ক্রীড়া প্রতিবেদক: অস্ট্রেলিয়া থেকে কাতার। ক্রিকেট হোক, কী ফুটবল। সর্বত্র ইংল্যান্ডের জয়জয়কার। ঠিক এক সপ্তাহ আগে টি-২০ বিশ্বকাপ জিতেছে জস বাটলাররা। সাত দিন পর ফুটবল বিশ্বকাপে দুরন্ত শুরু হ্যারি কেনদের। কাতার বিশ্বকাপের শুরুতেই ইংল্যান্ডের গর্জন। মরুশহরে মরুঝড়। সোমবার দোহার খলিফা ইন্টারন্যাশনালে স্টেডিয়ামে ইরানকে হাফ ডজন গোলে উড়িয়ে দিল গ্যারেথ সাউথগেটের দল। ম্যাচের রেজাল্ট ৬-২। জোড়া গোল বুকায়ো সাকার।
বাকি চার গোল জুড বেলিংহ্যাম, রহিম স্টার্লিং, মার্কাস রাশফোর্ড এবং জ্যাক গ্রিলিশের। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে কোনও দল ছয় গোল দিয়েছে কিনা জানা নেই। শুধু প্রথম ম্যাচই নয়, প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন বিশ্বমঞ্চে হাফ ডজন গোল দেওয়া সহজ নয়। দুরন্ত শুরু গত দুই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্টদের। দারুণ বল প্লের নিদর্শন রাখল ইংল্যান্ড। পাসিং, বল কন্ট্রোল এক কথায় অনবদ্য।
ইংলিশদের দক্ষতার সামনে ইরানকে অতি নিম্নমানের দেখাল। সব বিভাগেই অসাধারণ সাউথগেটের দল। শুধু হ্যারি কেনের গোল অধরা থাকল। তবে এদিন সেইভাবে ইংল্যান্ডের রক্ষণ পরীক্ষিত হয়নি। একইসঙ্গে হ্যারি মাগুয়েরের চোট চিন্তায় রাখবে ইংলিশ কোচকে। তবে এদিনের পারফরমেন্সে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্সকে সাবধানবাণী দিয়ে রাখল ইংল্যান্ড। ফুটবল পণ্ডিতদের চার সেরা দলের হিসেবে নিঃসন্দেহে ঢুকে পড়ল সাউথগেটের দল।
বিতর্কের বিশ্বকাপ। ঘটনাবহুল ম্যাচ। মাঠে এবং মাঠের বাইরে। ইংল্যান্ড-ইরান ম্যাচের আগে ‘ওয়ান লাভ আর্মব্যান্ড’ নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। কিন্তু শেষপর্যন্ত আয়োজকদের চাপের কাছে মাথা নত। হ্যারি কেনদের হাতে দেখা গেল না বিতর্কিত আর্মব্যান্ড। কিন্তু দেশের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন না ইরানের ফুটবলাররা। এমনকী স্টেডিয়ামে উপস্থিত অনেক সমর্থকও জাতীয় সঙ্গীতের সময় চুপ করে ছিলেন। যদিও এইসব বিতর্ক ম্যাচে লেশমাত্র প্রভাব ফেলেনি।
একমাত্র ইউরোপীয় দল হিসেবে গত দুই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছিল ইংল্যান্ড। এদিন ‘থ্রি লায়ন্স’দের নামের প্রতি সুবিচার করলেন গ্যারেথ সাউথগেট। প্রথমার্ধেই তিন গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। কার্লোস কুইরোজের মতো অভিজ্ঞ কোচের দলকে দাঁড়াতেই দেয়নি হ্যারি কেন, হ্যারি ম্যাগুয়েররা। অবশ্য দলের প্রথম গোলকিপার আলিরেজা বেইরানভ্যান্ডের প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া ইরানের কাছে বড় ধাক্কা। সেটপিস মুভমেন্টের সময় সতীর্থের সঙ্গে সংঘর্ষে চোট পান ইরানের গোলকিপার।
