ক্রাইম প্রতিবেদক: পাথর উত্তোলন কাজে অপরিহার্য বিস্ফোরক দ্রব্য (অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট) ফুরিয়ে যাওয়ায় দেশের একমাত্র পাথরখনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে সহসা চালু হবে না এই খনি। খনিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন সাড়ে ৫ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে খনিটি। এতে মাসে ৬০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে সরকার। পাথর উত্তোলনের কাজ বন্ধ করে খনির প্রায় ৭০০ শ্রমিককে সাময়িক ছুটিতে পাঠিয়েছে খনির উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম-জিটিসি। পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকার কারণে দেশের অবকাঠামো খাত সংকটের মধ্যে পড়বে বলে বনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ২০০৭ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে ২০১৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত ৫৯৩ কোটি টাকার লোকসান হয় মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের। আর ২০০৭ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত খনি থেকে ২০ লাখ টন পাথর উত্তোলন করা হলেও ১৩২ কোটি টাকার লোকসান হয়। অভিযোগ আছে, সিন্ডিকেটের কমিশন বাণিজ্যের কারণে দীর্ঘদিন খনি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ ছিল। পাথরখনিতে যথা সময়ে প্রয়োজনীয় মেশিনারিজের জোগান না দেওয়ারও অভিযোগ আছে। এখন পর্যন্ত দেশের গ্রানাইট বাজারের মাত্র ৬ শতাংশ দখলে নিতে পেরেছে এমজিএমসিএল।
খনির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি সূত্র জানায়, চুক্তি অনুযায়ী পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহূত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট খনি কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করার কথা। কিন্তু সময়মতো অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের সরবরাহ না আসায় বাধ্য হয়ে খনির উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হয়েছে। খনির শ্রমিকরা জানান, খনিতে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মজুত না থাকায় খনির অভ্যন্তরে ব্লাস্টিংয়ের কাজ বন্ধ রয়েছে। তাদের সাময়িক ছুটিতে পাঠানোয় তাদের দুর্ভোগে দিন কাটছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ও এমজিএমসিএলের পরিচালনা পর্ষদ চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বলেন, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেড সরবরাহ না থাকায় খনির কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈরুতে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেডের একটি গুদামে বিস্ফোরণের ঘটনায় বিশ্ববাজারে এই কাঁচামালের সংকট দেখা দেয়। এর পাশাপাশি করোনা ভাইরাস ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এই সংকট আরো তীব্র হয়। এ অবস্হায় একাধিক বার দরপত্র আহ্বান করেও এই বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। তবে গত ১০ মার্চ ২৫০ মেট্রিক টনের একটি চালানের ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ড থেকে আসবে এই চালান। ইতিমধ্যে চালানটি জাহাজে তোলা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটেডের এই সংকট পুরোটাই কারসাজি। তাদের মতে, সংকটের এই বিষয়টি ছয় মাস আগে সবাই জানত। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। বিস্ফোরক ছাড়া খনি চলবে না। তারপরও এটি আমদানি নিয়ে গড়িমসি করা হয়েছে। নানাভাবে সময়ক্ষেপণ করে সিন্ডিকেট এ নিয়ে জটিলতা তৈরি করেছিল। এমনভাবে দরপত্র আহ্বান করেছিল যাতে কোনো বিদেশি কোম্পানি দরপত্রে অংশ নিতে না পারে। আবার দরপত্রে অংশ নিলেও সিন্ডিকেটের কমিশন বাণিজ্য না হলে সেই দরপত্র বাতিল করে দেওয়া হতো।
শুধু বিস্ফোরক আমদানিতে অনিয়ম-দুর্নীতি নয়, মধ্যপাড়া কঠিন শিলাখনির উন্নয়ন ঠিকাদার কোম্পানি নামনামের বিল ছাড়করণেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের এনওসি না নিয়ে নামনামের পুরো ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিল ছাড় করে দেওয়া হয়েছে। পর্ষদসভার সিদ্ধান্ত ছিল সর্বশেষ বিল ছাড়ের আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এনওসি লাগবে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে প্রথম পর্ষদসভার সিদ্ধান্ত গোপন করে পরে নতুন করে পর্ষদসভা করে পুরো বিল ছাড় করে দেওয়া হয়।
প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোপেক্সের তথ্য অনুযায়ী এমজিএমসিএলের কাছে যেসব যন্ত্রপাতি দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— স্কিপ ইকুইপমেন্ট, কেইজ (খাঁচা) ইকুইপমেন্ট, মাইনিং যন্ত্রপাতি, হাউলেজ ইকুইপমেন্ট, ভেন্টিলেটর অ্যান্ড পাম্প সরঞ্জাম, ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড এক্সকাভেটিং ইকুইপমেন্ট, ডিজাইন অ্যান্ড সার্ভেইং ইকুইপমেন্ট এবং ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি অন্যতম। কিন্তু দেখা গেছে, প্রকল্প শেষে নামনাম এসব মালামাল না দিলেও তাদের কোনো ধরনের জরিমানা করা হয়নি। উলটো পুরো বিল ছাড় করে দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সূত্র মতে, যে কোনো প্রকল্প শেষ হলে ঐ প্রকল্পের ঠিকাদার কোনো ক্ষয়ক্ষতি করেছে কি না এবং চুক্তি অনুযায়ী কোনো মালামাল কম দিয়েছে কিংবা কাজটি যথাযথভাবে শেষ করেছে কি না, তা যাচাই-বাছাই শেষে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু অভিযোগ আছে, এই প্রকল্পের ঠিকাদার চুক্তির অসংখ্য শর্ত ভঙ্গ করলেও তাকে নামকাওয়াস্তে জরিমানা করে পুরো বিল দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্হায়ী কমিটির এক রিপোর্টে দেখা গেছে, ঠিকাদারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণ এবং যথা সময়ে সরকারকে না জানানোর কারনে খনিটি ২০০৭ সালে বাণিজ্যিক উত্পাদনে যাওয়ার কথা থাকলেও প্রথমে সেটি ২০১০ ও পরে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে বছরে ৬ হাজার কোটি টাকার পাথরের চাহিদা থাকায় খনি উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানের বরাবরই আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সাল পর্যন্ত সীমাহীন অব্যবস্থাপনা এবং লোকসানী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত হয়।



