীতিবাজ শিক্ষকদের মাধ্যমে কমিটি গঠন করে প্রকৃত সত্য আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষক প্রতিনিধি মাসুদ রানার নিজের নিয়োগ নিয়েই এক লোমহর্ষক জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ২০১২ সালের ১০ এপ্রিল দৈনিক আজাদী পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে প্রভাষক (হিসাববিজ্ঞান) পদে নিয়োগ পরীক্ষায় ‘তাহমিনা আক্তার’ নামের এক প্রার্থী মেধা তালিকায় ২য় স্থান অর্জন করেন। ১ম স্থান অধিকারী যোগদানে অপরাগতা প্রকাশ করলে নিয়ম অনুযায়ী ২য় স্থানে থাকা তাহমিনা আক্তারের নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩য় স্থানে থাকা মাসুদ রানা তৎকালীন অধ্যক্ষের সাথে যোগসাজশ করে তাহমিনা আক্তারের নামে ইস্যুকৃত অফিসিয়াল নিয়োগপত্রটি সম্পূর্ণ গোপন করেন। উল্টো তাহমিনা আক্তারের একটি ভুয়া ও জাল স্বাক্ষরযুক্ত ‘যোগদানে অনিচ্ছা পত্র’ তৈরি করে দাখিল করা হয়। এই জালিয়াতির মাধ্যমে বিগত ১৫ বছর ধরে অবৈধভাবে পদটি দখল করে আছেন মাসুদ রানা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মাসুদ রানা এ প্রতিবেদকে বলেন, আমাকে ফোন করে তৎকালীন অধ্যক্ষ নুরুল আলম নিয়োগ পত্র দিয়েছেন, জালিয়াতির বিষয়ে আমি অবগত নই।
বিগত ১৪মে ২০২৫ তারিখে ভুক্তভোগী তাহমিনা আক্তার বিষয়টি জানতে পেরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। মাউশি অধিদপ্তর বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ২৯ জুন ২০২৫ তারিখে (স্মারক নং- ৩৭.০২.০০০০.১০৫.৩১.০৩৩.২৫/৩৮৪৭/৬) মাউশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক ও সহকারী পরিচালককে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিলেও অদৃশ্য ইশারায় সেই তদন্ত আজ অবধি আলোর মুখ দেখেনি।
নিয়োগ বঞ্চিত ভুক্তভোগী তাহমিনা আক্তার এ প্রতিবেদকে জানান, নিয়োগ পরীক্ষায় আমি ২য় স্থান অধিকার করেছি বিষয়টি জানতাম না। ২০২৩ সালে আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) চট্টগ্রামের পরিচালক প্রফেসর ফজলুল কাদের জানান, সিডিএ স্কুল এন্ড কলেজের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগের তদন্ত চলমান । উল্লেখিত অভিযোগের বিষয়ে ফাইল না দেখে এই মুহুর্তে কিছুই বলা যাচ্ছে না ।
একজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো, ভুয়া স্বাক্ষর দিয়ে অন্যের চাকরিচ্যুত করা এবং বৈধ শিক্ষকদের দুদকের মাধ্যমে হয়রানি করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শ্রম আইনের চরম লঙ্ঘন।
সিডিএ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং নিরীহ ১৭ জন শিক্ষকের ওপর চলমান মানসিক হয়রানি বন্ধে মাউশি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং চউক কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। একই সাথে, শিক্ষক প্রতিনিধি মাসুদ রানার ২০১২ সালের জালিয়াতির তদন্তটি দ্রুত সম্পন্ন করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন অভিভাবক মহল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) নবাগত চেয়ারম্যান ও সিডিএ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ এর পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন প্রতিবেদককে জানান, কোনো প্রকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।



