দি ক্রাইম ডেস্ক: বিস্তৃত হচ্ছে দেশের বন্যা কবলিত এলাকা। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের নদ-নদীতে পানি বাড়ছেই। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এদিকে, সিলেট ও সুনামগঞ্জ এখনো বন্যার পানিতে ভাসছে। পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বন্যা কবলিত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও গোখাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে। এদিকে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। উজানের পানিতে কুড়িগ্রামে ব্রক্ষ্মপুত্রের পানি দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাবে গাইবান্ধা, রংপুর, নীলফামরী, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, লালমনিরহাট ও জামালপুরেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি এলাকায় খাবার ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বানভাসী মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। আগামী ২৪ ঘণ্টায় টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতকীর্করণ কেন্দ্র। নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় ত্রাণ দিতে গিয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। ভৈরবে মেঘনা পাড়ে চাতাল কল ভেঙে দুই শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন।
সিলেট অফিস: স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পানিতে এখনো ভাসছে সিলেট ও সুনামগঞ্জের অর্ধকোটি মানুষ। কখন অবস্থার উন্নতি হবে বলা যাচ্ছে না। সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল এস এম সফি উদ্দিন আহমদ রবিবার দুপুরে বন্যা কবলিত সিলেট সফরে এসে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সেনাবাহিনী বন্যা কবলিত এলাকায় সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাবে।’
এদিকে রবিবার সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি কম হওয়ায় মানুষের মধ্যে কিছুটা আশা জাগালেও সার্বিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন নেই। আবহাওয়া বিভাগ বলেছে আরো বৃষ্টি হবে। তাই বন্যার্তরা উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন। সিলেট ও সুনামগঞ্জের ২৪ টি উপজেলার অবস্থা খুব খারাপ। কোথায়ও সড়ক যোগাযোগ নেই। বন্যা কবলিত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও গোখাদ্যের চরম সংকট। অনেক স্থানে গবাদি পশু মরে গেছে। চাষের মাছ, হাঁসমুরগি ভেসে গেছে। অন্যদিকে আশ্রয় শিবির ও বাসাবাড়িতে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহের আবেদন জানিয়েছেন অনেকেই। নৌযানের অভাবে ত্রাণ পৌছানো যাচ্ছে না অনেক স্থানে। মোবাবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় অনেক স্থানের প্রকৃত খবরও পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল দুপুরে সিলেট রেল স্টেশন থেকে পানি নেমেছে। রেল যোগাযোগ শুরু হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।
সিলেট সিটি করপোরেশন, সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার বসিন্দারা এখনো পানির মধ্যে। কোন কোন স্থানে পানি কয়েক ইঞ্চি কমলেও বানভাসি মানুষের সার্বিক অবস্থার উন্নতি নেই। কিছু এলাকার পানি কমতে শুরু করলেও নগরীর উপশহরে এখনো প্রচুর পানি।
‘বন্যার পানি কমতে সময় লাগবে। দুএকদিনের মধ্যেই যাবে না,’ এই মন্তব্য করে সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল এস এম সফি উদ্দিন আহমদ রবিবার বন্যা কবলিত এলাকা সিলেট সফরে এসে বলেন, ‘এমন বিপর্যয়ের জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। হঠাৎ করে বন্যা এসে গেছে। এখন কাজের সময়, যত কষ্টই হউক দুর্গম এলাকায় উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ সহায়তা দিয়ে যাবো আমরা। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী নিজস্ব উদ্যোগে খাবার, চিকিত্সা দিচ্ছে। তবে অনেক অর্গানাইজেশন বন্যার্তদের ত্রাণ দিতে প্রস্তাব করেছে- বিষয়গওলো সমন্বয় করার চিন্তা করছি। সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমি সব জায়গায় যাচ্ছি- আমাদের অপারেশন আরো কিভাবে সুন্দর করা যায় তা দেখার জন্য। জানাতে এসেছি বাসভাসি মানুষের পাশে সেনাবাহিনী আছে। আর সবাই মিলে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠবো।
এদিকে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের শত ভাগ আবাসিক এলাকা, অফিস, রাস্তাঘাট, মসজিদ মন্দির প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বাসভবনে কোমর পানি, বুক পানি- সেখানে গ্রামগুলোর কি অবস্থায় সহজেই অনুমেয়। আক্ষরিক অর্থেই সুনামগঞ্জ জেলা শহরসহ ১২ টি উপজেলা দ্বীপের ন্যায় বিচ্ছিন্ন। এমনকি মোবাইল নেটওয়ার্কও নেই। পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান ঢাকা থেকে ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে জানান, সুনামগঞ্জে পানি কমছে। জেলা প্রশাসন বন্যার্তদের জন্য সব কিছু করে যাচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে সিলেট-সুনামগঞ্জ একমাত্র সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গত বৃহস্পতিবারেই বন্ধ হয়ে পড়ে। এর পর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ। খাদ্য-আশ্রয় ও বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি, মোমবাতির জন্য হাহাকার করছে মানুষ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ঐ এলাকার দোকানগুলোতেও খাদ্য সংকট চলছে। স্থানীয় সংবাদকর্মী এনটিভির দেওয়ান গিয়াস সহ অনেকেই নিজেদের ফেসবুকে ‘লাইভে’ এসে খাদ্যের জন্য আকুতি জানিয়েছেন। তারা বলেন, ‘আশ্রয় কেন্দ্রে ও আটকে থাকা দোতলা-তিনতলা বাসায় বানভাস ধনী-গরীব সবাই এখন আকাশের দিকে চেয়ে আছেন।’ ‘রবিবার সিলেট থেকে নৌপথে খাদ্য সামগ্রী নিয়ে সুনামগঞ্জের দিকে রওয়ানা দিলে সেটি দোয়ারাবাজারে কাছে গিয়ে আটকে পড়ে,এখন হেলিকপ্টারে করে খাদ্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু শহরের কোথাও কোন দালানের ছাদে হেলিকপ্টার নামার স্থান পাওয়া যাচ্ছে না,’ জেলা প্রশাসক মো.জাহাঙ্গির হোসেনের বরাত দিয়ে ঢাকা থেকে অবসর প্রাপ্ত জেলা জজ জেসমিন আরা রবিবার দুপুরে গণমাধ্যমকে এই প্রতিনিধিকে বলেন, ‘মানুষ কি কষ্টে ও বিপদে আছে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।’
রবিবার বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমলে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের মূল ট্রাফিক পয়েন্ট থেকে পানি কয়েক ইঞ্চি নেমেছে। নিজেদের জমানো সঞ্চয় আর মানুষের সহায়তাই এখন মানুষের ভরসা। স্থানীয়রা জানান, যাতায়াত ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় ত্রাণ কার্যক্রমও খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। অনেকের ঘরে চাল-সবজি থাকলেও সেগুলো রান্না করে খাওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। অনেকেই বলেছেন টাকা আছে খাবার নেই। সিলেট সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আলম বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে কতজন রয়েছে, সেটি বলা যাচ্ছে না। এখন সব কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সরকারিভাবে ৩০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে, কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে সেগুলোও আনা হয়নি। খাবার সরবরাহ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে হয়নি।
সিলেটে পানিবাহিত রোগব্যাধির সংক্রমণ বাড়ছে। বিশেষ করে ডায়রিয়ার প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। সিলেট সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, এখন অবধি ৪৫০ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া চর্মরোগেও ভুগছেন কয়েকজন।
মৌলভীবাজার : জেলার বড়লেখা, জুড়ী, সদর উপজেলা, কুলাউড়া, রাজনগর, কমলগঞ্জ এবং শ্রীমঙ্গলে বন্যা দেখা দিয়েছে। ৩২৫ গ্রামের প্রায় ২ লাখ সাড়ে ৭ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ সকল গ্রামের অধিকাংশ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। গ্রামগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন। পাহাড়ধসে উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের আয়েশাবাগ চা বাগানে রাজন ব্যনার্জি (৬০) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের আদিত্যের মহাল এলাকায় ঢলের পানিতে শনিবার তলিয়ে যাওয়া শিশুর মৃতদেহ রবিবার উদ্ধার হয়েছে। বিদ্যুতের সাব স্টেশনে বন্যার পানি ঢোকায় ইতিমধ্যে জুড়ী ও বড়লেখায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
