খন রঞ্জন রায়: ৮ মার্চ আর্ন্তজাতিক নারী দিবস। বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশে রক্তিম বেদনার সাথে পালন করা হতো এই দিবস। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ নারী দিবসকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ায় তা জাতিসংঘভুক্ত দেশসমূহে পালন করা নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যায়। এই দিবস পালন করে জাদুকরী কিছু জন্ম না নিলেও নারীদের কর্মের প্রতি সমর্থন জানান দেয়। নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা আর নারী-পুরুষ বৈষম্য বিলোপের চেতনাসঞ্চারী কাজ করে জাতিসংঘ। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায়- ৩২/১৪২ নং সিদ্ধান্তের আলোকে ৮মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অনুরোধ করে। মূলত এই সিদ্ধান্তের পর থেকে নারীদের কদর অক্ষুণ্ন রেখে অবধারিতভাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে।

নারী জীবনের প্রতি এই দিবস আলাদা ছায়া ফেলেছে। অবশ্য নারী দিবসের জয়গান গেয়ে আসছে আরো অনেক আগে। বলা যায় শতাব্দী প্রাচীন এই দিবস। এই দিবস পালন নিয়ে রয়েছে এক বেদনার ইতিহাস। আনন্দ বিবর্জিত এক হৃদয়হীন নিমর্মতার ক্রূরতা। নিম্ন মজুরি, বৈষম্য কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নারীরা রাস্তায় নেমেছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের সুই কারখানার নারী শ্রমিকদের সময়ের বিপরীতে এই প্রতিবাদ রাষ্ট্রযন্ত্রের ভালো ঠেকেনি। ৮ মার্চ তারিখের এই প্রতিবাদী ঠান্ডা লড়াইয়ে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী দমনপীড়ন চালায়। নারী প্রতিবাদকারীরা তীরবিদ্ধ ঈগলের মতো অসহায় দাপাদাপি করতে থাকে। সকল দোদুল্যমানতা ফেলে আমেরিকার সুই কারখানার সকল নারী শ্রমিকরা একতাবদ্ধ হয়। মৌলিক ভাবনা নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলে।

অবিস্মরণীয় এক সত্তা হয়ে ৮ মার্চ ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে গঠন করে মহিলা শ্রমিক ইউনিয়ন। তাঁরা অন্যতম প্রধান উদ্যোগী হলেও এই আন্দোলন ক্রমশ আমেরিকা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিব্যাপ্ত হয়। সংবেদনশীল এই আবেগ অনুভূতির শক্ত অবস্থান তৈরি হতে থাকে। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে জার্মানির নারী নেত্রী ‘ক্ল্যারা জেটকিন’ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের ঘোষণা দেন। এরপর থেকে উন্মুক্ত ও উদার মননের প্রতীক হিসাবে অনেক দেশ বা রাষ্ট্র এই দিবস পালনের উদ্যোগী হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানে মহিলাদের অধিকার সমতা সর্বস্তরে অংশগ্রহণের সুযোগ রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি আলাদা অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়েছে। নারীদের যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষে সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন থাকছে। শুভ ও মঙ্গলবোধের প্রতীক হতে নারী শিক্ষার বিস্তার, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ ও নারীর ক্ষমতায়নে বিস্ময়কর শক্তি নিয়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। শুভ ও মঙ্গলবোধের প্রতীক হিসাবে নারী শব্দের ভেতরে অগণিত প্রশ্নের সূক্ষ্ণ সমাধান রয়েছে।

মায়াময়ী- মমতাময়ী অনেক অর্থবোধক শব্দের খোলা উৎস নারী। মানবী, রমণী, নন্দিনী, ভাবিনী, কামিনী, প্রমীলা, অবলা, মহিলা, বালা, বিজয়া, জয়ন্তী, অপরাজিতা, অন্তঃপুরিকা, অন্তঃপুরচারিণী, অন্তপুরবাসিনী, অষ্টনায়িকা, অবরোধবাসিনী, জানানা, জেনানা, শঙ্খিনী, পামিনী, রামা, রমা, ললনা, শর্বরী, কৌমরী ইত্যাদি হাজারো নামে স্ত্রীলোক, স্ত্রীসুলভ, স্ত্রী- জাতীয়, স্ত্রী জাতীয়া, নরম, নমনীয়, মসৃণ, কোমল, মেয়ে, মেয়েলী, নারী, তান্ত্রিক, মাতৃতান্ত্রিক ইত্যাদি বিষয়ে বিভূষিতা নারী মানবজীবনেরই প্রতিচ্ছবি।

