খন রঞ্জন রায়: বাংলাদেশে যে কয়টি বিশেষ প্রতিবেশ অঞ্চল আছে, তার মধ্যে হাওড় একটি। শুকনো মৌসুমে এর এক রূপ, বর্ষাকালে অন্যরকম সৌন্দর্য। হাওড় আলাদা ধরনের একটি ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশ অঞ্চল। এখানে মাছ, গাছ, ফসল, বসতি, এমনকি জমির মাপজোখেও বিশেষত্ব আছে।

হাওড় হলো বৃহদাকার অগভীর জলাশয়। প্রাকৃতিকভারে ভূগাঠনিক অবনমনের ফলে হাওড়ের-সৃষ্টি। হাওড় শব্দটি সাংস্কৃতিক শব্দ সাগর এর বিকৃত রূপ বলে ধারণা করা হয়। বর্ষাকালে এর জল রাশির ব্যাপ্তি কূলহীন সমুদ্রের আকার ধারণ করে। শীতকালে তা শুকিয়ে গিয়ে এবং সংকুচিত হয়ে দিগন্ত বিস্তৃত শ্যামল প্রান্তরের রূপ নেয়।

হাওড় দেখতে অনেকটা বাটি বা থালার মতো। ১৯৯০-এর দশকে ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানের আওতায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পানি-ব্যবস্থাপনার জন্য যে সমীক্ষা হয়েছিল, তার তথ্য অনুযায়ী হাওড় অঞ্চল আছে ছয় হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে, অর্থাৎ ছয় লাখ হেক্টর। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলা নিয়ে হাওড়াঞ্চলের অবস্থান। এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ হাওড়াঞ্চল নামে এই এলাকাটি পরিচিত। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নিয়ে এ হাওড়াঞ্চলের অবস্থান। এ সাত জেলায় ছোট-বড় অসংখ্য হাওড় আছে। এর মধ্যে ৩৭৩ টি আকারে অনেক বড়। হাওড়ের মাটি পলিগঠিত বিধায় খুবই উর্বর এবং প্রচুর ধান জন্মে। ধান ও মাছ এ এলাকার অন্যতম ফসল। প্রচুর জলাশয় থাকার ফলে বিপুল পরিমাণ মাছ, শামুক, ঝিনুকের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র হিসাবে সুযোগ অবারিত।

ভৌগোলিক অবস্থান অনুসারে ৩ ভাগে চিহ্নিত এই হাওড়ের সিলেট ও মৌলভীবাজার অংশ নিয়ে পাহাড় নিকটবর্তী হাওড়। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওড়াঞ্চল নিয়ে প্লাবন ভূমির হাওড়। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলার কয়েকটি হাওড়, কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার হাওড় গভীর পানিতে নিমজ্জিত হাওড়। হাওড়াঞ্চলের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলাই শ্রেষ্ঠ অবস্থানে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অশ্বখুরাকৃতি বা বাটির মতো নিম্নাঞ্চলকে ভাটি অঞ্চল বা হাওড় অঞ্চল হিসেবে চেনা হয়। ১৭৮৭ সালের বন্যা ও ভূমিকম্পের পর ব্রহ্মপুত্র নদ তার গতিপথ মধুপুর গড়ের পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে পরিবর্তন করলে পলিমাটিতে ভরাট হওয়ার অভাবে এ অঞ্চল নিচু থেকে যায়। তাছাড়া মেঘালয় ও বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর সংঘটিত ডাউকি চ্যুতির কারণে অতি প্রাচীনকালে এলাকাটি ৩ থেকে ১০ মিটার বসে যায়।

