# উৎপাদন খরচ ৪০০
# বিক্রি মাত্র ১৮০–২০০
# লবণ চাষে ভয়াবহ লোকসান
বিজন কুমার বিশ্বাস, কক্সবাজার: কক্সবাজারের উপকূল জুড়ে লবণ উৎপাদন পুরোদমে চললেও চাষিদের মুখে নেই হাসি। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে লবণের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় চলতি মৌসুমেও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন হাজার হাজার লবণ চাষি। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও মৌসুমের চার মাসে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন। অথচ উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে লবণের দাম কমে যাওয়ায় চাষিদের প্রতি মণে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কক্সবাজারের চৌফলদণ্ডী উপকূলের বাজারপাড়ার লবণ চাষি জিয়ার খান জানান, গত বছর তিন কানি জমিতে লবণ চাষ করে প্রায় দেড় লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এবারও একই পরিমাণ জমিতে লবণ মাঠ করলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশায় দিন কাটছে।
তিনি বলেন, “আমরা লবণের ন্যায্যমূল্য চাই। বর্তমানে প্রতি মণ লবণ উৎপাদন করতে প্রায় ৪০০ টাকা খরচ হয়, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকায়। গত বছর প্রায় দেড় লাখ টাকা লোকসান হয়েছে, এবারও একই পরিস্থিতি। এভাবে চলতে থাকলে লবণ চাষ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”
একই অভিযোগ তুলেছেন লবণ চাষি সিরাজুল ইসলামের। তিনি বলেন, “লবণ চাষ করতে অনেক টাকা খরচ হয়। কিন্তু সেই তুলনায় দাম একেবারেই কম। এখন প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৮০ টাকায়, অথচ উৎপাদন খরচই এর চেয়ে বেশি। খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
লবণ চাষি সৈয়দ আলম বলেন, “টানা দুই বছর ধরে লবণ চাষে লোকসান হচ্ছে। এখন শুধু লবণ চাষ করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। বাসায় ছোট একটি দোকান আছে বলেই কোনোভাবে চলতে পারছি।”
এদিকে উৎপাদন খরচও ক্রমেই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।
রিয়াদুল হক বলেন, “গত বছর এক বান্ডিল ত্রিপলের দাম ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে ৫ হাজার টাকা হয়েছে। শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, তেলও সহজে পাওয়া যায় না। এত খরচের পরও প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকায়। অন্তত ৪০০ টাকা মণ হলে আমরা কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারতাম।”
চাষিদের অভিযোগ, বাজারে লবণের দাম কমে যাওয়ার পেছনে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি বড় কারণ। কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি ও লবণ চাষি কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা আবদুল শুক্কুর বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট’ নামে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে। এতে স্থানীয় চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, “বর্তমানে কক্সবাজারেই মানসম্মত ধবধবে সাদা লবণ উৎপাদন হচ্ছে। তবুও অপ্রয়োজনীয় আমদানির কারণে বাজারে দাম কমে যাচ্ছে। দ্রুত লবণ আমদানি বন্ধ করে চাষিদের রক্ষায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।”
অন্যদিকে কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভুঁইয়া জানান, মৌসুমের শুরুতে চাষিরা মাঠে নামতে কিছুটা দেরি করলেও এখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পুরোদমে লবণ উৎপাদন চলছে।
তিনি বলেন, “এখন মাঠে উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকারও কাজ করছে। চাষের জমির পরিমাণ ও মাঠে কত চাষি নেমেছেন—এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সংগ্রহে বিসিক কাজ করছে।”
বিসিক সূত্র জানায়, গত মৌসুমে ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে উৎপাদিত হয়েছিল ২৫ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন লবণ। তবে চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়ে ২৭ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, ন্যায্যমূল্য না পেলে ভবিষ্যতে অনেক চাষিই লবণ উৎপাদন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। তাই দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন উপকূলের হাজার হাজার লবণ চাষী।