সাহিত্যে নারীকে অতীন্দ্রিয় জগতের কখনো দেবী কখনো বা দানবী বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধর্মগ্রন্থগুলোয় নারী ভূমিকা নিয়ে কখনো তিমির চাদরে ঢেকে কখনো মানবমনের ভেতরের প্রতিরোধ্য শক্তি হিসাবে দেখানো হয়েছে। নারী ত্রাতা- দার্শনিক- মুনি- ঋষি- পথপ্রদর্শক হিসাবে উপস্থাপন রয়েছে। মনুসংহিতায় নারী জাতি ক্ষেত্রস্বরূপ এবং পুরুষ বীজস্বরূপ বলে মূল্যবান চিত্রায়ন হয়েছে।

হিন্দুধর্মের চিন্তা ও দর্শনে নারী অমিততেজ ও শক্তির প্রতীক। দুর্গা, কালী, লক্ষ্ণী, সরস্বতী, চণ্ডী, চামুণ্ডা সবই নারীশক্তির ছায়ারা ভেসে ওঠে। ধর্মীয় অনুভূতির সকল পথ বাতলাতে মঙ্গলামঙ্গলের বিষয় ভাবনায় স্ত্রী শক্তিকে উপস্থাপন করা হয়। নারী সবসময়ই সৃষ্টিশীল কল্পনা। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যথার্থই বলেছিলেন- ‘তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেব’।

ইসলাম ধর্মে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত বলা হয়েছে। সন্তান জন্মদানে মায়ের ভূমিকা বিশেষ উৎকর্ষের। নিরন্তর ক্রিয়াশীল আনন্দময়ী এই মাতৃত্ব নিয়েই নারীদের ভয়ংকর নির্মম অভিজ্ঞতা হয়। শুধু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মায়ের মধ্যে ১৬৫ জন মা মারা যান। জনস্বাস্থ্যবিদ ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞদের খুব নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফল সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কোনো নারীর প্রাণহানি ঘটলে তা মাতৃমৃত্যু বলে বিবেচিত হয়। গর্ভধারণজনিত জটিলতার কারণে, প্রসবকালে এবং প্রসব-পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে প্রাণহানি ঘটলেই তা মাতৃমৃত্যু।

বিখ্যাত স্বাস্থ্য সাময়িকী ‘ল্যানসেট’ গবেষণায় দেখা গেছে, মাতৃমৃত্যুর সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো প্রসবকালীন রক্তপাত, অনিরাপদ গর্ভপাত, গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ ব্যাধি, প্রসবকালীন সংক্রমণ, রক্তের জমাট ইত্যাদিত। এছাড়াও শিশু জন্মের সময় দক্ষ চিকিৎসকের যত্নের অভাব, প্রসবকালীন দক্ষ দাই বা প্রসবকর্মীর অপর্যাপ্ততা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নবজাতক ও মায়ের স্বাস্থ্য শক্তিশালী করার জন্য মিডওয়াইফ প্রশিক্ষণের আহ্বান জানায়। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর ব্যাপারে আলাদা অনুচ্ছেদ সংযোজন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেদনার সঙ্গে জানিয়েছে সারা বিশ্বের মাতৃমৃত্যুর ৯৯ শতাংশ ঘটে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। অর্ধেক ঘটে সাব সাহারার আফ্রিকায় আর এক তৃতীয়াংশ নিদারুণ দারিদ্রের দক্ষিণ এশিয়ায়। নিয়তিবাদী এই তথ্যে বাংলাদেশের জন্য বেশ খানিকটা স্বস্তিদায়ক।

দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। খ্যাতি কুড়ানো এই তথ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল- ইউনিসেফ। সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ আগামী ২০৩০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সন্তান প্রসবে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৫০ জনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রায় জোরালোভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর বাইরের ভয়ে হিম করে দেওয়া বিবেকহীনতার নানা সহিংসতা নারীকে পশ্চাদপদ গোষ্ঠীতে পরিণত করেছে। শিক্ষা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ৬০ ভাগ বালিকা। আফ্রিকা-এশিয়ায় শ্রমশক্তির ৬০ ভাগ মহিলা; খাদ্য উৎপাদনে ৮০ ভাগ ভূমিকা নারীদের। সারা বিশ্বের মোট খাদ্যের অর্ধেক উৎপাদন করে নারীরা। পরিস্কার পক্ষপাত নিয়ে মোট সম্পদের মাত্র ১ শতাংশের মালিক নারীরা।