হবিগঞ্জ: জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রবিবার বিকাল পর্যন্ত জেলার নবীগঞ্জ, আজমিরিগঞ্জ, লাখাই ও বানিয়াচঙ্গ উপজেলার মোট ২১টি ইউনিয়নে বন্যার পানি ঢুকেছে। অন্তত ১৫০টি গ্রামের মানুষ অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছেন। মানুষজন বাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিচ্ছেন। খোয়াই ও কুশিয়ারা নদীর পানি ক্রমশ বৃদ্ধি। এদিকে শনিবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার গোয়ালনগরে খোয়াই নদীর ৭ মিটার বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় নদীর পানি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করেছে। তবে বিবিয়ানা গ্যাসকূপ থেকে বন্যার পানি প্রায় তিন ফুট নিচে রয়েছে। আজমিরিগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুর এলাকায় কুশিয়ারা নদীর হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে যাওযায় বানিয়াচঙ্গ নবীগঞ্জ ও আজমিরিগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধি পচ্ছে।
নেত্রকোনা: দুগার্পুরে বন্যার পানি কমলেও কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, বারহাট্টা এবং খালিয়াজুরীর বন্যা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। এদিকে খালিয়াজুরীতে বন্যাদুর্গতদের উদ্ধার এবং ত্রাণ তত্পরতার জন্য গত শনিবার বিকাল থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছেন। তবে এখনো জেলার ৭টি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। ১৮৮টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে বন্যার্তরা রয়েছেন। গত শনিবার রাতে বৃষ্টি না হলেও গতকাল রবিবার বিকাল থেকে আবারও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এতে করে বন্যার্তদের দুভোর্গ আরো বেড়ে গেছে। চলাচলের জন্য পাওয়া যাচ্ছে না নৌযান।
এদিকে, গতকাল বিকাল পর্যন্ত মোহনগঞ্জে ট্রেন চলাচল শুরু হয়নি। পানি না সরায় রেলের প্রকৌশলীরা সেতু সংস্কার করতে পারেনি। তবে ট্রেন ময়মনসিংহ এবং ঢাকা থেকে নেত্রকোনার বারহাট্টার পর্যন্ত চলছে। নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী এম এল সৈকত জানান, নেত্রকোনার দুগার্পুরে সোমেশ্বরী নদের পানি কমেছে এবং দুগার্পুর পৌর এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। কলমাকান্দায় উব্ধাখালি, নেত্রকোনা ও মোহনগঞ্জে কংশ এবং খালিয়াজুরীতে ধনু নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। খালিয়াজুরী উপজেলার ৯৫ শতাংশ এলাকা এখন পানিতে ডুবে আছে। ৭ উপজেলার ৭৪৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে বন্যার্তরা আশ্রয় নিয়েছেন। কৃষকরা তাদের গবাদিপশু পালন করতে পারছেন না। বন্যার পানিতে জমানো খর সব ভেসে গেছে। কারো কারো গরু ও ভেসে গেছে।
কেন্দুয়া (নেত্রকোনা): নেত্রকোনা-৩ আসনের এমপি অসীম কুমার উকিল ও তার স্ত্রী অপু উকিলের সঙ্গে বন্যা দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবির আহম্মেদ খান রুজেল (৩৫) মারা গেছেন। উপজেলার নওপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ত্রাণ বিতরণের সময় হঠাৎ স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েন আবির। পরে তাকে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্হ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আবির আহম্মেদ খান রুজেল উপজেলার চিরাং ইউনিয়নের বাট্টা গ্রামের মানিক খানের ছেলে।
সিরাজগঞ্জ: যমুনা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার পুঠিয়াবাড়ি, চরমালশাপাড়াসহ বাঁধের ভেতরে বাড়িঘরে বন্যার পানি ঢুকছে। এছাড়াও নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ফসল ডুবে গেছে । প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা । করোতোয়া, ফুলজোড়,ইছামতি,বড়ালসহ বিভিন্ন নদ-নদী খাল বিলের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলার কাজিপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছে।
কিশোরগঞ্জ: হাওরে পানি বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শনিবার থেকে চার উপজেলার ১৬০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার গ্রাহক ও তাদের পরিবার বিদ্যুত্বিহীন অবস্থায় রয়েছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে- ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও করিমগঞ্জ। ইটনা, অষ্টগ্রাম, নিকলী, মিঠামইন, তাড়াইল ও করিমগঞ্জ উপজেলার নিচু এলাকার অনেক বাড়িঘর ও দোকানপাটে পানি ঢুকেছে এবং গ্রামীণ সড়কগুলো ডুবে গেছে। গবাদি পশু নিয়ে অনেকেই বিপাকে পড়েছেন। পানিকবলিত এলাকার লোকজন স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
