দি ক্রাইম ডেস্ক: ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানার টাংগাব ইউনিয়নের বারইহাটি গ্রামে এক কক্ষ বিশিষ্ট একটি টিনের চালা ঘরে মাত্র দুইজন শিক্ষার্থী দিয়ে চলছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের অনুমোদিত শিক্ষকের সংখ্যা ৬ জন থাকলেও বর্তমানে বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যাও দুইজন। আশেপাশের দুই বর্গ কিলোমটিার এলাকার মধ্যে এই বিদ্যালয় ছাড়া আর কোন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই।
জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে স্থানীয় দানশীল ব্যক্তি রিয়াজ উদ্দিন ফরাজির দান করা জমিতে বারইহাটি গ্রামে বারইহাটি বাজারের কাছে বারইহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি সরকারীকরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ছিল প্রায় আড়াই শতাধিক। প্রায় ৮ বছর ধরে বিদ্যালয়টির ভবন পরিত্যক্ত। সাময়িক ক্লাস নেওয়ার জন্য দুই কক্ষ বিশিষ্ট একটি টিনের চালা ঘর নির্মাণ করা হলেও একটি কক্ষ গুদাম ঘর হিসেবে হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। শিক্ষক স্বল্পতা, শ্রেণী কক্ষসহ বিদ্যালয়টিতে শিশুদের উপযোগী পড়াশোনার পরিবেশ না থাকায় দিন দিন শিক্ষার্থীও সংখ্যা কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিদ্যালয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি পরিত্যক্ত। জানালা বিহীন একটি টিনের চালা ঘরে ছোট্ট একটি শ্রেণী কক্ষে বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সুলতানা রাজিয়া দুইজন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাচ্ছেন। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে বিদ্যালয়ের অপর শিক্ষক জহিরুল ইসলাম বাইরে থেকে বিদ্যালয়ে এসে উপস্থিত হন।
বিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষার্থীর দুইজনই প্রথম শ্রেণীতে পড়াশোনা করে। প্রাক প্রাথমিক, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণীতে আর কোন শিক্ষার্থী নেই। দুই শিশু শিক্ষার্থীর মধ্যে নাজিফা নামের শিক্ষার্থীর মা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, বিদ্যালয়ে এই দুইজন ব্যতীত আর কোন শিক্ষার্থী নেই। তার মেয়ে বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। তাকে জোর করে আনতে হয়। খেলার সাথী, সহপাঠীরা নেই তাই তার সাথে ক্লাস চলাকালীন পুরো সময় আমার বসে থাকতে হয়।
২০১৮ সালে বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ২০১৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বরাদ্দে মূল ভবনের পাশে একটি অফিস কক্ষ, দুইটি শ্রেণী কক্ষ বিশিষ্ট জানালা বিহীন একটি টিনের চালা ঘর নির্মাণ করা হয়। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য নলকূপ ও শৌচাগার ছিল না। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরাদ্দে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ওয়াশব্লক (হাত ধোয়ার স্থান ও শৌচাগার) নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রায় দুই বছর ধরে কাজটি চলমান। ওয়াশব্লক নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষ ও একটি শ্রেণী কক্ষে মাল বোঝাই করে রেখেছে। ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই দুইটি কক্ষ ব্যবহার করতে পারছে না।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক জহিরুল ইসলাম দুইজন শিক্ষার্থী ছাড়া আর কোন শিক্ষার্থী না থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়েছি পড়ানোর জন্য। আমাদের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরেও শিক্ষার্থী আনতে পারি না। বিদ্যালয়ে একটি মাত্র মাত্র শ্রেণী কক্ষ। টিনের চালা ঘর, গরমের দিনে প্রচণ্ড গরম লাগে। ফ্যানগুলো চুরি হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে বিদ্যালয়ের বেঞ্চগুলিও চুরি হয়ে যায়। আমাদের অফিস রুমটাও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দখলে। আমাদের বসার জায়গাও নাই। একজন শিক্ষক ক্লাস করালে অপরজনকে পাশের বাজারের কোন চা-স্টলে গিয়ে বসে থাকতে হয়।
বিদ্যালয়ের এমন দুরবস্থার মধ্যে গত ২ এপ্রিল বিউটি খাতুন নামে একজন শিক্ষক বিদ্যালয় ছাড়েন। জানা যায় তার আবেদনের প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ ডেপুটেশনে(প্রেষন) তাকে একই ইউনিয়নের চাকুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠান।
বিদ্যালয়টির এমন বেহাল অবস্থার মধ্যেও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস কিংবা কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। প্রতিমাসে অন্তত একবার ক্লাস্টারে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করার কথা। বিদ্যালয়ের পরিদর্শন বই সূত্রে জানা যায় ২০২১ সাল থেকে গত ৫ বছরে মাত্র তিন বার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন। বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু সাঈদ এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে পরিদর্শনে আসেন নাই।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুলতানা রাজিয়া বলেন, বছরে পর বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের জন্য আমরা উপজেলা শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করছি। কোন সাড়া পাচ্ছি না।
এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবু সাঈদ জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী নেই তা তিনি অবগত আছেন। সময়ের অভাবে পরিদর্শন করতে পারছি না। তবে শিক্ষকদের বলা হয়েছে শিক্ষার্থী ফিরিয়ে আনতে অন্যথায় বিদ্যালয়টি এবুলিষ্ট বা বিলুপ্ত করে দেওয়া হতে পারে। এমন একটি বিদ্যালয়ে এহেন অবস্থার শিক্ষকদের মধ্যে বদলি ও প্রেষণের কার্যক্রম কিভাবে চলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যাপার। আমি বলতে পারবো না।