জাতিসংঘের ‘ডেকলারেশন অন দ্য ডেকলারেশন অফ ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন’ থেকে যথার্থ বলা হয়- নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে প্রধান সামাজিক কৌশলগুলির মধ্যে একটি এবং ‘নারী ও পুরুষের মধ্যকার ঐতিহাসিক অসম ক্ষমতা সম্পর্কের প্রকাশ’। ভীতি সঞ্চারকারী এই উক্তি নারীর প্রতি বাস্তব সহিসংতার প্রতিফলন। সমগ্র বিশ্বজুড়ে তিনজন নারীর অন্তত একজনকে মারা হয়েছে বা জোরপূর্বক যৌনক্রিয়া করতে বাধ্য করা হয়েছে। নারীর প্রতিদিনের জীবনকে কলংকিত করছে ধর্ষণ, গৃহ নির্যাতন, যৌন হয়রানি, প্রজননগত জোরজবরদস্তি, কন্যা শিশু হত্যা, লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাত, প্রসবকালীন সহিংসতা, নারী খৎনা, জোরপূর্বক বিবাহ, জোরপূর্বক গর্ভপাত, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক বেশ্যাবৃত্তি, নারী পাচার, পাথর ছুঁড়ে হত্যা, চাবুক মারা, কখনো বা পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থের হৃদয়হীন নির্মমতা জানিয়ে নারী হত্যা বা অনারকিলিং-এর মতো নৃশংস ঘটনায় নারীরা মূল শেকড় থেকে ছিটকে পড়ে।

বিরামহীন ক্ষরণরত নারী শব্দের কাছাকাছি নারী সাফল্যও কম নয়। অতীতকাল থেকে ছিটেফোঁটা, মুষ্টিমেয় থাকলেও বর্তমানে তা ক্রমবর্ধমান। রাষ্ট্রীয় শাসনকাজ থেকে প্রযুক্তিগত, বুদ্ধিদীপ্ত, খেলাধুলা সকল ক্ষেত্রেই প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। নারীর সর্বক্ষেত্রে সুযোগপ্রাপ্তির অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের লড়াইয়ে সফল হচ্ছে। নারীরা এখন নিঃসঙ্গ একাকী নয়। বিংশ শতাব্দীর ঝলমলে জগতে দিবসকে নিয়ে আরো উচ্ছ্বাস প্রকাশ হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে রাশিয়া, বেলারুশ, ভিয়েতনাম, আর্মেনিয়া, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, উগান্ডা, ইউক্রেনসহ অনেক দেশ সরকারিভাবে ছুটি পালন করে। নেপাল, চীন, মাদাগাস্কারসহ আরো কিছু দেশে নারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ছুটি ভোগ করে। বাংলাদেশে সরকারিভাবে আনুষ্ঠানিক ছুটি না থাকলেও নারী কর্মী আধিক্যের প্রতিষ্ঠানসমূহে উৎপাদন বন্ধ থাকে।

নারীরা সামাজিক সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সামর্থ্যমতো সাজপোশাক, রূপচর্চার নারীসুলভ বৈশিষ্ট্যে আনন্দ প্রকাশ করে। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি,মাননীয় প্রধান উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ নারী দিবস উপলক্ষ্যে বিশ্বের সকল নারীর প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী প্রদান করেন। পত্র-পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র ও টেলিভিশনে টকশোর আয়োজন হয়। নারীবাদী সংগঠনসহ অনেক সংগঠন নারীর কর্মের প্রতি পূর্ণসমর্থন জানিয়ে সভা, সমাবেশ, আলোচনা, শোভাযাত্রা, পোস্টার প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কনসহ সৃজনশীল নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করে শিল্পিত চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। নারীর জীবনযুদ্ধের বেদনা নিরাময়ের ক্ষেত্রে ওষুধের কিছুটা প্রলেপ পড়ে নারী দিবসের এই দিনে মানবেতিহাসের অন্তঃস্রোতে প্রবাহমান নারীর স্বীকৃতিহীন কর্মময় জীবনধারার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি।

লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক

খন রঞ্জন রায়: ৮ মার্চ আর্ন্তজাতিক নারী দিবস। বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশে রক্তিম বেদনার সাথে পালন করা হতো এই দিবস। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ নারী দিবসকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ায় তা জাতিসংঘভুক্ত দেশসমূহে পালন করা নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যায়। এই দিবস পালন করে জাদুকরী কিছু জন্ম না নিলেও নারীদের কর্মের প্রতি সমর্থন জানান দেয়। নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা আর নারী-পুরুষ বৈষম্য বিলোপের চেতনাসঞ্চারী কাজ করে জাতিসংঘ। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায়- ৩২/১৪২ নং সিদ্ধান্তের আলোকে ৮মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অনুরোধ করে। মূলত এই সিদ্ধান্তের পর থেকে নারীদের কদর অক্ষুণ্ন রেখে অবধারিতভাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে।

নারী জীবনের প্রতি এই দিবস আলাদা ছায়া ফেলেছে। অবশ্য নারী দিবসের জয়গান গেয়ে আসছে আরো অনেক আগে। বলা যায় শতাব্দী প্রাচীন এই দিবস। এই দিবস পালন নিয়ে রয়েছে এক বেদনার ইতিহাস। আনন্দ বিবর্জিত এক হৃদয়হীন নিমর্মতার ক্রূরতা। নিম্ন মজুরি, বৈষম্য কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নারীরা রাস্তায় নেমেছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের সুই কারখানার নারী শ্রমিকদের সময়ের বিপরীতে এই প্রতিবাদ রাষ্ট্রযন্ত্রের ভালো ঠেকেনি। ৮ মার্চ তারিখের এই প্রতিবাদী ঠান্ডা লড়াইয়ে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী দমনপীড়ন চালায়। নারী প্রতিবাদকারীরা তীরবিদ্ধ ঈগলের মতো অসহায় দাপাদাপি করতে থাকে। সকল দোদুল্যমানতা ফেলে আমেরিকার সুই কারখানার সকল নারী শ্রমিকরা একতাবদ্ধ হয়। মৌলিক ভাবনা নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলে।

অবিস্মরণীয় এক সত্তা হয়ে ৮ মার্চ ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে গঠন করে মহিলা শ্রমিক ইউনিয়ন। তাঁরা অন্যতম প্রধান উদ্যোগী হলেও এই আন্দোলন ক্রমশ আমেরিকা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিব্যাপ্ত হয়। সংবেদনশীল এই আবেগ অনুভূতির শক্ত অবস্থান তৈরি হতে থাকে। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে জার্মানির নারী নেত্রী ‘ক্ল্যারা জেটকিন’ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের ঘোষণা দেন। এরপর থেকে উন্মুক্ত ও উদার মননের প্রতীক হিসাবে অনেক দেশ বা রাষ্ট্র এই দিবস পালনের উদ্যোগী হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানে মহিলাদের অধিকার সমতা সর্বস্তরে অংশগ্রহণের সুযোগ রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি আলাদা অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়েছে। নারীদের যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষে সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন থাকছে। শুভ ও মঙ্গলবোধের প্রতীক হতে নারী শিক্ষার বিস্তার, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ ও নারীর ক্ষমতায়নে বিস্ময়কর শক্তি নিয়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। শুভ ও মঙ্গলবোধের প্রতীক হিসাবে নারী শব্দের ভেতরে অগণিত প্রশ্নের সূক্ষ্ণ সমাধান রয়েছে।

মায়াময়ী- মমতাময়ী অনেক অর্থবোধক শব্দের খোলা উৎস নারী। মানবী, রমণী, নন্দিনী, ভাবিনী, কামিনী, প্রমীলা, অবলা, মহিলা, বালা, বিজয়া, জয়ন্তী, অপরাজিতা, অন্তঃপুরিকা, অন্তঃপুরচারিণী, অন্তপুরবাসিনী, অষ্টনায়িকা, অবরোধবাসিনী, জানানা, জেনানা, শঙ্খিনী, পামিনী, রামা, রমা, ললনা, শর্বরী, কৌমরী ইত্যাদি হাজারো নামে স্ত্রীলোক, স্ত্রীসুলভ, স্ত্রী- জাতীয়, স্ত্রী জাতীয়া, নরম, নমনীয়, মসৃণ, কোমল, মেয়ে, মেয়েলী, নারী, তান্ত্রিক, মাতৃতান্ত্রিক ইত্যাদি বিষয়ে বিভূষিতা নারী মানবজীবনেরই প্রতিচ্ছবি।

