মাহবুবুর রহমান: আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব বসতি দিবস। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। মানুষের বাসস্থান, নগরায়ণ, ভূমি, মৌলিক নাগরিক সুবিধা এবং পরিকল্পিত ও টেকসই নগর উন্নয়নের বিষয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। এ বছর বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য—“Adequate Housing for All”, অর্থাৎ “সবার জন্য পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত আবাসন”। জাতিসংঘের মতে, নিরাপদ ও উপযুক্ত আবাসন শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি মৌলিক অধিকার। বিশ্বজুড়ে আবাসন সংকট এখন বড় মানবিক ও নগর উন্নয়ন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ৩ বিলিয়নের বেশি মানুষ পর্যাপ্ত আবাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত, আর ১ বিলিয়নের বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক বসতি ও বস্তিতে বসবাস করছেন। সংঘাত, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
আবাসন শুধু একটি ঘর নয়
বিশ্ব বসতি দিবসের এবারের বার্তায় আবাসনকে কেবল একটি ভবন বা বসবাসের জায়গা হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক অধিকার হিসেবে বিবেচনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, উপযুক্ত আবাসনের সঙ্গে নিরাপদ ভূমির অধিকার, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই শুধু নতুন বাড়ি নির্মাণ করলেই আবাসন সমস্যা সমাধান হবে না; প্রয়োজন পরিকল্পিত ও সেবাসমৃদ্ধ বসতি। এ জন্য এ বছরের বিশ্ব বসতি দিবসে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের পাশাপাশি secure land tenure, well-planned neighbourhoods, adequate basic services এবং বিভিন্ন ধরনের housing options নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক আবাসন, সরকারি আবাসন, ভাড়াভিত্তিক আবাসন, সমবায়ভিত্তিক আবাসন এবং কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন আবাসন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ দ্রুত নগরায়ণ
বাংলাদেশে বিশ্ব বসতি দিবসের গুরুত্ব আরও বেশি। জনসংখ্যার ঘনত্ব, সীমিত ভূমি, দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আগমন এবং আয়-বৈষম্যের কারণে দেশের বড় শহরগুলোতে আবাসন ও নাগরিক সেবার ওপর চাপ বাড়ছে। UN-Habitat-এর বাংলাদেশ বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, দেশের নগর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ৬২ মিলিয়ন মানুষ শহরাঞ্চলে বসবাস করছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে এই নগর জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জলবায়ু-অভিবাসীরাও ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের দিকে আসছেন। এই দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে যদি পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, আবাসন, পরিবহন, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবার সমন্বয় না থাকে, তাহলে শহরের ওপর চাপ আরও বাড়বে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতি, নিম্নমানের আবাসন এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। UN-Habitat-ও বাংলাদেশে নগর দারিদ্র্য, বস্তি ও underserved settlements এবং substandard, overcrowded ও unhealthy housing conditions-কে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের জন্য বার্তা
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুই নগরকেন্দ্র ঢাকা ও চট্টগ্রাম। কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কারণে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এই দুই শহরে আসছেন। ফলে আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু জমির মূল্য বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত আবাসন, জলাবদ্ধতা, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং নাগরিক সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও পাহাড়, সমুদ্র, নদী, খাল, জলাধার ও বিভিন্ন পরিবেশগত সংবেদনশীল এলাকা বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শিল্প, বন্দর, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবাসন ও নাগরিক অবকাঠামো উন্নয়ন না হলে নগরায়ণের সুফলের পাশাপাশি পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন বাড়াচ্ছে আবাসনের ঝুঁকি
বাংলাদেশের জন্য আবাসন সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কারণে অনেক মানুষ নিজ বসতভিটা হারিয়ে নতুন এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হন। এ ধরনের বাস্তুচ্যুত মানুষ যখন শহরে এসে বসতি স্থাপন করেন, তখন শহরের আবাসন, পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও কর্মসংস্থানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। UN-Habitat বলছে, বাংলাদেশে জলবায়ু অভিবাসন ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের দিকে বাড়ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে এই জনগোষ্ঠী শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ হলে তারা অনিরাপদ ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
দরকার সাশ্রয়ী আবাসন নীতি