নাক দিয়ে রক্তপাত শুরু হয়। প্রাথমিক শুশ্রূষার পর উঠে দাঁড়িয়েছিলেন আলিরেজা। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিবর্তন নেওয়ার ইশারা করেন। এই একটি মুহূর্তেই অনেকটা পিছিয়ে পড়ে ইরান। পরিবর্ত গোলকিপার হোসেন হোসেইনির এত বড় মঞ্চে খেলার কোনও অভিজ্ঞতা নেই। অর্থাৎ যা হওয়ার, তাই হল।
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই কাতারে পারদ চড়তে শুরু করে। শুধুই কি ইংল্যান্ড? খলিফা ইন্টারন্যাশনালে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজির ছিল ইরানের সমর্থকরাও। তবে একশো গজে আধিপত্য ছিল ইংরেজদের। তাঁদের পক্ষে বল পজেশন ৮২ শতাংশ। ম্যাচের ৩০ মিনিটের মাথায় প্রথম পজিটিভ সুযোগ। সাকার ক্রস থেকে গোলে শট নিতে ব্যর্থ মেশন মাউন্ট। তার দু’মিনিটের মধ্যে হ্যারি ম্যাগুয়েরের শট ক্রসপিসে লাগে। তবে গোলের খাতা খুলতে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি।
ম্যাচের ৩৫ মিনিটে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন জুড বেলিংহ্যাম। লুক শ’র সেন্টারে নিখুঁত হেড ১৯ বছরের ফুটবলারের। মাইকেল ওয়েনের পর কনিষ্ঠতম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ইংল্যান্ডের জার্সিতে গোল করার নজির গড়লেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের ফুটবলার। বিশ্বকাপে তো বটেই, ইংল্যান্ডের জার্সিতেও প্রথম গোল বেলিংহ্যামের। ম্যাচের ৪৩ মিনিটে বাঁ পায়ের জোরালো শটে ২-০ করেন বুকায়ো সাকা। কর্নার হেড করে নামিয়ে দেন ম্যাগুয়ের। তেকাঠিতে রাখতে ভুল করেননি ইংল্যান্ডের উইঙ্গার। তিন মিনিটের মধ্যে জোড়া গোল। ম্যাচের ৪৫+১ মিনিটে হ্যারি কেনের ক্রস থেকে চলন্ত বলে ডান পায়ের পুশে গোলে ঠেলেন রহিম স্টার্লিং। বিশ্বকাপের আগে খুব একটা ছন্দে ছিলেন না। কিন্তু এই গোল একলাফে তাঁর আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে।
মাঠেই আলিরেজার চিকিৎসা চলার জন্য প্রচুর সময় নষ্ট হয়। তাই ১৪ মিনিট অতিরিক্ত সময় দেন রেফারি। প্রথমার্ধে ইরানের সেরা সুযোগ এই অ্যাডেড টাইমে। কিন্তু কাজে লাগাতে পারেননি জাহানবখশ। ম্যাচের ৬২ মিনিটে ইরানের পায়ের জঙ্গল কাটিয়ে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের চতুর্থ গোল তুলে নেন বুকায়ো সাকা। কিন্তু ক্লিনশিট রাখতে পারেনি ইংল্যান্ড। ৬৫ মিনিটে ইরানের হয়ে ব্যবধান কমান মেহদি তারেমি। তবে এটা সান্ত্বনা পুরস্কার ছাড়া কিছুই নয়। মাঠে নেমেই মাত্র ৪৯ সেকেন্ডের মধ্যে স্কোরশিটে নাম লেখান মার্কাস রাশফোর্ড।
এখানেই শেষ নয়। ম্যাচের ৯০ মিনিটে ইরানের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতে ইংল্যান্ড। গোল করেন জ্যাক গ্রিলিশ। ম্যাচের শেষলগ্নে পেনাল্টি থেকে ব্যবধান কমায় ইরান। দ্বিতীয় গোল তারেমির। এদিন আরও একটি রেকর্ড হল। প্রথমার্ধে ১৪ মিনিট, দ্বিতীয়ার্ধে ১০ মিনিট অতিরিক্ত সময়। যা গড়ায় ১৩ মিনিট পর্যন্ত। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৯০ মিনিটের ম্যাচের ক্ষেত্রে এটাই দীর্ঘতম।