সাহিত্যে নারীকে অতীন্দ্রিয় জগতের কখনো দেবী কখনো বা দানবী বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধর্মগ্রন্থগুলোয় নারী ভূমিকা নিয়ে কখনো তিমির চাদরে ঢেকে কখনো মানবমনের ভেতরের প্রতিরোধ্য শক্তি হিসাবে দেখানো হয়েছে। নারী ত্রাতা- দার্শনিক- মুনি- ঋষি- পথপ্রদর্শক হিসাবে উপস্থাপন রয়েছে। মনুসংহিতায় নারী জাতি ক্ষেত্রস্বরূপ এবং পুরুষ বীজস্বরূপ বলে মূল্যবান চিত্রায়ন হয়েছে।

হিন্দুধর্মের চিন্তা ও দর্শনে নারী অমিততেজ ও শক্তির প্রতীক। দুর্গা, কালী, লক্ষ্ণী, সরস্বতী, চণ্ডী, চামুণ্ডা সবই নারীশক্তির ছায়ারা ভেসে ওঠে। ধর্মীয় অনুভূতির সকল পথ বাতলাতে মঙ্গলামঙ্গলের বিষয় ভাবনায় স্ত্রী শক্তিকে উপস্থাপন করা হয়। নারী সবসময়ই সৃষ্টিশীল কল্পনা। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যথার্থই বলেছিলেন- ‘তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেব’।

ইসলাম ধর্মে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত বলা হয়েছে। সন্তান জন্মদানে মায়ের ভূমিকা বিশেষ উৎকর্ষের। নিরন্তর ক্রিয়াশীল আনন্দময়ী এই মাতৃত্ব নিয়েই নারীদের ভয়ংকর নির্মম অভিজ্ঞতা হয়। শুধু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মায়ের মধ্যে ১৬৫ জন মা মারা যান। জনস্বাস্থ্যবিদ ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞদের খুব নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফল সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কোনো নারীর প্রাণহানি ঘটলে তা মাতৃমৃত্যু বলে বিবেচিত হয়। গর্ভধারণজনিত জটিলতার কারণে, প্রসবকালে এবং প্রসব-পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে প্রাণহানি ঘটলেই তা মাতৃমৃত্যু।

বিখ্যাত স্বাস্থ্য সাময়িকী ‘ল্যানসেট’ গবেষণায় দেখা গেছে, মাতৃমৃত্যুর সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো প্রসবকালীন রক্তপাত, অনিরাপদ গর্ভপাত, গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ ব্যাধি, প্রসবকালীন সংক্রমণ, রক্তের জমাট ইত্যাদিত। এছাড়াও শিশু জন্মের সময় দক্ষ চিকিৎসকের যত্নের অভাব, প্রসবকালীন দক্ষ দাই বা প্রসবকর্মীর অপর্যাপ্ততা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নবজাতক ও মায়ের স্বাস্থ্য শক্তিশালী করার জন্য মিডওয়াইফ প্রশিক্ষণের আহ্বান জানায়। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর ব্যাপারে আলাদা অনুচ্ছেদ সংযোজন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেদনার সঙ্গে জানিয়েছে সারা বিশ্বের মাতৃমৃত্যুর ৯৯ শতাংশ ঘটে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। অর্ধেক ঘটে সাব সাহারার আফ্রিকায় আর এক তৃতীয়াংশ নিদারুণ দারিদ্রের দক্ষিণ এশিয়ায়। নিয়তিবাদী এই তথ্যে বাংলাদেশের জন্য বেশ খানিকটা স্বস্তিদায়ক।

দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। খ্যাতি কুড়ানো এই তথ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল- ইউনিসেফ। সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ আগামী ২০৩০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সন্তান প্রসবে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৫০ জনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রায় জোরালোভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর বাইরের ভয়ে হিম করে দেওয়া বিবেকহীনতার নানা সহিংসতা নারীকে পশ্চাদপদ গোষ্ঠীতে পরিণত করেছে। শিক্ষা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ৬০ ভাগ বালিকা। আফ্রিকা-এশিয়ায় শ্রমশক্তির ৬০ ভাগ মহিলা; খাদ্য উৎপাদনে ৮০ ভাগ ভূমিকা নারীদের। সারা বিশ্বের মোট খাদ্যের অর্ধেক উৎপাদন করে নারীরা। পরিস্কার পক্ষপাত নিয়ে মোট সম্পদের মাত্র ১ শতাংশের মালিক নারীরা।

