নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী ১১ নম্বর ব্রিজ সংলগ্ন কড়াইল বস্তির পূর্ব পাশের লেকপাড়। কড়াইল বস্তি ঘেঁষে থাকা ‘মাটির রাস্তা’ নামক স্থানটি এখন পরিণত হয়েছে ভয়ংকর এক মাদক স্পটে। হাত বাড়ালেই সেখানে মিলছে হিরোইন, ইয়াবা, গাঁজা থেকে শুরু করে ফেনসিডিল। বনানী ও আশেপাশের এলাকায় এভাবে প্রকাশ্যে ও সহজে মাদক বিকিকিনির চিত্র আগে কখনো দেখা যায়নি বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আগে মোহাম্মদপুরের নির্দিষ্ট কিছু স্পটে যেভাবে প্রকাশ্যে মাদকের বাজার বসত, ঠিক সেই রূপ নিয়েছে বনানীর এই ‘মাটির রাস্তা’। স্থানটিতে যেকোনো নতুন মুখ পৌঁছানো মাত্রই অনায়াসে মিলছে সব ধরনের প্রাণঘাতী মাদক। এই মাদক স্পটের কারণে কেবল কড়াইল বস্তিই নয়, বনানী, গুলশান ও আশেপাশের এলাকার তরুণ ও যুবসমাজ দ্রুত ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসক্তরা ভিড় জমাচ্ছে এই মাটির রাস্তায়।
লেক ঘেঁষে অবস্থান হওয়ায় স্থানটি মাদক কারবারিদের জন্য নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। লেকের পানিতে নৌকা চলাচলকে কাজে লাগিয়ে কৌশলে রুট পরিবর্তন করে মাদকের চালান পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে স্পটে। নৌপথ ব্যবহারের কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানো কিংবা দ্রুত সটকে পড়া সহজ হয়ে উঠেছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।
জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারের মন্ত্রীরা প্রায়ই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার বাণী শোনান। তবে, মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কড়াইল বস্তির ভেতরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার খবর মাঝে মধ্যেই পাওয়া যায়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ‘মাটির রাস্তা’ নামক এই ভয়ংকর স্পটে অভিযানে কোনো মাদক কারবারিকে খুঁজে পাওয়া যায় না। অভিযান পরিচালনাকারীরা কি সেখানে সত্যি মাদক ব্যবসায়ী খুঁজে পান না, নাকি তাদের খোঁজার সদিচ্ছাই নেই—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন ‘মাটির রাস্তা’ মাদক স্পটের নাম ঘুরলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কানে তা না পৌঁছানোয় নেপথ্যে কোনো প্রভাবশালী ‘অদৃশ্য শক্তি’ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বনানী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বনানীর মতো জায়গায় এত সহজে ও প্রকাশ্যে মাদক বিকিকিনি হবে, তা আমরা আগে কখনো দেখিনি। আমাদের সন্তানরা আজ চরম ঝুঁকিতে। কড়াইল বস্তির ভেতরে নাটকীয় অভিযান হয়, কিন্তু মূল স্পট ‘মাটির রাস্তা’ থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এখানে নিয়মিত বেচাকেনা চললেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয় না।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি (গুলশান বিভাগ) উপ-কমিশনার মোহাম্মদ রুহুল কবির খাঁন বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। ‘মাটির রাস্তা’ কেন্দ্রিক মাদক কারবারের বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেখানে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে দ্রুতই বিশেষ চিরুনি অভিযান চালানো হবে। কোনো মাদক কারবারি বা তাদের নেপথ্যের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ঢাকা মেট্রো) উত্তর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোঃ. রাজিউর রহমান জানান, “লেকের নৌপথ ব্যবহার করে মাদক সরবরাহের তথ্যটি নতুন। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। শিগগিরই কড়াইল লেকপাড় ও মাটির রাস্তা এলাকায় ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
অভিজাত বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকার কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই মাদকের ভয়াল থাবা এখনই উপড়ে ফেলতে না পারলে পুরো বনানী-গুলশান অঞ্চলের তরুণ প্রজন্ম চরম বিপর্যয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।




