মন্তব্য প্রতিবেদন
গৌতম চক্রবর্ত্তী: ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া মানেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয় বরং সেখান থেকেই শুরু হয় রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অধ্যায়—ক্ষমতা হস্তান্তর। ব্যালট বাক্স বন্ধ হওয়ার পর আসল মূল্যায়ন শুরু হয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিপক্বতা এবং সংবিধানের প্রতি সবার আনুগত্য দিয়ে। নির্বাচন কেবল একটি দিন বা একটি ঘটনার নাম নয় এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার শেষ ধাপটি যত স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ হয়, গণতন্ত্র তত দৃঢ় হয়।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফলাফল ঘোষণার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করে, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ পড়ান, সংসদ অধিবেশন বসে এবং স্পিকার নির্বাচিত হন- এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক রীতি। কিন্তু যখন সংসদ অনুপস্থিত থাকে, স্পিকারের পদ শূন্য থাকে বা রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কীভাবে? এখানেই সংবিধানের অন্তর্নিহিত শক্তি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক ভারসাম্যের বিষয়টি সামনে আসে। সংবিধান কেবল লিখিত বিধান নয় এটি একটি কার্যকর কাঠামো যা সংকটের মধ্যেও পথ দেখানোর জন্যই নির্মিত।
এমন রূপান্তরকালীন মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় ও প্রতীকী—কারণ নির্বাহী ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক বৈধতা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তার দপ্তরেই ন্যস্ত। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষভাবে ফলাফল যাচাই ও প্রকাশ এবং বিচার বিভাগের প্রয়োজনীয় আইনি ব্যাখ্যা পুরো প্রক্রিয়াকে বৈধতা ও ভারসাম্য দেয়। অর্থাৎ সংসদ সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকলেও রাষ্ট্র থেমে যায় না; বরং প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের পরিপূরক হয়ে শূন্যতা পূরণের সাংবিধানিক পথ খোঁজে। এই সমন্বয়ই গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার মূল সুরক্ষা।
তবে কেবল আইনি কাঠামো দিয়ে সব সংকট সামাল দেওয়া যায় না—রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে দেখা গেছে, সংকটের মুহূর্তে সংলাপ, সমঝোতা ও সহনশীলতাই উত্তেজনা কমিয়েছে এবং অনিশ্চয়তা দূর করেছে। ক্ষমতা হস্তান্তর যদি প্রতিশোধের মঞ্চে রূপ নেয়, তবে জনগণের রায় দুর্বল হয়ে পড়ে; আর যদি তা সংবিধান, সৌজন্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পথে এগোয়, তবে রাষ্ট্রীয় আস্থা আরও শক্ত হয়। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—বিরোধ থাকবে, মতভেদ থাকবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর সদিচ্ছাই স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রশাসনিক শূন্যতা। বিনিয়োগ পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা, কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাজারের আস্থা—সবকিছুই নির্ভর করে একটি ধারাবাহিক ও বৈধ শাসন কাঠামোর ওপর। ক্ষমতা হস্তান্তরের মুহূর্তে আবেগ নয়, প্রয়োজন দূরদর্শিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, প্রয়োজন দায়িত্ববোধ। জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের কর্তব্য পালন করেছে—এখন রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পালা সেই রায়ের মর্যাদা রক্ষা করার।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি, দল বা পদকে ঘিরে নয় – প্রশ্নটি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, আস্থা এবং ভবিষ্যৎকে ঘিরে। শপথ কে পড়াবেন বা কোন ভবনে সরকার বসবে—এসব আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও বড় বিষয় হলো পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ, কতটা সংবিধানসম্মত এবং কতটা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি এখানেই—ভোটের পরও রাষ্ট্র থেমে থাকে না বরং নতুন আস্থা, নতুন দায়িত্ব এবং নতুন প্রত্যাশাকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। সেই এগিয়ে চলার পথ যত বেশি ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, ততই দৃঢ় হবে নাগরিকের বিশ্বাস, ততই পরিণত হবে গণতন্ত্রের ভিত্তি।