জাতিসংঘের ‘ডেকলারেশন অন দ্য ডেকলারেশন অফ ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন’ থেকে যথার্থ বলা হয়- নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা হচ্ছে প্রধান সামাজিক কৌশলগুলির মধ্যে একটি এবং ‘নারী ও পুরুষের মধ্যকার ঐতিহাসিক অসম ক্ষমতা সম্পর্কের প্রকাশ’। ভীতি সঞ্চারকারী এই উক্তি নারীর প্রতি বাস্তব সহিসংতার প্রতিফলন। সমগ্র বিশ্বজুড়ে তিনজন নারীর অন্তত একজনকে মারা হয়েছে বা জোরপূর্বক যৌনক্রিয়া করতে বাধ্য করা হয়েছে। নারীর প্রতিদিনের জীবনকে কলংকিত করছে ধর্ষণ, গৃহ নির্যাতন, যৌন হয়রানি, প্রজননগত জোরজবরদস্তি, কন্যা শিশু হত্যা, লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাত, প্রসবকালীন সহিংসতা, নারী খৎনা, জোরপূর্বক বিবাহ, জোরপূর্বক গর্ভপাত, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক বেশ্যাবৃত্তি, নারী পাচার, পাথর ছুঁড়ে হত্যা, চাবুক মারা, কখনো বা পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থের হৃদয়হীন নির্মমতা জানিয়ে নারী হত্যা বা অনারকিলিং-এর মতো নৃশংস ঘটনায় নারীরা মূল শেকড় থেকে ছিটকে পড়ে।

বিরামহীন ক্ষরণরত নারী শব্দের কাছাকাছি নারী সাফল্যও কম নয়। অতীতকাল থেকে ছিটেফোঁটা, মুষ্টিমেয় থাকলেও বর্তমানে তা ক্রমবর্ধমান। রাষ্ট্রীয় শাসনকাজ থেকে প্রযুক্তিগত, বুদ্ধিদীপ্ত, খেলাধুলা সকল ক্ষেত্রেই প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। নারীর সর্বক্ষেত্রে সুযোগপ্রাপ্তির অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের লড়াইয়ে সফল হচ্ছে। নারীরা এখন নিঃসঙ্গ একাকী নয়। বিংশ শতাব্দীর ঝলমলে জগতে দিবসকে নিয়ে আরো উচ্ছ্বাস প্রকাশ হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে রাশিয়া, বেলারুশ, ভিয়েতনাম, আর্মেনিয়া, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, উগান্ডা, ইউক্রেনসহ অনেক দেশ সরকারিভাবে ছুটি পালন করে। নেপাল, চীন, মাদাগাস্কারসহ আরো কিছু দেশে নারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ছুটি ভোগ করে। বাংলাদেশে সরকারিভাবে আনুষ্ঠানিক ছুটি না থাকলেও নারী কর্মী আধিক্যের প্রতিষ্ঠানসমূহে উৎপাদন বন্ধ থাকে।

নারীরা সামাজিক সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সামর্থ্যমতো সাজপোশাক, রূপচর্চার নারীসুলভ বৈশিষ্ট্যে আনন্দ প্রকাশ করে। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি,মাননীয় প্রধান উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ নারী দিবস উপলক্ষ্যে বিশ্বের সকল নারীর প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী প্রদান করেন। পত্র-পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র ও টেলিভিশনে টকশোর আয়োজন হয়। নারীবাদী সংগঠনসহ অনেক সংগঠন নারীর কর্মের প্রতি পূর্ণসমর্থন জানিয়ে সভা, সমাবেশ, আলোচনা, শোভাযাত্রা, পোস্টার প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কনসহ সৃজনশীল নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করে শিল্পিত চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। নারীর জীবনযুদ্ধের বেদনা নিরাময়ের ক্ষেত্রে ওষুধের কিছুটা প্রলেপ পড়ে নারী দিবসের এই দিনে মানবেতিহাসের অন্তঃস্রোতে প্রবাহমান নারীর স্বীকৃতিহীন কর্মময় জীবনধারার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি।

লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক