মাহবুবুর রহমান:
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে দেশটি দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সংযোগ, নারী ক্ষমতায়ন ও মানব উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে সামনে এসেছে নতুন চ্যালেঞ্জ—গণতন্ত্রের সংকট, তরুণদের কর্মসংস্থান, জলবায়ু ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের আগামীর নেতৃত্ব কেমন হওয়া উচিত?

এটি শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্ন নয়; প্রশাসন, ব্যবসা, শিক্ষা, নাগরিক সমাজ—সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

১. দূরদর্শী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাভিত্তিক নেতৃত্ব

বাংলাদেশে উন্নয়ন অনেক সময় প্রকল্পনির্ভর ও স্বল্পমেয়াদি হয়ে পড়ে। আগামী দিনের নেতৃত্বকে হতে হবে “ইলেকশন-সাইকেল” নয়, বরং “প্রজন্ম-সাইকেল” চিন্তায় বিশ্বাসী।

অর্থাৎ—

২০–৩০ বছরের মাস্টার প্ল্যান

নগরায়ণ, পরিবহন ও পরিবেশের সমন্বিত নকশা

মানবসম্পদ উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ

শুধু আজকের ভোট নয়, ভবিষ্যৎ সন্তানের জীবনমানকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।

২. সৎ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব

দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় বাধা। অবকাঠামো গড়ে উঠলেও যদি আস্থার ঘাটতি থাকে, উন্নয়ন টেকসই হয় না।

আগামীর নেতৃত্বে থাকতে হবে—

সম্পদের প্রকাশ্য ঘোষণা

স্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা

সরকারি ক্রয়ে পূর্ণ ডিজিটাল স্বচ্ছতা

সংসদ ও গণমাধ্যমের কার্যকর নজরদারি

নেতৃত্ব মানে সুবিধা নয়, দায়বদ্ধতা—এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

৩. দক্ষ ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা

বাংলাদেশে এখনও দলীয় আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আগামীর নেতৃত্বকে এই ধারা ভাঙতে হবে।

প্রয়োজন—

মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি

আধুনিক সিভিল সার্ভিস সংস্কার

নীতি নির্ধারণে গবেষক ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তি

তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ

রাষ্ট্র পরিচালনা হবে “ক্যাডার বনাম ক্যাডার” নয়, বরং “ডেটা বনাম অনুমান”-এর ভিত্তিতে।

৪. তরুণ ও নারীকেন্দ্রিক নেতৃত্ব

বাংলাদেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সী। অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের অংশগ্রহণ সীমিত।

আগামীর নেতৃত্বে থাকতে হবে—

যুব প্রতিনিধিত্ব

স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের নীতি সহায়তা

আধুনিক স্কিল ট্রেনিং

নারীদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন

তরুণরা শুধু ভোটার নয়—তারা ভবিষ্যতের নির্মাতা।

৫. মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি

উন্নয়ন শুধু জিডিপি নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের মর্যাদা।

নেতৃত্বকে নিশ্চিত করতে হবে—

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা

প্রতিবন্ধী ও প্রবীণবান্ধব নীতি

ধর্ম ও মতভেদে সহনশীল সমাজ

শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার

একটি দেশ তখনই এগোয়, যখন সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটিও রাষ্ট্রের উপস্থিতি অনুভব করে।

৬. পরিবেশ ও জলবায়ু সচেতন নেতৃত্ব

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি।

আগামীর নেতৃত্বে থাকতে হবে—

সবুজ অর্থনীতি

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ

নদী ও বন রক্ষা

জলবায়ু অভিবাসন পরিকল্পনা

উন্নয়ন যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তা ভবিষ্যৎকে ঋণগ্রস্ত করে।

৭. ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি

বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। বাংলাদেশকে হতে হবে—

কারও উপগ্রহ নয়, অংশীদার

পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে ভারসাম্য রক্ষাকারী

রপ্তানি বহুমুখীকরণে সক্রিয়

প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় দৃঢ়

জাতীয় স্বার্থই হবে কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

৮. গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার

শক্তিশালী উন্নয়ন টেকসই হয় তখনই, যখন নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে।

আগামীর নেতৃত্বে চাই—

বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন

স্বাধীন বিচারব্যবস্থা

কার্যকর বিরোধী দল

শক্তিশালী স্থানীয় সরকার

গণতন্ত্র উন্নয়নের শত্রু নয়—বরং তার নিরাপত্তা বলয়।

পরিশেষে বলতে হয়- বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন বিশাল, ঝুঁকিও তেমনি গভীর। এই বাস্তবতায় আগামীর নেতৃত্বকে হতে হবে সাহসী, সৎ, দক্ষ ও মানবিক।

শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি নয়—রাষ্ট্র গড়ার রাজনীতি প্রয়োজন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নেতৃত্ব জনগণের ওপরে নয়—জনগণের পাশে দাঁড়াবে।

মাহবুবুর রহমান, সাংবাদিক, লেখক, কলামিষ্ট।

 

মাহবুবুর রহমান:
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে দেশটি দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সংযোগ, নারী ক্ষমতায়ন ও মানব উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে সামনে এসেছে নতুন চ্যালেঞ্জ—গণতন্ত্রের সংকট, তরুণদের কর্মসংস্থান, জলবায়ু ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের আগামীর নেতৃত্ব কেমন হওয়া উচিত?

এটি শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্ন নয়; প্রশাসন, ব্যবসা, শিক্ষা, নাগরিক সমাজ—সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

১. দূরদর্শী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাভিত্তিক নেতৃত্ব

বাংলাদেশে উন্নয়ন অনেক সময় প্রকল্পনির্ভর ও স্বল্পমেয়াদি হয়ে পড়ে। আগামী দিনের নেতৃত্বকে হতে হবে “ইলেকশন-সাইকেল” নয়, বরং “প্রজন্ম-সাইকেল” চিন্তায় বিশ্বাসী।

অর্থাৎ—

২০–৩০ বছরের মাস্টার প্ল্যান

নগরায়ণ, পরিবহন ও পরিবেশের সমন্বিত নকশা

মানবসম্পদ উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ

শুধু আজকের ভোট নয়, ভবিষ্যৎ সন্তানের জীবনমানকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।

২. সৎ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব

দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় বাধা। অবকাঠামো গড়ে উঠলেও যদি আস্থার ঘাটতি থাকে, উন্নয়ন টেকসই হয় না।

আগামীর নেতৃত্বে থাকতে হবে—

সম্পদের প্রকাশ্য ঘোষণা

স্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা

সরকারি ক্রয়ে পূর্ণ ডিজিটাল স্বচ্ছতা

সংসদ ও গণমাধ্যমের কার্যকর নজরদারি

নেতৃত্ব মানে সুবিধা নয়, দায়বদ্ধতা—এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

৩. দক্ষ ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা

বাংলাদেশে এখনও দলীয় আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আগামীর নেতৃত্বকে এই ধারা ভাঙতে হবে।

প্রয়োজন—

মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি

আধুনিক সিভিল সার্ভিস সংস্কার

নীতি নির্ধারণে গবেষক ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তি

তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ

রাষ্ট্র পরিচালনা হবে “ক্যাডার বনাম ক্যাডার” নয়, বরং “ডেটা বনাম অনুমান”-এর ভিত্তিতে।

৪. তরুণ ও নারীকেন্দ্রিক নেতৃত্ব

বাংলাদেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সী। অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের অংশগ্রহণ সীমিত।

আগামীর নেতৃত্বে থাকতে হবে—

যুব প্রতিনিধিত্ব

স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের নীতি সহায়তা

আধুনিক স্কিল ট্রেনিং

নারীদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন

তরুণরা শুধু ভোটার নয়—তারা ভবিষ্যতের নির্মাতা।

৫. মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি

উন্নয়ন শুধু জিডিপি নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের মর্যাদা।

নেতৃত্বকে নিশ্চিত করতে হবে—

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা

প্রতিবন্ধী ও প্রবীণবান্ধব নীতি

ধর্ম ও মতভেদে সহনশীল সমাজ

শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার

একটি দেশ তখনই এগোয়, যখন সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটিও রাষ্ট্রের উপস্থিতি অনুভব করে।

৬. পরিবেশ ও জলবায়ু সচেতন নেতৃত্ব

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি।

আগামীর নেতৃত্বে থাকতে হবে—

সবুজ অর্থনীতি

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ

নদী ও বন রক্ষা

জলবায়ু অভিবাসন পরিকল্পনা

উন্নয়ন যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তা ভবিষ্যৎকে ঋণগ্রস্ত করে।

৭. ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি

বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। বাংলাদেশকে হতে হবে—

কারও উপগ্রহ নয়, অংশীদার

পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে ভারসাম্য রক্ষাকারী

রপ্তানি বহুমুখীকরণে সক্রিয়

প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় দৃঢ়

জাতীয় স্বার্থই হবে কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

৮. গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার

শক্তিশালী উন্নয়ন টেকসই হয় তখনই, যখন নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে।

আগামীর নেতৃত্বে চাই—

বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন

স্বাধীন বিচারব্যবস্থা

কার্যকর বিরোধী দল

শক্তিশালী স্থানীয় সরকার

গণতন্ত্র উন্নয়নের শত্রু নয়—বরং তার নিরাপত্তা বলয়।

পরিশেষে বলতে হয়- বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন বিশাল, ঝুঁকিও তেমনি গভীর। এই বাস্তবতায় আগামীর নেতৃত্বকে হতে হবে সাহসী, সৎ, দক্ষ ও মানবিক।

শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি নয়—রাষ্ট্র গড়ার রাজনীতি প্রয়োজন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নেতৃত্ব জনগণের ওপরে নয়—জনগণের পাশে দাঁড়াবে।

মাহবুবুর রহমান, সাংবাদিক, লেখক, কলামিষ্ট।