দি ক্রাইম ডেস্ক: নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এখনো শপথ নেননি। কবে তাদের শপথ পড়ানো হবে তার তারিখও ঘোষণা করা হয়নি। গত রাত পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি গেজেটও। এরপরও চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আলোচনা শুরু হয়েছে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভা নিয়ে। মন্ত্রিসভায় কয়জন স্থান পাবেন, কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন; এসব নিয়েই চলছে দলের ভেতরে–বাইরে নানা আলোচনা। সাথে শরীক দলের বা বিরোধী দলের কাউকে মন্ত্রিসভায় রাখা হবে কিনা সেটা নিয়েও আছে নানা গুঞ্জন।
বিএনপির চট্টগ্রামের নেতারা মনে করেন, অতীতের ন্যায় নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায়ও গুরুত্ব পাবে চট্টগ্রাম। সর্বশেষ ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ১৯৩ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। একই বছরের ১০ অক্টোবর গঠন করে মন্ত্রিসভা। পর্যায়ক্রমে ওই মন্ত্রিসভায় চট্টগ্রাম জেলা থেকে স্থান পান ৫ জন। এর বাইরে চট্টগ্রাম থেকে ছিলেন প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার জাতীয় সংসদ–এর হুইপ ও মন্ত্রী মর্যদায় সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টাও। ফলে পূর্বের ধারাবাহিকতায় এবারও চট্টগ্রাম থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী রাখা হতে পারে। এক্ষেত্রে আলোচনায় আছেন ৬ নেতা। নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রাম দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং বাণিজ্যিক রাজধানী। আবার এবারের নির্বাচনে জয়ের দিকেও ভালো করেছে চট্টগ্রাম। সবমিলিয়ে আশা করছি অতীতের ন্যায় এবারও রাষ্ট্র পরিচালনায় চট্টগ্রাম থেকে আশানুরূপ অংশগ্রহণ থাকবে। সেক্ষেত্রে দলের জন্য কতটুকু অবদান আছে সেটা যেমন দেখতে হবে, পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যোগ্য ও মেধাবী কিনা সেটাও দেখতে হবে।
আলোচনায় যারা :
চট্টগ্রাম থেকে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন এমন নেতাদের মধ্যে আলোচনায় আছেন ৬ জন। এরা হচ্ছেন– চট্টগ্রাম–১১ আসন থেকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম– ৫ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম–৯ আসন থেকে নির্বাচিত আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম–১০ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয়তাবাদী পাট শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাঈদ আল নোমান। আলোচনায় আছেন চট্টগ্রাম–৬ আসন থেকে নির্বাচিত গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারও।
জানা গেছে, আলোচিতদের মধ্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নাম আছে সবার শীর্ষে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি পররাষ্ট্র বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন বলেও জোর আলোচনা চলছে। তিনি ২০০১ সালেও মন্ত্রী ছিলেন। এছাড়া ১৯৯১ সালে তৎকালীন নির্বাচনী এলাকা–৮ (ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, বন্দর) আসন থেকে উপ–নির্বাচনে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও একই এলাকা থেকে নির্বাচিত হন।
আলোচনায় থাকা ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ও সাঈদ আল নোমান; এই দুইজনের কেউ একজন প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হতে পারেন বলেও গুঞ্জন আছে।
কেন্দ্রীয় বিএনপির একাধিক নেতার সাথে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, বিএনপি এবার মন্ত্রিসভায় তারুণ্যকে মূল্যায়ন করবে। সেক্ষেত্রে তরুণ সংসদ সদস্যদের দলের প্রতি অবদানের পাশাপাশি শিক্ষাসহ বিভিন্ন যোগ্যতা খতিয়ে দেখা হবে। চট্টগ্রাম থেকে আলোচনায় থাকা দুই তরুণের মধ্যে উচ্চ শিক্ষিত মীর হেলাল দীর্ঘদিন ধরে দলের আন্দোলন–সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। আবার সাঈদ আল নোমানও উচ্চ শিক্ষিত। তিনি অঙফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমফিল এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমসিঙ অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল মিশিগান ইউনিভার্সিটি থেকেও স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন।
সাধারণত চট্টগ্রাম–৯ আসন থেকে দলের কেউ নির্বাচিত হলে তাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়ার প্র্যাক্টিস আছে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে। সেক্ষেত্রে এবার এ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান মন্ত্রিসভায় ‘প্রতিমন্ত্রী’ হিসেবে স্থান পেতে পারে বলে দাবি করেছেন তার অনুসারিরা।
বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তারুণ্যের পাশাপাপাশি প্রবীণদেরও মূল্যায়ন করা হবে মন্ত্রিসভায়। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রাম থেকে প্রবীণ হিসেবে মন্ত্রিসভার জন্য আলোচনায় আছেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদ নির্বাচনেও রাউজান থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারও টেকনোক্রেট মন্ত্রী হতে পারেন বলেও দাবি তার অনুসারিদের। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রাউজান থেকে গিয়াস কাদের চৌধুরীর পাশাপাশি দলের প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন গোলাম আকবরও। যদিও শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত মনোনয়ন পান গিয়াস কাদের। গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারিদের দাবি, দল মনোনয়ন না দিলেও মূল্যায়ন করবে তাকে। সেক্ষেত্রে মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাউজান থেকে থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা যে কারণে :
২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গঠিত বিএনপি সরকারের সর্বশেষ মন্ত্রিসভায় চট্টগ্রাম থেকে পর্যায়ক্রমে স্থান পান ৫ জন। ফলে এবারও আশাবাদী চট্টগ্রামবাসী। তারা বলছেন, চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন। বন্দরের অবস্থান এবং ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে চট্টগ্রামের আলাদা গুরুত্ব আছে পুরো বাংলাদেশসহ দাক্ষণ এশিয়ায়। কাজেই গুরুত্ব বিবেচনায় সব সরকারই চট্টগ্রামের নেতাদের প্রাধান্য দেয় তাদের মন্ত্রিসভায়। এমনকি সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও চট্টগ্রাম থেকে ৫জন মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। কাজেই অতীতের ন্যায় এবারও বিএনপি চট্টগ্রামকে মূল্যায়ন করবে।
জানা গেছে, ২০০১ সালে গঠিত বিএনপি সরকারে চট্টগ্রাম থেকে মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া ৫ জনের মধ্যে পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও এল কে সিদ্দিকী। প্রতিমন্ত্রী ছিলেন জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ও মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন।
এর মধ্যে আবদুল্লাহ আল নোমান ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০২ সালের ১১ মার্চ পর্যন্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৩ মার্চ থেকে সরকারের শেষ পর্যন্ত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৪ সালের ২৫ পর্যন্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন। ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মোরশেদ খান। সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এল কে সিদ্দিকী ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ২২ মে পর্যন্ত পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের (বর্তমানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়) প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৫ সালের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।
এছাড়া সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। জাতীয় সংসদের হুইপ ছিলেন সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম। জাতীয় সংসদের হুইপ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করেন।