ভৈরব (কিশোরগঞ্জ): বাজারঘাট এলাকায় গতকাল সকালে মেঘনা নদীর তীরবর্তী দুটি চাতাল কলের একাংশ ধসে দুই শ্রমিক নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ শÌমিকরা হলেন: বাজিতপুর উপজেলার মোস্তাকিম ও হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার শরীফ মিয়া। বিকালে ঘটনাস্থলে ছুটে যান স্থানীয় এমপি ও বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন।
শিবালয় (মানিকগঞ্জ): পদ্মা-যমুনার পানি আরিচা পয়েন্টে ২৪ ঘন্টায় ২১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল রবিবার ৭ দশমিক ৯৩ স্তরে প্রবাহিত হচ্ছিল। মালুচী, গান্ধাইল, তেওতা, নিহালপুর, দক্ষিণ শিবালয়, ছোট আনুলিয়া, অন্বয়পুর, ঝড়িয়ারবাগ দাসকান্তি প্রভৃতি এলাকায় যমুনার প্রবল ভাঙ্গনে অন্তত ৩শ’ বাড়ি ঝঁুকির মুখে রয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড আরিচা পিসিপোল নির্মাণ কারখানার পশ্চিম পার্শ্বের দেয়াল ঘেষা রাস্তার একাংশ ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে।
কুড়িগ্রাম: ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। শনিবার দুপুরে উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের যমুনা সরকারপাড়া গ্রামের মাঈদুল ইসলামের কন্যা মাকসুদা জান্নাত (১১) বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৩৮ সেন্টিমিটার এবং ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে ৩১ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তবে কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম): নাগেশ্বরীর বেরুবাড়ী ইউনিয়নের স্লুইসগেট সংলগ্ন ইসলামপুর, বামনডাঙ্গার মালিয়ানী ও নামাহাইল্যায় পাগলাকুড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে গত তিনদিন ধরে হু-হু শব্দে প্রবেশ করছে পানি। প্রতি মুহুর্তে তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। সেখানে বিস্তীর্ণ জলরাশিতে ভাসছে ঘর-বাড়ি। তলিয়ে যাওয়া রাস্তা-ঘাট তীব্র স্রোতে ভেঙে যাচ্ছে। ভেঙ্গে যাচ্ছে নদী পাড়ের কিছু ঘর-বাড়ি।
ঝিনাইগাতী (শেরপুর): বন্যা উজানে উন্নতি হলেও ভাটি এলাকায় অবনতি ঘটেছে। দুর্ভোগ বেড়েছে পানিবন্দি মানুষের। গত শুক্রবার নালিতাবাড়ি উপজেলার চেল্লাখালী,ভোগাভ নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে পÌবাহিত হয়। ঢলের পানির তোড়ে নদীর পাড় ভেঙ্গে ৩ টি ইউনিয়নের ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়। ২ টি বেইলিসেতু ভেঙ্গে যায় ঢলের পানির তোড়ে। রাস্তাঘাট ভেঙে অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশি নদীর রামেরকুড় বাঁধ ভেঙ্গে ও সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে পÌবাহিত হয়ে ২০ গÌাম প্লাবিত হয়। শÌীবরদী উপজেলার ১০টি গÌামসহ তিন উপজেলার ৫০টি গÌাম প্লাবিত হয়েছে।
জামালপুর: জেলার বন্যা পরিস্হিতি দিন দিন চরম অবনতি হচ্ছে। যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে পানি ১৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ৩২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, বকসিগঞ্জ ও জামালপুর সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। দেওয়ানগঞ্জ-খোলাবাড়ি সড়কের মন্ডল বাজার এলাকায় পাকা রাস্তা ভেঙ্গে উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
নাসিরনগর(ব্রাহ্মণবাড়িয়া): উপজেলার বিভিন্ন নদ-নদীতে প্রায় ৪ ফুট পানি বেড়েছে। শনিবার রাতে পানির তোড়ে উপজেলার বুড়িশ্বর ইউনিয়নের একটি ব্রিজ ভেঙ্গে যাওয়ায় কয়েকটি এলাকার বাসিন্দা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উপজেলার তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক প্লাবিত হয়েছে।
গাইবান্ধা: গাইবান্ধার সবগুলো নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জেলার চারটি উপজেলার নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে উপজেলাগুলোর নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের ঘড়বাড়িতে কোথাও হাটু আবার কোথাও কোমর পানি উঠেছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। ঘাঘটের পানির চাপে গাইবান্ধা শহররক্ষা বাঁধ ডেভিড কোম্পানীপাড়া ও কুঠিপাড়া এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।




