নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক বাস্তবায়নরত সেক্টর-১৮,উত্তরা-তে অবস্থিত ‘রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প (রুয়াপ) এর উন্নয়ন কাজে সময়ক্ষেপণ,ব্যাপক দুর্ণীতি ও নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আজ শনিবার (২৪ মে)সকাল ১০টায় রুয়াপ এলাকার ৭৯টি আবাসিক ভবনের মোট ৬,৬৩৬ জন ফ্ল্যাট মালিকের সমন্বয়ে এক বিশাল মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্টিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন,রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর আবাসন সমস্যার নিরসনের কল্পে তুরাগ থানার আওতাধীন সেক্টর-১৮, উত্তরা-তে দেশের সর্ববৃহৎ আবাসন প্রকল্পটি ২০১১-২০১৬ মেয়াদে সম্পন্ন করে ৬,৬৩৬ জন বরাদ্দপ্রাপ্তকে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে ২০১৭ সাল থেকে অদ্যাবধি অতিরিক্ত আরও ৮ বছর সময় পার করেও নানা দুর্ণীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে খুবই নিম্নমানের কাজ করে শেষ করা প্রতিটি ১৫ তলা বিশিষ্ট ৭৯টি ভবনের ৬,৬৩৬টি ফ্ল্যাট ও অন্যান্য অনাবাসিক স্থাপনার কাজ চুড়ান্তভাবে শেষ না করেই ৩০ জুন ২০২৫ সালে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করার পাঁয়তারা করছে।

বক্তারা বলেন, বরাদ্দপ্রাপ্ত ফ্ল্যাট মালিকগণ প্রকল্পের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের স্বপ্নপূরণের জন্য জীবন নিংড়ানো সঞ্চয় করা অর্থ পরিশোধের পরও তারা প্রসপ্রেক্টাস অনুযায়ী ঘোষিত মানের ফ্ল্যাট, ভবনের ইলেক্ট্রো-মেক্যানিক্যাল ডিভাইস এবং ক্যাম্পাসের অন্যান্য আবাসিক সুবিধাসমূহের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে নাই। সরকার কর্তৃক গ্রহণকৃত এই প্রকল্পে রাজউক কর্তৃপক্ষ (প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর) যে সকল বিষয়ে চরম অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার ফ্ল্যাট মালিকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে সরকারি অর্থের অপচয় এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর সাথে প্রতারণা করে প্রকল্পের কাজ পুরাপুরি ও মানসম্মতভাবে শেষ না করেই প্রকল্প সমাপ্ত করতে চলেছে।

যার কয়েকটি উদাহরণ:-

১। অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণঃ বাংলাদেশের এই সর্ববৃহৎ বহুতল এপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১১-২০১৬ মেয়াদে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্ত ২০১৬ সালের পর থেকে অদ্যাবধি অতিরিক্ত আরও ৮ বছর সময় পার হলেও প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন করতে পারে নাই। ফলে (ক) নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ৬,৬৩৬ জন বরাদ্দপ্রাপ্ত ফ্ল্যাট মালিককে ২০১৭ সাল থেকে ৩-৪ বছর এবং কারও কারও ক্ষেত্রে আরো অধিক সময় ২০-২৫ হাজার টাকা প্রতিমাসে বাসা ভাড়া করে থাকতে হয়েছে। ফলে বরাদ্ধ প্রাপ্ত ফ্ল্যাট মালিকগণের পকেট থেকে ৬০০-৭০০ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে।(খ) প্রকল্পের মেয়াদ ৮ বছর অতিরিক্ত হিসেবে চলমান থাকায় প্রকল্প পরিচালক, উপপরিচালক, প্রকৌশলী সহ কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা ও সুবিধাদি বাবদ শত শত কোটি টাকা সরকারী অর্থের অপচয় হয়েছে।

২। সুদসহ কিস্তি আদায়- রাজউক কর্তৃপক্ষ এপার্টমেন্ট ভবন এবং অন্যন্য অনাবাসিক সুবিধা নিশ্চিত না করেই ২০১৯ সাল থেকে ফ্ল্যাটের কিস্তির ওপর শতকরা ৯% হারে সুদ/বিলম্ব ফি আদায় করেছে। ফলে যে সকল ফ্ল্যাট মালিক রেজিষ্টেশন সম্পন্ন করেছে তাদেরকে কোটি কোটি টাকা সুদ/বিলম্ব ফি দিতে হয়েছে। বিষয়টিতে সংক্ষুব্দ হয়ে ৩০০-৪০০ জন ফ্ল্যাটমালিক ২০১৮-২০ সময়ে উচ্চআদালতে আইনের আশ্রয় নিয়েছে এবং হাইকোর্ট থেকে সুদবিহীন কিস্তি পরিশোধে আদেশ পেয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এখনো সুরাহা হয় নাই। এছাড়া, প্রকল্প সম্পূর্নরুপে বসবাসযোগ্য না করে যে সকল ফ্লাট মালিকের কাছ থেকে সুদ/বিলম্ব ফি নেয়া হয়েছে তাদেরকে রাজউক কর্তৃক প্রাপ্য টাকা ফেরত প্রদান করতে হবে।

৩। ফ্ল্যাট বরাদ্দকারীদের বাধ্যতামুলকভাবে পজেশন পেপারে স্বাক্ষর করতে হয়েছেঃ ভবন নির্মাণ কাজ শেষে বরাদ্দকারীদের চাবি ও ফ্ল্যাট বুঝে নেবার জন্য পত্র প্রদান করা হয় এবং সেই লক্ষে বরাদ্ধপ্রাপ্ত মালিকগণ মতিঝিলস্থ রাজউক অফিসে গেলে কোনরুপ ফ্ল্যাট পরিদর্শনের পুর্বেই ফ্ল্যাট বুঝে পেয়েছি মর্মে সকল ফ্ল্যাট মালিক পজেশন পেপার স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছে। পরবর্তীতে ফ্ল্যাট মালিকগণ রুয়াপ প্রজেক্টে এসে ভবন কন্ট্রাক্টরদের নিকট পজেশন পেপারের কপি জমা দিয়ে চাবি বুঝে নিতে হয়েছে। চাবি নিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খোলার পর বাথরুমের বাইরের দেয়ালে ড্যাম্প, বিভিন্ন স্থানে টাইলস ভাংগা, বিভিন্ন ফিটিংস ভাংগাসহ নানা অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। ভবন কন্ট্রাকটরদের নিকট এই বিষয়ে অভিযোগ করলে রাজউকের অনুমতিক্রমে এগুলো ঠিক করা হবে মর্মে তারা জানায়। কিন্ত পপরবর্তীতে কোন কিছুই তারা ঠিক করে দেয় নাই। ফলশ্রুতিতে, প্রত্যেক ফ্ল্যাট মালিককে ১-৫ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। যাতে সকল ফ্ল্যাট মালিককে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বেশী অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

৪। ভবন ও ফ্ল্যাট নির্মাণে কাজের মানঃ রুয়াপে বরাদ্দপ্রাপ্ত সকল ফ্ল্যা্ট মালিকগণ ফ্ল্যাট বুঝে পাবার পর ফ্ল্যাট ও ভবনের সিভিল নির্মাণ কাজ মান (ছাদে পানি জমা, পার্কিং এর টাইলস নিম্নমানের ও ভাংগা, বেসমেন্ট ও ছাদের ট্যাংকি থেকে পানি চুয়ানো ইত্যাদি) নিয়ে ব্যাপকভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং রাজউক অফিসে এবিষয়ে অভিযোগ জানানো হলে তারা এ পর্যন্ত কখনো কোন বিষয়ে কর্ণপাত করে নাই।

৫। রুয়াপ ক্যাম্পাসের প্রবেশদ্বার ও সার্বিক নিরাপত্তাঃ প্রকল্পের প্রসপেক্টাস অনুযায়ী আধুনিক মানের সুরক্ষিত প্রবেশদ্বার এবং নিরাপত্তার কথা উল্লেখ থাকলেও রুয়াপ ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরাসহ ৬টি প্রবেশদ্বারের কোনোটিতেই কার্য্যকর ব্যবস্থা আজও স্থাপন করা হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত রুয়াপে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। প্রকল্প সমাপ্তি ঘোষণা করার পূর্বেই রাজউক কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বলে তারা জোর দাবী জানান।

৬। পার্কিং বিল্ডিং, মসজিদ, সুইমিং পুল, এবং উম্মুক্ত পার্কিং নির্মানঃ রুয়াপ ক্যাম্পাসে বর্তমানে ২-টাওয়ারের ভবনের ঘাটতি পূরনের জন্য নতুন পার্কিং বিল্ডিং, ৪-তলা মসজিদ, এবং সুইমিং পুল নির্মান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী জুন-২৫ এর আগে এসকল কাজ শেষ করার কোন সম্ভাবনা নাই।এছাড়া, পরিকল্পনা অনুযায়ী হাসনাহেন ও সন্ধ্যামালতি ভবনের সামনে রুয়াপে আগত গেস্টদের জন্য উম্মুক্ত পার্কিং নির্মান কাজ আজও শুরু করা হয়নি। তাই, রাজউকের প্রকল্প সমাপনের নামে এসব টালবাহানা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য হতে পারেনা।

৭। ফায়ার হায়ড্রেন্ট সিস্টেম- পিডব্লিউডির ২০১৪ সালের সিডিউল অনুযায়ী ৯ তলার বেশী উচ্চতা সম্পন্ন ভবনের জন্য ক্রাইসিস সময়ে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য ডিজেল চালিত অটো-জেনারেটর (৫৫০ জিপিএম ক্ষমতা সম্পন্ন) স্থাপনের বিধান থাকলেও ৭৯টি ভবনের কোনোটিতেই তা স্থাপন করা হয়নি।

৮। ভবনে স্থাপিত ইলেক্টো-মেকানিক্যাল ডিভাইস সমূহের মান সম্পর্কে ফ্ল্যাট মালিকগণ অবগত নয়ঃ প্রত্যেকটি ভবনে স্থাপিত লিফট, জেনারেটর, ট্রান্সফর্মার, ওয়াটারপাম্প, ফায়ার-হাইড্রেন্ট সিস্টেম, সোলার-প্যানেল সিস্টেম, ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে সংযোগ দেয়া গ্যাস পাইপ সিস্টেম, এসটিপি প্লান্ট, বজ্রপাত প্রতিরোধক সিস্টেমসহ সকল ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতির সিডিউল অনুযায়ী মান, ওয়ারেন্টি/ গ্যারান্টি ইত্যাদি বিষয়ে ফ্ল্যাট মালিকগণ অবগত করা এবং বুঝিয়ে দেওয়া হয় নাই। অতএব একটি থার্ড-পার্টি অডিটের মাধ্যমে প্রয়োজন কারেকশনের ব্যবস্থা করে রাজউক কর্তৃপক্ষকে তার প্রকল্প সমাপ্ত করা উচিত। নচেৎ ৭৯টি ভবনের ফ্ল্যাট মালিকগণকে নিম্ন মানের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল ডিভাইস নিয়েই আগামী দিনগুলো ভোগান্তির সাথে পার করতে হবে।

৯। ৪-টাওয়ার ভবন ও ২-টাওয়ার ভবনের কমন ফ্লোর স্পেসের বৈষম্যঃ সমান পরিমাণ টাকা প্রদান করা হলেও ৪-টাওয়ারের ভবনের তুলনায় ২-টাওয়ারের ভবনে কমনস্পেসের পরিমাণ অনেক অনেক কম। যার ফলে ২-টাওয়ারের ভবন সমূহে ২০-২৫ টা গাড়ি পার্কিং নাই, ভবন পরিচালনা কমিটির অফিস নাই, সিকিউরিটি/ড্রাইভার বসার রুম নাই এবং মাল্টিপারপার্স হলরুম ও সাধারণের চলাচলের পথ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই সংকীর্ন। গাড়ি পার্কিং বিষয়ে রাজউকের অতিরিক্ত ৫০ কোটি টাকা খরচ করে নতুন পার্কিং ভবন তৈরির কাজ চলমান থাকলেও, ২-টাওয়ারের ভবন সমূহে কমনস্পেসের পরিমাণ আর বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে না। ফলে এই অনিয়মের কারণে প্রকল্পের অতিরিক্ত ৫০ কোটি টাকা খরচের দায় প্রকল্প কর্মকর্তাদের ওপর বর্তায় এবং কম কমনস্পেস বরাদ্দ করায় ৪-টাওয়ার ভবনের সাথে তুলনা করে ২-টাওয়ারের ভবন মালিকদের আনুপাতিক হারে টাকা ফেরত প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

১০। সড়ক বাতি স্থাপনঃ রাজউকের বরাদ্দ অনুযায়ী ২০১৮ সাল থেকে ধাপে ধাপে রুয়াপ ক্যাম্পাসে বসবাসকারীগণ আগমন শুরু করলেও রুয়াপ ক্যাম্পাস গত ৭ বছর অন্ধকারে থাকার পর ২০২৫ সালের শুরুর দিকে সড়ক বাতি স্থাপনের কাজ শুরু হয়ে এখনো চলমান। নিরাপত্তা ইস্যুতে সড়ক বাতি স্থাপনের মতো মৌলিক চাহিদা সম্পন্ন গুরুত্বপুর্ণ এই কাজটিকে পাশ কাটিয়ে সময়ক্ষেপণ করার পিছনে রাজউকের কি উদ্দ্যেশ্য ছিল তা আজও বোধগম্য নয়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সেবা প্রদানে বিরত থেকেও রাজউক নিম্ন আয়ের ফ্ল্যাট বরাদ্দপ্রাপ্তদের ওপর সুদ/বিলম্ব ফি চাপিয়ে দেওয়ার মত ঘৃণ্য কাজ করেছে।

১১। রুয়াপ ক্যাম্পাসে বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন কার্যক্রমঃ- ভূমি ব্যবহার নকশা অনুযায়ী রাজউক কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে মাটি ভরাট ও সবুজায়ন/বনায়নের কাজ শুরু করা হলে আজ এই রুয়াপ ক্যাম্পাস সবুজে-শ্যমলে ভরপুর থাকতো। রাজউক কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমানভাবে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বৃক্ষরোপণের কাজ শুরু করলেও এখনো তা সমাপ্ত হয়নি এবং কারিগরী নির্দেশনা অনুযায়ী গাছ রোপণ ও ব্যবস্থাপনা যথাযথ না হওয়ায় সবুজায়ন কর্মসূচিটিও সফলতার মুখ দেখবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী আরো দুই বছর রাজউক কর্তৃক গাছ রোপণ ও পরিচর্যার কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

১২। মেইল পার্ক, ফিমেল পার্ক ও স্কেটিং গ্রাউন্ড:- রুয়াপ ক্যাম্পাসের ভূমি ব্যবহার নকশায় পুরুষদের জন্য ও নারীদের জন্য আলাদা দুটি পার্ক এবং শিশুদের জন্য একটি স্কেটিং গ্রাউন্ড চিহ্নিত করা রয়েছে। উল্লেখিত পার্ক দুটি এবং স্কেটিং গ্রাউন্ডটির বাস্তবায়ন কার্য্যক্রম চলমান থাকলেও অত্যন্ত নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করায় উদ্বোধনের আগেই পার্কের চলাচলের পথ ও স্কেটিং গ্রাউন্ডটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। এসব ফাটল ঢাকার জন্য রাজউক কন্ট্রাক্টর এখন রাস্তা রঙ করার কাজে ব্যস্ত। রাজউক কর্তৃপক্ষ আগামী জুন-২০২৫ এ প্রকল্প সমাপন করে এসব নিম্নমানের সিমেন্ট-বালুর কাজসমূহ ৬,৬৩৬ জন ফ্ল্যাটবাসীর ঘাড়ে ‘বোঝার উপর শাকের আটি’র মত চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয়কারী এই রাজউক কি এ দূর্নীতি থেকে পরিত্রান পেতে পারে?

১৩। শিশু পার্কঃ- পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজউক কর্তৃপক্ষ রুয়াপ ক্যাম্পাসে শিশুদের জন্য একটি পার্ক নির্মান করেছে। ঊদ্ভোধনের কয়েক মাস পর দেখা যাচ্ছে যে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যাবহার করে স্থাপিত এ পার্কটি এখনই তার জৌলুস হারিয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এই পার্কটি অচিরেই শিশুদের আনন্দ দেয়ার চেয়ে দুঃখ দিতে থাকবে।

১৪। প্রকল্পের দক্ষিণে পাশের বাউন্ডারি ওয়াল অসম্পূর্ণঃ- প্রকল্পের দক্ষিণে কুশিয়ারা ভবনের পাশের বাউন্ডারি ওয়ালটি আজও শেষ করা হয় নাই। এছাড়া, রুয়াপ ক্যাম্পাসের চতুর্দিকে নির্মিত দেওয়াল খুবই নিম্নমানের। যা বিভিন্ন স্থানে, ইতোমধ্যে, একাধিক স্থানের ইট ভেংগে চোর প্রবেশ করে বিভিন্ন ভবনের পানির পাম্প সহ অন্যান্য মুল্যবান যন্ত্রপাতি নিয়ে গেছে। রাজউক কর্তৃপক্ষের দূর্নীতি ও অনিয়মের এসব কাজের ফল এই নিরীহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীকে বহন করতে হচ্ছে।

১৫। রুয়াপ ক্যাম্পাসের কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি সেন্টারঃ- রাজউক তার প্রকল্পের আওতায় রুয়াপ ক্যাম্পাসে একটি কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি সেন্টার নির্মান করেছে। কিন্ত এ ভবন দুটি নির্মিত হলেও রাজউকের চরম অনিয়ম ও দূর্নীতির ফলে আজো ভবন দুটির পরিপূর্ন কার্য্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। ফলে হাজার হাজার বসবাসকারী এ স্থাপনা থেকে কোনো উপকার পাচ্ছে না। রাজউক এসকল বিষয়ে কোন সঠিক পদক্ষেপ না নিয়েই প্রকল্প সমাপ্ত করতে চাইলে তা রুয়াপবাসী প্রতিহত করবে।

১৬। রুয়াপ ক্যাম্পাসের ফ্ল্যাটে গৃহস্থালী রান্নার কাজে এলপিজি গ্যাস সংযোগঃ প্রকল্পের প্রসপেক্টাস অনুযায়ী রুয়াপ ক্যাম্পাসের ফ্ল্যাটে গৃহস্থালী রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও আজও রাজউক সে ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে পারেনি। রাজউক এ কাজে বসুন্ধরা এলপিজি গ্যাস কোম্পানিকে নিয়োজিত করলেও বসুন্ধরা অদ্যাবধি ৫০ ভাগ ভবনেও গ্যাস সংযোগ প্রদান করতে সক্ষম হয়নি। এসকল কাজ সমাপ্ত না করে রাজউক কিভাবে প্রকল্প সমাপনের চিন্তা করতে পারে!

১৭। রুয়াপ প্রকল্পের জমি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রয়ঃ- কম-বেশী প্রায় ১০০ একর ভূমিতে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পটির একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূমি রাজউক কর্তৃপক্ষ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে একটি ব্যবসায়ীক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করে দিয়ে প্রকল্পের হাজার হাজার সুবিধাভোগীর সাথে অবিশ্বাসী আচরণ করেছে। যার ফলে চার দেয়ালে বেষ্টিত সম্পূর্ণ এ আবাসিক এলাকাটির নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। রাজউক এ বিষয়টিও সমাধান না করে কোনভাবেই প্রকল্প সমাপ্ত করতে পারেনা।তারা (রুয়াপবাসী) এর প্রতিকার চায়।

১৮। বিভিন্ন সেবা-সুবিধা অনুপস্থিতঃ- রুয়াপ ক্যাম্পাসের বর্তমানে বসবাসরত প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের জন্য সরকারিভাবে স্থাপিত কোন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ডাকঘর, ব্যাংক, ইত্যাদি সেবাসুবিধা অনুপস্থিত।

১৯। কবরস্থান ও শশ্মান:- বিশাল এই জনগোষ্ঠীর জন্য প্রকল্পের সন্নিকটে কবরস্থান ও শশ্মানের জন্য কোনো জায়গা বরাদ্দ নাই।

২০। রুয়াপ সোসাইটি (ব্লক-এ) এর জন্য নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থাঃ রুয়াপ সোসাইটি ব্লক-এ (কেন্দ্রীয় কমিটি) এর কার্য্ক্রম পরিচালনার জন্য রাজউক থেকে একটি থোক বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত আয়ের উৎস হিসেবে কমার্শিয়াল ভবনের কমিউনিটি সেন্টারসহ মার্কেট ভবনের এক বা একাধিক ফ্লোর বরাদ্দ দেওয়া আবশ্যক।

রুয়াপবাসী উল্লেখিত সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রাজউক কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক বাস্তবায়নরত সেক্টর-১৮,উত্তরা-তে অবস্থিত ‘রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প (রুয়াপ) এর উন্নয়ন কাজে সময়ক্ষেপণ,ব্যাপক দুর্ণীতি ও নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আজ শনিবার (২৪ মে)সকাল ১০টায় রুয়াপ এলাকার ৭৯টি আবাসিক ভবনের মোট ৬,৬৩৬ জন ফ্ল্যাট মালিকের সমন্বয়ে এক বিশাল মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্টিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন,রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর আবাসন সমস্যার নিরসনের কল্পে তুরাগ থানার আওতাধীন সেক্টর-১৮, উত্তরা-তে দেশের সর্ববৃহৎ আবাসন প্রকল্পটি ২০১১-২০১৬ মেয়াদে সম্পন্ন করে ৬,৬৩৬ জন বরাদ্দপ্রাপ্তকে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে ২০১৭ সাল থেকে অদ্যাবধি অতিরিক্ত আরও ৮ বছর সময় পার করেও নানা দুর্ণীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে খুবই নিম্নমানের কাজ করে শেষ করা প্রতিটি ১৫ তলা বিশিষ্ট ৭৯টি ভবনের ৬,৬৩৬টি ফ্ল্যাট ও অন্যান্য অনাবাসিক স্থাপনার কাজ চুড়ান্তভাবে শেষ না করেই ৩০ জুন ২০২৫ সালে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করার পাঁয়তারা করছে।

বক্তারা বলেন, বরাদ্দপ্রাপ্ত ফ্ল্যাট মালিকগণ প্রকল্পের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের স্বপ্নপূরণের জন্য জীবন নিংড়ানো সঞ্চয় করা অর্থ পরিশোধের পরও তারা প্রসপ্রেক্টাস অনুযায়ী ঘোষিত মানের ফ্ল্যাট, ভবনের ইলেক্ট্রো-মেক্যানিক্যাল ডিভাইস এবং ক্যাম্পাসের অন্যান্য আবাসিক সুবিধাসমূহের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে নাই। সরকার কর্তৃক গ্রহণকৃত এই প্রকল্পে রাজউক কর্তৃপক্ষ (প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর) যে সকল বিষয়ে চরম অনিয়ম ও দূর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার ফ্ল্যাট মালিকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে সরকারি অর্থের অপচয় এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর সাথে প্রতারণা করে প্রকল্পের কাজ পুরাপুরি ও মানসম্মতভাবে শেষ না করেই প্রকল্প সমাপ্ত করতে চলেছে।

যার কয়েকটি উদাহরণ:-

১। অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণঃ বাংলাদেশের এই সর্ববৃহৎ বহুতল এপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১১-২০১৬ মেয়াদে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্ত ২০১৬ সালের পর থেকে অদ্যাবধি অতিরিক্ত আরও ৮ বছর সময় পার হলেও প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন করতে পারে নাই। ফলে (ক) নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ৬,৬৩৬ জন বরাদ্দপ্রাপ্ত ফ্ল্যাট মালিককে ২০১৭ সাল থেকে ৩-৪ বছর এবং কারও কারও ক্ষেত্রে আরো অধিক সময় ২০-২৫ হাজার টাকা প্রতিমাসে বাসা ভাড়া করে থাকতে হয়েছে। ফলে বরাদ্ধ প্রাপ্ত ফ্ল্যাট মালিকগণের পকেট থেকে ৬০০-৭০০ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে।(খ) প্রকল্পের মেয়াদ ৮ বছর অতিরিক্ত হিসেবে চলমান থাকায় প্রকল্প পরিচালক, উপপরিচালক, প্রকৌশলী সহ কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা ও সুবিধাদি বাবদ শত শত কোটি টাকা সরকারী অর্থের অপচয় হয়েছে।

২। সুদসহ কিস্তি আদায়- রাজউক কর্তৃপক্ষ এপার্টমেন্ট ভবন এবং অন্যন্য অনাবাসিক সুবিধা নিশ্চিত না করেই ২০১৯ সাল থেকে ফ্ল্যাটের কিস্তির ওপর শতকরা ৯% হারে সুদ/বিলম্ব ফি আদায় করেছে। ফলে যে সকল ফ্ল্যাট মালিক রেজিষ্টেশন সম্পন্ন করেছে তাদেরকে কোটি কোটি টাকা সুদ/বিলম্ব ফি দিতে হয়েছে। বিষয়টিতে সংক্ষুব্দ হয়ে ৩০০-৪০০ জন ফ্ল্যাটমালিক ২০১৮-২০ সময়ে উচ্চআদালতে আইনের আশ্রয় নিয়েছে এবং হাইকোর্ট থেকে সুদবিহীন কিস্তি পরিশোধে আদেশ পেয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এখনো সুরাহা হয় নাই। এছাড়া, প্রকল্প সম্পূর্নরুপে বসবাসযোগ্য না করে যে সকল ফ্লাট মালিকের কাছ থেকে সুদ/বিলম্ব ফি নেয়া হয়েছে তাদেরকে রাজউক কর্তৃক প্রাপ্য টাকা ফেরত প্রদান করতে হবে।

৩। ফ্ল্যাট বরাদ্দকারীদের বাধ্যতামুলকভাবে পজেশন পেপারে স্বাক্ষর করতে হয়েছেঃ ভবন নির্মাণ কাজ শেষে বরাদ্দকারীদের চাবি ও ফ্ল্যাট বুঝে নেবার জন্য পত্র প্রদান করা হয় এবং সেই লক্ষে বরাদ্ধপ্রাপ্ত মালিকগণ মতিঝিলস্থ রাজউক অফিসে গেলে কোনরুপ ফ্ল্যাট পরিদর্শনের পুর্বেই ফ্ল্যাট বুঝে পেয়েছি মর্মে সকল ফ্ল্যাট মালিক পজেশন পেপার স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছে। পরবর্তীতে ফ্ল্যাট মালিকগণ রুয়াপ প্রজেক্টে এসে ভবন কন্ট্রাক্টরদের নিকট পজেশন পেপারের কপি জমা দিয়ে চাবি বুঝে নিতে হয়েছে। চাবি নিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খোলার পর বাথরুমের বাইরের দেয়ালে ড্যাম্প, বিভিন্ন স্থানে টাইলস ভাংগা, বিভিন্ন ফিটিংস ভাংগাসহ নানা অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। ভবন কন্ট্রাকটরদের নিকট এই বিষয়ে অভিযোগ করলে রাজউকের অনুমতিক্রমে এগুলো ঠিক করা হবে মর্মে তারা জানায়। কিন্ত পপরবর্তীতে কোন কিছুই তারা ঠিক করে দেয় নাই। ফলশ্রুতিতে, প্রত্যেক ফ্ল্যাট মালিককে ১-৫ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। যাতে সকল ফ্ল্যাট মালিককে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বেশী অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

৪। ভবন ও ফ্ল্যাট নির্মাণে কাজের মানঃ রুয়াপে বরাদ্দপ্রাপ্ত সকল ফ্ল্যা্ট মালিকগণ ফ্ল্যাট বুঝে পাবার পর ফ্ল্যাট ও ভবনের সিভিল নির্মাণ কাজ মান (ছাদে পানি জমা, পার্কিং এর টাইলস নিম্নমানের ও ভাংগা, বেসমেন্ট ও ছাদের ট্যাংকি থেকে পানি চুয়ানো ইত্যাদি) নিয়ে ব্যাপকভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং রাজউক অফিসে এবিষয়ে অভিযোগ জানানো হলে তারা এ পর্যন্ত কখনো কোন বিষয়ে কর্ণপাত করে নাই।

৫। রুয়াপ ক্যাম্পাসের প্রবেশদ্বার ও সার্বিক নিরাপত্তাঃ প্রকল্পের প্রসপেক্টাস অনুযায়ী আধুনিক মানের সুরক্ষিত প্রবেশদ্বার এবং নিরাপত্তার কথা উল্লেখ থাকলেও রুয়াপ ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরাসহ ৬টি প্রবেশদ্বারের কোনোটিতেই কার্য্যকর ব্যবস্থা আজও স্থাপন করা হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত রুয়াপে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। প্রকল্প সমাপ্তি ঘোষণা করার পূর্বেই রাজউক কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বলে তারা জোর দাবী জানান।

৬। পার্কিং বিল্ডিং, মসজিদ, সুইমিং পুল, এবং উম্মুক্ত পার্কিং নির্মানঃ রুয়াপ ক্যাম্পাসে বর্তমানে ২-টাওয়ারের ভবনের ঘাটতি পূরনের জন্য নতুন পার্কিং বিল্ডিং, ৪-তলা মসজিদ, এবং সুইমিং পুল নির্মান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী জুন-২৫ এর আগে এসকল কাজ শেষ করার কোন সম্ভাবনা নাই।এছাড়া, পরিকল্পনা অনুযায়ী হাসনাহেন ও সন্ধ্যামালতি ভবনের সামনে রুয়াপে আগত গেস্টদের জন্য উম্মুক্ত পার্কিং নির্মান কাজ আজও শুরু করা হয়নি। তাই, রাজউকের প্রকল্প সমাপনের নামে এসব টালবাহানা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য হতে পারেনা।

৭। ফায়ার হায়ড্রেন্ট সিস্টেম- পিডব্লিউডির ২০১৪ সালের সিডিউল অনুযায়ী ৯ তলার বেশী উচ্চতা সম্পন্ন ভবনের জন্য ক্রাইসিস সময়ে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য ডিজেল চালিত অটো-জেনারেটর (৫৫০ জিপিএম ক্ষমতা সম্পন্ন) স্থাপনের বিধান থাকলেও ৭৯টি ভবনের কোনোটিতেই তা স্থাপন করা হয়নি।

৮। ভবনে স্থাপিত ইলেক্টো-মেকানিক্যাল ডিভাইস সমূহের মান সম্পর্কে ফ্ল্যাট মালিকগণ অবগত নয়ঃ প্রত্যেকটি ভবনে স্থাপিত লিফট, জেনারেটর, ট্রান্সফর্মার, ওয়াটারপাম্প, ফায়ার-হাইড্রেন্ট সিস্টেম, সোলার-প্যানেল সিস্টেম, ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে সংযোগ দেয়া গ্যাস পাইপ সিস্টেম, এসটিপি প্লান্ট, বজ্রপাত প্রতিরোধক সিস্টেমসহ সকল ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতির সিডিউল অনুযায়ী মান, ওয়ারেন্টি/ গ্যারান্টি ইত্যাদি বিষয়ে ফ্ল্যাট মালিকগণ অবগত করা এবং বুঝিয়ে দেওয়া হয় নাই। অতএব একটি থার্ড-পার্টি অডিটের মাধ্যমে প্রয়োজন কারেকশনের ব্যবস্থা করে রাজউক কর্তৃপক্ষকে তার প্রকল্প সমাপ্ত করা উচিত। নচেৎ ৭৯টি ভবনের ফ্ল্যাট মালিকগণকে নিম্ন মানের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল ডিভাইস নিয়েই আগামী দিনগুলো ভোগান্তির সাথে পার করতে হবে।

৯। ৪-টাওয়ার ভবন ও ২-টাওয়ার ভবনের কমন ফ্লোর স্পেসের বৈষম্যঃ সমান পরিমাণ টাকা প্রদান করা হলেও ৪-টাওয়ারের ভবনের তুলনায় ২-টাওয়ারের ভবনে কমনস্পেসের পরিমাণ অনেক অনেক কম। যার ফলে ২-টাওয়ারের ভবন সমূহে ২০-২৫ টা গাড়ি পার্কিং নাই, ভবন পরিচালনা কমিটির অফিস নাই, সিকিউরিটি/ড্রাইভার বসার রুম নাই এবং মাল্টিপারপার্স হলরুম ও সাধারণের চলাচলের পথ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই সংকীর্ন। গাড়ি পার্কিং বিষয়ে রাজউকের অতিরিক্ত ৫০ কোটি টাকা খরচ করে নতুন পার্কিং ভবন তৈরির কাজ চলমান থাকলেও, ২-টাওয়ারের ভবন সমূহে কমনস্পেসের পরিমাণ আর বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে না। ফলে এই অনিয়মের কারণে প্রকল্পের অতিরিক্ত ৫০ কোটি টাকা খরচের দায় প্রকল্প কর্মকর্তাদের ওপর বর্তায় এবং কম কমনস্পেস বরাদ্দ করায় ৪-টাওয়ার ভবনের সাথে তুলনা করে ২-টাওয়ারের ভবন মালিকদের আনুপাতিক হারে টাকা ফেরত প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

১০। সড়ক বাতি স্থাপনঃ রাজউকের বরাদ্দ অনুযায়ী ২০১৮ সাল থেকে ধাপে ধাপে রুয়াপ ক্যাম্পাসে বসবাসকারীগণ আগমন শুরু করলেও রুয়াপ ক্যাম্পাস গত ৭ বছর অন্ধকারে থাকার পর ২০২৫ সালের শুরুর দিকে সড়ক বাতি স্থাপনের কাজ শুরু হয়ে এখনো চলমান। নিরাপত্তা ইস্যুতে সড়ক বাতি স্থাপনের মতো মৌলিক চাহিদা সম্পন্ন গুরুত্বপুর্ণ এই কাজটিকে পাশ কাটিয়ে সময়ক্ষেপণ করার পিছনে রাজউকের কি উদ্দ্যেশ্য ছিল তা আজও বোধগম্য নয়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সেবা প্রদানে বিরত থেকেও রাজউক নিম্ন আয়ের ফ্ল্যাট বরাদ্দপ্রাপ্তদের ওপর সুদ/বিলম্ব ফি চাপিয়ে দেওয়ার মত ঘৃণ্য কাজ করেছে।

১১। রুয়াপ ক্যাম্পাসে বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন কার্যক্রমঃ- ভূমি ব্যবহার নকশা অনুযায়ী রাজউক কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে মাটি ভরাট ও সবুজায়ন/বনায়নের কাজ শুরু করা হলে আজ এই রুয়াপ ক্যাম্পাস সবুজে-শ্যমলে ভরপুর থাকতো। রাজউক কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমানভাবে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বৃক্ষরোপণের কাজ শুরু করলেও এখনো তা সমাপ্ত হয়নি এবং কারিগরী নির্দেশনা অনুযায়ী গাছ রোপণ ও ব্যবস্থাপনা যথাযথ না হওয়ায় সবুজায়ন কর্মসূচিটিও সফলতার মুখ দেখবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী আরো দুই বছর রাজউক কর্তৃক গাছ রোপণ ও পরিচর্যার কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

১২। মেইল পার্ক, ফিমেল পার্ক ও স্কেটিং গ্রাউন্ড:- রুয়াপ ক্যাম্পাসের ভূমি ব্যবহার নকশায় পুরুষদের জন্য ও নারীদের জন্য আলাদা দুটি পার্ক এবং শিশুদের জন্য একটি স্কেটিং গ্রাউন্ড চিহ্নিত করা রয়েছে। উল্লেখিত পার্ক দুটি এবং স্কেটিং গ্রাউন্ডটির বাস্তবায়ন কার্য্যক্রম চলমান থাকলেও অত্যন্ত নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করায় উদ্বোধনের আগেই পার্কের চলাচলের পথ ও স্কেটিং গ্রাউন্ডটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। এসব ফাটল ঢাকার জন্য রাজউক কন্ট্রাক্টর এখন রাস্তা রঙ করার কাজে ব্যস্ত। রাজউক কর্তৃপক্ষ আগামী জুন-২০২৫ এ প্রকল্প সমাপন করে এসব নিম্নমানের সিমেন্ট-বালুর কাজসমূহ ৬,৬৩৬ জন ফ্ল্যাটবাসীর ঘাড়ে ‘বোঝার উপর শাকের আটি’র মত চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয়কারী এই রাজউক কি এ দূর্নীতি থেকে পরিত্রান পেতে পারে?

১৩। শিশু পার্কঃ- পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজউক কর্তৃপক্ষ রুয়াপ ক্যাম্পাসে শিশুদের জন্য একটি পার্ক নির্মান করেছে। ঊদ্ভোধনের কয়েক মাস পর দেখা যাচ্ছে যে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যাবহার করে স্থাপিত এ পার্কটি এখনই তার জৌলুস হারিয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এই পার্কটি অচিরেই শিশুদের আনন্দ দেয়ার চেয়ে দুঃখ দিতে থাকবে।

১৪। প্রকল্পের দক্ষিণে পাশের বাউন্ডারি ওয়াল অসম্পূর্ণঃ- প্রকল্পের দক্ষিণে কুশিয়ারা ভবনের পাশের বাউন্ডারি ওয়ালটি আজও শেষ করা হয় নাই। এছাড়া, রুয়াপ ক্যাম্পাসের চতুর্দিকে নির্মিত দেওয়াল খুবই নিম্নমানের। যা বিভিন্ন স্থানে, ইতোমধ্যে, একাধিক স্থানের ইট ভেংগে চোর প্রবেশ করে বিভিন্ন ভবনের পানির পাম্প সহ অন্যান্য মুল্যবান যন্ত্রপাতি নিয়ে গেছে। রাজউক কর্তৃপক্ষের দূর্নীতি ও অনিয়মের এসব কাজের ফল এই নিরীহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীকে বহন করতে হচ্ছে।

১৫। রুয়াপ ক্যাম্পাসের কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি সেন্টারঃ- রাজউক তার প্রকল্পের আওতায় রুয়াপ ক্যাম্পাসে একটি কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি সেন্টার নির্মান করেছে। কিন্ত এ ভবন দুটি নির্মিত হলেও রাজউকের চরম অনিয়ম ও দূর্নীতির ফলে আজো ভবন দুটির পরিপূর্ন কার্য্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। ফলে হাজার হাজার বসবাসকারী এ স্থাপনা থেকে কোনো উপকার পাচ্ছে না। রাজউক এসকল বিষয়ে কোন সঠিক পদক্ষেপ না নিয়েই প্রকল্প সমাপ্ত করতে চাইলে তা রুয়াপবাসী প্রতিহত করবে।

১৬। রুয়াপ ক্যাম্পাসের ফ্ল্যাটে গৃহস্থালী রান্নার কাজে এলপিজি গ্যাস সংযোগঃ প্রকল্পের প্রসপেক্টাস অনুযায়ী রুয়াপ ক্যাম্পাসের ফ্ল্যাটে গৃহস্থালী রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও আজও রাজউক সে ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে পারেনি। রাজউক এ কাজে বসুন্ধরা এলপিজি গ্যাস কোম্পানিকে নিয়োজিত করলেও বসুন্ধরা অদ্যাবধি ৫০ ভাগ ভবনেও গ্যাস সংযোগ প্রদান করতে সক্ষম হয়নি। এসকল কাজ সমাপ্ত না করে রাজউক কিভাবে প্রকল্প সমাপনের চিন্তা করতে পারে!

১৭। রুয়াপ প্রকল্পের জমি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রয়ঃ- কম-বেশী প্রায় ১০০ একর ভূমিতে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পটির একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূমি রাজউক কর্তৃপক্ষ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে একটি ব্যবসায়ীক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করে দিয়ে প্রকল্পের হাজার হাজার সুবিধাভোগীর সাথে অবিশ্বাসী আচরণ করেছে। যার ফলে চার দেয়ালে বেষ্টিত সম্পূর্ণ এ আবাসিক এলাকাটির নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। রাজউক এ বিষয়টিও সমাধান না করে কোনভাবেই প্রকল্প সমাপ্ত করতে পারেনা।তারা (রুয়াপবাসী) এর প্রতিকার চায়।

১৮। বিভিন্ন সেবা-সুবিধা অনুপস্থিতঃ- রুয়াপ ক্যাম্পাসের বর্তমানে বসবাসরত প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের জন্য সরকারিভাবে স্থাপিত কোন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ডাকঘর, ব্যাংক, ইত্যাদি সেবাসুবিধা অনুপস্থিত।

১৯। কবরস্থান ও শশ্মান:- বিশাল এই জনগোষ্ঠীর জন্য প্রকল্পের সন্নিকটে কবরস্থান ও শশ্মানের জন্য কোনো জায়গা বরাদ্দ নাই।

২০। রুয়াপ সোসাইটি (ব্লক-এ) এর জন্য নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থাঃ রুয়াপ সোসাইটি ব্লক-এ (কেন্দ্রীয় কমিটি) এর কার্য্ক্রম পরিচালনার জন্য রাজউক থেকে একটি থোক বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত আয়ের উৎস হিসেবে কমার্শিয়াল ভবনের কমিউনিটি সেন্টারসহ মার্কেট ভবনের এক বা একাধিক ফ্লোর বরাদ্দ দেওয়া আবশ্যক।

রুয়াপবাসী উল্লেখিত সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রাজউক কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।