১৭৬২ সালের ২ এপ্রিলের একটি ভূমিকম্পে ২০০ মানুষ মারা যায় এবং চট্টগ্রামের ১৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়ে যায়। ভূমিকম্পটি মিয়ানমারের ব্যাপক পরিবর্তন করে এবং তৎকালে বেঙ্গলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ৮.৮ মাত্রার সেই ভূমিকম্পটির পরে সুনামিও আঘাত হানে। সেই ভূমিকম্পেই মধুপুরের গড় এবং হাওড় এলাকার জন্ম হয়। এরপরের ১৭৮৭ সালের ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র এবং তিস্তা তার গতিপথ বদলায়। ১৮৯১ সালের ভূমিকম্পে খাসিয়া পাহাড়ের ৪০ হাজার বর্গমাইল এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই এলাকাটি দেবে গিয়েই মধুপুর গড় সৃষ্টি হয়। গারো ও খাসিয়া পাহাড়ের অববাহিকায় ছিল বলে সেই অঞ্চলটি অনাবাদী বনাঞ্চল ছিল।

১৯৩৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ভৈরবে মেঘনা নদীর ওপর রেলসেতু উদ্বোধন হওয়ার পর হাওড় এলাকায় বন্যায় বিপুল পরিমাণ পানি জমতে থাকে। এর আগে বর্ষাকালেও ওই অঞ্চলে তেমন প্লাবন হতো না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত ভৈরব সেতু নির্মাণের জন্য মেঘনার পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং সেতুটির জন্য উজানের পানি নামার পথে বাঁধাগ্রস্ত হয়। যদি ১৭৬২ সালকে হাওড় এলাকার জন্ম সময় হিসেবে গণ্য করা হয় তবে এই এলাকাটির বর্তমান রূপের বয়স আড়াই শ’ বছর অতিক্রম করেছে। পুরো দেশের আর কোন অঞ্চলের সঙ্গে এর ভৌগোলিক সমতা নেই। তবে বাংলাদেশের এই অঞ্চলের কাছাকাছি এলাকার বাইরেও দেশজুড়েই নানা ধরনের বিল, হাওড় বা জলাভূমি রয়েছে। দেশের যে এলাকাটিকে হাওড় বলে চেনা হয় সেটি সাতটি জেলার প্রায় অর্ধশতাধিক উপজেলার পুরো বা আংশিক অঞ্চল নিয়ে গড়ে উঠেছে।

সিলেট শহর থেকে প্রায় ৫০ কিঃমিঃ দূরে ছিল তামাবিল সীমান্ত ঘেঁষে ডাউকি ফল্ট। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন তৎকালীন ভারতের অসম প্রদেশের সিলেট জেলায় সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে সেই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮.১। সরকারি হিসাবমতে, সে ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা ১৫৪২ হলেও বেসরকারি হিসাবে ছিল কয়েকগুণ বেশি। তৎকালীন সিলেট জেলার ডাউকি ফল্টই ছিল সেই ভূমিকম্পের উৎসস্থল। প্রাবল্যের তুলনায় ডাউকি ফল্টের সেই ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা কম হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল বিপুল।

সুদূর কলকাতা ও দিল্লী এমনকি ভুটান ও বার্মা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এর ক্ষয়ক্ষতি। ভারতের বর্তমান মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলং সেই ভূমিকম্পের ফলে আরও ৩০ ফুট উচ্চতায় চলে যায়। ভূমিকম্পের পূর্বে খাসিয়া, জৈয়ন্তিয়া ও গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সিলেট ছিল তুলনামূলক উঁচু এলাকা। সেই ভূমিকম্পে সিলেট অঞ্চলের ভূ-আকৃতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। মাটি দেবে গিয়ে সৃষ্টি হয় বড় বড় হাওড় ও বিলের । বদলে যায় সবকটি নদীর গতিপথ । উজানের পাহাড়ী ঢলের শিকার হয় এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা । তখন থেকেই বন্যাপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয় বর্তমান সিলেট বিভাগ।

বর্তমানের সরকারি হিসাবে দেশে ৪৭টি বড় হাওড় এবং বিভিন্ন মাপের ৬,৩০০টি বিল রয়েছে। বৃহত্তর সিলেটের শনির হাওড়, হাকালুকি হাওড়, কাওয়া দীঘি হাওড়, টাঙ্গুয়ার হাওড় খুবই ব্যাপকভাবে পরিচিত।এদের মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওড় দেশে-বিদেশে অনেকের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। একান্নটি বিলের সমন্বয়ে এই হাওড় গঠিত। এটি ২০০০ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। সুনামগঞ্জে এর অবস্থান। হাওড় এলাকায় কিছু মানববসতিও আছে। তবে তা গ্রামীণ এলাকা যা বুঝায় তা নয়। গ্রাম বলতে আমরা সাধারণত মানববসতি বুঝি । দুটি বা তিনটি গ্রামের মধ্যে যে বিস্তীর্ণ জমি, সেখানে গ্রামের কৃষকেরা চাষাবাদ করেন।

