নিজস্ব প্রতিনিধিঃ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম বিসিক শিল্প নগরীতে ১ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকার মালামাল লুটপাট খবর পাওয়া গেছে। পৌরসভায় অবস্থিত বিসিক শিল্প নগরীতে প্লট নং: বি-৬, বি-৭ এ অবস্থিত আব্দুল মান্নানের নামে বরাদ্দকৃত এবং মিজানুর রহমানের মালিকানাধীন মিজান অয়েল মিল নামীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটেছে।
জানা যায়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিএসটিআই থেকে লাইসেন্স প্রাপ্ত মিজানুর রহমান বিসিক শিল্প নগরীতে বি-৬, বি-৭ নাম্বারের প্লটে গত পহেলা মে ২০১৪ থেকে ব্যবসা শুরু করেন। মুন্সীরহাট ইউনিয়ন বাহেরগড়া গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে আব্দুল মান্নানের নামে বরাদ্দকৃত বি-৬, বি-৭ নাম্বারের প্লট দুটি মিজান অয়েল মিলের সঙ্গে ৩০ মে ২০২৪ পর্যন্ত ১০ বছরের মেয়াদে চুক্তিপত্র হয়। মেয়াদ শেষে পূনরায় চুক্তিপত্র নবায়নের শর্ত থাকা মিজান অয়েল মিলের মালিক পাঁচ লক্ষ টাকা অগ্রিম জামানত প্রদানের পর, সরিষা তেলের মিল ও নারিকেল তেলের মিল স্থাপনের পর ব্যবসা আরম্ভ করে আসছে।
উৎপাদনমুখী পন্যের ব্যবসায়ী মুন্সীরহাট ইউনিয়নের বিষভাগ গ্রামের মরহুম আবদুল মন্নানের ছেলে মোঃ মিজানুর রহমান উক্ত ব্যবসার বিপরীতে, ২০১৮ সনে মিউচুয়েল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড কাদৈর বাজার শাখা থেকে ব্যবসা বৃদ্ধির লক্ষে দুই কোটি টাকা ঋণ নিয়ে- ট্রেড লাইসেন্স করে রীতিমত সরকারের রাজস্ব আয়কর প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। দিন দিন ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধির ফলে বহুলোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে শ্রমিক/ কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা অব্যাহত রাখে।
চুক্তিপত্রের মেয়াদ শেষ হবার পূর্বে প্লট মালিক আবদুল মান্নান গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সনে মারা যান। আবদুল মান্নানের মৃত্যুর কয়েকদিন পর থেকে তার স্ত্রী ফয়েজের নেছা সুমী জামানত বাবদ তাকে আরো ৩ লক্ষ টাকা প্রদানের জন্য এবং নতুন করে চুক্তিপত্র করার জন্য মিজানুর রহমানকে চাপ সৃষ্টি করে। ১০ বৎসর মেয়াদের চুক্তির তারিখ ৩০ মে ২০২৪ শেষ হলে, মিজানুর রহমান আরো ৩ লক্ষ টাকা জামানত বাড়িয়ে দেয়ার আশ্বাস দেয়। চুক্তিপত্রের মেয়াদ শেষ হবার পরে আব্দুল মন্নানের ওয়ারিশগণের সাথে চুক্তিপত্র নবায়ন করতে আগ্রহ প্রকাশ করলে, আবদুল মান্নানের স্ত্রী সুমী ওয়ারিশ সনদ ও অন্যান্য কাগজ পত্র তৈরী করে চুক্তিপত্র নবায়ন করবে বলে সময়ক্ষেপন করতে থাকে কিন্তু চুক্তিপত্র নবায়নের পূর্বেই আবদুল মান্নানের স্ত্রী সুমী তার স্বামীর সংসার ছাড়িয়া অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানের সাথে মালিকের সাথে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে, গত ২৪ জুন ২০২৪ ওয়ারিশগণের প্রথম অভিভাবক আবদুল মান্নানের মা আনোয়ারা বেগম- তিন লক্ষ টাকা জামানত প্রদান করে- নতুন চুক্তিপত্র অনুযায়ী মিজান অয়েল মিলের সাথে রীতিমত ভাড়া আদান প্রদান করে আসছে। এরেই মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আবদুল কাদেরকে মিজান অয়েল মিলের ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে, গত ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ মিজানুর রহমান ব্যবসায়ীক কাজে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে যায়। গত ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সন্ধ্যা অনুমান সাড়ে ৭ টার সময়, কোন কথাবার্তা এবং বিরোধ ছাড়াই, আবদুল মান্নানের সংসার বিসর্জন দিয়ে চলে যাওয়া স্ত্রী সুমী এবং তার বোন জামাই তিনপাড়া গ্রামের বদিউল আলমের ছেলে আবু বক্করের নেতৃত্বে চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার উত্তর শ্রীপুর গ্রামের মুজিবের মিজানুর রহমান (৩৮), নুরু মিয়ার ছেলে বাবলু (৩৫), শাহ আলমের ছেলে আরাফাত (২৩) পাঁচরা গ্রামের মৃত আতর আলীর ছেলে মোঃ মাসুদ (৪২), মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে মোঃ সহিদ (৪৩) সহ অজ্ঞাত ১৫/২০ জন সন্ত্রাসী মিজান অয়েল মিল নামক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্র, দা, ছেনি, লাঠি, শাবল, রড ইত্যাদিসহ বেআইনি অনুপ্রবেশ করে, সকলে একযোগে আক্রমণ চালায়।
এসময় প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শ্রমিক ম্যানেজার অপারেটর সহ সবাইকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চড় থাপ্পর এবং কিল ঘুষি মেরে আতংক সৃষ্টি করে। মিজান অয়েল মিলে রক্ষিত সরিষার তেল, নারিকেলের তেল, খৈল, প্লাস্টিক ম্যাঙ্কেস দানা, ক্যাশবক্সে থাকা নগদ- তিন লক্ষ টাকা, অটো প্যাকেজিং মেশিন, ২টন এসি ৩টি, ৪টি কম্পিউটার, প্রিন্টার ১টি, ইলেক্ট্রিকের তার, সুইচ বোর্ড, ১৪ টি কাঠের ঘানি, বিভিন্ন সাইজের ৫টি স্পোর মেশিন, ৩০ ঘোড়া মোটর ৫টি, অয়েল ফিল্টার ৩টি, ৫ ঘোড়া মোটর ৭টি, ২৫ ঘোড়া মোটর ৫টি, চায়না তৈরী একটি অয়েল ফিল্টার মেশিন সহ ১ কোটি ৭৪ লক্ষ ২৯ হাজার টাকার মালামাল লুটপাট করে নিয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রটি জানায়, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিকাল ৫টায় ফয়েজের নেছা সুমীর নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা ওই প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ বক্সে থাকা কাষ্টমারগণ কর্তৃক মালামালের জামানত হিসেবে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় দুই কোটি টাকার সংরক্ষিত চেক নিয়া যায়। মেশিনারীজ, নগদ টাকা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্রয়- বিক্রয় ও হিসাব নিকাশের যাবতীয় খাতা বই সহ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ডুকোমেন্ট লুট করে নিয়ে গিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, বেআইনিভাবে বেদখল দেয়ার কয়েকদিন পর লুটপাট ও চুরির হওয়া মাটির সাথে ঢালাইযুক্তভাবে আটকানো থাকা, মিজান অয়েল মিলের বহু মেশিনারীজ মালামাল, বিভিন্ন সাইজের স্পেলার ঘানি, মোটর, লাইন ইত্যাদি মেশিনারিজ মেঝের নীচ হইতে ফাউন্ডেশন ঢালাই করা অবস্থায় সংযুক্ত থাকা মালামাল- ফয়েজের নেছা সুমী অন্যত্র বিক্রয় করে দিয়েছে বলে বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছেন।
এ সংবাদ পেয়ে সত্যতা যাচাই করতে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫ টায় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ও শ্রমিকরা মিজান অয়েল মিলে গেলে, ফয়েজের নেছা সুমীর ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা তাহাদেরকে খুনের ভয় দেখিয়ে এবং বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ফ্যাক্টরী থেকে বের করে তালা বন্ধ করে দেয়। প্রতিষ্ঠানের সকল মালামাল লুট হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে বিদেশে থাকা মালিক মিজানুর রহমান চলতি বছরের গত ১৮মার্চ বাংলাদেশে এসে পরস্পর খোজ খবর নিয়া জানিতে পারে যে, ১-৭ নং আসামীগণ সহ অজ্ঞাত ১৫/২০ জন সন্ত্রাসী তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি বিক্রি করে ফেলেছে|। তিনি শিল্প নগরীতে গিয়ে খোঁজ খবর নিতে থাকলে ফয়েজের নেছা সুমী তার ভাড়া করা সন্ত্রাসী দ্বারা আক্রমন করে এবং চুপ না থাকলে প্রাণনাশের হুমকি প্রদর্শন করেছে বলে জানা গেছে।
এবিষয়ে তিনি চৌদ্দগ্রাম থানায় মামলা করবে বলে জানিয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, আবদুল মান্নানের মৃত্যুর পর তার সংসার বিসর্জন দিয়ে- আবদুল মান্নানের রেখে যাওয়া এক ছেলে দুই মেয়ের ভবিষ্যত জীবনের কথা চিন্তা না করে, ১নং আসামী ফয়েজের নেছা সুমি আরেকটি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিবাহের সংবাদ পেয়ে মান্নানের গর্ভধারণী মা আনোয়ারা বেগম তাহার সকল আত্মীয় স্বজন এবং প্রতিবেশীদের পরামর্শক্রমে- সামাজিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আবদুল মান্নানের ওয়ারিশদের অভিভাবক হিসেবে, তাহার রেখে যাওয়া সম্পদ এবং সন্তানদের পরিচালনাসহ সকল বিষয়ে দায়িত্বগ্রহন করে, মিজান অয়েল মিলের সাথে নতুন করে একটি চুক্তি সম্পাদন করে। এ খবরে এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ফয়েজের নেছা সুমী তার বর্তমান স্বামী এবং বোন জামাই আবু বক্কর সহ মিজান অয়েল মিল জোরপূর্বক বেদখল করার জন্য গোফনে ৪ লক্ষ টাকায় একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর সাথে চুক্তি করে। তবে চুক্তির সময় সন্ত্রাসীরা কোন মালামাল নিতে পারবেনা শর্ত থাকার পরও- তারা লোভ সামলাতে না ফেরে লক্ষ লক্ষ টাকার মালামাল লুটপাট করে নিয়ে গেছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছেন।