বিশ্ব বসতি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বার্তা বহন করছে—আবাসনকে শুধু বেসরকারি বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, সামাজিক আবাসন, স্বল্পমূল্যের আবাসন প্রকল্প, ভাড়াভিত্তিক আবাসন এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক আবাসন উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন পরিকল্পনার সঙ্গে কর্মসংস্থান, গণপরিবহন ও নাগরিক সেবা একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। কর্মস্থল থেকে অনেক দূরে আবাসন তৈরি করলে মানুষের যাতায়াত ব্যয় বাড়ে এবং শহরে যানজটও বাড়তে পারে। তাই ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনায় Housing + Transport + Employment + Basic Services—এই চারটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অনানুষ্ঠানিক বসতি উন্নয়নও জরুরি
শহরের বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাসকারী মানুষকে উচ্ছেদ করে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়াই আবাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন যেখানে সম্ভব সেখানে বসতি উন্নয়ন, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। যেসব এলাকা বাস্তবিক অর্থেই ঝুঁকিপূর্ণ, সেসব ক্ষেত্রে নিরাপদ ও পরিকল্পিত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতিসংঘের এবারের বার্তাতেও নিম্নআয়ের পরিবার, গৃহহীন মানুষ, সংকট ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রয়োজন ভূমির নিরাপত্তা ও পরিকল্পিত বসতি
আবাসন সংকট সমাধানে শুধু ভবন নির্মাণ নয়, ভূমি ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ ভূমির অধিকার না থাকলে নিম্নআয়ের মানুষ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল আবাসন গড়ে তুলতে পারেন না। অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি, জলাভূমি, খাল বা পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা আবাসিক ব্যবহারে চলে গেলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, বন্যা ও পরিবেশগত সংকট বাড়তে পারে। এ কারণে নগর সম্প্রসারণের আগে প্রয়োজন ভূমির ব্যবহার নির্ধারণ, পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি master plan-এর সঙ্গে আবাসন উন্নয়নকে সামঞ্জস্য করা।
আবাসন হতে হবে জলবায়ু-সহনশীল
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আবাসন পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়টি এখন আর ঐচ্ছিক নয়। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি, নদী ও নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি এবং শহরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভবন ও বসতি পরিকল্পনা করতে হবে। UN-Habitat-এর এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের আলোচনায়ও আবাসনকে environmentally sustainable এবং climate-resilient করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আজ থেকে শুরু হচ্ছে Urban October
বিশ্ব বসতি দিবসের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের Urban October কর্মসূচিও শুরু হচ্ছে। অক্টোবরজুড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নগরায়ণ, আবাসন, জলবায়ু, পরিবেশ, নগর প্রশাসন ও টেকসই শহর নিয়ে আলোচনা ও কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। মাসটির সমাপ্তি হবে ৩১ অক্টোবর World Cities Day পালনের মধ্য দিয়ে। এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের বৈশ্বিক আয়োজন ৫ থেকে ৮ অক্টোবর ওমানের মাসকাটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের সরকার, স্থানীয় সরকার, নগর পরিকল্পনাবিদ, উন্নয়নকর্মী, আবাসন বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য অংশীজন একত্রিত হয়ে সবার জন্য উপযুক্ত আবাসন নিশ্চিতের নীতি ও বাস্তব সমাধান নিয়ে আলোচনা করছেন।
‘সবার জন্য আবাসন’ বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
বিশ্ব বসতি দিবসের মূল বার্তা হচ্ছে—একটি শহর তখনই সফল, যখন সেখানে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী, স্বাস্থ্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের সুযোগ থাকে। জাতিসংঘের মহাসচিবের এবারের বার্তায় বলা হয়েছে, উপযুক্ত আবাসন মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুযোগের ভিত্তি। আবাসনে বিনিয়োগ দারিদ্র্য কমাতে, বৈষম্য মোকাবিলা করতে এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য সরকার, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন অংশীদার ও জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বার্তা প্রযোজ্য। আগামী দিনের নগরায়ণকে শুধু ভবন নির্মাণ বা রাস্তা সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবনমান, আবাসন, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করতে হবে। বিশ্ব বসতি দিবস তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়—একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ঘর মানুষের অধিকার; আর একটি পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই শহর গড়ে তোলা রাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। সবার জন্য উপযুক্ত আবাসন নিশ্চিত করা গেলে শুধু ঘরের সংকটই কমবে না; একই সঙ্গে কমবে দারিদ্র্য ও বৈষম্য, বাড়বে জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, শক্তিশালী হবে সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং তৈরি হবে জলবায়ু-সহনশীল ভবিষ্যৎ নগর। বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য তাই বাংলাদেশের জন্যও একটি স্পষ্ট আহ্বান—উন্নয়ন হোক মানুষের জন্য, নগর হোক সবার জন্য, আর আবাসন হোক নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ।
মাহবুবুর রহমান- লেখক, মানবাধিকার কর্মী।