হাওড়ের অবস্থাটা একটু আলাদা। এখানে গ্রামগুলো অনেক দূরে দূরে। মাঝখানটা খোলা। শুকনো মৌসুমে সেখানে চাষাবাদ হয়। বৈশাখের শেষে পানি আসতে শুরু করে। জমি সব তলিয়ে যায়। গ্রামগুলো অথৈই পানিতে বিচিত্র দ্বীপের মতো দেখা যায়। তখন হাওড়গুলোর মধ্যে কোনো সীমানা থাকে না। যেদিকে চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। নদীর পাড় ডুবে যাওয়ার ফলে নদী আর হাওড় একাকার হয়ে যায়। এ অবস্থা থাকে বছরে ছয় মাস। ওই সময় মানুষ ঘরে বন্দী থাকে। কেউ কেউ মাছ ধরেন। কার্তিকের শেষে পানি সরে যেতে শুরু করলে আরম্ভ হয় চাষাবাদের আয়োজন। কিছু কিছু জায়গায় সারা বছরই পানি থাকে । এগুলোই হচ্ছে বিল বা জলমহাল। এগুলো মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে সরকার ইজারা দেয়। হাওড়ের গ্রামগুলোতে অনেক জেলের বসতি। তাঁদের বেশির ভাগ এখন এই ইজারাদারদের শ্রমদাস হিসেবে কাজ করেন। জেলেরা হিন্দু হলে কৈবর্ত’ আর মুসলমান হলে বলে ‘মাইমল’। তাদের হাওড়ের এই বৈচিত্র্যময় জীবন বড়ই দুর্ভাগ্যের।

হাওড় উন্নয়নে বিগত সরকারসমূহ বিক্ষিপ্ত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কাড়ি কাড়ি অর্থ বরাদ্দ করা হয়। এক শ্রেণীর লোকের পকেট ভারী ও প্রেসার, ডায়াবেটিস, লোভরোগ বৃদ্ধি হয়। হাওড়বাসীর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজন সমান নয়। সব অঞ্চলের দারিদ্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাও সমান নয়। পাহাড়ি ও হাওড় অঞ্চলের পরিমাণও মোট ভূখণ্ডের তুলনায় বেশি নয়। পাহাড়ি ও হাওড় অঞ্চলের পরিমাণও মোট ভূখণ্ডের তুলনায় বেশি নয়। সব অঞ্চলের মানুষও ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে না।

নদীভাঙন এক গতানুগতিক বিষয় হলেও এর দ্বারা বিপর্যস্ত মানুষের সংখ্যাও দেশের জনসংখ্যার তুলনায় খুব বেশি না। কিন্তু বড় বিপর্যয় দেখা দেয় হাওড় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, প্রকৃতি প্রদত্ত এই দুর্যোগে কারো হাত না থাকলেও নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার, যাদের এক ফসলের ওপর সারা বছরের জীবনধারণ নির্ভরশীল। হাওড় অঞ্চলের মানুষের জীবিকাই নয়, তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকটিও চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বছরের নির্দিষ্ট সময় ভূমি পানিতে ডুবে থাকায় তাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না।
শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণে তারা মূল স্রোতধারায় আসতে পারছে না। তাদের জীবনযাত্রা দেখভাল ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য ‘হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

১৯৭৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ‘হাওড় উন্নয়ন বোর্ড’ গঠিত হয় এবং ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ১১ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে এক রেজলিউশনের মাধ্যমে দেশের সব হাওড় ও জলাভূমি সমন্বিতভাবে উন্নয়ন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পুনরায় ‘বাংলাদেশ হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’কে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংযুক্ত অফিস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। ‘এ বোর্ড হাওড় ও জলাভূমির সার্বিক ও সমন্বিত উন্নয়ন সাধনকল্পে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বয় ও সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান, জলাভূমির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছিল। সেই আলোকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৩৭৩টি হাওড়ের বিস্তীর্ণ এলাকার সমন্বিত উন্নয়নের জন্য ‘হাওড় মহাপরিকল্পনা’ নেয়া হয়।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০ বছর মেয়াদি এ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। সংশ্লিষ্ট সকল সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় রেখে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য হাওড় এলাকার সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এটি একটি ‘সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা’। ২০১২ সালের ৩ মে বাংলাদেশ হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের বৈঠকে মহাপরিকল্পনার অনুমোদন দেয়া হয়। এ বোর্ডের চেয়ারম্যান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ১৫৩টি প্রকল্পের বিপরীতে ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ৬৯টি, মধ্যমেয়াদি ৫৯টি ও দীর্ঘমেয়াদি ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাক্রমে ৯ হাজার ৫১৩ কোটি, ১০ হাজার ৪১৬ কোটি ও ৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- বন্যা ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ফসল উৎপাদন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, শিক্ষা, বসতি স্থাপন, স্বাস্থ্য সুবিধা, স্যানিটেশন, শিল্প কারখানা, বনায়ন, খনিজ সম্পদের ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন ইত্যাদি।

কিন্তু অবাক করা সত্য হচ্ছে, হাওড়াঞ্চল ঘিরে সরকারের গৃহীত এ মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি হাকালুকিসহ মৌলভীবাজার জেলার কোনো হাওড়কে। মৌলভীবাজার জেলায় হাকালুকি হাওড়সহ্‌ রয়েছে, কাউয়াদীঘি ও হাইলসহ ছোট-বড় ৩০- ৩৫টি হাওড়। জাইকার অর্থায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাওড় অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রকল্পে কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার ২৯টি হাওড় অন্তর্ভুক্ত।

একটা সময় ছিল যখন হাওড় এলাকায় মাথাপিঁছু জমির পরিমাণ বেশি ছিল। ফলে একটিমাত্র বোরো ফসলেই হাওড় এলাকার কৃষক পরিবারগুলোও স্বচ্ছল জীবনযাপন করত। চাকরি বাকরি করায় তাদের আগ্রহ ছিল কম। লেখাপড়া করাটাকেও তেমন গুরুত্ব দিত না। সরকারের কাছেও তারা কিছু দাবি করত না। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। মাথাপিছু জমি কমে গেছে। পরিবারপিছু জমি কমেছে। ফলে জমির ফসল থেকে আসা আয়ে আর এদের চলে না। তাছাড়া প্রায় প্রতিবছর হাওড় এলাকার বোরো ফসল অকাল বন্যায় ভাসিয়ে নেয়। ফলে হাওড় এলাকার কৃষক পরিবারের যে শক্ত অর্থনৈতিক ভিত ছিল, তা আর নেই।

ইতোমধ্যেই দেখা গেছে, বিগত কয়েকবছর থেকে হাওড় এলাকার এক সময়ের সচ্ছল কৃষক পরিবারের সন্তানরা ব্যাপকভাবে শহরমুখী হয়ে পড়েছে। কিন্তু লেখাপড়ায় পিছিয়ে থাকা হাওড় এলাকার নারী-পুরুষ শহরে এসে কায়িক শ্রম বিক্রি করে কিংবা পোশাকশিল্পে কাজ করে অতিকষ্টে জীবিকা নির্বাহ করছে। অনেক সচ্ছল কৃষক পরিবারের মেয়েরা বাসাবাড়ির ঝি-চাকরের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। শহর-গ্রাম-হাওড়ের প্রাণপ্রাচুর্য নষ্ট হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদী গৃহীত হাওড় উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার বদৌলতে দুঃখের অমানিশা কাটিয়ে হাওড়বাসী ঘুরে দাঁড়াক। আবার সেখানে কৃষক- জেলেসহ সব মানুষের মুখে হাসি ফুটে উঠুক। আমাদের চেতনার মূল স্রোতধারা হোক এমনটাই।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।

