সোহরাব হোসেন, ঢাকা: কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের রমরমা ব্যবসা জমিয়ে বসেছে সেখানকার কারারক্ষীরা। তারা ছিনতাইকারীদের চেয়েও ভয়ংকর। বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে তাদের জন্য খাবার পাঠানো, বাইরের ক্যান্টিনে খাবার বিক্রি, ছোটখাট কেনাকাটা এবং বকশিশের নামে চলছে হরদম বাণিজ্য। দর্শনার্থীদের পদে পদে শিকার হতে হচ্ছে চরম হয়রানির। আবার টাকা দিলেই হয়ে যাচ্ছে ‘মুশকিল আসান’।
গত বৃহস্পতিবার জীবনের প্রথম কারাগারে বন্দি থাকা এক স্বজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। তার আগের রবিবার আমার সেই আত্মীয় একটি মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। কেন্দ্রীয় কারাগারে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার আগে আমরা জানতাম না তিনি কারাগারের কোন সেলে বন্দি আছেন।
সকাল ৯ টায় কারাগারের গেইটে সাক্ষাৎ স্লিপ করতে গেলে সেখানে জানতে চান আমাদের আত্মীয় কোন সেলে বন্দি আছেন? আমরা বললাম, জানিনা। পরে বলল, তাহলে তথ্য কেন্দ্র থেকে জেনে আসুন। পাশেই দেখতে পেলাম ব্যানারে লেখা তথ্য কেন্দ্র। সেখানে কে তথ্য দিবে কাউকে খুঁজতে শুরু করলাম। কিন্তু কোন চেয়ার-টেবিল নেই। সাধারণত আমরা যে কোন তথ্য কেন্দ্রে দেখি কেউ না কেউ বসে থাকে। এখানের দৃশ্যটা তেমন না। জীবনের প্রথম তাই কিভাবে কি করতে হয় সেই অভিজ্ঞতা নেই। এর মধ্যে একজন কারারক্ষী জিজ্ঞাসা করলেন, কি সমস্যা? আমি বললাম, আমার স্বজন কোন ওয়ার্ডে আছে জানিনা। পরে তিনি বললেন, তথ্য খুঁজে দেখতে ২০০ টাকা দিতে হবে। ১০০ টাকা দিতে চাইলাম রাজি হলেন না।
তিনি বললেন, ২০০ টাকা দিলে বলেন নাহলে বই আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। বই আসবে মানে কি ঠিক না বুঝে আরেকজন কারারক্ষীকে বললাম। তিনিও ২০০ টাকা চাইলেন। পরে বুঝলাম তারা সব এক সিন্ডিকেট। ২০০ টাকা দেওয়ার পর একজন কারারক্ষী মোবাইল বের করে ছবি তুলে রাখা নথিতে বন্দির নাম, বাবার নাম বলার পর খুঁজতে শুরু করেন। পরে বললেন, ‘সে তো আমদানিতে আছে, দেখা করতে পারবেন না। আমদানিতে থাকলে দেখা করা যায়না।’
আমদানি কি ঠিক জানি না আমি। তাহলে এখন কি করা যায়? জানতে চাইলে কারারক্ষী বলেন, ওয়ার্ডে গেলে দেখা করতে পারবেন। এছাড়া এখন দেখা করতে চাইলে ২০০০ টাকা লাগবে। টাকা দিলে আমি সিস্টেমে সাক্ষাৎ রুমে ডেকে নিয়ে আসব।
কি করব বুঝতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তার সাথে দরকষাকষি করে ১০০০ টাকায় রাজি করালাম। ১০০০ টাকা দেওয়ার পর তিনি একটি স্লিপ দিয়ে বললেন, ‘১০টার সময় ২ নম্বর গেইট দিয়ে ঢুকবেন। তার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। আমি আপনার বন্দিকে ডেকে আনতে লোক পাঠাচ্ছি।’ বলা হলো আমরা তিনজন একসাথে সাক্ষাৎ রুমে যেতে পারব। কিন্তু আমরা গিয়েছিলাম পাঁচ জন। বাকি দুইজনকে বাইরে থাকতে হবে।
১০টার সময় সাক্ষাৎ রুমে যাওয়ার সময় সেখানকার কারারক্ষী আমাদের একসাথে পাঁচ জন দেখে বললেন, আপনারা অতিরিক্ত দুইজন ২০০ টাকা দিলে পাঁচ জনই ঢুকতে পারবেন। পরে ২০০ টাকা দিয়ে পাঁচ জনই ঢুকলাম। সাক্ষাৎ করে বন্দি স্বজনের কাছে জানতে পারলাম তিনি আমদানিতে নয় পদ্মা ৪/১ এ আছেন। সাক্ষাৎ এর সময় ৩০ মিনিট পর বের হয়ে সেই কারারক্ষীকে বললাম, আপনি মিথ্যা বললেন কেন? সে তো আমদানিতে নয় পদ্মায় আছে।
কারারক্ষী তখন বলে, আমি তো কাগজে দেখেছি আমদানিতে আছে। যাই হোক ধোঁকা না খেলে জীবনে অভিজ্ঞতা হয়না। তাই বিষয়টি মেনে নিয়েছি। কিন্তু এভাবে প্রকাশ্যে কারারক্ষীরা বন্দির স্বজনদের জিম্মি করে টাকা আদায় করছে যা রীতিমতো ডাকাতি বলা চলে। তাদের এই প্রকাশ্য ডাকাতি বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।




