সুকান্ত বিকাশ ধর, সাতকানিয়া: প্রশাসনের নির্লিপ্ততা, কেন্দ্রে ঢুকে জোরপূর্বক ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ব্যালট পেপার ঢুকিয়ে দেওয়া, এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিতভাবে ভোটে হারিয়ে দেওয়াসহ নানা ধরনের কারচুপির অভিযোগ এনে এক ভিডিও বার্তা দিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে চন্দনাইশ পৌরসভা এলাকার নিজ বাড়িতে বসে এ ভিডিও বার্তাটি দেন অলি। ভিডিও বার্তাটি শুক্রবার মধ্য রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) এলাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কর্নেল অলির সন্তান এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ওমর ফারুক ১ হাজার ২৬ ভোটের ব্যবধানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জসীম উদ্দিন আহমেদর কাছে পরাজিত হন। ছেলে নির্বাচনে হারার একদিন পর শুক্রবার কর্নেল অলি ভিডিও বার্তায় ভোটে কারচুপিসহ নানা ধরনের অভিযোগ করেন।
ভিডিওতে কর্নেল অলি প্রশাসনের নির্লিপ্ততার অভিযোগ এনে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আড়াইটা থেকে তিনটার পর কেন্দ্রের বাইরে দায়িত্বরত আমাদের কর্মীদের পিটিয়ে বের করে দিয়েছেন। প্রশাসনকে বিষয়টি বারবার বলার পরও আমাদের নেতাকর্মীদের মারপিট করা হয়েছে। অন্যদিকে, জসিম (বিএনপি প্রার্থী) ছয় থেকে সাতটি মাইক্রোবাস-মোটরসাইকেল নিয়ে ডেমোনেস্ট্রেশন দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেছে। সন্ধ্যার আগে ও সন্ধ্যার পরে প্রায় ৩০-৪০টি মোটরসাইকেল-ট্রাক নিয়ে মিছিল করে উপজেলা হেডকোয়াটারে প্রবেশ করে তছনছ করেছে। সেখানে আর্মি ক্যাম্প, পুলিশ ক্যাম্প, পুলিশের থানা ও প্রশাসন তাদের বারণ করে নাই। আমাদের নেতাকর্মীদের অনেক কষ্ট করে সুশৃঙ্খল রাখার চেষ্টা করেছি। এখানে (ভোটে) আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং যারাই নির্বাচনে দায়িত্বে ছিল, তারা একতরফাভাবে কাজ করেছে। বিভিন্ন জায়গায় সাড়ে চারটার পর এজেন্টদের বের করে দিয়েছে। এছাড়াও ওমর ফারুকের সাড়ে চার হাজার ভোট বাতিল বলে গণ্য করেছে। আমাদের এজেন্ডদের বাতিল ভোটের বিষয়ে কেন বা কিভাবে করা হলো তা দেখানো হয়নি।
ভিডিওতে কর্নেল অলিকে বলতে শোনা যায়, বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। তবে আমরা লক্ষ্য করেছি, বিকাল চারটার পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় কারচুপির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে হাসিমপুর তরুণ সংঘ স্কুল, হাসিমপুর বড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দোহাজারী আব্দুর রহমান হাই স্কুল কেন্দ্রে সাড়ে চারটার পর অপরিচিত কয়েকশত লোক জোরপূর্বক কেন্দ্রে প্রবেশ করে অনেকগুলো ব্যালট পেপার সেখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে। হয়তো ওখানে যারা প্রিসাইডিং-পোলিং ছিল তাদের সাথে পূর্ব পরিকল্পনা ছিল এভাবে কাজ করার জন্য।
ওমর ফারুককে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে পরাজিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে ভিডিওতে কর্নেল অলি বলেন, আপনাদের অবগতির জন্য জানাতে চাই আপনার যদি মনে করেন প্রফেসর ওমর ফারুক পরাজিত হয়েছে, ড. কর্নেল অলি আহমদ পরাজিত হয়েছে-আমরা পরাজিত হই নাই। আল্লাহর মেহেরবানী, আমার নবীর দয়া- মুক্তিযোদ্ধা কখনো পরাজিত হয় না, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কখনো পরাজিত হয় না, পরাজিত হয়েছে টাকা এবং আমার নির্বাচনী এলাকার কিছু লোক। ওমর ফারুকসহ বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রার্থী যারা এক থেকে দেড় হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছে, এটা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও সুক্ষভাবে হয়েছে।
প্রশাসনের নিরব ভূমিকার অভিযোগ তুলে ভিডিওবার্তায় কর্নেল অলি বলেন, কিছু উশৃঙ্খল ছেলেরা আমাদের কর্মী-সমর্থকদের উপর আক্রমণ করেছে, প্রশাসন নিরব। অথচ প্রশাসনের উচিত, দুই দিন বিভিন্ন জায়গায় পেট্রোলিং করা এবং কোন খানে সমস্যা হচ্ছে কিনা দেখা। এ ব্যাপারে তারা (প্রশাসন) নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
ভিডিও বার্তার শেষে কর্নেল অলি বলেন, আমি সারা জীবন আপনাদের খেদমত করেছি, এই খেদমত মরণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। আমার ছেলে সব সময় আপনাদের পাশে থাকবে। নির্বাচনে জিতলাম কি জিতলাম না এতে কিছু যায় আসে না। জনগণের সেবায় আমি এবং আমার পরিবার সদা সর্বদা নিয়োজিত থাকব। কারো সাথে ঝগড়া-ঝাটির প্রয়োজন নাই। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে আপনারা দিন কাটাবেন। কর্নেল অলি সবার জীবন সুন্দর ও সফলতা কামনার পাশাপাশি উশৃঙ্খলতা পরিহার করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রস্তুত থাকার জন্য নেতাকর্মীদের আহ্বান জানান কর্নেল অলি।
উল্লেখ্য, চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক এলাকায় নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৪ সংসদীয় আসনটি। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আলহাজ জসিম উদ্দিন আহমেদ মোট ভোট পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৪৯৩। এর মধ্যে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী ওমর ফারুক পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৬৭ ভোট। শুধুমাত্র ১হাজার ২৬ ভোটের ব্যবধানে ওমর ফারুক পরাজিত হন। এই আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫১৪। পোস্টাল ভোটের মধ্যে ওমর ফারুক পান ২হাজার ৫১৫ ও জসীমউদ্দীন পান ৭১০ ভোট।