খন রঞ্জন রায়: বাংলাদেশে যে কয়টি বিশেষ প্রতিবেশ অঞ্চল আছে, তার মধ্যে হাওড় একটি। শুকনো মৌসুমে এর এক রূপ, বর্ষাকালে অন্যরকম সৌন্দর্য। হাওড় আলাদা ধরনের একটি ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশ অঞ্চল। এখানে মাছ, গাছ, ফসল, বসতি, এমনকি জমির মাপজোখেও বিশেষত্ব আছে।

হাওড় হলো বৃহদাকার অগভীর জলাশয়। প্রাকৃতিকভারে ভূগাঠনিক অবনমনের ফলে হাওড়ের-সৃষ্টি। হাওড় শব্দটি সাংস্কৃতিক শব্দ সাগর এর বিকৃত রূপ বলে ধারণা করা হয়। বর্ষাকালে এর জল রাশির ব্যাপ্তি কূলহীন সমুদ্রের আকার ধারণ করে। শীতকালে তা শুকিয়ে গিয়ে এবং সংকুচিত হয়ে দিগন্ত বিস্তৃত শ্যামল প্রান্তরের রূপ নেয়।

হাওড় দেখতে অনেকটা বাটি বা থালার মতো। ১৯৯০-এর দশকে ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানের আওতায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পানি-ব্যবস্থাপনার জন্য যে সমীক্ষা হয়েছিল, তার তথ্য অনুযায়ী হাওড় অঞ্চল আছে ছয় হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে, অর্থাৎ ছয় লাখ হেক্টর। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলা নিয়ে হাওড়াঞ্চলের অবস্থান। এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ হাওড়াঞ্চল নামে এই এলাকাটি পরিচিত। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নিয়ে এ হাওড়াঞ্চলের অবস্থান। এ সাত জেলায় ছোট-বড় অসংখ্য হাওড় আছে। এর মধ্যে ৩৭৩ টি আকারে অনেক বড়। হাওড়ের মাটি পলিগঠিত বিধায় খুবই উর্বর এবং প্রচুর ধান জন্মে। ধান ও মাছ এ এলাকার অন্যতম ফসল। প্রচুর জলাশয় থাকার ফলে বিপুল পরিমাণ মাছ, শামুক, ঝিনুকের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র হিসাবে সুযোগ অবারিত।

ভৌগোলিক অবস্থান অনুসারে ৩ ভাগে চিহ্নিত এই হাওড়ের সিলেট ও মৌলভীবাজার অংশ নিয়ে পাহাড় নিকটবর্তী হাওড়। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওড়াঞ্চল নিয়ে প্লাবন ভূমির হাওড়। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলার কয়েকটি হাওড়, কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার হাওড় গভীর পানিতে নিমজ্জিত হাওড়। হাওড়াঞ্চলের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলাই শ্রেষ্ঠ অবস্থানে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অশ্বখুরাকৃতি বা বাটির মতো নিম্নাঞ্চলকে ভাটি অঞ্চল বা হাওড় অঞ্চল হিসেবে চেনা হয়। ১৭৮৭ সালের বন্যা ও ভূমিকম্পের পর ব্রহ্মপুত্র নদ তার গতিপথ মধুপুর গড়ের পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে পরিবর্তন করলে পলিমাটিতে ভরাট হওয়ার অভাবে এ অঞ্চল নিচু থেকে যায়। তাছাড়া মেঘালয় ও বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর সংঘটিত ডাউকি চ্যুতির কারণে অতি প্রাচীনকালে এলাকাটি ৩ থেকে ১০ মিটার বসে যায়।

১৭৬২ সালের ২ এপ্রিলের একটি ভূমিকম্পে ২০০ মানুষ মারা যায় এবং চট্টগ্রামের ১৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়ে যায়। ভূমিকম্পটি মিয়ানমারের ব্যাপক পরিবর্তন করে এবং তৎকালে বেঙ্গলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ৮.৮ মাত্রার সেই ভূমিকম্পটির পরে সুনামিও আঘাত হানে। সেই ভূমিকম্পেই মধুপুরের গড় এবং হাওড় এলাকার জন্ম হয়। এরপরের ১৭৮৭ সালের ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র এবং তিস্তা তার গতিপথ বদলায়। ১৮৯১ সালের ভূমিকম্পে খাসিয়া পাহাড়ের ৪০ হাজার বর্গমাইল এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই এলাকাটি দেবে গিয়েই মধুপুর গড় সৃষ্টি হয়। গারো ও খাসিয়া পাহাড়ের অববাহিকায় ছিল বলে সেই অঞ্চলটি অনাবাদী বনাঞ্চল ছিল।

১৯৩৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ভৈরবে মেঘনা নদীর ওপর রেলসেতু উদ্বোধন হওয়ার পর হাওড় এলাকায় বন্যায় বিপুল পরিমাণ পানি জমতে থাকে। এর আগে বর্ষাকালেও ওই অঞ্চলে তেমন প্লাবন হতো না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত ভৈরব সেতু নির্মাণের জন্য মেঘনার পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং সেতুটির জন্য উজানের পানি নামার পথে বাঁধাগ্রস্ত হয়। যদি ১৭৬২ সালকে হাওড় এলাকার জন্ম সময় হিসেবে গণ্য করা হয় তবে এই এলাকাটির বর্তমান রূপের বয়স আড়াই শ’ বছর অতিক্রম করেছে। পুরো দেশের আর কোন অঞ্চলের সঙ্গে এর ভৌগোলিক সমতা নেই। তবে বাংলাদেশের এই অঞ্চলের কাছাকাছি এলাকার বাইরেও দেশজুড়েই নানা ধরনের বিল, হাওড় বা জলাভূমি রয়েছে। দেশের যে এলাকাটিকে হাওড় বলে চেনা হয় সেটি সাতটি জেলার প্রায় অর্ধশতাধিক উপজেলার পুরো বা আংশিক অঞ্চল নিয়ে গড়ে উঠেছে।

সিলেট শহর থেকে প্রায় ৫০ কিঃমিঃ দূরে ছিল তামাবিল সীমান্ত ঘেঁষে ডাউকি ফল্ট। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন তৎকালীন ভারতের অসম প্রদেশের সিলেট জেলায় সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে সেই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮.১। সরকারি হিসাবমতে, সে ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা ১৫৪২ হলেও বেসরকারি হিসাবে ছিল কয়েকগুণ বেশি। তৎকালীন সিলেট জেলার ডাউকি ফল্টই ছিল সেই ভূমিকম্পের উৎসস্থল। প্রাবল্যের তুলনায় ডাউকি ফল্টের সেই ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা কম হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল বিপুল।

সুদূর কলকাতা ও দিল্লী এমনকি ভুটান ও বার্মা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এর ক্ষয়ক্ষতি। ভারতের বর্তমান মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলং সেই ভূমিকম্পের ফলে আরও ৩০ ফুট উচ্চতায় চলে যায়। ভূমিকম্পের পূর্বে খাসিয়া, জৈয়ন্তিয়া ও গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সিলেট ছিল তুলনামূলক উঁচু এলাকা। সেই ভূমিকম্পে সিলেট অঞ্চলের ভূ-আকৃতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। মাটি দেবে গিয়ে সৃষ্টি হয় বড় বড় হাওড় ও বিলের । বদলে যায় সবকটি নদীর গতিপথ । উজানের পাহাড়ী ঢলের শিকার হয় এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা । তখন থেকেই বন্যাপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয় বর্তমান সিলেট বিভাগ।

বর্তমানের সরকারি হিসাবে দেশে ৪৭টি বড় হাওড় এবং বিভিন্ন মাপের ৬,৩০০টি বিল রয়েছে। বৃহত্তর সিলেটের শনির হাওড়, হাকালুকি হাওড়, কাওয়া দীঘি হাওড়, টাঙ্গুয়ার হাওড় খুবই ব্যাপকভাবে পরিচিত।এদের মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওড় দেশে-বিদেশে অনেকের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। একান্নটি বিলের সমন্বয়ে এই হাওড় গঠিত। এটি ২০০০ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। সুনামগঞ্জে এর অবস্থান। হাওড় এলাকায় কিছু মানববসতিও আছে। তবে তা গ্রামীণ এলাকা যা বুঝায় তা নয়। গ্রাম বলতে আমরা সাধারণত মানববসতি বুঝি । দুটি বা তিনটি গ্রামের মধ্যে যে বিস্তীর্ণ জমি, সেখানে গ্রামের কৃষকেরা চাষাবাদ করেন।

