ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন পরিচালনায় যুক্ত শীর্ষ ব্যক্তিরা জেনেশুনে অনিয়মকে অস্বীকার করে মূলত অনিয়মকারীদের সঙ্গেই আঁতাত করেছেন।
রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শুক্রবার দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন। তিনি মন্তব্য করেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সচিব যদি ভোটে ঘটে যাওয়া অনিয়ম অস্বীকার করেন, তবে স্পষ্ট যে তারা ওই অনিয়মকারীদের সঙ্গে আপস করেছেন এবং নিজেদের পদের প্রতি সুবিচার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ঢাকা থেকে খুলনা ও কুষ্টিয়া অভিমুখে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের দীর্ঘ লংমার্চের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি জানাতে মূলত এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।
এর আগে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে এবং সার্বিক পরিচালনায় নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। একইভাবে ভোটের দিনে কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল পর্যবেক্ষণ শেষে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীনও নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হওয়ার দাবি করেন এবং ১১-দলীয় জোটের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সমাধান করা হয়েছে বলে জানান। এ নির্বাচনে মির্জা ফয়সলের কাছে এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত হন জামায়াতের প্রার্থী।
তবে ইসির এই দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, উপনির্বাচনে প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তারা পরিচয়পত্র বা ব্যাজ ছাড়াই দায়িত্ব পালন করেছেন। ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্মকর্তা পরিচয় জানতে চাইলে তড়িঘড়ি করে কাগজে কলমে নাম লিখে পকেটে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যার কোনো নিয়োগপত্র তারা দেখাতে পারেননি। ফলে তারা আদৌ ইসি নিয়োগকৃত কর্মকর্তা কি না তা নিশ্চিত হওয়ার উপায় ছিল না। এ ছাড়া কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ফল ঘোষণা না করেই পুলিশের গাড়িতে চড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের সমর্থকরা গাড়ি আটকে দেন। আগে থেকে ব্যালটে সিল মারা, জাল ভোট দেওয়া এবং কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ইসি সচিবের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য নির্বাচনে সংঘটিত অনিয়মকে একপ্রকার বৈধতা দিয়েছে। তবে পুরো উপনির্বাচনের ফল নিয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করতে চান না তারা। তৃণমূল পর্যায় থেকে আরও বিস্তারিত তথ্য আসছে, যা পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে দলগতভাবে পরবর্তী বক্তব্য দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণভোট বাস্তবায়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, সরকারকে অবশ্যই গণভোটের রায় মেনে নিতে হবে, অন্যথায় চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। সরকার একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী আচরণ অব্যাহত রাখলে রাজনীতি সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে এবং সরকারই দেশকে সেই পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জামায়াত সংসদের মধ্য দিয়েই এই সংকটের নিরসন চায়। আগামী ৯ নভেম্বর সংসদের অধিবেশন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, জনগণ গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে মত দিয়েছে। তাই বিশেষ কমিটির প্রয়োজন না দিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডেকে জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটানো উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে শনিবার শুরু হতে যাওয়া জামায়াত ও ১১-দলীয় ঐক্যের খুলনামুখী লংমার্চের সার্বিক পথনকশা তুলে ধরা হয়। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম থেকে বহর শুরু হয়ে হানিফ ফ্লাইওভার, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, খুলনা ও রূপসা সেতু পার হয়ে যশোর ও কুষ্টিয়ার দিকে যাবে। প্রায় ৪২৫ কিলোমিটারের এই যাত্রাপথে ১৯টি জেলা অতিক্রম করা হবে এবং পথের নানা পয়েন্টে একাধিক পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। শুরুতে ৬৫০ থেকে ৭০০টি গাড়ি থাকলেও পথে বিভিন্ন জেলা থেকে আরও বহর যুক্ত হয়ে খুলনায় পৌঁছানোর সময় গাড়ির সংখ্যা প্রায় ১ হাজারে দাঁড়াবে। পরবর্তী সময়ে যশোর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া থেকে আরও যানবাহন যুক্ত হয়ে কুষ্টিয়া জেলা স্টেডিয়াম পৌঁছানো নাগাদ প্রায় দেড় হাজার গাড়ির দীর্ঘ বহর তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
লংমার্চের কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে দলীয় নেতা-কর্মীদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন জামায়াত সেক্রেটারি। তিনি জানান, যাত্রাপথে কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য বা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে এমন স্লোগান দেওয়া যাবে না। কোনো বাধা বা উসকানির মুখে পড়লেও গাড়ি থেকে না নেমে ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখতে হবে। প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তর থেকে এই কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস মিলেছে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া বিমানবাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তার নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তীতে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চরম ব্যর্থতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, মতিউর রহমান আকন্দ ও সেলিম উদ্দিনসহ দলের একাধিক শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন।