হাওড়ের অবস্থাটা একটু আলাদা। এখানে গ্রামগুলো অনেক দূরে দূরে। মাঝখানটা খোলা। শুকনো মৌসুমে সেখানে চাষাবাদ হয়। বৈশাখের শেষে পানি আসতে শুরু করে। জমি সব তলিয়ে যায়। গ্রামগুলো অথৈই পানিতে বিচিত্র দ্বীপের মতো দেখা যায়। তখন হাওড়গুলোর মধ্যে কোনো সীমানা থাকে না। যেদিকে চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। নদীর পাড় ডুবে যাওয়ার ফলে নদী আর হাওড় একাকার হয়ে যায়। এ অবস্থা থাকে বছরে ছয় মাস। ওই সময় মানুষ ঘরে বন্দী থাকে। কেউ কেউ মাছ ধরেন। কার্তিকের শেষে পানি সরে যেতে শুরু করলে আরম্ভ হয় চাষাবাদের আয়োজন। কিছু কিছু জায়গায় সারা বছরই পানি থাকে । এগুলোই হচ্ছে বিল বা জলমহাল। এগুলো মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে সরকার ইজারা দেয়। হাওড়ের গ্রামগুলোতে অনেক জেলের বসতি। তাঁদের বেশির ভাগ এখন এই ইজারাদারদের শ্রমদাস হিসেবে কাজ করেন। জেলেরা হিন্দু হলে কৈবর্ত’ আর মুসলমান হলে বলে ‘মাইমল’। তাদের হাওড়ের এই বৈচিত্র্যময় জীবন বড়ই দুর্ভাগ্যের।

হাওড় উন্নয়নে বিগত সরকারসমূহ বিক্ষিপ্ত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কাড়ি কাড়ি অর্থ বরাদ্দ করা হয়। এক শ্রেণীর লোকের পকেট ভারী ও প্রেসার, ডায়াবেটিস, লোভরোগ বৃদ্ধি হয়। হাওড়বাসীর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজন সমান নয়। সব অঞ্চলের দারিদ্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাও সমান নয়। পাহাড়ি ও হাওড় অঞ্চলের পরিমাণও মোট ভূখণ্ডের তুলনায় বেশি নয়। পাহাড়ি ও হাওড় অঞ্চলের পরিমাণও মোট ভূখণ্ডের তুলনায় বেশি নয়। সব অঞ্চলের মানুষও ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে না।

নদীভাঙন এক গতানুগতিক বিষয় হলেও এর দ্বারা বিপর্যস্ত মানুষের সংখ্যাও দেশের জনসংখ্যার তুলনায় খুব বেশি না। কিন্তু বড় বিপর্যয় দেখা দেয় হাওড় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, প্রকৃতি প্রদত্ত এই দুর্যোগে কারো হাত না থাকলেও নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার, যাদের এক ফসলের ওপর সারা বছরের জীবনধারণ নির্ভরশীল। হাওড় অঞ্চলের মানুষের জীবিকাই নয়, তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকটিও চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বছরের নির্দিষ্ট সময় ভূমি পানিতে ডুবে থাকায় তাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না।
শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণে তারা মূল স্রোতধারায় আসতে পারছে না। তাদের জীবনযাত্রা দেখভাল ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য ‘হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

১৯৭৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ‘হাওড় উন্নয়ন বোর্ড’ গঠিত হয় এবং ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ১১ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে এক রেজলিউশনের মাধ্যমে দেশের সব হাওড় ও জলাভূমি সমন্বিতভাবে উন্নয়ন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পুনরায় ‘বাংলাদেশ হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’কে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংযুক্ত অফিস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। ‘এ বোর্ড হাওড় ও জলাভূমির সার্বিক ও সমন্বিত উন্নয়ন সাধনকল্পে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বয় ও সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান, জলাভূমির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছিল। সেই আলোকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৩৭৩টি হাওড়ের বিস্তীর্ণ এলাকার সমন্বিত উন্নয়নের জন্য ‘হাওড় মহাপরিকল্পনা’ নেয়া হয়।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০ বছর মেয়াদি এ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। সংশ্লিষ্ট সকল সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় রেখে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য হাওড় এলাকার সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এটি একটি ‘সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা’। ২০১২ সালের ৩ মে বাংলাদেশ হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের বৈঠকে মহাপরিকল্পনার অনুমোদন দেয়া হয়। এ বোর্ডের চেয়ারম্যান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ১৫৩টি প্রকল্পের বিপরীতে ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ৬৯টি, মধ্যমেয়াদি ৫৯টি ও দীর্ঘমেয়াদি ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাক্রমে ৯ হাজার ৫১৩ কোটি, ১০ হাজার ৪১৬ কোটি ও ৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- বন্যা ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ফসল উৎপাদন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, শিক্ষা, বসতি স্থাপন, স্বাস্থ্য সুবিধা, স্যানিটেশন, শিল্প কারখানা, বনায়ন, খনিজ সম্পদের ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন ইত্যাদি।

কিন্তু অবাক করা সত্য হচ্ছে, হাওড়াঞ্চল ঘিরে সরকারের গৃহীত এ মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি হাকালুকিসহ মৌলভীবাজার জেলার কোনো হাওড়কে। মৌলভীবাজার জেলায় হাকালুকি হাওড়সহ্‌ রয়েছে, কাউয়াদীঘি ও হাইলসহ ছোট-বড় ৩০- ৩৫টি হাওড়। জাইকার অর্থায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাওড় অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রকল্পে কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার ২৯টি হাওড় অন্তর্ভুক্ত।

একটা সময় ছিল যখন হাওড় এলাকায় মাথাপিঁছু জমির পরিমাণ বেশি ছিল। ফলে একটিমাত্র বোরো ফসলেই হাওড় এলাকার কৃষক পরিবারগুলোও স্বচ্ছল জীবনযাপন করত। চাকরি বাকরি করায় তাদের আগ্রহ ছিল কম। লেখাপড়া করাটাকেও তেমন গুরুত্ব দিত না। সরকারের কাছেও তারা কিছু দাবি করত না। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। মাথাপিছু জমি কমে গেছে। পরিবারপিছু জমি কমেছে। ফলে জমির ফসল থেকে আসা আয়ে আর এদের চলে না। তাছাড়া প্রায় প্রতিবছর হাওড় এলাকার বোরো ফসল অকাল বন্যায় ভাসিয়ে নেয়। ফলে হাওড় এলাকার কৃষক পরিবারের যে শক্ত অর্থনৈতিক ভিত ছিল, তা আর নেই।

ইতোমধ্যেই দেখা গেছে, বিগত কয়েকবছর থেকে হাওড় এলাকার এক সময়ের সচ্ছল কৃষক পরিবারের সন্তানরা ব্যাপকভাবে শহরমুখী হয়ে পড়েছে। কিন্তু লেখাপড়ায় পিছিয়ে থাকা হাওড় এলাকার নারী-পুরুষ শহরে এসে কায়িক শ্রম বিক্রি করে কিংবা পোশাকশিল্পে কাজ করে অতিকষ্টে জীবিকা নির্বাহ করছে। অনেক সচ্ছল কৃষক পরিবারের মেয়েরা বাসাবাড়ির ঝি-চাকরের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। শহর-গ্রাম-হাওড়ের প্রাণপ্রাচুর্য নষ্ট হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদী গৃহীত হাওড় উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার বদৌলতে দুঃখের অমানিশা কাটিয়ে হাওড়বাসী ঘুরে দাঁড়াক। আবার সেখানে কৃষক- জেলেসহ সব মানুষের মুখে হাসি ফুটে উঠুক। আমাদের চেতনার মূল স্রোতধারা হোক এমনটাই।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়,সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক।